লীলাবতী পর্ব – ২০ হুমায়ূন আহমেদ

লীলাবতী

কী নাম?

আনিসুর রহমান।

আর কোনো নাম আছে?

জি না।

মালেক বলে কাউকে চেনো?

জি না।

মালেক নাম তো খুবই কমন, এই নামে কাউকে চেনো না?

জি না। কমিউনিষ্ট পাটির নেতা মোহাম্মাদ মালেক। উনাকে চেন না?

জি না।

শরিয়তুল্লাহ বলে কাউকে চেন? ঠিকানা তস্তুরীবাজার।

জি না।

সে তো তোমাকে তিনটা ডিকশনারি পাঠিয়েছিল, তাকে চেনো না?

জি না।

সফিকুর রহমান বলে কাউকে চেনো?

আমার বাবার নাম সফিকুর রহমান।

তাও ভালো, নিজের বাবাকে ইচনতে পারছ। আমি ভেবেছিলাম, তুমি কাউকেই চিনবে না। নিজের বাবাকেও না।প্রশ্ন কর্তা হেসে ফেললেন। প্রশ্ন কর্তার সঙ্গে যে তিনজন আছেন তারাও হাসলেন। যে ঘরে কথাবার্তা হচ্ছে সেই ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ। ছোট্ট ঘুপচি মতো ঘর। হলুদ রঙের দালান। ছাদ অনেক উঁচু। উঁচু ছাদ থেকে ঝুলন্ত লম্বা তারের মাথায় ইলেকট্রিক বান্ধ। ঘরে কোনো হাওয়া আসছে না। কিন্তু বান্ধটা পেন্ডুলামের মতো দুলছে।

আনিসের দৃষ্টি বান্ধে আটকে যাচ্ছে। বাম্বের আলো উজ্জ্বল। মনে হয় একশ পাওয়ারের বাহু। উজ্জ্বল আলো চোখে পড়ায় সে তার সামনে বসা তিনজনকে ঠিকমতো দেখতে পারছে না। যিনি তাঁকে প্রশ্ন করছেন তিনি পুলিশের কোনো সিনিয়র অফিসার হবেন। কারণ তাঁর পাশের দুজন অত্যন্ত সমীহ করে তাঁর দিকে তাকাচ্ছেন। মূল প্রশ্নকর্তার গায়ে সার্ট-প্যান্ট। সাটের রঙ হালকা নীল। বাকি দুজনের গায়ে পুলিশের পোশাক। প্রশ্ন কর্তার সামনের টেবিলে ফুলতোলা একা রুমাল। রুমালে একটা পিস্তল।

তোমার নাম আনিসুর রহমান?

জি।

তোমার বাবা নাম সফিকুর রহমান?

জি।

এমএ পাশ করেছ?

জি।

তোমার বিষয়বস্তু হলো ইতিহাস।

জি।

টেবিলে রাখা পিস্তলটা তুমি চেনো? চেনো না? তোমাকে চিনতেই হবে, কারণ তোমাকে ধরা হয়েছে পিস্তলসহ। এখন বলো, পিস্তলটিা চেনো না?

জি চিনি।

এই পিস্তল কখনো ব্যবহার করেছ?

জি না।

ব্যবহার করো নাই কী জন্যে?

আমাকে পিস্তলটা লুকিয়ে রাখার জন্যে দেয়া হয়েছে। ব্যবহার করার জন্য দেয়া হয় নি।

কে তোমাকে দিয়েছে?

আমি তার নাম বলব না।

নাম তো অবশ্যই বলবে। আমরা এখনো জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করি নাই। যখন জিজ্ঞাসাবাদ সত্যি সত্যি শুরু করব, তখন প্রশ্ন জিজ্ঞাস করার আগেই উত্তর দিয়ে দিবে। তোমাকে তোমার নাম জিজ্ঞসা করব, তুমি নিজের নাম তো বলবেই, তোমার বাবার নাম বলবে, তোমার শ্বশুরের নামও বলবে। শ্বশুরের নাম কী?

স্যার, আমি এখনো বিয়ে করি নি।বিয়ে করো নি কেন? পার্টির নিষেধ আছে? তুমি কমিউনিস্ট পাটির মেম্বার না?জি মেম্বার।তোমাকে মেম্বার কে বানিয়েছেন? মোহাম্মদ মালেক? জি।ভাষা আন্দোলনে জড়িত আছ? জি না।জড়িত না কী জন্যে— বাংলা ভাষা পছন্দ করো না? না-কি আরো বড় ধরনের আন্দোলনের জন্যে অপেক্ষা? স্যার, একটু পানি খাব।অবশ্যই পানি খাবে। পানি কেন খাবে না! তোমাকে যদি এখন পানি না। দেই, তাহলে রোজহাশরে আমি নিজে পানি পাব না। পানি দিচ্ছি। পানি খাও। তারপর গরম এক কাপ চা দিচ্ছি। চা খাও। ধূমপানের অভ্যাস আছে?

জি আছে।গুড। সিগারেট দিচ্ছি। সিগারেট খাও। মন শান্ত করো এবং সুবোধ বালকের মতো প্রশ্নের উত্তর দাও। তুমি যে কী ভয়াবহ অবস্থায় আছ তুমি জানো না। তুমি ধরা পড়েছ অস্ত্রসহ। অস্ত্র মামলায় তোমার যাবজীবন সাজা হয়ে যাবে। আর আমরা যদি আরেকটু কায়দা-কানুন করি, তাহলে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিতে পারব। ঠিক আছে। এখন কিছু সময়ের জন্যে আমরা ব্ৰেক নেব। ভালো কথা, সারাদিনে তুমি কিছু খেয়েছ?

জি না।তাহলে তো শুধু চা খাওয়া ঠিক হবে না। চায়ের সঙ্গে সামান্য কিছু হলেও খাওয়া। মাখন দেওয়া দুই পিস পাউরুটি দিতে বলি? বলব? জি বলুন।আমার নাম এবং তোমার বাবার নাম কিন্তু এক। আমার নামও সফিকুর রহমান। আইবি’র পুলিশ ইন্সপেক্টর সফিকুর রহমান। তোমার বাবা নিশ্চয়ই খুব ভালো মানুষ ছিলেন। ছিলেন না?

জি।আমি কিন্তু ভালো মানুষ না। আমি খুব খারাপ মানুষ। কতটা খারাপ কিছুক্ষণের মধ্যেই টের পাবে।স্যার, একটু পানি খাব।অবশ্যই পানি খাবে। তোমাকে তো বলেছি পানি দেয়া হবে। পানি, চা, সিগারেট, মাখন লাগানো দুই স্নাইস পাউরুটি। আচ্ছা আনিস, গত দুই বছর তুমি কোথায় ছিলে? ময়মনসিংহে, নয়াপাড়া। সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের বাড়িতে।এই রিভলবার কি তখনো তোমার সঙ্গে ছিল? জি।আর কেউ সেখানে তোমার সঙ্গে দেখা করার জন্যে গিয়েছিল? জি না।মনে করে দেখ, কেউ না?

জি না। স্যার পানি খাব।ও হ্যাঁ পানি খাবে। পানি, চা-নাশতা দিতে বলছি। সিগারেট দিচ্ছি। সিগারেট টানতে থাকো এবং যে সব প্রশ্ন করব তার জবাবগুলি ঠিক করে রাখো। কাগজ দেয়া হবে। কাগজে গুছিয়ে লিখবো। তিনটা মাত্র প্রশ্ন। প্রশ্নগুলি মন দিয়ে শোনো— প্রশ্ন এক. এ জাতীয় অস্ত্ৰ তোমাদের কাছে কয়টি আছে? কার কার কাছে আছে? প্রশ্ন দুই. হিন্দুস্তানের সঙ্গে তোমাদের কি যোগাযোগ আছে? প্রশ্ন তিন. তোমাদের মূল আন্দোলনটি বৃহৎ বাংলা আন্দোলন, সর্বহারা আন্দোলন না-কি ভালো পাকিস্তান আন্দোলন। সহজ প্রশ্ন— সহজ উত্তর। ঠিক না আনিস?

জি স্যার।পুলিশ ইন্সপেক্টর সাহেব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললেন, প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক না পেলে আমি কী করব সেটাও একটু বলে রাখি, এতে সুবিধা হবে। আমি তোমার তিনটা আঙুলের নখের নিচে আলপিন ঢুকিয়ে দেব। কোন তিনটা আঙুল সেটা তুমিই ঠিক করবে। খুবই কষ্টকর প্রক্রিয়া, কিন্তু কী আর করা! স্যার পানি খাব।পুলিশ ইন্সপেক্টর সফিকুর রহমান পানি দিতে বললেন। চা-সিগারেট দিতে বললেন। তার মুখে হাসি।

আনিস কুণ্ডুলি পাকিয়ে শুয়ে আছে। তার নিচে দুটা কালো কম্বল। আরেকটা কম্বল তার গায়ে। যে সেলে তাকে রাখা হয়েছে সেটি ফাঁসির আসামিদের জন্যে আলাদা করা কনডেম সেল। সেলের ছাদের সঙ্গে আলো-বাতাস আসা-যাওয়ার জন্যে চারকোনা একটি ভেন্টিলেটার আছে। এই মুহুর্তে ভেন্টিলেটার দিয়ে রোদ এসেছে। সেই রোদ পড়েছে দেয়ালে। আনিস রোদের দিকে তাকিয়ে আছে। সেলের ভেতরে ভ্যাপসা গরম।

আনিসের লাগছে ঠাণ্ডা। তার কাছে মনে হচ্ছে, মেঝের নিচ থেকে ঠাণ্ডা উঠে এসে তার গায়ে লাগছে। দুটা কম্বলে ঠাণ্ডা মানছে না। দিনের বেলাতেও তার মুখের কাছে এবং কানের কাছে মশা ভিনভন্ন করছে। হাত দিয়ে মশা তাড়ানোর উপায় নেই। দুটা হাতই ফুলে উঠেছে। নখের নিচে পিন ঢুকানোর ফল ফলেছে, হাত বিষিয়ে উঠেছে।

বেশির ভাগ সময় আনিস ঘোরের মধ্যে কাটাচ্ছে। ঘোরটা যখন আসে। তখন তার ভালো লাগে। আঙুলের যন্ত্রণা টের পাওয়া যায় না। ঘোরের সময় সে কাউকে না কাউকে সেলের ভেতর বসে থাকতে দেখে। বেশির ভাগ সময় দেখে মালেক ভাইকে। মালেক ভাই নিচু গলায় কথা বলেন। তাঁর কথাগুলি বেশির ভাগ সময়ই গানের মতো মনে হয়। মনে হয়। গানের সুরে কথা বলে এই মানুষটা তাকে ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করছে।কেমন আছ আনিস?

ভালো আছি। মনে হয় জ্বর আসছে কিন্তু আমি ভালো আছি।তোমার কথা শুনে ভালো লাগল। আনিস শোনো, যেখানে থাকবে, যে অবস্থায় থাকবে ভালো থাকার চেষ্টা করবে। ভালো থাকার চেষ্টা করাটা খুব জরুরি।জি।আনিস শোনো, দেশের ভালোর জন্যে দেশের সব মানুষ কাজ করে না।

অল্প কিছু মানুষ কাজ করে। তুমি অল্প কিছু মানুষের একজন। এটা ভেবে তোমার ভালো লাগছে না? জি লাগছে।যে কষ্ট তুমি ভোগ করছ, সেই কষ্ট তোমার পরের প্রজন্ম ভোগ করবে না। তারা বাস করবে স্বাধীন বাংলাদেশে।মালেক ভাই, এইসব কথা অনেকবার বলেছেন। নতুন কিছু বলুন।নতুন কথা শুনতে চাও? এইগুলাও নতুন কথা।

আনিস মাঝে মাঝে সিদ্দিকুর রহমান সাহেবকে তার পাশে বসে থাকতে দেখে। তিনি সবসময়ই অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলেন।মাস্টার।জি।ফুলের পাপড়ি সবসময় বেজোড় সংখ্যায় হয়। একটা ফুলের পাপড়ি হয় জোড় সংখ্যায়। ফুলের নামটা বলো।বলতে পারছি না।চিন্তা করো। চিন্তা করে বলো।চিন্তা করতে ভালো লাগছে না।কেন ভালো লাগছে না? গাছপালা বনজঙ্গল আমার ভালো লাগে না। তাদের নিয়ে চিন্তা করার কিছু নেই। চিন্তা করতে হবে মানুষ নিয়ে।গাছপালা, বনজঙ্গল এরা কি মানুষের অংশ না? এইসব আপনি কী বলেন, এরা মানুষের অংশ হবে কী জন্যে?

আমার তো মনে হয় মানুষই বরং গাছপালার অংশ। মানুষকে গাছের ফুল হিসেবে কল্পনা করো। ফুলের থাকে পাপড়ি, মানুষের আঙুল হলো পাপড়ি। ফুলের থাকে গন্ধ— মানুষের গুণ হচ্ছে গন্ধ। ফুল থেকে ফল হয়… আপনি কি চুপ করবেন?

আচ্ছা যাও চুপ করলাম।হঠাৎ হঠাৎ আনিস লীলাবতীকে দেখতে পায়। সে খুব ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে, আপনি আমার সঙ্গে চলুন তো।কোথায় যাব? আমাদের বাড়িতে যাবেন। আমি আপনাকে জঙ্গলের ভেতর লুকিয়ে রাখব, কেউ আপনাকে পাবে না।এরা আমাকে ছাড়বে না।

তাহলে একটা কাজ করুন, এরা আপনার কাছে যা যা জানতে চায় সব বলে দিন। হড়হড় করে বলে দিন।সম্ভব না।অবশ্যই সম্ভব। পুলিশ ইন্সপেক্টর সাহেবকে ডাকুন, ডেকে সব বলে দিন।পুলিশ ইন্সপেক্টর সাহেবকে বেশির ভাগ সময়ই আনিস তার আশেপাশে দেখতে পায়। তিনি হাতে একটা আলপিন নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন এবং একটা প্রশ্নই বারবার করতে থাকেন। আনিসও ক্লান্তিহীনভাবে সেই প্রশ্নের উত্তর দিতে থাকে।

তোমার নাম কী?

আনিস।

তোমার নাম কী?

আনিস।

তোমার নাম কী?

আনিস।

তোমার নাম কী?

আনিস।

তোমার নাম কী?

আনিস।

বনের ভেতর চৌকি পাতা। চৌকির উপর শীতলপাটি। সিদ্দিকুর রহমান শীতলপাটিতে শুয়ে আছেন। পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো এসে পড়েছে তার গায়ে। রোদটা ভালো লাগছে। চৌকির উপর কিছু ধান ছিটিয়ে রাখা হয়েছে। সিদ্দিকুর রহমানের ধারণা, পাখিরা ধান খেতে চৌকিতে এসে বসবে। তার ধারণা ঠিক হয় নি। কোনো পাখি আসছে না। তারা মানুষের প্রতি তাদের ভয় দূর করতে পারে নি।

বন্য কোনো ফুল কাছেই কোথাও ফুটেছে। তিনি ফুলের কড়া ঘাণ পাচ্ছেন। কাঁঠালাচাপার তীব্র ঘাণ। বনের ভেতরে কাঠালাচাপার কোনো গাছ তার চোখে পড়ে নি। গন্ধটা আসছে কোথা থেকে? তিনি শোয়া থেকে উঠে বসলেন। সুলেমান-লোকমান কেউ তার পাশে নেই। ইদানীং তিনি তাদের বনের ভেতর ঢুকতে দেন না। তারা এসে পাটি বিছিয়ে চলে যায়। বনের বাইরে অপেক্ষা করে। আজ কেউ আশেপাশে থাকলে ভালো হতো। কাঁঠালচাপা গাছে ফুল ফুটেছে কি-না দেখতে বলতেন।

সিদ্দিকুর রহমানের পেছনে খুটাখুটি শব্দ হচ্ছে। তিনি ঘাড় ফিরিয়ে খুবই অবাক হলেন। নীল রঙের একটা পাখি খুঁটে খুঁটে ধান খাচ্ছে। পাখির মাথায় ঝুটি আছে। ঠোঁট টিয়া পাখির ঠোঁটের মতো লাল। সিদ্দিকুর রহমান যে পাখিটার দিকে তাকিয়ে আছেন তা সে বুঝতে পারছে। কিন্তু ভয় পাচ্ছে না। খুঁট খুঁট শব্দে ধান খেয়ে যাচ্ছে। সিদ্দিকুর রহমান বললেন, কিরে তুই একা কেন?

তোর সঙ্গীসাথিরা কই? হঠাৎ কথা শুনে পাখি সামান্য চমকে গেল। ডানা ঝাপ্টাল। আবার শান্ত হয়ে গেল। সিদ্দিকুর রহমান মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছেন। নীল পাখির একটি সঙ্গীকে তার মাথার উপর দিয়ে কয়েকবার উড়ে যেতে দেখা গেল। সে মনে হয় সাহস সঞ্চয় করছে। পরিস্থিতি বিবেচনা করছে।

তিনি আবারো শুয়ে পড়লেন। পাখিরা আসুক। কেউ কেউ এসে বসুক তার গায়ে।ধর্মপাশা থানার ওসি সাহেব ঘোড়ায় চড়ে এসেছেন। সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের সঙ্গে দেখা করবেন। জরুরি। লোকমান-সুলেমানের উপর দায়িত্ব কেউ যেন বনে ঢুকতে না পারে। ওসি সাহেবকে তারা সাহস করে এই কথা বলতে পারল না।

ওসি সাহেব বললেন, উনি বনের ভেতর কী করেন? সুলেমান বলল, উনার শরীর খারাপ। উনি শুয়ে থাকেন।শরীর খারাপ হলে বনের ভেতর শুয়ে থাকতে হবে কেন? সুলেমান জবাব দিল না। এই প্রশ্নের জবাব তার কাছে নেই। ওসি সাহেব বললেন, জঙ্গলে কোথায় শুয়ে থাকেন? ব্যবস্থা আছে।কী ব্যবস্থা? চলেন নিজের চোখে দেখবেন।

ওসি সাহেব যে দৃশ্য দেখলেন তার জন্যে তিনি প্রস্তুত ছিলেন না। সিদ্দিকুর রহমান শুয়ে আছেন, তাকে ঘিরে রাজ্যের পাখি। কিছু পাখি। আবার তার গায়ের উপর বসে আছে। পায়ের শব্দে সব পাখি উড়ে গেল। সিদ্দিকুর রহমান উঠে বসলেন। ওসি সাহেব বললেন, স্যার সাল্লামালিকুম। আমাকে চিনেছেন? ওসি ধর্মপাশা।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, কী ব্যাপার?

স্যার একজন লোক সম্পর্কে খোঁজ নিতে এসেছি। আনিস নাম। আপনার বাড়িতে জায়গির থাকত।এখন সে নাই।স্যার জানি। সে জেলে আছে। ঘুঘু লোক। পিস্তলসহ ধরা পড়েছে। কমিউনিস্ট পার্টি করত।সিদ্দিকুর রহমান বললেন, আমি তাকে ভালো লোক হিসাবে জানি।ভালো-মন্দের বিচার একেকজনের কাছে একেক রকম। আপনার কাছে যে ভালো, অন্যের কাছে সে খারাপ।

সিদ্দিকুর রহমান বললেন, যে ভালো সে সবসময় ভালো। সবের কাছে ভালো।ওসি সাহেব বললেন, স্যার, এই বিষয়ে আপনার সঙ্গে তর্ক করব না। আপনার কাছে একটা অনুমতির জন্যে এসেছি। আনিস যে ঘরে থাকত সেই ঘরটা সার্চ করব। ঘরে কাগজপত্র কী আছে দেখব।অনুমতি না দিলে সার্চ করবেন না? অনমতি না দিলেও সার্চ করব। আমার সঙ্গে সার্চ ওয়ারেন্ট আছে।তাহলে অনুমতি চাইলেন কেন?

ভদ্রতা করলাম স্যার। আমরা তো ব্রিটিশ সরকারের পুলিশ না। আমরা পাকিস্তান সরকারের পুলিশ। আমরা ভদ্র।যান। সার্চ করেন।সার্চটা আপনার সামনে করতে চাই।আমি এখান থেকে যাব না। বাড়িতে আমার বড় মেয়ে আছে। নাম লীলা। সব কিছু এখন সে দেখে। সে থাকবে আপনার সঙ্গে।

স্যার, আরেকটা বেয়াদবি করব। আমরা শুধু আনিস যে ঘরে থাকত সেই ঘর সার্চ করব না। আমরা পুরো বাড়ি সার্চ করব। সরকারের হুকুম। আমরা হুকুমের গোলাম।সিদ্দিকুর রহমান কিছু বললেন না। আবার চৌকিতে শুয়ে পড়লেন।সন্ধ্যা পর্যন্ত বাড়ি সার্চ হলো। মূলবাড়ি, শহরবাড়ি। নদীর পাড়ে নিরঞ্জন যেখানে থাকে। সেই ছনের ঘর। কিছুই বাদ গেল না। চারটা বাধাই করা মোটা মোটা খাতা ছাড়া কিছু পাওয়া গেল না। খাতার প্রতিটি পাতায় একটা শব্দ লেখা লীলাবতী!

ওসি সাহেব লীলাবতীর দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার নামই তো লীলাবতী! এই লোক লক্ষবার আপনার নাম লিখেছে, কারণ কী? লীলাবতী বলল, আপনি যেমন কারণ জানেন না। আমিও জানি না।তার সঙ্গে আপনার পরিচয় ছিল না? লক্ষ বার নাম লেখার মতো পরিচয় ছিল না।সে যে অতি বিপদজনক ব্যক্তি তা কি জানেন? আগে জানতাম না। এখন জানলাম।আগে কী জানতেন?

আগে জানতাম উনি লাজুক ধরনের একজন মানুষ। ওসি সাহেব শুনুন, আমি খুব খুশি হবো খাতা চারটা যদি আপনি রেখে যান।খাতাগুলি সীজ করা হয়েছে। রাখা যাবে না।আপনাদের কাছে চারটা খাতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে সাংকেতিক ভাষায় অনেক গোপন তথ্য লুকানো? ওসি সাহেব জবাব দিলেন না। তিনি মঞ্জুকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।আপনি কে? আমার নাম মঞ্জু। মঞ্জুল করিম।আপনি এই বাড়ির কে? আমি এই বাড়ির কেউ না।

এই বাড়ির কেউ না, তাহলে এই বাড়িতে আছেন কেন? আমি লীলাবতীকে তার মামার বাড়ি থেকে এ বাড়িতে নিয়ে এসেছি।সেটা কবে? প্রায় দেড় বছর।দেড় বছর ধরে এ বাড়িতে আছেন? আপনি কী করেন? অর্থাৎ এই বাড়িতে আপনার কাজটা কী? মঞ্জু, হকচাকিয়ে গেলেন। তাই তো, এ বাড়িতে তার কাজটা কী? ওসি সাহেব বললেন, আপনাকে যে আমার সঙ্গে একটু থানায় যেতে হবে।কেন?

জিজ্ঞাসাবাদ করব।জিজ্ঞাসাবাদ এখানে করেন।সব জিজ্ঞাসাবাদ সব জায়গায় করা যায় না।আমি থানায় যাব না। জিজ্ঞাসাবাদ যা করার এখানে করেন।ওসি সাহেব বললেন, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।পুলিশের দল রাত আটটায় মঞ্জুকে হ্যান্ডকাফ এবং কোমরে দড়ি বেঁধে ধর্মপাশা থানার দিকে রওনা হলো। সারা গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়ল। এই দৃশ্য দেখার জন্যে।

পরীবানু কাঁদছে। তার দুই পুত্র ঝড়-তুফান চিৎকার করে কাঁদছে। জইতরী-কইতরী কাঁদছে। সিদ্দিকুর রহমান তাঁর বাড়ির উঠানে ইজিচেয়ারে স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। তাঁর পেছনে হাঁটু গেড়ে বসে আছে সুলেমান-লোকমান। এক সময় সিদ্দিকুর রহমান চাপা গলায় বললেন, আমার বাড়ির মেহমান পুলিশ আমার সামনে থেকে ধরে নিয়ে গেল। এত বড় অপমান আল্লাহপাক আমার জন্যে রেখেছেন?

তাঁর কথা শেষ হবার আগেই সুলেমান নিঃশব্দে উঠান ছেড়ে গেল। সুলেমানের ছাড়া অলঙ্গায় (বর্শ জাতীয় অস্ত্র) ধর্মপাশা থানার ওসি নিহত হলেন, সেকেন্ডে অফিসার গুরুতর আহত হলেন। রিজার্ভ পুলিশ তলব করা হলো ময়মনসিংহ থেকে। সিদ্দিকুর রহমান সাহেবকে গ্রেফতার করে ময়মনসিংহ নিয়ে যাওয়া হলো পরের দিন ভোরে। সেই দিন দুপুরেই শত শত মানুষ ধর্মপাশা থানা ঘেরাও করে থানা জ্বলিয়ে দিল। দৈনিক আজাদ পত্রিকায় যে রিপোর্টটি ছাপা হলো তার শিরোনাম–

ধর্মপাশা থানা ভস্মিভূত ও লুষ্ঠিত

চার পুলিশ নিহত

তারিখ ৪ জুলাই ১৯৫৭ সন।

সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের দিন কাটছে জেল হাজতে। মামলা চলছে দীর্ঘদিন। হাতকড়া বাঁধা অবস্থায় তিনি দিনের পর দিন কোর্ট যাচ্ছেন। কোর্ট থেকে ফেরত আসছেন। উকিলদের জেরার মুখে তিনি একটি কথাই বলছেন, সুলেমান নিজের ইচ্ছায় কিছু করে নাই, আমি তাকে বলেছি মঞ্জুকে ছাড়িয়ে আনতে। মঞ্জু, আমার বাড়ির অতিথি। তাকে কোমরে দড়ি বেঁধে নিয়ে যাবে তা হয় না।

সিদ্দিকুর রহমান সাহেবের উকিল বাবু নিত্যরঞ্জন সাহা তাকে অনেক বুঝিয়েছেন। তাকে বলেছেন, আপনি অপরাধ নিজের ঘাড়ে টেনে নিচ্ছেন, এতে লাভ হবে না। সুলেমান বাঁচবে না, তাকে ফাঁসিতে ঝুলতে হবে। মাঝখান থেকে আপনি বিপদে পড়বেন। আপনি যেটা সত্যি সেটা বলুন। বলুন আপনি এই বিষয়ে কিছুই জানেন না। সুলেমান যা করেছে নিজের দায়িত্বে করেছে। সিদ্দিকুর রহমান বলেছেন, আমি একেকবার একেক কথা বলি না উকিল সাহেব।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *