এক চুমুক পানি খেয়েই
রাহেলার মনে হল, তার আসলে পিপাসা পায়নি। রাহেলা বললেন, মজিদ কি এসেছে মধুর মা ?
‘জ্বি আসছে। ‘কতক্ষণ হল এসেছে ? ‘অনেকক্ষণ। ‘আমাকে বলনি কেন ? রাহেলা উঠে দাঁড়ালেন। তাঁর মার্থা অবশ্যি এখনাে ঘুরছে। আজ সকালে ব্লাড় প্রেশারের ওষুধ কি তিনি খেয়েছেন? রাহেল মনে করতে পারলেন না। মজিদকে পাঠাতে হবে ডাক্তার সাহেবকে আনার জন্যে। রাহেলার এক দূর সম্পর্কের চাচা তাঁর ডাক্তার। ওঁর বাসায় টেলিফোন নেই, খবর দিতে কাউকে পাঠাতে হয়।
দরজার বাইরে দাড়িয়ে মজিদ খুক খুক করে কাশল। রাহেলা বললেন, মজিদ, তুমি কখন এসেছ?
‘অনেকক্ষণ হইল আসছি। “খবর দাওনি কেন?”
মজিদ অন্যদিকে তাকিয়ে মাথা চুলকাচ্ছে। এ বাড়ির সবক‘টা কাজের মানুষ এমন গাধা কেন? মজিদকে স্টেশনে পাঠানাে হয়েছিল দূর থেকে দেখার জন্যে শুভ্র ঠিকমত ট্রেনে উঠতে পারল কি না। এই খবর সে বাসায় এসে দেবে না ?
‘শুভ্র কি ট্রেনে ঠিকমত উঠেছে ?” ‘জি আম্মা। ‘ওর বন্ধুরা সব ছিল ? ‘জি, ছিল। ‘শুভ্র তােমাকে দেখতে পায়নি তাে? ‘জ্বি না। ছােট ভাইজানের চোখে চশমা ছিল না।
রাহেলা হতভম্ব হয়ে গেলেন। এই গাধা কী বলছে ! চোখে চশমা ছিল না মানে কী? গাধাটা কি জানে না, চশমা ছাড়া শুভ্র অন্ধ? নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ ভঙ্গিতে রাহেলা বললেন, চোখে চশমা ছিল না?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৯
“জ্বি না। চশমা ছাড়া সে ট্রেনে গিয়ে উঠল কীভাবে? ‘একজন সুন্দরমত আপা উনার হাত ধইরা টেরেইনে নিয়ে তুলছেন। ‘তুমি জিজ্ঞেস করনি, আপনার চশমা কোথায়? ‘জ্বি না। আপনে বলছেন দূর থাইক্যা দেখতে।
গাধাটার সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছা করছে না। রাহেলা দোতলায় উঠে এলেন। এইটুক সিঁড়ি ভাঙতেই তঁার দম আটকে আসছে। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে মেঝেতে পড়ে যাবেন। মধুর মাকে দিয়ে খবর পাঠালেন যেন ডাক্তার আনা হয়। ঘড়ি দেখলেন, শুভ্রর বাবার আসার সময় হয়েছে। তার সঙ্গে কথা বললে রাহেলার মনের অস্থিরতা কিছুটা কমবে। মানুষটা হয়ত যুক্তি দিয়ে বোঝাবে, চশমা ছাড়া শুভ্রের তেমন অসুবিধা হবে না।
কিংবা কোনাে ব্যবস্থা করবে যেন ট্রেনেই শুভ্র চশমা পেয়ে যায়। সুন্দরমত একজন আপা শুভ্রের হাত ধরে টেনে তুলেছে। সেই সুন্দরমত আপাটি। কে ? শুভ্রের কোনাে মেয়েবন্ধু আছে বলে তিনি জানেন না। এ বাড়িতে মেয়েরা কখনো আসেনি। কারো সঙ্গে ভাব থাকলে শুভ্র নিশ্চয়ই তাকে এ বাড়িতে আসতে বলত। রাহেলার খুব শরীর খারাপ লাগছে। আবার পিপাসা হচ্ছে। হাত কাঁপছে।
শুভ্রর বাবা বাড়ি ফিরলেন রাত বারােটা দশ মিনিটে। এত রাতে তিনি কখনাে বাড়ি ফিরেন না। তাঁর টুঙ্গী সিরামিক্স কারখানার সমস্যা হচ্ছে বলে গত কয়েক রাত ফিরতে দেরি হচ্ছে।
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৯
ইয়াজউদ্দিন সাহেব দোতলায় উঠে দেখলেন, শুভ্রর ঘরে বাতি জ্বলছে। তিনি বিস্মিত হয়ে উকি দিলেন। শুভ্রের বিছানায় রাহেলা পা তুলে বসে আছেন। রাহেলার মাথার চুল ভেজা। মনে হচ্ছে কিছুক্ষণ আগেই মাথায় পানি ঢালা হয়েছে। ইয়াজউদ্দিন সাহেব বললেন, কী ব্যাপার?
রাহেলা ক্ষীণ গলায় বললেন, শুভ্র তার চশমা হারিয়ে ফেলেছে। ‘শুভ্রের কথা জানতে চাচ্ছি না। তােমার কী হয়েছে ? ‘আমার খুব অস্থির লাগছে।‘ ‘প্রেশার বেড়েছে ?”
‘ডাক্তার এসেছিল ?”
‘প্রেসার এখন কত ?
উনি বলেননি। অষুধ খেতে দিয়েছেন। খেয়েছ?
ইয়াজউদ্দিন সাহেব চেয়ার টেনে রাহেলার মুখােমুখি বসলেন। ‘ভাত খেয়েছ রাহেলা ?”
‘উঠে খাবার দিতে বলে। আমি গােসল করে চারটা খাব। খাবার টেবিলে কথা হবে। শুভ্রের চশমার ব্যাপারে এত চিন্তিত হবার কিছু দেখছি না। তুমি কি ওকে বাড়তি চশমা দাওনি ?
‘ওর হ্যান্ডব্যাগে দুটা আছে। কিন্তু ওকে তো বলা হয়নি।
‘না বললেও অসুবিধা হবে না। একসময় না একসময় ও ব্যাগ খুলবে। ব্যাগ খুললেই পেয়ে যাবে।
রাহেলা ফিসফিস করে বললেন, যদি ব্যাগটা হারিয়ে ফেলে? চোখে তাে এখন দেখছে না। নিজের ব্যাগ চিনবে কী করে?
রূপালী দ্বীপ-পর্ব-৯
ইয়াজউদ্দিন সাহেব ধৈর্য হারালেন না। শান্ত গলায় বললেন, চিটাগাং নেমে নতুন চশমা বানিয়ে নেবে। প্রেসক্রিপশন সবসময় শুভ্রর মানিব্যাগে থাকে। থাকে?
‘নামো তো বিছানা থেকে। নামে। ‘আমার খুব অস্থির লাগছে।
‘শোনো রাহেলা, আমি বরং এক কাজ করি। আমাদের চিটাগাং অফিসের সিদ্দিককে বলে দিই, সে ভােরবেলা চিটাগাং রেল স্টেশনে যাবে এবং শুভ্রকে বলবে,
আর হ্যান্ডব্যাগের সাইড পকেটে চশমা আছে।
‘আচ্ছা।‘ ‘তােমার অস্থিরতা কি এখন একটু কমেছে ?
Read more