বাড়িতে বাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানাের অনুমতি চাই
এ সরকার নানা কাজ করছে, যা এর আগে ছিল অভাবনীয়। সেসব কাজ প্রশংসিত হচ্ছে। সরকার কি আরেকটি কাজ করতে পারে? আমার বাসার ছাদে আমি একটা বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা ওড়াতে চাই, সরকার কি তার অনুমতি দিতে পারে? বিশ্বকাপ ফুটবলের সময় বাংলাদেশের বাড়িতে বাড়িতে, আঙিনায় ছাদে আমরা অনেক উড়িয়েছি আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিলের পতাকা, এমনকি জার্মানি, ফ্রান্স, ইতালির পতাকাও দুলক্ষ্য ছিল না। কিন্তু এবার আমরা ওড়াতে চাই বাংলাদেশের পতাকা।
বাড়িতে, গাড়িতে, গাছের চূড়ায়। বাংলাদেশ খেলছে বিশ্বকাপে। আমরা পতাকা ওড়াব না? আর্জেন্টিনা এই সেবারও প্রথম রাউন্ড থেকে বিদায় নিয়েছিল, তাই বলে তাে দেশে আর্জেন্টিনার পতাকা ওড়ানােয় খামতি ছিল না। আমাদের নিজেদের দেশ খেলছে বিশ্বকাপ, আর আমরা নিজেদের পতাকা ওড়াব না? পতাকা নিয়ে মিছিল করব না? হাবিবুল বাশারের স্ত্রী শাওন বাশার সেই আবেদনই জানিয়েছেন, আপনারা সবাই পতাকা ওড়ান, বাংলাদেশের পতাকা।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন করব না? আসলে ১৬ ডিসেম্বর বা ২৬ মার্চ ছাড়া বেসরকারি ভবনে পতাকা ওড়ানাের নিয়ম নেই। আলবদর-প্রধানটি মন্ত্রী হয়ে গাড়িতে পতাকা উড়িয়েছিলেন, কিন্তু আমাদের দেশে অমন্ত্রীদের, নাগরিকদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা ওড়ানাে বৈধ নয়।
রম্য কথা -পর্ব-(৯)
আসলে পতাকা নিয়ে আমাদের কতগুলাে শুচিবায়ুগ্রস্ততা আছে। আমেরিকানদের নেই। ১৯৯৫ সালে আমেরিকার আইনসভায় একটা বিল তােলা হয়েছিল; জাতীয় পতাকা পােড়ানাে যাবে না-এই ছিল বিলের মর্ম। সেটা পাস হয়নি। কারণ পতাকা পােড়ানাে নাগরিকের মত প্রকাশের অধিকার, এটাকে নিষিদ্ধ করা যায় না। ওরা পতাকা দিয়ে পােশাকই নয়, অন্তঃপােশাকও বানায়। পতাকা দিয়ে করে না, এমন কোনাে কাজ নেই। তাই বলে কি আমেরিকানদের দেশপ্রেম ধুলায় মিশে গেছে। যে দেশে পতাকা পােড়ানাে বেআইনি নয়, সেই দেশটা পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রতাপশালী দেশ।
আর আমরা, আমাদের সােনার ছেলেরা যখন খেলছে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় উৎসবে, ভারতের মতাে পরাশক্তিকে হারিয়ে দিচ্ছে ঘােষণা দিয়ে, যখন তাদের কাছে প্রস্তুতি ম্যাচে হেরে গেছে নিউজিল্যান্ডও, যখন বাংলাদেশ বাংলাদেশ’ বলে গ্যালারিতে নেচে উঠেছে ওয়েস্ট ইন্ডিয়ানরাও, তখন আমরা কেন মেতে উঠব না আমাদের জাতীয় পতাকা আর জাতীয় সংগীত নিয়ে। |
আমাদের আছে মাশরাফি বিন মুর্তজার মতাে স্ট্রাইকার বােলার। প্রকৃতি পেসার, কলার উঁচাননা, চোখে আগুন, চিবুকে ইস্পাতের দৃঢ়তা। ১৯৯৬ সালে ডেভ হােয়াটমাের শ্রীলঙ্কাকে চ্যাম্পিয়ন করতে ব্যবহার করেছিলেন প্রথম ১৫ ওভারের ফিল্ডিং বাধ্যবাধকতার সুযােগ, পকেট থেকে বের করেছিলেন জয়াসুরিয়াকে।
আমাদেরও আছে তামিম ইকবাল, শাহরিয়ার নাফীস, আফতাব। আমাদের আছে রফিক আর রাজ্জাকের মতাে বিশ্বমানের বােলার। আমাদের আছে আশরাফুল, হাবিবুল বাশার। আমাদের আছে সাকিব, মুশফিকুর রহিমের মতাে বিস্ময়বালক। আমরা লড়ব। আমরা মাঠে নামার আগে হেরে বসব না। আর আমরা সবাই জানি, ক্রিকেট কেবল দক্ষতা আর যােগ্যতার খেলা না, ক্রিকেট হলাে হৃৎপিণ্ডের খেলা।
রম্য কথা -পর্ব-(৯)
ক্রিকেট হলাে স্নায়ুর খেলা। যে যাকে চেপে ধরতে পারে, যে যার ওপরে চড়াও হতে পারে। বাংলাদেশ এবার স্নায়ুর লড়াইয়ে এগিয়ে ছিল ভারতের চেয়ে। সত্যিকারের বাঘের মতাে খেলেছে তারা, আর তুলনায় ভারতীয়রা-ক্রিকইনফো ডট কমের সহকারী সম্পাদক আনন্দ বসু লিখেছেন তাঁর লেখায়-খেলেছে মেষশাবকের মতাে।
অন্য দেশের হয়ে অনেক খেলা দেখেছি, বিশ্বকাপ ফুটবল আর ক্রিকেট দেখতে কাটিয়েছি অনেক বিনিদ্র রাত। এবার আমরা রাত জাগছি নিজের দেশের জন্য। এবার যদি আমার টিম জেতে, তাহলে আমার দেশও যে জিতে যাবে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা হারায় অনেক কান্নাকাটি করেছি, এবার কাঁদতে চাই নিজের দেশের জয়ের আনন্দে। পরাজয়ের কথাটা এখন আর ভাবতেই চাই না। জিততে থাকুক। কারণ আমাদের হাবিবুল বাশাররাই শিখিয়েছেন, আমরা জেতার জন্য মাঠে নামি এখন, কিশাের তামিম ইকবাল যেমনটা বলেছেন, আমি কোনাে নামের বিরুদ্ধে খেলি,খেলি বােলারের বিরুদ্ধে।
আজকে আমাদের এই জায়গাটায় নিয়ে গেছে আমাদের ক্রিকেট টিম। নিয়ে গেছেন ডেভ হােয়াটমাের। আমাদের সারাক্ষণের প্রার্থনা-খেলােয়াড়েরা সুস্থ থাকুক, সুস্থ থাকুক ডাক্তারের ছুরির নিচে একাধিকার ফালি হওয়া মাশরাফির হাঁটু আর পিঠ। ফরমে থাকুক আমাদের ক্রিকেটাররা। জয় চাই, আরও চাই। অনেক মার খেয়েছি, অনেকবার, আমরা, এই দেশের জনগণ, নানাভাবে-রাজনীতিতে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে, অভাবে, স্বভাবে, প্রাকৃতিক দুর্ঘটনায় । এইবার আমরা আমাদের দেশ নিয়ে মাতব, হাসব, কাদব, ভালােবাসার প্রকাশ ঘটাব।
রম্য কথা -পর্ব-(৯)
আমরা এবার আমাদের বাসায় বাসায় উড়াব জাতীয় পতাকা। মাথায় বাঁধব, হাতে দোলাৰ, সাইকেলে বাঁধব-এই অনুমতিটা কি সরকার দিতে পারে? | জাতীয় পতাকার যথেচ্ছ ব্যবহার করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি পৃথিবীর শক্তিশালীতম দেশ হয়ে টিকে থাকতে পারে, জাতীয় পতাকার আবেগ ও ব্যবহার নিশ্চয়ই আমাদের কোনাে ক্ষতি করবে না?
এই সরকারই সম্ভবত পারে একটা তথ্যবিবরণীর মাধ্যমে এই অনুমতিটা আমাদের দিয়ে দিতে। | (পাদটীকা: এই বছর কে চ্যাম্পিয়ন হবে, সেটা আমি বলব না। লন্ডন টাইমস এর ভারত-বাংলাদেশ খেলার রিপাের্টে বলা হয়েছে, এটা কি বিস্ময়? আসলে অসাধারণ সব প্রতিভা আর প্রচণ্ড প্রাণসঞ্চারী বাংলাদেশ উঠে আসছে, এটা তারই প্রমাণ। এমনকি তারা এবারই প্রথম বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়নও হতে পারে।
কিন্তু ক্রিকেট-বিশ্লেষকেরা বলছেন ২০১১ সালে কে চ্যাম্পিয়ন হবে। ওই বিশ্বকাপের একটা স্বাগতিক দেশ বাংলাদেশ, ১৯৯৬ সালে যেমন ছিল শ্রীলঙ্কা, আর তখন তাদের সঙ্গে ছিলেন ডেভ হােয়াটমাের, ২০১১ সাল পর্যন্ত যদি তিনি থাকেন, আর সাকিব মুশফিকুর-তামিমের মতাে বিস্ময়কর বালকেরা যদি পাইপলাইনে আসতেই থাকে, আপনিই বলুন, কে হচ্ছে ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের চ্যাম্পিয়ন)
২০ মার্চ ২০০৭
Read more
