রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১)

প্রস্তাবনা 

একুশ খুব অদ্ভুত একটা বয়স। 

এই বয়সে মাথায় বিচিত্র সব পাগলামি ভর করেবুকের ভেতর থাকে এক ধরনের অস্থিরতাসেই অস্থিরতার একটি রূপ হল কী যেন নেই, কী যেন নেইঅনুভূতি

রূপালী দ্বীপসেই কী যেন নেইকে খোঁজার চেষ্টাও এই বয়সেই প্রথম দেখা দেয়পৃথিবীর বেশির ভাগ সাধুসন্ত এই বয়সে গৃহত্যাগ করেন। 

চার বছর আগে জানুয়ারি মাসের এক প্রচণ্ড শীতের রাতে একুশ বছর বয়েসী একদল ছেলেমেয়ে নিয়ে একটা উপন্যাস লিখতে বসেছিলামউপন্যাসের নাম দারুচিনি দ্বীপসেই উপন্যাসে একদল ছেলেমেয়ে ঠিক করল, তারা দল বেধে বেড়াতে যাবে প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন আইল্যান্ডেসেখানে কাটাবে পূর্ণচন্দ্রের একটি অপূর্ব রাতআমি উপন্যাস শেষ করব জোছনার সুন্দর একটা বর্ণনা দিয়ে। 

পাত্রপাত্রীদের আমি কিন্তু প্রবাল দ্বীপ পর্যন্ত নিতে পারিনিতার আগেই উপন্যাস শেষ করতে হয়েছে, কারণ আমি নিজে তখনো দ্বীপে যাইনিস্বপ্নের সেই দ্বীপ কেমন আমি জানতাম না| এখন জানিসেই অপূর্ব দ্বীপে আমি নিজে এক টুকরো জমি কিনে কাঠের একটা ছােট্ট ঘর বানিয়েছিতার নাম দিয়েছি সমুদ্র বিলাসফিনিকফোটা জোছনায় আমি দেখেছি জ্বলন্ত সমুদ্রফেনাআহা, কী দৃশ্য ! সেই প্রায় পরাবাস্তব ছবি দেখতে দেখতে মনে হয়েছে, তরুণতরুণীদের শেষ পর্যন্ত নিয়ে যাইনা সমুদ্রের কাছে

রূপালী দ্বীপ -পর্ব-১

যেখানে শেষ করেছিলাম দারুচিনি দ্বীপসেখান থেকেই শুরু হােক নতুন গল্প রূপালী দ্বীপ| আসুন, রূপালী দ্বীপের পাত্র-পাত্রীদের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় 

করিয়ে দিই। 

ঘন্ট্য পড়ে গেছেকমলাপুর রেল স্টেশন থেকে এক্ষুনি ছেড়ে দেবে চিটাগাং মেলদারুচিনি দ্বীপের যাত্রীরা সবাই উঠে পড়েছে ট্রেনেএকজন শুধু ওঠেনিসে হল বন্দুবন্টুর ভাল নাম অয়নঅর্থাৎ পর্বতপর্বত নাম হলেও এই ছােটখাট মানুষটা মাথা নিচু করে প্ল্যাটফর্মের অন্ধকার কোণায় দাড়িয়েসে যাচ্ছে না, অথচ তারই যাবার আগ্রহ ছিল সবচেবেশিসে চাঁদার টাকাটা জোগাড় করতে পারেনিঅথচ তার আশা ছিল, শেষ মুহূর্তে হলেও টাকা জোগাড় হবেহয়নি। 

প্ল্যাটফর্মে দারুচিনি দ্বীপের দলটাকে বিদায় জানাতে মুনা এসেছে বাবার সঙ্গেমুনার ভাই সঞ্জু যাচ্ছেআপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে, মুনা তার ভাইকে বিদায় জানাতেই এসেছেএই প্রকাশ্য কারণের বাইরে আছে একটি অপ্রকাশ্য কারণপ্রকাশ্য কারণ হল অয়নমুনা আসলে এসেছে অয়নকে বিদায় জানাতেঅতি প্রিয়জনদের হাত নেড়ে বিদায় জানাতে খুব কষ্ট হয়, আবার এই কষ্টের সঙ্গে এক ধরণের আনন্দও থাকেমুন৷ মাকাছ থেকে টাকা চুরি করে অয়নকে একটা হালকা নীল রঙের স্যুয়েটার কিনে দিয়েছেকথা ছিল এই সুয়েটার গায়ে সে ট্রেনে উঠবে

মুনা কল্পনার দৃষ্টিতে পরিস্কার দেখতে পাচ্ছে অয়ন নীল রঙের স্যুয়েটার পরে ট্রেনের কামরা থেকে গলা বের করে তার দিকে তাকিয়ে খুব হাত নাড়ছেআর সে দেখেও না দেখার ভান করছেসে.ঠিক করে রেখেছে, ভাল করে তাকাবেও নাঅয়ন ভাইয়ের দিকে ভাল করে তাকালেই তার চোখে পানি এসে যায়এই অদ্ভুত ব্যাপারটা কেন হয় কে জানে? আজ সে এটা হতে দেবে নাকিছুতেই তাকাবে নাদরকার হলে চোখ বন্ধ করে রাখবে। 

রূপালী দ্বীপ -পর্ব-১

গার্ড সবুজ ফ্লাগ দোলাচ্ছেসবাই ট্রেনে উঠে পড়েছেশুধু মোতালেব প্ল্যাটফর্মে দাড়িয়ে উদ্বিগ্ন চোখে এদিকওদিক দেখছেসবাই আছেএক্ষুনি ট্রেন ছেড়ে দেবেতাহলে কি অয়ন যাচ্ছে না? মােতালেব ভাইকে জিজ্ঞেস করতেও লজ্জা লাগছেমুনার ধারণা, প্রশ্রটা করলেই মােতালেব ভাই অনেক কিছু টের পেয়ে যাবেনতিনি ভুরু কুঁচকে তাকাবেনযে তাকানাের অর্থ হচ্ছে হঠাৎ করে অয়নের কথা কেন? ব্যাপারটা কী? ব্যাপারটা যে কী তা মুনা কাউকে বলতে চায় না

কাউকে নাঅয়নকে তাে কখনােই নামরে গেলেও সে তার গােপন ভালবাসা কাউকে জানাবে নাঅন্যদের মতাে অয়নকে নিয়ে ঠাট্টাতামাশা করবেঅন্যরা যেমন ডাকে বন্টুসেও ডাকবে বন্টু ভাই  মােতালেব ট্রেনের কামরায় উঠতে যাচ্ছেমুনা আর থাকতে পারল নাপ্রায় ফিসফিস করে বললাে, মােতালেব ভাই, অয়ন ভাইকে তাে দেখছি নাউনি 

আপনাদের সঙ্গে যাচ্ছেন না

মােতালেব বিরক্ত মুখে বলল, যাওয়ার তাে কথা, গাধাটা এখনাে কেন আসছে 

কে জানে? ট্রেন মিস করবেগাধাটা সবসময় এরকম করেআগে একবার পিকনিকে গেলামসে গেল নাপরে শুনি, চাঁদার টাকা জোগাড় হয়নিআরে, একজন চাদা না দিলে কী হয়? সবাই তাে দিচ্ছি। 

রূপালী দ্বীপ -পর্ব-১

মুনা ক্ষীণ স্বরে বলল, ওনার কি টাকার জোগাড় হয়নি? মােতালেব বলল, কী করে বলবআমাকে তো কিছু বলেনি। 

মুনা অসম্ভব রকম মনখারাপ করে বাবার কাছে চলে এলআর তখনি সে অয়নকে দেখলঅয়ন শুকনাে মুখে দাঁড়িয়ে আছেতার দাঁড়ানাের ভঙ্গি থেকেইবােঝা যায়, সে চাচ্ছে না কেউ তাকে দেখে ফেলুকমুনা চেঁচিয়ে ডাকল, অয়নভাই! অয়ন ভাই

অয়ন প্ল্যাটফর্মে গাদা করে রাখা প্যাকিং বাক্সগুলির আড়ালে সরে গেলমুনএগিয়ে গেলপিছনে এলেন সােবাহান সাহেব। 

মুনা বলল, অয়ন ভাই, আপনি যাচ্ছেন না? ট্রেন তো ছেড়ে দিচ্ছে। 

অয়ন কী বলবে ভেবে পেল নাসােবাহান সাহেব উত্তেজিত গলায় বললেন, দৌড়ে গিয়ে ওঠোসিগন্যাল দিয়ে দিয়েছে

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *