‘আনুশকা মন খারাপ করে আছে। তুমি নাকি তার সঙ্গে ঝগড়া করেছ?
জরী কিছু বলল না। জানালার অন্ধকারের দিকে মুখ ঘুরিয়ে বসল। বৃষ্টি থেমে গেছে। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে।
জরী হাই তুলতে তুলতে বলল, প্রচণ্ড ঘুম পাচ্ছে। ইস, একটা পুরাে কামরা যদি আমার একার থাকত, তা হলে দরজা বন্ধ করে হাত–পা ছড়িয়ে কী আরাম করে ঘুমুতাম !
শুভ্র ইতস্তত করে বলল, আমি একটা খালি কামরার ব্যবস্থা করতে পারি। করব?
‘একটা পুরো কামরা শুধু আমার জন্যে ? ‘কীভাবে করবে?
‘কীভাবে করব তা তােমার জানার দরকার নেই। করব কি না সেটাই জানতে চাচ্ছি।
প্লীজ শুভ্র, করাে। কীভাবে করবে ? ‘ম্যাজিক। বড়লােকদের হাতে অনকে ধরনের ম্যাজিক থাকে।
শুভ্র বুফে কারের বাইরে এসে দেখে, সুলেমান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে। সুলেমান মনে হল শুভ্রকে দেখে লজ্জা পাচ্ছে। সে চলে যেতে ধরেছিল, শুভ বলল, একটা কামরার ব্যবস্থা করুন।
সুলেমান হতভম্ব গলায় বলল, আপনাদের দুজনের জন্যে? “না, একজন শুধু যাবে। তার শরীর খারাপ। ‘ও অচ্ছি। আমি স্যার, ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। ‘ভয় পাবার কিছু নেই। ‘একজন ডাক্তারের ব্যবস্থা কি স্যার করব?” ‘আপনি কি ডাক্তারও সঙ্গে নিয়ে এসেছেন?”
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৪
‘জি না স্যার। খুঁজে বের করব। এত বড় ট্রেন, একজন–না—একজন ডাক্তার তাে থাকবেনই। ডাক্তার কি লাগবে স্যার?”
‘আমার ব্যবহারে অসন্তুষ্ট হবেন না স্যার।
শুভ্র বিস্মিত হয়ে তাকাল। লােকটাকে এখন আর তার এত খারাপ লাগছে না। কী রকম বিনীত ভঙ্গিতে তাকাচ্ছে।
ট্রেন এসে চাটগাঁয়ে থামল ভাের পাঁচটায়। চারদিক অন্ধকার। ভােরের কোনাে আভাস দেখা যাচ্ছে না। প্ল্যাটফর্মের আলাে কামরায় ঢুকছে। এই আলােটুকুই ভরসা, কারণ, ট্রেন প্ল্যাটফর্মে ঢােকার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ট্রেনের সব বাতি নিভিয়ে দেয়া হয়েছে।
রানার হাতে একটা পেনসিল টর্চ। প্রয়ােজনের সময় কোনো জিনিসই কাজ করে না। রানার পেনসিল টর্চও কাজ করছে না। বােতাম টিপে টিপে তার হাত ব্যথা হয়ে গেছে। অথচ এই পেনসিল–টর্চ রওনা হবার আগের দিন কেনা হয়েছে। রানা। উচু গলায় বলল, কেউ ট্রেন থেকে নামবে না, আনটিল ফাদার অর্ডার। যে যেখানে আছ সেখানেই থাক। মালের দিকে লক্ষ রাখাে। নাে মুভমেন্ট।
আনুশকা বলল, খামাখা চিৎকার কোরাে না তো। শুধু শুধু হৈচৈ করছ কেন? ‘শুধু শুধু হৈচৈ করছি? বাতি নেই কিছু নেই, এর মধ্যে একটা–কিছু যদি হয় ?
কী হবে?” অনেক কিছুই হতে পারে। জরী কোথায়? জরীকে তাে দেখছি না। ‘রানা, তােমার আলগী মাতব্বরি অসহ্য লাগছে। ‘অসহ্য লাগলেও কিছু করার নেই। সহ্য করে নিতে হবে। জরী কোথায়?”
শুভ্র বলল, জরী অন্য কামরায় ঘুমুচ্ছে। তার শরীর ভাল না।
রানা রাগী গলায় বলল, অন্য কামরায় ঘুমুচ্ছে মানে? কে ডিসিশান দিল? আমি কিছুই জানি না, আর দলের একজন মেম্বার অন্য কামরায় চলে গেল।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৪
আনুশকা বলল, চিৎকার বন্ধ করাে তাে রানা! যথেষ্ট চিঙ্কার হয়েছে। তুমি প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানাে। ইতিমধ্যে ভাের হবে। আমরা নামব।
‘দলের ভালমন্দ আমি দেখব না?” ‘তোমাকে কিছু দেখতে হবে না। অনেক দেখেছ।
রানা রাগ করে ট্রেন থেকে নেমে গেল। নামার সময় নইমার পা মাড়িয়ে দিয়ে গেল। ব্যাপারটা অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু নইমার ধারণা, রানা এই কাজটা ইচ্ছা করেই। করেছে। নইমা অল্পতেই কাতর হয়। পায়ের ব্যথায় সে কাতরাচ্ছে। নীরা বলল,
তুই এমনভাবে চিৎকার করছিস, তাতে মনে হচ্ছে হাঁটুর নিচ থেকে তাের পা খুলে পড়ে গেছে।
‘ব্যথা পেলে চিৎকার করব না? ‘এমন কিছু ব্যথা পাসনি যে ট্রেনের সব মানুষকে সেটা জানাতে হবে। ‘খামাখা ঝগড়া করছিস কেন? পায়ের চামড় খুলে গেছে – আর ..
‘তাের এত নরম চামড়ার পা তুই ফেলে ছড়িয়ে বসে আছিস কেন? কোলে নিয়ে বসে থাকলেই হত।
নইমা কোনাে কথা না বলে উঠে দাড়াল। পায়ে স্যান্ডেল পরল। আনুশকা বলল, যাচ্ছিস কোথায় ? নইমা বলল, দ্যাটস নান অব ইয়াের বিজনেস।
নইমা ট্রেন থেকে নেমে গেল। সে হাঁটতে শুরু করেছে ওভারব্রিজের দিকে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-১৪
জরীর খুব ভাল ঘুম হয়েছে। এসি দেয়া স্লীপিং বার্থের ব্যবস্থা ভাল। শুধু কামরাটা বেশি ঠাণ্ডা। কামরার অ্যাটেনডেন্ট বালিশ এবং কম্বল দিয়েছে। একা একটা কামরার দরজা বন্ধ করে ঘুমানাের আলাদা আনন্দ আছে। জরী অনেকদিন পর খুব আরাম করে ঘুমুল। মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখল – সেইসব স্বপ্নও আনন্দময় স্বপ্ন। ভয়ংকর কোনাে দুঃস্বপ্ন নয়। | এখন ট্রেন থেমে আছে। চিটাগাং এসে গেছে এটা সে বুঝতে পারছে। তার পরেও বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছা করছে না। জীবনের আনন্দময় সময়ের একটি হচ্ছে ঘুম–ঘুম ভাব নিয়ে শুয়ে থাকা।
Read more