শেষ বিকেলের মেয়ে পর্ব:২ জহির রায়হান

শেষ বিকেলের মেয়ে পর্ব:২

শিউলি আস্তে করে বললো, রাগ করলেন তো? করুন। এমনি সবাই আমার ওপর রাগ করে। আপনি অবশ্য ওদের সবার মত কিনা জানি না। ক্ষণকাল থেমে শিউলি আবার বললো, জানেন, আমি অনেক লোকের সঙ্গে মিশেছি। ওরা অনেকেই আপনার বয়েসি। কেউবা ছোট। কেউ আরো বড়ো। ওদের সঙ্গে বন্ধু হিসেবেই মিশতাম। আমি। আপনি হয়তো বলবেন, এ দেশে পুরুষে মেয়েতে বন্ধুত্ব চলতে পারে না। আমি বলবো, ওটা ভুল। ওটা আপনাদের মনের সংস্কার ছাড়া আর কিছু নয়। এই যে আমরা দু’জন এক রিক্সায় চড়ে বাসায় ফিরছি। লোকে দেখে কত কিছুই না ভাবতে পারে। কিন্তু আমি জানি, আমাদের মনে কোন দুর্বলতা নেই।

কাসেদ নড়েচড়ে বসলো।শান্ত শিশুর মত নীরবে শিউলির কথাগুলো শুনছে সে। গাল বেয়ে মুদু ঘাম ঝরছে তার।বড় রাস্তা পেরিয়ে রিক্সাটা গলির মধ্যে ঢুকলো।শিউলি বললো, জানেন? ওরা কেউ আমার বন্ধুত্বের মূল্য দিতে পারে নি। কিছুদিন মেলামেশার পরেই ওদের ব্যবহার যেন কেমন পাল্টে যেতো। আমার চোখেমুখে চেহারায় কি যেন খুঁজে বেড়াতো। ওরা।

আমি দেখে ঠিক বুঝতে পারতাম না। তারপর–। বলতে গিয়ে আবার হেসে উঠলো শিউলি। তারপর যা আশঙ্কা করতাম। তাই হতো। ওরা প্ৰেম নিবেদন করে বসতো আমায়। কি বিশ্ৰী ব্যাপার দেখুন তো। কাসেদের মুখের দিকে তাকালো শিউলি। ওর চেহারায় কি প্রতিক্রিয়া হলো তাই হয়তো লক্ষ্য করছিলো সে।কাসেদ নীরব।হঠাৎ সে প্রশ্ন করলো, আপনার বয়স কত?

মেয়েদের বয়স জিজ্ঞেস করতে নেই। ওরা বিব্রত বোধ করে। কিন্তু শিউলির চোখেমুখে কোন ভাবান্তর দেখা গেলো না। যেন এমনি প্রশ্নের সঙ্গে সে বহুদিন থেকে পরিচিত। বহুবার তাকে এর জবাব দিতে হয়েছে। তাই পরীক্ষণে শিউলি বললো, অত্যন্ত সহজভাবেই বললো, বয়স জানতে চাইছেন কেন, ভাবছেন বুঝি আমি অল্প বয়সে পেকে গেছি? কাসেদ বললো না, ঠিক তার উল্টো। বয়স হলে কি হবে। আপনি আসলে এখনও বাচ্চা রয়ে গেছেন।শিউলি মুহুর্ত কয়েক স্থির চােখে তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। যেন এর আগে এমনি উত্তর সে শোনে নি কোনদিন।ওকে চুপ থাকতে দেখে কাসেদ জিজ্ঞেস করলো, চুপ করে গেলেন যে? কি ব্যাপার, রাগ করেন নি তো?

রাগ? অপূর্ব ভঙ্গি করে শিউলি জবাব দিলো, আপনি আমার কে যে আপনার উপর রাগ করবো? কাসেদ বেশ বুঝতে পারলো, এ মেয়ের সঙ্গে কথা বলায় সে পেরে উঠবে না। তবু শিউলিকে ভাল ভাগলো। ওর।বেশ মেয়ে।বড় সরল মেয়ে শিউলি।কিছুক্ষণের পরিচয়ে বড় সহজ হয়ে এসেছে সে। যে কথাগুলো সকলকে বলা যায় না, তাও সে বলেছে ওকে।জাহানারা যদি শিউলির মত হতো? কাসেদ ভাবলো নীরবে।শিউলি বললো, আমার আর সব বন্ধুরা যদি আপনার মতো হতো তাহলে বড় ভালো হতো, তাই না কাসেদ সাহেব?

কাসেদ বললো, আমি আপনার বন্ধুদের কোনদিন দেখিনি সুতরাং তাদের সম্পর্কে কোন মন্তব্য করতে পারছিনে। তবে, আমাকে কেন যে আপনি আদর্শ বন্ধু বলে ভাবছেন তাও ঠিক বুঝতে পারলাম না। একি আপনার উচিত হচ্ছে।নিশ্চয়ই হচ্ছে। অত্যন্ত জোরের সঙ্গে জবাব দিলো শিউলি। আজকাল আর মানুষ চিনতে আমার ভুল হয় না। আপনাদের মত পুরুষের চোখের দিকে তাকালেই মনের ভাষা পড়ে নিতে পারি। আমি। বুঝতে পারি, লোকটা কেমন।শিউলি থামালো।কাসেদ মৃদু হেসে বললো, অল্প বয়সে দেখছি অনেক অভিজ্ঞতা হয়েছে আপনার।অভিজ্ঞতা কম বেশি সবারই হয়। শিউলি গম্ভীর গলায় জবাব দিলো। তবে কেউ অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেয়, কেউ নেয় না।

আপনি কোন দলে?

শিউলি বলল, প্রথমোক্ত।

কাসেদ বলল, তাহলে নতুন কোন পুরুষের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব না করাই উচিত।

তারপর বন্ধু বানানো উচিত।

আমাকে যাচাই করেছেন কি?

অবশ্যই।

কখন করলেন?

আপনার অজান্তে। মুখ টিপে হাসল শিউলি। আমার বাসা এসে গেছে। এখানে নামতে হবে। আমায়।রিক্সাটা থামিয়ে ছাই রঙের একটা দোতলা বাড়ির সামনে নেমে পড়লো শিউলি। বাড়ির বারান্দায় উঠে দাঁড়িয়ে পেছন ফিরে তাকালো সে। বললো, আবার দেখা হবে। সময় করে একবার আসুন আমাদের বাসায়। কাল কিম্বা পরশু।কাসেদ সংক্ষেপে বলল, আসবো।রিক্সা থেকে মুখ বের করে ওদের বাসাটা ভালো করে দেখে নিলো সে। দেখলো একটা বুড়ো দোতলার বারান্দায় নীরবে দেখছে ওদের।বাসায় এসে একবার জাহানারা ও শিউলির কথা ভাবলো কাসেদ। দুটি মেয়েতে কি আশ্চৰ্য ব্যতিক্রম।জাহানারাকে সে আজ অনেক দিন ধরে চেনে।কতদিন সে গেছে ওদের বাসায়। সেও এসেছে এখানে।

সাহিত্য নিয়ে আলোচনা করেছে ওরা, তর্ক করেছে ইকবালের দর্শন নিয়ে। রবি ঠাকুরের কবিতা নিয়ে।মাঝে মাঝে ব্যক্তিগত আলোচনার আশেপাশে এলেও গভীরে যায়নি কোনদিন। ইচ্ছে করেই যেন এড়িয়ে গেছে জাহানারা।হ্যারিকেনের আলোটা একটু বাড়িয়ে দিয়ে টেবিলের উপর থেকে একটা খাতা টেনে নিয়ে বসলো কাসেদ। কবিতা লিখবো। বহুদিন কিছু লেখা হয় নি।পাশের ঘরে ছোট খালুর সঙ্গে কথা বলছেন মা।তাদের কথাগুলো এখান থেকে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে কাসেদ।মা বললেন, ওদের দু’জনকে নিয়েই তো আমার যত দুশ্চিন্তা। নিজের জন্যে ভাবিনে। বুড়ো হয়ে গেছি। কাল বাদে পরশু একদিন কবরে যেতে হবে।

খালু বললেন, ‘সব বুড়ো-বুড়িদেরই ওই এক চিন্তা বড়বু’, ছেলেমেয়েদের একটা কিছু হিল্লে হােক। দু’পয়সা রুজি-রোজগার করে নিজের পায়ে দাঁড়াক ওরা। আরো কি যেন বলতে যাচ্ছিলেন তিনি।মা কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে হঠাৎ বললেন, নাহারের জন্যে একটা ছেলে দেখে দাও না। বয়স তো ওর কম হলো না।খালু বললেন, ‘আজকাল ছেলে পাওয়া বড় ঝকমারি বড়বু’। ম্যাট্রিক পাশ করা ছেলে, সেও আবার ম্যাট্রিক পাশ মেয়ে চায়, বুঝলেন না?

মা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর অস্পষ্ট গলায় বললেন, মেয়ে আমার ম্যাট্রিক পাশ নয়। সত্যি, কিন্তু ঘরকন্নায় ওকে কেই হার মানাতে পারবে না। ক্ষণকাল নীরব থেকে মা আবার বললেন, কি যে হয়েছে আজকাল কিছু বুঝিনে, আমাদের জামানায় লোকে দেখতো মেয়ে কেমন রান্নাবান্না করতে পারে।‘সে জামানা পুরোনো হয়ে গেছে বড়বু’। এখন লোকে লেখাপড়া না জানা বউ-এর কথা চিন্তাও করতে পারে না।খালু থামলেন।অনেকক্ষণ ওদের কোন কথাবার্তা শোনা গেল না।হয়তো এখনো মনে মনে নাহারের কথা চিন্তা করছেন মা।

কাসেদের আপনি বোন নয় নাহার।মায়ের দূর সম্পৰ্কীয় এক খালাতো বোনের মেয়ে। ছােটবেলায় ওর মা মারা যান। ওর বাবা তখন কি একটা কোম্পানীতে চাকরি করতেন।স্ত্রীকে হয়তো বড় ভালবাসতেন। তিনি, তবুও কিছুদিন পরে চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে মিলিটারীতে চলে যান। নাহারকে রেখে যান মায়ের কাছে। মাঝে মাঝে চিঠি আসতো।কখনো মাদ্রাজ থেকে। কখনো পেশোয়ার থেকে। কখনো কানপুর।

শেষ চিঠি এসেছিলো আরাকান থেকে।

তারপর তার আর কোন খোঁজ পাওয়া যায় নি।

কেউ বলেছে যুদ্ধে মারা গেছে।

কেউ বলেছে, জাপানীরা ধরে নিয়ে গেছে টোকিওতে।

লড়াই শেষ হলো।

সন্ধি হলো শত্ৰু-মিত্ৰে।

তারপর আরো কত বছর গেলো নাহারের বাবা আর ফিরে এলেন না।মা বলতেন, আমার কোন মেয়ে নেই, তুই আমার মেয়ে। তোকে মানুষ করে বড় ঘরে বিয়ে দেবো। আমি। তোর ঘরের নাতি-পুতি দেখবো, তবে মরবো।বাবা বলতেন, বেশ হলো, এতদিনে মেয়ের সখ মিটলো তোমার।মা বলতেন, মিটবে না। খোদার কাছে কত কেঁদেছি, কত বলেছি আমায় একটা মেয়ে দাও।

দেখলেতো, খোদার কাছে যা চাওয়া যায়। তাই পাওয়া যায়। তবু তুমি এক বেলা নামাজ পড় না। কেন পড়ােনা বলতো? তোমার কি পরকালের একটুও ভয় হয় না? আবার ইহকাল পরকাল নিয়ে এলে কেন বলতো? বাবা ক্ষেপে উঠতেন, বেশ তো কথা হচ্ছিলো।মা স্নান হেসে বলতেন, নামাজের নাম নিলেই তোমার গায়ে জ্বর আসে কেন বলতে পারো?

বাবা কিছু বলতেন না, শুধু সরোষ দৃষ্টিতে এক পলক তাকাতেন মায়ের দিকে। মা আফসোস করে বলতেন, তুমি আমাকে দোজখে না নিয়ে ছাড়বে না। বাবা নির্বিকার গলায় জবাব দিতেন, বেহেস্তের প্রতি আমার লোভ নেই। তোমার যদি থেকে থাকে তুমি যেও, আমি তোমার পথ আগলে দাঁড়াবো না। এরপর মা থেমে যেতেন, অবুঝ স্বামীর সঙ্গে তর্ক করা নিরর্থক তা তিনি ভালো করেই জানতেন।

সামনে খোলা খাতাটার দিকে চোখ পড়তেই কাসেদ বিব্রত বোধ করলো। কবিতা লিখতে বসে খাতার মধ্যে এতক্ষণ সব কি লিখছে সে? ইকবাল, জাহানারা, বিয়ে, নাহার, মিলিটারী, কানপুর, নামাজ, শিউলি। একটার পর একটা হিজিবিজি লেখা। সাদা কাগজটা আরো অনেক শব্দের ভরে ভরে উঠছে। খাতা থেকে পাতাটা ছিড়ে নিয়ে বাইরে ফেলে দিলো কাসেদ।দরজার দিকে চােখ পড়তে দেখলাে, নাহার দাঁড়িয়ে।কি ব্যাপার কিছু বলবে?

নাহার বললো, মা ডাকছেন। বলে চলে গেল সে।মা তখনো গল্প করছিলেন খালুর সঙ্গে। খালু একটা মোড়ার ওপর বসে। মা চৌকির ওপর পা ছড়িয়ে খালুর পান বানাচ্ছেন, আর কি যেন আলাপ করছেন।নাহার একপাশে দাঁড়িয়ে।কাসেদ আসতে মা বললেন, বস।খালু বললেন, তুমি কি সেই কেরানীগিরির চাকরিটা এখনো আঁকড়ে রেখেছো নাকি? কাসেদ সায় দিয়ে বললো, হ্যাঁ।খালু বললেন, অন্য কোথায় ভালো দেখে একটা কিছু পাওয়া যায়। কিনা চেষ্টা-চরিত্র করো।

এ দিয়ে কতদিন চলবে।খালু নিজে এককালে কেরানী ছিলেন; তাই কেরানীগিরির বেদনা তিনি মর্মে মর্মে উপলব্ধি করেন।কাসেদকে চুপ থাকতে দেখে তিনি আবার বললেন, ধোপার গাধা আর কোম্পানীর অফিসের কেরানীর মধ্যে পার্থক্য নেই বুঝলো? এতে না আছে কোন রোজগার, না আছে সম্মান।কাসেদ বললো, তিনজন মানুষ আমরা, এ রোজগারেই চলে যাবে। টাকা টাকা করে, টাকা দিয়ে করবো কি?

মা বললেন, শোন, ছেলের কথা শোন। যেন সংসার এই থাকবে। ঘরে আর বউ ছেলে আসবে না। বলি তুই এমন হলি কি করে বলতো, তোর বাবা তো এমনটি ছিলেন না। কাসেদ কোন উত্তর দেবার আগেই খালু বললেন, ‘এ নিয়ে তোমায় চিন্তা করতে হবে না। বড়বু’। মাথায় বোঝা চাপলে আপনা থেকেই সব ঠিক হয়ে যাবে। বলে পান খাওয়া দাঁতগুলো বের করে একগাল হাসলেন তিনি। নাহার হঠাৎ বললো, মা ভাত দেবো?

মা ব্যস্ততার সঙ্গে বললেন, তাইতো, কথায় কথায় দেখছি অনেক রাত হয়ে গেছে। যাও ভাত বেড়ে না ও, তোমার খালুও এখানে খাবেন।খালু সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, না বড়বু, আমি বাসায় গিয়ে খাবো। ওরা সবাই বসে থাকবে।মা হেসে বললেন, মেয়ে আসছে বেড়াতে, বাসায় নিশ্চয়ই খুব ভালো পাক-শাক হচ্ছে। আমাদের এখানে ডাল-ভাত কি আর মুখে রুচবে?

কি যে বলেন বড়বু, খালু বিনয়ের সঙ্গে বললেন, বাসায় কি আর আমরাও কোর্মা পোলাও খাই, ডাল ভাত সব জায়গায়। এখন চলি, আরেক দিন এসে খেয়ে যাবো। যাবার উদ্যোগ করতে করতে আবার থেমে গেলেন খালু। কাসেদের দিকে তাকিয়ে বললেন, সালমা এসেছে ঢাকায়। বড়বু’কে বলে গেলাম রোববার দিন ওকে নিয়ে বাসায় এসো। কাসেদ অবাক হয়ে বললো, রোববার দিন কেন? মা বললেন, তোমাদের দাওয়াত করে গেলেন উনি। নাতিনের আকিকা হবে। প্রথমে কিছু বুঝতে পারলো না কাসেদ। যখন বুঝতে পারলো তখন আরো চিন্তিত হলো সে, সালমার মেয়ে হয়েছে নাকি?

মা পরীক্ষণে বললেন, ওমা তুই জানিসনে? বলতে গিয়ে কথাটা গলার মধ্যে আটকে গেলো তার। ঢোক গিলে আবার বললেন, আজ তিন মাস হতে চললো, তা তুই জানবি কোথেকে, আত্মীয়-স্বজন কারো খোঁজ কি তুই রাখিস। কি যে হলি বাবা।খালু হেসে বললেন, ও কিছু না বড়বু। এ হলো কেরানী রোগ।আর কারো কথা মনে থাকে না, সব ভুলে যেতে হয়।আরেকটা পান মুখে পুরে দিয়ে একটু পরে বিদায় নিলেন খালু।পাকঘরে বসে খাওয়ার আয়োজন করছে নাহার।মা কলতলায় বসে বসে অজু করছেন। এশার নামাজ না পড়ে। ভাত মুখে দেন না তিনি।

কাসেদ তখনো মায়ের বিছানায় বসে।

নীরব।

নীরবে ভাবছে সে।

কি আশ্চৰ্য, সালমা মা হয়েছে।

সেই সালমা–

পরনে কালো ডোরাকাটা ফ্রক। মাথায় সাপের মত সরু একজোড়া বিনুনী। পায়ে স্লিপার।অপরিসর বারান্দায় রেলিঙের পাশে দাঁড়িয়ে মেয়েটি দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রয়েছে।পেছন থেকে পা টিপে টিপে এসে ওর চোখজোড়া দু’হাতে চেপে ধরলো কাসেদ।এই কি হচ্ছে, হাতজোড়া ছাড়িয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ালো সালমা। কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থেকে সে সহসা ঠোঁট বাঁকিয়ে বললো, সেই কখন থেকে বসে আছি। আর উনি এতক্ষণে এলেন।ওর একটা বিনুনীতে টান মেরে কাসেদ বললো, এই তোকে একশো বার নিষেধ করে দিয়েছি না মিথ্যে কথা বলিসনে।সালমা অবাক হয়ে বললো, বা-রে মিথ্যে কথা কই বললাম।

এই তো বললি।

কই, কখন?

এইতো একটু আগে।

ইস, উনি বললেই হলো, ঠোঁট উল্টে মুখ ভেংচালো সালমা।ওর বেণী জোড়া ধরে আবার টান দিলো কাসেদ, বসে আছি বললি কেন, তুই তো আসলে দাঁড়িয়েছিলি।চুলে টান পড়ায় যন্ত্রণায় কঁকিয়ে উঠলো সালমা। তারপর চিৎকার করে উঠে বললো, বলবো, একশোবার মিথ্যে কথা বলবো আমি। তাতে তোর কি শুনি।কাসেদ ক্ষেপে গিয়ে ওর মাথাটা রেলিঙের সঙ্গে ঠকে দিয়ে বললো, তুই করে বললি কেন রে, আমি কি তোর ছোট না বড়?

সালমা ততক্ষণে কাঁদতে শুরু করেছে।ওকে কাঁদতে দেখে কাসেদ বিব্ৰতবোধ করলো। বার কয়েক হাফপ্যান্টে হাত মুছলো সে। তারপর কাছে এসে দাঁড়িয়ে কোমল গলায় বললো, লেগেছে না-রে? সালমা কোনো জবাব দিলো না।একটু পরে ওর পিঠের উপর ভয়ে ভয়ে একখানা হাত রেখে কাসেদ শুধালো, পার্কে যাবি না?

এক ঝটিকায় ওর হাতখানা দূরে সরিয়ে দিলো সালমা।কাসেদ আবার রেগে গিয়ে বললো, এই এক দুই করে আমি দশ পর্যন্ত গুনবো; এর মধ্যে যদি তুই না যাস তাহলে আমি চললাম। বলে জোরে জোরে এক দুই গুনতে শুরু করলো সে। ন’য়ে এসে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলো কাসেদ। সালমা তখনো কাঁদছে। কাসেদকে চুপ করে থাকতে দেখে একবার শুধু আড়চোখে তাকালো সালমা।

কাসেদ অতি কষ্টে দশ উচ্চারণ করলো; কিন্তু সঙ্গে বললো; দেখ তোকে পনেরো পর্যন্ত সময় বাড়িয়ে দিলাম। এবার কিন্তু একটুও নড়াচড় হবে না। বলে আবার গুনতে শুরু করলো সে।পনেরো বলার পূর্ব মুহূর্তে সালমা চিৎকার করে উঠলো, তুই আমাকে মেরেছিস কেন? কাসেদ হেসে দিয়ে বললো, আর মারবো না, চল।ডান হাতের আঙ্গুলগুলো দিয়ে চোখের পানি মুছতে মুছতে উঠে দাঁড়ালো সালমা। তারপর ফিক্‌ করে হেসে দিয়ে বললো, আজ কিন্তু আমাকে দোলনায় চড়াতে হবে।

আর একদিন।তখন ফ্রক ছেড়ে সালওয়ার পায়জামা ধরেছে সালমা।বয়স বেড়েছে। হয়তো পনেরো কিম্বা ষোল।ঘুটফুটে সন্ধ্যা। আকাশে অসংখ্য মেঘের ভিড়। এই বুঝি বৃষ্টি এলো। কাঠের সিঁড়িগুলো বেয়ে উপরে উঠে এসে কাসেদ দেখলো, বাসায় কেউ নেই। শুধু সালমা ড্রয়িং রুমে একখানা চৌকির ওপর লম্বা হয়ে শুয়ে কি একটা পত্রিকা পড়ছে।কে কাসেদ ভাই, এই সন্ধ্যাবেলা কোত্থেকে? মহাবিদ্যালয় মানে কলেজ থেকে, বাসায় কি কেউ নেই? না, ওরা সবাই সিনেমায় গেছে।তুমি যাওনি? যাইনি সে তো দেখতেই পাচ্ছেন। পত্রিকাটা বন্ধ করে উঠে বসে সালমা বললো, শরীরটা সেই সকাল থেকে ভালো নেই।কেন, কি হয়েছে? ওর সামনে চৌকিতে এসে বসলো কাসেদ।সালমা বললো, অসুখ করেছে।কি অসুখ?

সালমা ফিক্‌ করে হেসে দিলো এবার যান, অতো কথার জবাব দিতে পারবো না। একটা কিছু পেলেই হলো, অমনি সেটা নিয়ে প্রশ্ন আর প্রশ্ন। কি বিশ্ৰী স্বভাব আপনার। কাসেদ গম্ভীর হয়ে গেলো। একটু পরে উঠে দাঁড়িয়ে বললো, বিশ্ৰী স্বভাব দিয়ে তোমায় আর ব্যতিব্যস্ত করবো না, চলি এবার।মুহুর্তে ওর পথ আগ্‌লে দাঁড়ালো সালমা। যাবেন কি করে, বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।হােক, তাতে তোমার কি? সালমা মুখ টিপে হাসলো একটুখানি। তারপর বললো, ইস, এত রাগ নিয়ে আপনি চলেন কি করে।সহসা ওর খোলা চুলের গোছা ধরে একটা জোরে টান মারলো কাসেদ। রাগে ফেটে পড়ে বললো, ফাজিল মেয়ে কোথাকার। ইয়ার্কির আর জায়গা পাও না, তাই না?

সালমার মুখখানা মান হয়ে গেলো। দেখতে না দেখতে চোখজোড়া পানিতে টলমল করে উঠলো। ওর। সামনে থেকে সরে গিয়ে নিঃশব্দে আবার কোঁচের উপরে বসলো সে। পরীক্ষণে ডুকরে কেঁদে উঠলো সালমা, আমি এমন কি করেছি যে, আপনি সব সময় আমার সঙ্গে আমন দুব্যবহার করেন? চলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়িয়েও থমকে দাঁড়ালো কাসেদ।সালমা কাঁদছে।কৌচের ওপর উপুড় হয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে সে।খোলা জানােলা দিয়ে আসা বাতাসে নয়, কান্নার আবেগে দেহটা কাঁপছে তার।

খোলা চুলগুলো পিঠময় ছড়ানো।

ধীরে ধীরে ওর পাশে এসে বসলো কাসেদ।

সালমা, সে ডাকলো ভয়ে ভয়ে।

সালমা কোনো উত্তর দিলো না।

ওর মাথার উপর আস্তে করে একখানা হাত রাখলে সে। সালমা। সহসা উঠে বসলো। সালমা তীব্র দৃষ্টিতে তাকালো এক পলক ওর দিকে। তারপর তীব্ৰ বেগে ছুটে পাশের ঘরে চলে গেল সে।কাসেদ ডাকলো, সালমা।সালমা সজোরে দরজাটা বন্ধ করে দিলো।তারপর আর কোন সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না তার।সেদিন অনেকক্ষণ এক ঘরে বসেছিলো কাসেদ। ভেবেছিলো হয়তো এক সময় রাগ পড়ে গেলে বাইরে আসবে সালমা।

সালমা আসেনি।

অন্যদিন।

খালুজী তখন বরিশালে বদলী হয়ে গেছেন।

সালমা কলেজে পড়ে।

অফিসের কি একটা কাজে বরিশাল যেতে হলো তাকে।তিন দিন ছিলো।যেদিন রাতে সে চলে আসবে সেদিন সবার কাছ থেকে বিদায় নেয়া হলো, কিন্তু সালমাকে আশেপাশে কোথাও খুঁজে পেল না।খালাম্মাকে জিজ্ঞেস করতে তিনি বললেন, কি জানি কোথায় গেলো। বোধ হয়। ছাদে, বলে বার কয়েক ওর নাম ধরে ডাকলেন তিনি।কোনো সাড়া শব্দ পাওয়া গেলো না।কিছুক্ষণ পরে ছাদে এসে কাসেদ দেখলো, সালমা দাঁড়িয়ে। ছাদের এক কোণে, চুপচাপ।

পরনের কালো শাড়িটা গাঢ় অন্ধকারের সঙ্গে মিশে গেছে তার। চুলগুলো এলো খোঁপা করা।দূরে, স্টিমার ঘাটের দিকে তাকিয়ে কি যেন গুনগুন করছে সে।হয়তো কোনো গানের কলি কিম্বা কোনো অপরিচিত সুর।কাসেদ ডাকলো, সালমা।সালমা ঘুরে দাঁড়িয়ে তাকালো ওর দিকে। কিছু বললো না।কাসেদ বললো, আমি যাচ্ছি সালমা।সালমা পরক্ষণে বললো, যাবেন বৈ-কি, আপনাকে তো কেউ ধরে রাখে নি।কাসেদ অপ্ৰস্তৃত গলায় বললো, না, তা নয়, তোমার কাছ থেকে বিদায় নিতে এলাম।সালমা মৃদু গলায় বললো, বেশ বিদায় দিলাম।কাসেদ চলে যাচ্ছিলো, সালমা পেছন থেকে ডাকলো তাকে, শুনুন, এখুনি কি যাচ্ছেন?

হ্যাঁ।

এত সকাল সকাল গিয়ে কি হবে।

সকাল কোথায়, স্টিমারের সময় হয়ে গেছে।

কে বললো, এখনো দুঘণ্টা বাকি।

বাজে কথা।

চলুন, ঘড়ি দেখবেন।

কাসেদের সঙ্গে নিচে নেমে এলো সালমা।ড্রয়ার থেকে খালুজীর ঘড়িটা বের করে এনে দেখালো তাকে। বললো, আমার কথা বিশ্বাস করেন নি তো, এই দেখুন, এখন মাত্ৰ নটা বাজে। স্টিমার ছাড়বে এগারোটার সময়।

 

Read more

শেষ বিকেলের মেয়ে পর্ব:৩ জহির রায়হান

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *