রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-২১)

সেন্ট্রি গভীর মনযােগে দাঁত খোচাচ্ছেদাত খোচানো শেষ হলে নিশ্চয়ই কানখোচাবেখোঁচাখুঁচি যাদের স্বভাব তারা স্থির থাকতে পারে নাতাদের সবসময় কিছু না কিছু খোচাতে হয়। 

রূপালী দ্বীপরানা আবার করুণ গলায় ডাকল পুলিশ সাহেব ! ব্রাদারএকটু শুবেন

মনিরুজ্জামান ওসি সাহেবের সামনে বসে আছেমনিরুজ্জামানের গায়ে থ্রী পিস স্যুট, লাল টাইকোটের বাটন হােলে পাতাসহ গোলাপের কুঁড়িগোলাপটা ঠিক আছে পাতা দুটি মরে গেছেমনিরুজ্জামানের মুখে তেলতেলে ভাব হাসিসে আজ সারা দিনে প্রচুর পান খেয়েছে বলে মনে হয়দাত খয়েরি বর্ণ ধারণ করেছেঠোট দুটিও লালমনিরুজ্জামানের হাতে সাদা রুমালকিছুক্ষণ পরপর ঠোট মােছার জন্যে রুমাল ব্যবহার করতে হচ্ছে। 

মনিরুজ্জামানের পাশে আছে হারুনুর রশীদহারুনুর রশীদের কাজ হচ্ছে মনিরুজ্জামানকে ছায়ার মতাে অনুসরণ করাহারুনুর রশীদ পাতলা একটা পাঞ্জাবি পরে আছেনিচে গেঞ্জি নেই বলে পাঞ্জাবির ভেতর দিয়ে তার লোমভর্তি বুক দেখা যাচ্ছেহারুনুর রশীদের মুখ খুব গম্ভীরসেই তুলনায় মনিরুজ্জামানের মুখ হাসি হাসি। 

মনিরুজ্জামান বলল, তারপর ওসি সাহেব, ভাই, কেমন আছেন বলেন দেখিজ্বি, ভাল আছি। 

সকালে চলে আসতাম ফাস্ট ফ্লাইট পেলাম নাগাড়িতে রওনা হলে পেছতে পৌছতে বিকাল হবেসেকেড ফ্লাইটে এসেছি। 

ভাল করেছেন। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২১

আমি এসেই আপনার বিষয়ে খোঁজখবর করেছিখবর যা পেয়েছি তাতে মনটা ভাল হয়েছেআমি হারুনুর রশীদকে বললাম, এরকম অফিসার যদি দশটা থাকে, তাহলে দেশ ঠিক হয়ে যায়কী হারুন, বলি নাই?” 

হারুন হঁসূচক মাথা নাড়েমনে হচ্ছে সে কথা কম বলেকিংবা মাথা নাড়াই তার চাকরি। 

দেশের আজ যে অবস্থা তা কিন্তু দেশের জনগণের জন্যে নাখারাপ অফিসারের জন্যেজনগণ কখনো ভুল করে না। 

আপনি আমার বিষয়ে কী খােজ পেয়েছেন?সব খোজই পেয়েছি ভাইপ্রদীপ জ্বলে উঠলে দূর থেকে টের পাওয়া যায় আলো দেখা যায়বুঝলেন রহমান সাহেব, আমি খবর পেয়েছি, আপনি অত্যন্ত 

অনেস্ট অফিসারঘুষ খান নাঅন্যায় করেন নাঠিক শুনি নাই রহমান সাহেব ?” 

জ্বি, ঠিকই শুনেছেনআপনার নাম রহমান তাে ? আব্দুর রহমান আমার নাম। 

এতবড় একটা কাজ যে আপনি করলেন, অনেস্ট অফিসার বলেই করতে পারলেনঘুষখায় অফিসারের আত্মা থাকে ছোট সাহস থাকে নাকী হারুন, আমি এই কথা বলি নাই ?” 

হারুন আবার সূচক ঘাড় নাড়ল। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২১

মনিরুজ্জামান গলা নিচু করে বলল, এত বড় একটা কাজ সুন্দরভাবে করার জন্যে আমি ছোটভাই হিসাবে আপনাকে সামান্য উপহার দিতে চাইনা করবেন নানা করলে মনে ব্যথা পাব। 

মনিরুজ্জামান হারুনুর রশীদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করলহারুনুর রশীদ ব্রীফকেস খুলে ব্রাউন পেপারের একটা মােটা মোড়ক ওসি সাহেবের ফাইলের কাছে রেখে ভারী গলায় বলল ফিফটি আছে। 

ওসি সাহেব বললেন, ফিফটি কি ? ফিফটি থাইজেন্ড স্যার। 

মনিরুজ্জামান বলল, উপহার কী কিনব, কী আপনার পছন্দ, তা তাে জানি নাএই জন্যেই ক্যাশপছন্দমত একটাকিছু কিনে নেবেন ভাই সাহেবছােট ভাইয়ের উপর মনে কিছু নিবেন না। 

আচ্ছা। 

বুঝলেন ভাই সাহেব, খুব ভয়ে ভয়ে ছিলামআপনি রাগই করেন কি নাউপহার এক জিনিস আর ঘুষ ভিন্ন জিনিস। 

তা তাে বটেইএখন ভাই সাহেব, মেয়েটাকে বের করে দেন ঢাকায় নিয়ে যাইমেয়েটাকে বলছেন কেন? বলুন স্ত্রীকে বের করে দিনহা হাঅল্পদিন হয়েছে বিয়ে, এখনো অভ্যস্ত হইনিযাই হােক, আমি স্ত্রীকে নিয়ে যেতে এসেছিআমার স্ত্রীর যে বড় চাচা উনিও আসছেনবাই রােডে আসছেন। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২১

ওসি সাহেব শান্ত গলায় বললেন, ব্যাপারটা আপনি যত সহজ ভাবছেন তত সহজ নাসামান্য জটিলতা আছে। 

কী জটিলতা ? মনিরুজ্জামান চোখ সরু করে বললআপনার স্ত্রী জবানবন্দি দিয়েছেন, আপনার সঙ্গে বিয়ে হয়নিযে রাতে বিয়ে 

হবার কথা সেই রাতে উনি পালিয়ে গেছেন| বললে তো হবে নাতাে এখন এরকম বলবেইআরাে যে জঘন্য কিছু বলে নাই সেটাই আমার সৌভাগ্যবিয়ে যে হয়েছে তার কাগজপত্র আছেদেখতে পারেনহারুন, কাবিননামাটা দেখাও তাে। 

হারুন ব্রীফকেস খুলে কাবিননামা বের করল| মনিরুজ্জামান বলল, খুব ভাল করে দেখেনআমার স্ত্রীর দস্তখত আছেদেখতে পচ্ছেন

চারজন সাক্ষি আছেসাক্ষি কারা এইটাও একটু লক্ষ করুনআপনারা পুলিশের লােক, কিছুই আপনাদের চোখ এড়াবে নাতবু মনে করিয়ে দেয়াএকজন আছেন মিনিস্টার, প্রতিমন্ত্রী না, আসল মন্ত্রীএকজন আর্মির ব্রিগেডিয়ার, একজন হচ্ছেন ইউনিভার্সিটির ফুল প্রফেসরআরেক জন বিশিষ্ট শিল্পপতি আর খাননাম শুনেছেন আশা করি। 

বলেন কী! এঁরা সবাই কি আপনার আত্মীয়? জ্বি নাতবে পরিচিত। 

সাধারণত দেখা যায়, বিয়েতে ঘনিষ্ঠ আত্মীয়স্বজনরা সাক্ষি হয়আপনার বেলাতেই ব্যতিক্রম দেখলাম। 

আমার সবই ব্যতিক্রমদেখলেন না বৌকে বিয়ের পরেই ভাগিয়ে নিয়ে চলে চেলিতবে হজম করতে পারে নাই বদহজম হয়ে গেছেহাহাহা। 

রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২১

আপনাকে খুব আনন্দিত মনে হচ্ছেঅবশ্যই আনন্দিতআম ছালা সব ধরা পড়ে গেছেসাথের বদগুলােকে মাইল্ড পিটন দিয়েছেন তাে

জ্বি না, দেই নাইভদ্রলােকের ছেলেপুলে, পিটন দিয়ে শেষে কোন বিপদে পড়ি !’ 

কোনাে বিপদে পড়বেন নাআমি তাে আছি আপনার পিছনেআমি মানুষটা ছােটখাট কিন্তু আল্লাহর দয়ায় আমার যোগাযােগ ভাল। 

সেটা বুঝতে পারছি। 

অনেকেই বুঝতে পারে নাপ্রয়ােজন বােধ করলে হেভি পিটন দিয়ে দেনএদের চুরির মামলায় ফেলে নাকানিচুবানি খাওয়ানো যায় ? আমার স্ত্রীর গায়ে চার লাখ টাকার জড়োয়া গয়না ছিল এই মামলা ... ধান দেখেছে, বুলবুলি দেখে নইএইবার বুলবুলি দেখবেছােট্ট বুলবুলি। 

হারুনর রশীদ বলল, স্যার, আপনি কাইন্ডলি বেগম সাহেবকে রিলিজ করে 

দেনআমরা ঢাকাদিকে রওনা হয়ে যাইবেলাবেলি পৌছতে হবে| এত সহজে তাে ভাই হবে নামামলা করেছেন, আমরা আসামী কোর্টে চালানদেবকোট যা করার করবে। 

সে কী ? আপনি মামলা করেছেন ঢাকায় আমরা আসামী ঢাকা পাঠাব‘ 

তা হলে এত যন্ত্রণার প্রয়ােজন নাইমামলা তুলে নিবআপনি আমার স্ত্রীকে শুধু রিলিজ করে দিন। 

সেটাও সম্ভব নাএকটা বেড়াছেড়া লেগে যাবে বলে মনে হয়কী বেড়াছেড়া ?যাদের থানা হাজতে আটকে রেখেছি তারা এত সহজে ছেড়ে দেবে তা মনে হয়। 

যারা আমার স্ত্রীকে নিয়ে এসেছে ওদের উপর আমার কোনাে রাগ নাইছেলেমানুষ ভুল করেছেমানুষমাত্রই ভুল করেতা ছাড়া সমস্যাটা মূলত তৈরিকরেছে আমার স্ত্রীকাজেই শাস্তি যা দেবার আমি আমার স্ত্রীকেই দেবআপনিওদের ছেড়ে দিনআমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে চলে যাই। 

(চলবে)

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-২২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *