‘বিয়ের আসর থেকে তুই পালিয়ে এলি কীভাবে?
‘বড় চাচী ব্যবস্থা করে দিলেন। আমি হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে বসে ছিলাম। বড় চাচী পালিয়ে যেতে বললেন।
আগে তো শুনেছিলাম, তাের এই চাচী তােকে দেখতে পারে না। ‘মানুষকে চট করে চেনা যায় না, আনুশকা। এই চাচী আমাকে সত্যি সত্যি অপছন্দ করতেন। সারাক্ষণ কঠিন সব অপমান করতেন। আমরা যে তাঁর বাড়ির আশ্রিত অন্নদাস এই কথা দিনের মধ্যে খুব কম হলেও দশবার মনে করিয়ে দিতেন।
অথচ এই তিনিই আমার চরম দুঃসময়ে আমার পাশে এসে দাড়ালেন। আমার মা আমার পাশে এসে দাড়াল না, আমার বাবাও না। কে পাশে এসে দাড়াল? আমার বড় চাচী। | আনুশকা বলল, চার ব্যাপারটা মন থেকে তাড়াতে পারছি না। মনে হচ্ছে, এক কাপ চা খেতে না পারলে মরে যাব। কী করা যায় বল তাে?
জরী বলল, এখন আর শুধু একটা জিনিসই করা যেতে পারে। ঐ লােকটার পায়ে ধবা। সেটা কি ঠিক হবে ? সামান্য এক কাপ চায়ের জন্যে পা ধরা ? তাও যদি সুন্দর পা হত একটা কথা ছিল। | আনুশকা অন্যমনস্ক গলায় বলল, “পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয় রাধা” – এই দুটা লাইন রবীন্দ্রনাথের কোন গল্পে আছে বল তাে?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৭
জানি না। বলতে পারব না। হঠাৎ কবিতার লাইন কেন?”
অনুশকা বলল, তাের পায়ে ধরার কথা থেকে মনে এল। আমাদের মন বিচিত্র এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছোটাছুটি করে।| ‘গল্পগুচ্ছে আছে জানি, কিন্তু কোন গল্প মনে পড়ছে না। আমার কিছু মনে না এলে খুব অস্থির লাগে। মাথায় চাপা যন্ত্রণা হয়। আমার ইচ্ছা করছে ডেকে ডেকে সবাইকে জিজ্ঞেস করি।‘
‘হ্যালো ম্যানেজার সাহেব, বলুন তাে “পায়ে ধরে সাধা, রা নাহি দেয়. রাধা” – এই লাইন দুটো রবীন্দ্রনাথের গল্পগুচ্ছের কোন গল্পে আছে?” | ম্যানেজার কঠিন চোখে তাকিয়ে রইল। জরী বলল, শুভ্র বলতে পারবে। যদি কেউ জানে শুভ্র জানবে।
শুভ্র শুকনাে মুখে একটা সিগারেট ধরিয়েছে। সিগারেট ধরানাের অস্বস্তিতে সে প্রায় মরে যাচ্ছে। মােতালেবের চাপাচাপিতে এটা করতে হয়েছে। মেতালেব হুঙ্কার দিয়ে
বলেছে – খাবি না মানে? খেতে হবে। গুড বয় হয়ে অনেক দিন পার করেছিল। আর না। এখন আমরা ব্যাড বয় হব।
‘ব্যাড বয় হলে সিগারেট খেতে হবে ?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৭
‘অবশ্যই খেতে হবে। সিগারেট খেতে হবে। গাঁজা খেতে হবে। শার্টের বুকের বােতাম খােলা রাখতে হবে। মেয়েরা আশেপাশে থাকলে অশ্লীল রসিকতা করতে হবে। খােল, শার্টের বুকের বােতাম খােল, যাতে বুকের লােম দেখা যায়। তাের বুকে লােম আছে ?
শুভ্রর চোখ–মুখ লাল হয়ে গেল। মােতালেব বলল, লজ্জায় তুই দেখি টমেটোর মতাে হয়ে গেছিস। ফুসফুস ভর্তি করে সিগারেটের ধোঁয়া নে, দেখবি লজ্জা কেটে যাবে। লাজুক মানুষ এইজন্যেই সিগারেট বেশি খায়। লজ্জা ঢাকার জন্যে খায়। গাঁজা খেলে কী হয় জানিস?
‘লজ্জা বেড়ে যায়। গাজা হল লজ্জাবর্ধক। বিরাট বডিবিল্ডারও দেখবি গাজার কঙ্কেতে টান দিয়ে মিহি মেয়েলি গলায় কথা বলবে। গাঁজার অন্য মজা।
শুভ্র বলল, তুই গাঁজা খেয়েছিস?
‘অবশ্যই খেয়েছি। গাঁজা খেয়েছি। কালিপূজার সময় ভাং–এর যে সরবত করে তাও খেয়েছি। ভাং–এর সরবত খেলে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হয়। কী হয় শুনতে চাস?
‘চাই।
‘এই তাে পথে আসছিস। আমার ধারণা ছিল তুই বলবি, শুনতে চাই না। দাঁড়া, তােকে বলব কী হয়। তার আগে জরী আর আনুশকাকে নিয়ে আসি। ওরা কোথায় ?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৭
‘চা খেতে গিয়েছে বুফে করে।
‘চল, ওদের নিয়ে আসি। ভাং খেলে কী হয় এটা শুনলে মেয়েরা খুব মজা পায়। এটা বলতে হবে মেয়েদের সামনে।
শুভ্রর খেতে ইচ্ছা করছে না। সিগারেট হাতে নিয়ে হাঁটতে লজ্জা লজ্জা। লাগছে। তার কাছে মনে হচ্ছে, সে কোনাে অপরাধ করে ফেলেছে এবং মা পরিষ্কার দেখছেন। এক্ষুনি যেন তিনি বলবেন, শুভ্র বাবা, তেমার হাতে কী?
মােতালেব বলল, সবাই মিলে ছাদে বসে যেতে পারলে ইন্টারেস্টিং হত। ট্রেনের ছাদে হাত–পা ছড়িয়ে শুয়ে থাকলে দারুণ লাগে।
শুভ্র বলল, ভয় লাগে না? ‘প্রথম দু–তিন মিনিট ভয় লাগে। তারপর আর লাগে না।
আনুশকা ওদের দেখেই বলল, ঐ ম্যানেজার আমাদের চা দিচ্ছে না। আধ ঘণ্টার মতাে বসে আছি। একটু বলে দেখাে না।
মােতালেব বলল, তােমার মতাে রূপবতীকে চা দেয়নি, আমাকে দেবে? হাতি ঘােড়া গেল তল, মােতালেব বলে কত জল ?
“তােমার তাে অনেক টেকনিক আছে।”
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৭
‘আচ্ছা দেখি। একটা নিউ টেকনিক অ্যাপ্লাই করে দেখি। শুভ্র, তুই আয় আমার সঙ্গে। এই টেকনিকে ম্যান পাওয়ার লাগে। | শুভ্র বাধ্য ছেলের মতাে রওনা হল। সে ভেবেছিল, তার হাতে সিগারেট দেখে জরী বা আনুশকা কিছু বলবে। তারা কিছু বলেনি।শুধু জরী সিগারেটের দিকে তাকিয়ে বিচিত্র ভঙ্গিতে হেসেছে। বাচ্চা ছেলে বাবার জুতায় পা ঢুকিয়ে হাঁটার চেষ্টা করলে মারা যেমন ভঙ্গিতে হাসে অনেকটা সেই ভঙ্গির হাসি। মােতালেব কাচুমাচু মুখে ম্যানেজারকে বলল, ভাইজান, রূপবতী দুই মহিলা আধ ঘণ্টার উপর বসে আছে। এদের চা দিচ্ছেন না কেন?
‘বুফে কার বন্ধ। ‘এখানে আসার পথে দেখলাম, টী–পটে চা নিয়ে ফাস্ট ক্লাসের দিকে যাচ্ছে। “আগে অর্ডার ছিল।
‘ভাই, আমরা গল্পগুজব করতে করতে ছুটি কাটাতে যাচ্ছি। দেন না। দশটা টাকা নাহয় বেশি রাখেন। নাে প্রবলেম।
‘বললাম তাে, হবে না।
Read more