‘আপনি বিকেলে আসুন। ‘বিকেলে আসব কেন?” ‘আমি আসতে বলছি এইজন্যে আসবেন। ‘ওসি সাহেব, আপনি তাে ঝামেলা করছেন। আমি ঝামেলা পছন্দ করি না।‘
‘ঝামেলা আমিও পছন্দ করি না। মহিলাকে আমি ছেড়ে দিলাম, আপনিও গাড়িতে করে জোর করে নিয়ে গেলেন, পরে দেখা গেলাে আসলেই আপনাদের বিয়ে হয়নি।
কাগজপত্র দেখালাম না ? কাগজপত্রের দাম নাই।
মনিরুজ্জামান হতভম্ব হয়ে বলল, কাগজপত্রের দাম নাই — কী বলেন আপনি! | মনিরুজ্জামান সাহেব, পুলিশে কাজ করছি দশ বছর ধরে – এই দশ বছরে একটা জিনিস শিখেছি — মানুষের চেয়ে বেশি মিথ্যা বলে কাগজ।
‘সিগনেচার আপনি বিশ্বাস করেন না?” ‘ছি না।‘
‘আমি কিন্তু জানি কী করে বিশ্বাস করাতে হয়। বিশ্বাস করাবার মতাে ব্যবস্থা নিয়ে আসব।
‘আসুন। বিশ্বাস করাতে পারলে আমি ওনাকে ছেড়ে দেব। আপনি নিয়ে চলে যাবেন | শাস্তি দিতে চাইলে দেবেন। পথেই কোথাও গলা টিপে মেরে ফেলতে পারেন। আপনার সমস্যা হবে না। ডাক্তাররা পােস্টমর্টেম রিপাের্ট আপনার কথামত দেবে। পুলিশও ফাইন্যাল রিপাের্ট যা চাইবেন তাই দেবে।
‘শুধু আপনি দিবেন না ?” ‘জ্বি না।” “কেন দিবেন না?
কারণ আমি মানুষটা খারাপ। ‘আমি ঠিক এক ঘণ্টা পরে আসব।
‘এক ঘণ্টা পরে এলে হবে না। আপনাকে বিকেলে আসতে বলেছি – আপনি বিকেলে আসবেন।
‘হাতি ঘােড়া গেল তল, চার পয়সার ওসি বলে কত জল?”
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২
ওসি সাহেব হাই তুললেন। মনিরুজ্জামান বলল, মেয়েটা কোথায়? আমি ঐ মেয়েটার সঙ্গে কথা বলব। নাকি আমাকে কথাও বলতে দেবেন না?
‘দেব। কথা বলতে দেব।‘
মনিরুজ্জামান হারুনুর রশীদের দিকে তাকিয়ে ইশারা করল।
হারুনুর রশীদ অত্যন্ত স্বাভাবিক ভঙ্গিতে পঞ্চাশ হাজার টাকার ব্রাউন পেপারের প্যাকেট হাতে নিয়ে ঝট করে ব্রীফকেসে ভরে ফেলল। কাজটা সে করল দেখার মতো দ্রুততায়।
পাগলী নতুন শাড়ি পরেছে। মাথায় চুল আঁচড়েছে। তাকে আর চেনা যাচ্ছে না। সে নিজেও মনে হয় হকচকিয়ে গেছে। চুপচাপ বসে আছে, কোনােরকম হৈচৈ করছে
কিছুক্ষণ পরপর নিজের দুটা হাত তার চোখের সামনে ধরে গভীর মনােযােগের সঙ্গে কী যেন দেখছে। জরী বলল, তুমি কী দেখ?
পাগলী হাসল। ‘নাম কী তােমার ?
পাগলী জবাব দিল না। ‘তােমার কি শাড়িটা পছন্দ হয়েছে?
পাগলী হা–সূচক মাথা নাড়ল এবং আবারও তার দুটা হাত চোখের সামনে মেলে ধরল।
মুনা বলল, জরী আপা, মেয়েটাকে কী সুন্দর লাগছে দেখছেন? ‘ই, দেখছি।
‘এত সুন্দর একটা মেয়ে পথে পথে ঘােরে! আশ্চর্য !
নইমা শুয়ে আছে। কম্বল বিছানাে হয়েছে। কম্বলের উপর ফুলতােলা নতুন চাদর। নতুন বালিশ। সবই কিনে আনানাে হয়েছে। নইমা বালিশে মাথা রেখেই ঘুমুচ্ছে। তার জ্বর এসেছে। মুনা বসে আছে নইমার মাথার কাছে।
আনুশকা বলল, ওর জ্বর কি বেশি মুনা?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২
‘সমস্যা হয়ে গেল তাে!
‘আপনাকে দেখে কিন্তু মনে হচ্ছে না আপা কোনাে সমস্যা আছে। শান্তমুখে বসে আছেন।”
আনুশকা হাসল। মুনা বলল, আপা, আমাদেরকে কি ওরা এখানে রাতেও আটকে রাখবে?
‘না, ছেড়ে দেবে। সন্ধ্যার আগেই ছেড়ে দেবে।”
কীভাবে বলছেন?”
‘আমাদের সঙ্গে শুভ্র আছে না? শুভ্রর কোনাে সমস্যা তার বাবা–মা হতে দেবেন না।
ওনারা তাে আর জানেন না এখানে কী হচ্ছে।”
‘ইতিমধ্যে জেনে গেছেন বলে আমার ধারণা। তারা তাদের ছেলের উপর লক্ষ রাখবেন না, তা হয় না।
আনুশকার কথার মাঝখানেই মনিরুজ্জামান এসে দাড়াল। জরী হতভম্ভ হয়ে তাকিয়ে আছে। ভূত দেখলেও কেউ এত চমকায় না।
মনিরুজ্জামান বলল, খেল তাে ভাল দেখালে। যাই হােক, এখন সমস্ত খেলার অবসান হয়েছে। বিকেলে তােমাকে নিয়ে ঢাকা রওনা হব।
‘আমাকে নিয়ে ঢাকা রওনা হবেন মানে? আমি আপনার সঙ্গে ঢাকা যাব
কেন?”
‘স্বামীর সঙ্গে কোথাও যাবে না, এটা কেমন কথা? “আপনি আমার স্বামী ? ‘অবশ্যই। বিয়ের কাবিননামাও নিয়ে এসেছি। ওসি সাহেবকে দেখালাম। ‘বিয়ের কাবিননামা ?”
‘এক লাখ এক টাকা কাবিনের কাবিননামা। বিকেলের মধ্যে তােমার বড় চাচাও চলে আসবেন।
জরীর মুখে কথা আটকে গেল। কী–একটা কথা অনেক বার বলতে গিয়েও বলতে পারল না।
মনিরুজ্জামান হৃষ্ট গলায় বলল, আচ্ছা যাই – দেখা হবে বিকেলে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২
জরী তাকাল আনুশকার দিকে। আনুশকা হাসছে। আনুশকার হাসি দেখে পাগলীও হাসতে লাগল। এতে নইমার ঘুম ভেঙে গেলাে। সে উঠে বসল এবং আনন্দিত গলায় বলল, কী হয়েছে? কী হয়েছে? | মনিরুজ্জামান আর দাঁড়াল না। তার অনেক কাজ বাকি আছে। কাজ শেষে করতে হবে। নষ্ট করার মতো সময় হাতে নেই। ওসির ক্রু টাইট দিতে হবে, তবে যাবার আগে দলের ছেলেগুলিকে দেখে যাওয়া দরকার।
রানা দেখল, থ্রী পিস স্যুটপরা এক ভদ্রলোক আসছেন। সে উৎসাহের সঙ্গে উঠে বসল। মনে হচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ কেউ আসছে। তাদের মুক্তির ব্যবস্থা হচ্ছে। রানাই আগ বাড়িয়ে বলল, স্নামালিকুম।
মনিরুজ্জামান বলল, ওয়ালাইকুম সালাম। আপনারা ভাল ? ‘জি স্যার, আছি মােটামুটি। ‘কষ্ট হয়নি তাে?”
মােতালেব বলল, কোনাে কষ্ট হয়নি। অত্যন্ত আনন্দে সময় কাটছে। সময় কি ব্যাপার আগে জানতাম না। এখন জানি। আরো বৎসরখানেক এখানে থাকতে পারলে সায়েন্সের অনেক কিছু শিখতাম। আপনাকে তাে ভাই চিনতে পারছি না – আপনার পরিচয়?
‘আমার নাম মনিরুজ্জামান। আমি জরীর হাসবে। ‘কার হাসবেন্ড ?
‘জরীর। আমি তাকে নিতে এসেছি। বিকেলে ওকে নিয়ে চলে যাব। আপনারা যেখানে যাচ্ছেন চলে যান। আপনাদের উপর আমার কোনাে রাগ নেই। আপনাদের একটু সমস্যা হল – তার জন্যে আমার স্ত্রীর হয়ে আমি আপনাদরে কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করছি।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২
রানা বলল, কী বললেন? আপনি কে? ‘জরীর হাসবেন্ড। শুভ্র বিস্মিত হয়ে বলল, জরী তাে বিয়ে করেনি ।
মনিরুজ্জামান হাসিমুখে বলল, আপনাদের তাই বুঝিয়েছে, ঘটনা ভিন্ন। বিয়ে হয়েছে, কাবিন হয়েছে। এক লক্ষ এক টাকা মােহরানা। যাই, কেমন? খােদা হাফেজ।।
মনিরুজ্জামান হনহন করে এগুচ্ছে! তার পেছনে হারুনুর রশীদ। হারুনুর রশীদ যে এতটা লম্বা তা আগে বােঝা যায়নি। এখন বােঝা যাচ্ছে। তাকে দেখে মনে
হচ্ছে, একটা তালগাছ ব্রীফকেস হাতে কুঁজো হয়ে দাড়িয়ে আছে। | দলের সবাই খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। সঞ্জু বলল, অবস্থা ভাল মনে হচ্ছে
শুভ্র, তুই কি একটা কাজ করবি?
‘কী কাজ?
তুই তাের বাবাকে টেলিফোন করে ঘটনাটা বলবি? জরীকে একটা লােক জোর করে ধরে নিয়ে চলে যাবে – আর আমরা যাব দারুচিনি দ্বীপে! তা কী করে হয় ?
শুভ্র চুপ করে আছে। সঞ্জু বলল, কথা বলছিস না কেন ? ‘বাবাকে কী বলব?”
‘তাের কিছু বলতে হবে না। তাের বাবাই তাের ভেতর থেকে সব কথা টেনে বের করে নিয়ে আসবেন।
শুভ্র অস্বস্তির সঙ্গে চুপ করে আছে। রানা রাগী ভঙ্গিতে বলল, তুই এমন স্টোন। ফেস হয়ে গেলি কেন? বাবার সঙ্গে কথা বলতে লজ্জা লাগছে?
শুভ্র বলল, বাবাকে কিছু বলার দরকার নেই। ‘বলার দরকার নেই কেন?” ‘আমার ধারণা বাবা সবই জানেন।
“গাধার মতাে কথা বলবি না শুভ। তাের বাবা কোনো পীর–ফকির না যে সব জানে। তোকে টেলিফোন করতে বলা হয়েছে, তুই টেলিফোন করবি এবং কাদো কাদো গলায় বলবি, আমাদের রক্ষা করাে। এস ও এস। বঁাচও বাঁচাও।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২২
এরা কি আমাদের টেলিফোন করতে দেবে? ‘এইটা একটা টেকনিক্যাল কথা বলেছিস। তােকে টেলিফোন করতে দেবে কি না সেটা হচ্ছে কথা। সম্ভবত দেবে না – তবে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।‘
বন্টু বলল, প্রয়ােজনে আমি ওসি সাহেবের পা চেপে ধরব। অনেক ধরনের মানুষের পা ধলেছি, পুলিশের পা কখনো ধরিনি। পা ধরে সবচে‘ বেশি মজা কখন পেয়েছিলাম জানিস? একবার এর পীর সাহেবের পা ধরেছিলাম – কী মােলায়েম পা ! ধরলে ছাড়তে ইচ্ছা করে না।
শুভ্র ওসি সাহেবের সামনে বসে আছে। ওসি সাহেব টেলিফোন সেট তার দিকে বাড়িয়ে বললেন, নিন, টেলিফোন করুন।
শুভ্র বিব্রত মুখে বলল, আমি নাম্বার ভুলে গেছি। নাম্বার ভুলে গেছেন মানে? নিজের বাসার নাম্বার মানে নেই?
‘জ্বি না। বাসায় তাে কখনাে টেলিফোন করা হয় না। তবে আমার হ্যান্ডব্যাগের পকেটে একটা ডায়েরি আছে সেখানে নাম্বার লেখা আছে।
‘আচ্ছা, হ্যান্ডব্যাগ আনিয়ে দিচ্ছি।
শুভ্র ডায়েরির জন্যে অপেক্ষা করছে। ওসি সাহেব কৌতূহল এবং আগ্রহ নিয়ে শুভ্রকে দেখছেন।
Read more