টেলিফোন ধরলেন শুভ্রর মা। শুভ্র বলল, মা, কেমন আছ? রাহেলা প্রায় হাহাকার করে উঠলেন, তুই কেমন আছিস বাবা?
“তাের চশমা ! তাের চশমা আছে ?
হুঁ, আছে। খাওয়াদাওয়ার কি কোনাে সমস্যা হচ্ছে? ‘না, কোন সমস্যা হচ্ছে না।
বাইরের পানি খাচ্ছিস না তাে?
‘একসঙ্গে বেশি করে পানির বােতল কিনে নে। ‘আচ্ছা মা, নেব।‘ ‘গত রাতে ভাল ঘুম হয়েছিল তাে?”
এদিকে আমি সারা রাত ঘুমুতে পারিনি। শুধু দুঃস্বপ্ন দেখেছি। শুভ্র, তুই ভাল আছিস তাে?”
‘আমি ভাল আচ্ছি মা।। ‘তাের বন্ধুরা? ওরা ভাল আছে তাে? ‘হ্যা, ওরাও ভাল আছে। আচ্ছা মা, বাবা কি অফিসে, না বাসায়?” ‘তাের বাবা বাসায়। আজ কোথাও যায়নি। ওর শরীরটা নাকি ভাল না। বাবা কী করছেন? ‘বিছানায় শুয়ে শুয়ে রে” নিচ্ছে। বই পড়ছে। ‘কী বই পড়ছেন মা?” ‘কী বই পড়ছে তা তাে দেখিনি – দেখে আসব ? ‘না, তুমি বাবাকে দাও। ‘তুই আমার সঙ্গে আরেকটু কথা বল শুভ্র। তারপর তাের বাবাকে দেব। ‘উহু, তুমি আগে বাবাকে দাও। তারপর আমি আবার তােমার সঙ্গে কথা বলব। ‘তুই কি আমাকে মিস করছিস শুভ্র ?” ‘। মা, তুমি বাবাকে দাও। ইয়াজউদ্দিন সাহেব টেলিফোন রিসিভার হাতে নিয়ে ভারী গলায় বললেন,
হ্যালাে।
শুভ্র বলল, বাবা, তুমি কী বই পড়ছ? তােমার হাতে এখন কী বই ? বইটার নাম হল “Moon is down”. শুভ্র খুশিখুশি গলায় বলল, তুমি আমার টেবিল থেকে বইটা নিয়েছ, তাই না?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৩
‘এটা তােমার জন্মদিনে দেব বলে আনিয়ে রেখেছিলাম। প্যাকেট করা বই তুমি খুললে কেন? না বলে প্যাকেট খােলা তাে নিষেধ।
মানুষের প্রকৃতি এমন যে সে সবসময় নিষেধ অমান্য করে। ‘বইটা তােমার কেমন লাগছে বাবা? ‘ভাল, খুব ভাল। ‘তােমার কি চোখে পানি এসেছে?” ‘এখনো আসেনি।
‘পঞ্চাশ পৃষ্ঠার পর থেকে দেখবে – একটু পরপর চোখ ভিজে উঠেছে। তুমি ক’ পৃষ্ঠা পর্যন্ত পড়েছ?‘
‘কুড়ি–পঁচিশ পৃষ্ঠা হবে। ‘বাবা, তােমার সঙ্গে আমার খুব জরুরি কয়েকটা কথা আছে।
‘এখন তুমি ছুটি কটাতে গেছ, এখন আবার জরুরি কথা কী ? এখন শুধু হালকা কথা বলবে।”
‘কথাটা খুব জরুরি বাবা। ‘ ‘আমি তােমার কোনাে জরুরি কথা শুনতে চাচ্ছি না। ‘বাবা, আমরা খুব বিপদে পড়েছি।
‘মানুষ হয়ে জন্মগ্রহণ করেছ, বিপদে তাে পড়বেই। বিপদে পড়বে, আবার বিপদ থেকে বের হয়ে আসবে। আবার পড়বে। দিস ইজ দ্যা গেম।
‘পুলিশ আমাদের ধরে এনে হাজতে রেখে দিয়েছে। ‘ও, আচ্ছা।
আমাদের সঙ্গে জরী নামের যে মেয়েটি আছে – তার হাসবেন্ড এসেছে তাকে নিয়ে যেতে। ‘হাসবেন্ড নিয়ে যেতে চাইলে তাে তােমরা কিছু করতে পারবে না। পুরুষ শাসিত সমাজে স্বামীর অধীকার স্বীকৃত। | ‘লােকটির সঙ্গে জরীর বিয়ে হয়নি। লােকটা মিথ্যা কথা বলছে। মিথ্যা কথা বলে মেয়েটিকে নিয়ে যেতে চাচ্ছে।
‘উল্টোটাও তাে হতে পারে। হয়তাে মেয়েটাই মিথ্যা বলছে। মেয়েরা পুরুষদের চেয়েও গুছিয়ে মিথ্যা বলতে পারে। একজন পুরুষ যখন মিথ্যা কথা বলে তখন বোঝা যায় সে মিথ্যা বলছে। কিন্তু একটা মেয়ে যখন মিথ্যা বলে তখন বােঝার কোনাে উপায়ই নেই সে মিথ্যা বলছে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৩
‘তুমি খুবই অদ্ভুত কথা বলছ বাবা।
‘এটা আমার কথা না। যে বইটা এই মুহূর্তে আমি পড়ছি সেই বইয়ের নায়ক বলছে , তাের প্রিয় বই Moon is down–এই এটা লেখা।
‘ঐ লােকটা একটা ফ্রড বাবা। ওর প্রতিটি কথাই মিথ্যা। ‘ও, আচ্ছা।
‘বাবা শােনো – আমরা ভয়ংকর বিপদে পড়েছি। তুমি কি কিছু করতে পার আমাদের জন্যে ?”
না। না কেন ? ‘আমি তােমাকে বিপদে ফেলিনি, কাজেই বিপদ থেকে তােমাকে টেনে তােলার দায়িত্বও আমার নয়। তুমি স্বাধীনতা চেয়েছ, তােমাকে স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। বন্ধু বান্ধব নিয়ে রওনা হয়েছ। এখন তুমি হুট করে আমার সাহায্য চাইতে পার না।
শুভ্র চুপ করে রইল। ইয়াজউদ্দিন সাহেব বললেন, তা ছাড়া আমি সারা জীবন বেঁচে থাকব না। এ জীবনে আমি যা সঞ্চয় করেছি সেইসব রক্ষার দায়িত্ব তােমার। আজ যদি এই সামান্য বিপদ থেকে নিজের চেষ্টায় বের হতে না পার, তা হলে ভবিষ্যতে বড় বড় বিপদ থেকে উদ্ধার পাবে কী করে? বুঝতে পারছ আমি কী বলছি?
‘পারছি।
‘যখন কোনাে সমস্যা আসবে তখন সমস্যাটাকে একটা বস্তুর মতো তােমার সামনের টেবিলে রাখবে। নানান দিক থেকে সমস্যাটা দেখবে। একসময় লক্ষ করবে সমস্যাটার একটা দুর্বল দিক আছে। তুমি আক্রমণ করবে দুর্বল দিকে।
“আমার সমস্যার দুর্বল দিক কোনটা বাবা?”
“যে লােক সমস্যা তৈরি করেছে, মেয়েটির হাসবেন্ড বলে যে নিজেকে দাবি করছে সেই সবচে‘ দুর্বল। সে দুর্গ তৈরি করেছে মিথ্যার উপর। এ–জাতীয় লােকেরা ভীতু প্রকৃতির হয়। এদের ভয় দেখালে ওরা অসম্ভব ভয় পায়। এদের ভয় দেখাতে হয়। ছােটখাট ভয় না। বড় ধরনের ভয়।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৩
‘ভয় কীভাবে দেখাব? ‘সেটা তুমি জান কীভাবে ভয় দেখাবে।
‘আমি ভয় দেখালেই সে ভয় পাবে কেন?” ‘তুমি ভয় দেখালে সে ভয় পাবে, যদি সে জানে তুমি কে। তােমার ক্ষমতা কী ?
‘বাবা, আমার তাে কোনাে ক্ষমতা নেই ? “তােমার ক্ষমতা হচ্ছে তােমার অর্থ। তােমার সঙ্গে চেকবই আছে না?” ‘জ্বি, আছে।
‘তুমি যদি চেকবই বের করে এক কোটি টাকার একটা চেক লিখে দাও, সেই চেক ফেরত আসবে না। ব্যাংক সেই চেক অনার করবে। এইখানেই তোমার ক্ষমতা। এই ক্ষমতা দিয়ে তুমি যে–কোনাে মানুষকে ভয় দেখাতে পার।”
‘কিন্তু বাবা, এই ক্ষমতা তাে মিথ্যা ক্ষমতা।
এই ক্ষমতা মিথ্যা। কোনাে ক্ষমতাবান লােকই এই ব্যাপারটা জানে না। তুমি জান।That‘s the best thing about you. শুভ্র, অনেকক্ষণ কথা হল, এখন টেলিফোন রাখি?”
‘তুমি আর কিছু বলবে না বাবা?”
‘হ্যা, বলব। I love you my son. এবং তুমি তোমার “মুন ইজ ডাউন” বইটিতে আমার সম্পর্কে যে উক্তি করেছ তা আমি পড়েছি। থ্যাংক য়ু।
ইয়াজউদ্দিন টেলিফোন নামিয়ে রেখে হাতের বই খুললেন। প্রথম পাতায় শুভ্র সবুজ কালি দিয়ে লিখে রেখেছে —
বাবা, জন্মদিন শুভেচ্ছা। আমার খুব ইচ্ছা করে আমি তােমার মতাে হই।
ইয়াজউদ্দিন দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে বললেন, শুভ্র শুভ্রর মতােই থাকুক। ওকে আমার মতাে হতে হবে না।
রাহেলা বললেন, তুমি টেলিফোন রেখে দিলে কেন? আমি শুভ্রের সঙ্গে কথা বলতাম।
‘স্যরি। আমি আবার যােগাযােগ করে দিচ্ছি।
না লাগবে না। রাহেলার চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখ মুছছেন।
ওসি সাহেব বললেন, শুভ্র সাহেব, আপনার টেলিফোনের কথা তাে শেষ হয়েছে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৩
‘কী বললেন আপনার বাবা ? ‘বাবা আমাকে মনিরুজ্জামান নামের ঐ লােকটার সঙ্গে কথা বলতে বললেন।
কথা বলবেন? “জ্বি, কথা বলব।
‘উনি চলে এসেছেন। আমি ডেকে দিচ্ছি। আপনারা কথা বলুন। নিরিবিল কথা বলুন।
‘ওসি সাহেব, আপনিও থাকতে পারেন। | মনিরুজ্জামান এসে বসল শুভ্রর সামনের চেয়ারে। মনিরুজ্জামানের পাশে বসেছে হারুনুর রশীদ। সে কৌতূহলী হয়ে শুভ্রকে দেখছে।
শুভ্র বলল, স্লামালিকুম।
‘ওয়ালাইকুম সালাম। আমি আপনাকে চিনতে পারিনি ভাই। আপনি ইয়াজউদ্দিন সাহেবের ছেলে। বাহ, ভাল। আপনার সঙ্গে পরিচিত হয়ে খুব আনন্দিত হয়েছি। ছি ছি, এটা তাে বিরাট লজ্জার ব্যাপার হয়ে গেল, ইয়াজউদ্দিন সাহেবের ছেলে কিনা হাজতে! ইয়াজউদ্দিন সাহেবের কাছে তাে মুখ দেখাতে পারব
শুভ্র বলল, আপনি আমাদের এই ঝামেলা দূর করবেন, আশা করি। “অবশ্যই, অবশ্যই। আমি ওসি সাহেবকে বলে দিয়েছি।
আপনাদের উপর থেকে যত চার্জ ছিল সব তুলে নেয়া হয়েছে। আপনারা আপনাদের মতাে বেড়াতে যাবেন। আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে ফিরে যাব।
‘জরীও আমাদের সঙ্গে যাবে। ‘কী বললেন?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৩
শুভ্র শান্তমুখে বলল, আপনি যথেষ্ট যন্ত্রণা করেছেন। তার পরেও আপনাকে ক্ষমা করেছি। এরচে‘ বেশি যন্ত্রণা করার চেষ্টা করলে ক্ষমা করব না।
কী করবেন? ‘আপনি জীবিত ঢাকা ফিরবেন না।
কী বললেন? ‘এই বাক্যটি আমি দ্বিতীয়বার বলব না। তবে যে বাক্যটি বলা হয়েছে – তা কার্যকর করার সমস্ত ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। এই তথ্যটা আপনার জানা থাকা দরকার।
শুভ্র উঠে দাঁড়াল। মনিরুজ্জামান বলল, আরে বসেন, বসেন। রাগ করে উঠে যাচ্ছেন কেন? চা খান। ওসি সাহেব, আমাদের একটু চা খাওয়ার ব্যবস্থা করেন না
রে ভাই।
Read more