শুভ্র বলল, আমি চা খাই না। মনিরুজ্জান হাত ধরে টেনে তাকে বসিয়ে ফেলল। হাসিমুখে বলল, আমাদের মধ্যে একটা ভুল বােঝাবুঝি থাকবে এটা কেমন কথা? আমরা আলাপ আলােচনার মাধ্যমে ...
‘এখানে আলাপ–আলােচনার কিছু নেই।
“আচ্ছা, না থাকলে নাই। চা তাে খাওয়া যাবে। আমার সঙ্গে চা খেতে তো অসুবিধা নেই?”
‘অসুবিধা আছে।
ওসি সাহেব হাই তুলতে তুলতে বললেন, শুভ্র সাহেব, ঢাকা থেকে আপনার কাছে এক ভদ্রলােক এসেছেন। রফিক নাম। উনি থানার বাইরে অপেক্ষা করছেন। আপনি কি ওনার সঙ্গে কথা বলবেন?
শুভ্র বলল, ওনাকে অপেক্ষা করতে বলুন। মনিরুজ্জামানের মুখ ছাইবর্ণ হয়ে গেল। সে পরপর দু‘বার ঢােক গিলল। শুভ্র দেখল তার বাবার কথাই ঠিক হয়েছে। ভয় কাজ করছে।
থানার সামনে পর্যটনের এসি বসানাে মাইক্রোবাস অপেক্ষা করছে। মাইক্রোবাসের পেছনে একটি পাজেরাে গাড়ি। পাজেরােতে সুলেমান অপেক্ষা করছে। সে টেকনাফ পর্যন্ত যাবে। সুলেমানের সঙ্গে আরাে দু’জন। এই দু‘জনের চোখ ছােট ছোট, হাক ভাব কেমন কেমন। এরা কখনাে চোখে চোখে তাকায় না। কথা বলে মাটির দিকে তাকিয়ে। দু‘জনের গায়েই চামড়ার জ্যাকেট। থানার বারান্দায় রফিক সাহেবও হাঁটাহাঁটি করছেন।
শুভ্র বের হতেই রফিক সাহেব এগিয়ে গেলেন। শুভ্র বলল, আপনি এখানে?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪
রফিক সহজভাবে বললেন, চিটাগাং–এ একটা কাজ ছিল – এসেছিলাম। আজই ঢাকা ফিরে যাব। ভাবলাম, আপনার সঙ্গে দেখা করে যাই। স্যারকে কিছু বলতে হবে?
“না, কিছু বলতে হবে না।
‘আপনারা কি আজ রাতটা চিটাগাং থাকবেন? না কি রাতেই কক্সবাজার চলে যাবেন ?
‘বুঝতে পারছি না। আমার বন্ধু রানা এইসব দেখছে। সে যা ঠিক করে, তাই।
‘সুলেমান একটা ব্যবস্থা করে রেখেছে। আমার মনে হয় সেইটাই ভাল ব্যবস্থা হবে। ছােটখাট সমস্যা যেহেতু হচ্ছে ...
‘কী ব্যবস্থা ?”
পর্যটনের মাইক্রোবাস যাবে। আপনারা সবাই বেশ আরাম করে যেতে পারবেন। পেছনে পেছনে সুলেমান যাবে পাজেরাে জীপ নিয়ে। দু’জন বডিগার্ডও আছেন। এ ছাড়াও এসপি সাহেবের সঙ্গে কথা হয়েছে। তিনি পুলিশ এসকর্টের ব্যবস্থা করেছেন। পুলিশের একটা জীপ আগে আগে যাবে। টেকনাফ পর্যন্ত যাবে। আমি বলছি কি – আপনারা সবাই খাওয়াদাওয়া করে মাইক্রোবাসে উঠে বসুন এবং এক টানে চলে যান টেকনাফ। এটাই সবচে’ ভাল বুদ্ধি।
‘ভাল বুদ্ধি মন্দ বুদ্ধি না। আমাদের টীম লীডার হল রানা। ও যা বলে তাই করা হবে। আপনি গাড়ি–টাড়ি নিয়ে চলে যান।
‘জ্বি আচ্ছা।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪
“আর সুলেমানকে বলুন সে যেন আর আমার পেছনে পেছনে না আসে।‘ | ‘জ্বি আচ্ছা, বলে দিচ্ছি। আপনাদের খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থাটা শুধু করি – সারা দিন খাননি, আমারই খারাপ লাগছে।
“কিছু করতে হবে না।
আমি ব্যবস্থা করে রেখেছিলাম। ‘না। প্লীজ না। ‘খাবারগুলি প্যাকেট করে পৌছে দিই?” ‘আপনাকে কিছু করতে হবে না। ‘আমি কি তা হলে চলে যাব ? ‘হঁ্যা, চলে যাবেন। দলবল নিয়ে যাবেন। Leave us alone. “জ্বি আচ্ছা। আপনার খুব কষ্ট হল!
‘কষ্ট কিছু হয়নি। আমি অনেক কিছু শিখেছি। রফিক সাহেব, আপনার সঙ্গে কি সিগারেট আছে ? একটা সিগারেট দিন তো।
রফিক বিস্মিত হয়ে তাকালেন। তার কাছে সিগারেট ছিল না। তিনি সিগারেট আনতে নিজেই চলে গেলেন। শুভ্র দাড়িয়ে আছে।
হাজতের দরজা খোলা হয়েছে। ওসি সাহেব দাড়িয়ে আছেন। তিনি আনুশকার দিকে
তাকিয়ে বললেন, আপনারা বের হয়ে আসুন।
‘আমাদের কি ছেড়ে দিচ্ছেন?
‘জরীর কী হবে? ও কি ঐ বদমাশটার সঙ্গে যাবে, না আমাদের সঙ্গে যাবে ?
‘সেটা উনি ঠিক করবেন। উনি যদি আপনাদের সঙ্গে যেতে চান, তা হলে যাবেন। আবার যদি মনিরুজ্জামান সাহেবের সঙ্গে যেতে চান, তাও যেতে পারেন।
“থ্যাংক য়ু ওসি সাহেব। আপনি কি আরেকটা ছােট্ট কাজ করবেন?‘ ‘কাজটা কী বলুন, দেখি পারি কি না। ‘আমি এই পাগলীটাকে সঙ্গে নিয়ে যেতে চাই। ‘ওকে নিয়ে কী করবেন? ‘আমি ওর চিকিৎসা করাব। সুস্থ করে তুলব।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪
‘মিস আনুশকা, এইসব শখ ক্ষণস্থায়ী হয়। কিছুদিন পর দেখবেন অসহ্য বােধ হচ্ছে। না পারছেন গিলতে, না পারছেন উগরে ফেলে দিতে। বরং সে এখানে থাকুক। আমি কোনো একটা মহিলা সংগঠনে পাঠিয়ে দেব। যােগাযােগও করছি।
‘আমার সঙ্গে দিয়ে দিতে আইনগত কোনাে বাধা আছে ?
‘না, আইনগত কোনাে বাধা নেই। ‘তা হলে ও আমাদের সঙ্গে যাচ্ছে।
ওসি সাহেব হেসে ফেললেন। আনুশকা বলল, মেয়েটার নাম কী ? ‘ওর নাম–টাম নেই – বা থাকলেও এখন কেউ জানে না।
না থাকলেই ভাল। আমি ওর নতুন একটা নাম দেব।”
নইমা ঘুমুচ্ছে। মুনা অনেক চেষ্টা করেও তার ঘুম ভাঙাতে পারছে না। আনুশকা বলল, মুন, ভাল করে দেখ, মরেটরে যায়নি তাে?
মুনা হেসে উঠল খিলখিল করে। মুনার সঙ্গে পাগলীটাও হাসতে শুরু করল। তার হাসি আর থামে না। হাসির শব্দে ঘুম ভাঙল নইমার। সে হতচকিত গলায় বলল, কী হয়েছে? কী হয়েছে? মুনা হাসতে হাসতে বলল, আপা, আমাদের ছুটি হয়ে গেছে। আমরা এখন যাচ্ছি।
কোথায় যাচ্ছি ? ‘দারুচিনি দ্বীপ।
‘আমি কোথাও যাব না। আমি ঢাকা চলে যাব। আনুশকা, আমাকে ঢাকা পাঠাবার ব্যবস্থা কর। অসম্ভব, আমি তােদের সঙ্গে যাব না। মরে গেলেও না। মৱে গেলেও না। মরে গেলেও না। ‘আচ্ছা আচ্ছা, তােকে ঢাকা পাঠাব। এরকম করিস না তো! গায়ে কি এখনাে জ্বর আছে ?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪
মুনা বললাে, হ্যা আপা, জ্বর আছে। বেশ জ্বর।
জরী বলল, আমি একটা ব্যাপার বুঝতে পারছি না। আমরা রেলস্টেশনে বসে আছি কেন?
রানা রাগী গলায় বলল, রেলস্টেশনে বসে আছি, কারণ এক জায়গায় বসে আলাপ–আলােচনা করে ডিসিশান নিতে হবে।
‘কী ডিসিশান ?
‘ডিসিশান হচ্ছে – আমরা কি আজ রাতেই কক্সবাজার রওনা হব, না আজ রাতটা চিটাগাং–এ থেকে পরদিন ভােরে রওনা হব।
‘ডিসিশান নিচ্ছ না কেন?
‘হুট করে তাে আর ডিসিশান নেয়া যায় না। চিন্তা-ভাবনার ব্যাপার আছে। আনুশকা, তােমার কী মত?
আনুশকা হাই তুলতে তুলতে বলল, তুমি হচ্ছ দলপতি। তুমি ডিসিশান নেবে। তুমি যা বলবে তাই হবে। তুমি যদি বল, রাত তিনটায় রওনা হবে – ফাইন উইথ মি।
বল্ট বলল, আমাদের খাওয়াদাওয়ার কী হবে রে রানা? খিদেয় মরে যাচ্ছি।
‘খিদেয় মরে যাবি কী জন্যে? একটু আগে সবাইকে দেড় ফুট সাইজের একটা কলা খাওয়ালাম না ?
এই কলাই কি আমাদের ডিনার?” “আচ্ছা একটা কথা, আমরা কি খাওয়া দাওয়া করার জন্যে বের হয়েছি, না আমাদের অন্য উদেশ্যও আছে ?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪
নীরা বলল, ক্ষুধার্ত অবস্থায় কিছুই ভাল লাগে না রানা। সুকান্তের মতো কবির কাছেও ক্ষুধার্ত অবস্থায় পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটির মতো মনে হয়েছে। | ‘হবে, খাবার ব্যবস্থাও হবে। আগে বাসার খোখবর করে দেখি। মোতালেব, তুই আয় আমার সঙ্গে।
‘আমি যাব কী জন্যে ? আমি তো আর দলপতি না, কিংবা দলপতির অ্যাসিসটেন্টও না।
রানা রাগ করেও বের হয়ে গেল।
সন্ধ্যা হয়ে গেছে। এখন কক্সবাজারে রওনা হওয়া ঠিক হবে না। পথে কোনাে বিপদ–আপদ হয় কি না কে বলবে ? জঙ্গলের ভেতর গাড়ির চাকা পাংচার হয়ে গেলো। চাকা ঠিক করা হচ্ছে, এর মধ্যে বেরিয়ে এল একদল ডাকাত। সঙ্গে এতগুলি মেয়ে ... রিস্ক নেয়া যাবে না। রতিটা এখানেই থাকতে হবে। স্টেশনের প্লাটফর্মে কাটাতে হবে! হােটেল নেয়ার প্রশ্নই আসে না। এত টাকা হােটেলওয়ালাকে সে কেন খামাখা দোবে? তা ছাড়া অনেক টাকা বাজেটের
অতিরিক্ত খরচ হয়েছে। আগে যে বাসা ঠিক করা হয়েছিল তাকে টাকা দিতে হয়েছে। আর একটা রাত স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে কাটানো এমন কিছু না। রানা ভোরে রওনা হবার জন্যে বারো সীটারের একটা লক্কর মুড়ির টিন মার্কা মাইক্রোবাস ঠিক করল। সে–ই সবচে‘ কম ভাড়ায় যেতে রাজি হয়েছে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-২৪
রাতের খাবার কিনে ফিরল। পরােটা–গােশত। আনুশকা পরােটা হাতে নিয়ে বলল, গােল গোল এই জিনিসগুলি কি ? রানা থমথমে গলায় বলল, কেন, পরােটা কখনো খাওনি ? ‘খেয়েছি। লোহার তৈরি পরােটা খাইনি। এইগুলি কীভাবে খায় ?
‘খেতে না চাইলে খাবে না। আমাকে বাজেটের দিকে লক্ষ রাখতে হবে। পােলাও–কোর্মা খাওয়ানাে সম্ভব না। খিদে লাগলে খাবে, না লাগলে নাহ।
‘গােশতগুলিও তাে মনে হচ্ছে প্লাস্টিকের। রানা বলল, সবাই হাতে হাতে নিয়ে নাও — পারহেড দুটা করে পরোটা।
নইমা কিছুই খেল না। সে ঢাকা চলে যাবে। কিছুতেই থাকবে না। তাকে টিকেট কেটে রাতের ট্রেনে তুলে দিলেই হবে। তাকে অনেক বােঝানাের চেষ্টা করা হচ্ছে, সে বুঝ মানছে না।
নীরা বলল, এত কাছে এসে ফিরে যাবি ? ‘হ্যা, ফিরে যাব। ‘এখন তাে আর কোনাে সমস্যা নেই। ‘সমস্যা নেই, সমস্যা হবে। আমার শিক্ষা হয়ে গেছে।
(চলবে)
Read more