রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-২)

অয়ন নিচু গলায় বলল, চাচা, আমি যাচ্ছি নাযাচ্ছ না কেন?টাকা জোগাড় করতে পারিনিএকজনের দেয়ার কথা ছিল, সে শেষ পর্যন্ত ...গার্ড বাঁশি বাজিয়ে দিয়েছেট্রেন নড়তে শুরু করেছেঅয়ন ছােট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল

রূপালী দ্বীপ মুনার চোখে পানি এসে গেছেসে ভেজা চোখে তার বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। 

সােবাহান সাহেব পকেট থেকে মানিব্যাগ বের করে শান্তগলায় বললেন, বাবা, এই নাও, এখানে ছয় টাকা আছেতুমি যাওদৌড়াও। 

অয়ন ধরা গলায় বলল, বাদ দিন চাচাআমি যাব না। 

অয়নের খুব কষ্ট হচ্ছেসে কখনােই কোথাও যেতে পারে না, সে জন্যে খুবকষ্ট তাে তার হয় নাআজ কেন হচ্ছে? | সােবাহান সাহেব বললেন, এক থাপ্পড় দেববেয়াদব ছেলেদৌড় দাওদৌড় দাও। 

মুনা বলল, যান অয়ন ভাই, যানপ্লীজ! অয়ন টাকা নিল। 

সে দৌড়াতে শুরু করেছেতার পেছনে পেছনে দৌড়াচ্ছে মুনাকেন ছুটছে তা সে নিজেও জানে না

দলের সবাই জানালা দিয়ে মুখ বের করে তাকাচ্ছেমােতালেব এবং সঞ্জু হাত বের করে রেখেছে কাছাকাছি এলেই টেনে তুলে ফেলবেএই তাে আর একটুআর একটু ...। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২

সােবাহান সাহেব চোখ বন্ধ করে প্রার্থনা করছেন হে মঙ্গলময় ! এই ছেলেটিকে দারুচিনি দ্বীপে যাবার ব্যবস্থা তুমি করে দাও” 

ট্রেনের গতি বাড়ছে। 

গতি বাড়ছে অয়নেরআর ঠিক তার পাশাপাশি ছুটছে মুনসে কিছুতেই অয়নকে ট্রেন মিস করতে দেবে নাকিছুতেই না। 

এখন থেকেই শুরু হল আমাদের নতুন গল্প ,.

বেঁটে মানুষ ভাল দৌড়তে পারে নাবেঁটে মানুষের পা থাকে খাটোখাটো পায়ে লম্বা স্টেপ নেয়া যায় নাকিন্তু বন্টু প্রায় উড়ে যাচ্ছেসে অসাধ্য সাধন করল, ছুটন্ত ট্রেন প্রায় ধরে ফেললতার বন্ধুরা ট্রেনের দরজাজানালায় ভিড় করে আছেরানা হাত বের করে আছেএকবার বুদ্বুর হাত ধরতে পারলেই টেনে তুলে ফেলবেমজার ব্যাপার হচ্ছেবন্টুর পাশাপাশি ছুটছে মুনট্রেনের কামরা থেকে মুখ বের করে যারা উদ্বিগ্ন চোখে তাকিয়ে আছে তাদের সবার মনে প্রশ্ন এই মেয়েটা পাগলের মতো দৌড়াচ্ছে কেন?

এর তো দারুচিনি দ্বীপে যাবার কথা নামুনাও যে শেষ মুহূর্তে বন্টুর সঙ্গে দৌড়াতে থাকবে এবং অবিকল বন্দুর মতােই ট্রেনের দরজার হাতল চেপে ধরবে, তা সে নিজেও বুঝতে পারেনিযখন বুঝতে পেরেছেতখন আর সময় নেইট্রেনের চাকায় গতির কাপনবেগ ক্রমেই বাড়ছেএখন প্লাটফর্মে নেমে যাবার উপায় নেই। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২

প্ল্যাটফর্মে হতভম্ব মুখে মুনার বাবা সােবাহান সাহেব পঁড়িয়ে আছেনতিনি এখনো পুরো ঘটনাটা বুঝতে পারছেন নামেয়েটা হঠাৎ তার পাশ থেকে এমন ছুটতে শুরু করল কেন? কেনইবা দৌড়ে ট্রেনে উঠে পড়ল? ট্রেনে তার বড় ভাই আছে, এটা একটা ভরসাঅবশ্যি সঞ্জু না থাকলেও সমস্যা হত না

এই ছেলেমেয়েরা তার মেয়েটার কোনো অনাদর করবে নাএরা সঞ্জুর বন্ধু, তিনি এদের খুব ভাল করেই চেনেনমুনা ট্রেনের জানালা থেকে মুখ বের করে বাবার দিকে তাকিয়ে হাসলসোবহান সাহেব এত দূর থেকে সেই হাসি দেখলেন না। তবে তিনি হাত নাড়লেনহাত নেড়ে একধরনের অভয় দিলেন, বলার চেষ্টা করলেন, সব ঠিক আছে” 

বাবার দিকে তাকিয়ে মুনার কান্না পাচ্ছেএকা একা দাঁড়িয়ে থাকা বাবাকে কী অসহায় দেখাচ্ছে! যেন একজন ক্লান্ত, পরিশ্রান্ত মানুষ, যার সব প্রিয়জন একটু আগেই ট্রেনে করে অনেক অনেক দূরে চলে গেছে, যাদের আর কখনােই ফিরে পাওয়া যাবে না। 

মুনার মনে হচ্ছে, তার বাবা কঁদছেনতিনি অল্পতেই কঁাদেনমূনা যখন এসএসসি পরীক্ষা দিতে গেল সেদিনও তিনি কাঁদলেনচোখ মুছতে মুছতে বললেন

আহা!, দেখতে দেখতে মেয়েটা এত বড় হয়ে গেল! আজ এসএসসি দিচ্ছেদুদিন পরে বিয়ে দিতে হবে। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২

যেদিন এসএসসির রেজাল্ট হল সেদিনও কঁদলেনরুমাল চোখে চেপে ধরে গঢ়ি স্বরে বললেন, আমি খুব খুশি হয়েছি মা, খুবই খুশিসেকেড ডিভিশন এমন খারাপ কিছু না, ম্যাট্রিকের সেকেন্ড ডিভিশনও খুব টফি। বাবা তার জন্য রাজশাহী সিল্কের শাড়ি কিনে আনলেনপরীক্ষা পাসের উপহারমুনার জীবনের প্রথম শাড়িসারা জীবনে মুনা নিশ্চয়ই অনেক জামাকাপড় কিনবেঅনেক শাড়ি কিনবে কিন্তু জীবনের প্রথম শাড়িটার কথা কখনাে ভুলবে নাআচ্ছা, এই তথ্য কি বাবা 

জানেন

বাতাসে মুনার চুল উড়ছে, গায়ের ওড়না উড়ছেআর সে মনে মনে বলছে, কেন আমার বাবা এত ভালমানুষ হলেন? কেন? কেন?

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-৩) 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *