শেষ বিকেলের মেয়ে শেষ : পর্ব জহির রায়হান

শেষ বিকেলের মেয়ে শেষ : পর্ব

শেষ বিকেলের মেয়ে শেষ : পর্ব

ঠোঁটের কোণে একসূতো হাসি জেগে উঠলো ধীরে ধীরে, তারপর সে হাসি অতি সুক্ষ্ম ঢেউ তুলে ছড়িয়ে পড়লো তার সম্পূর্ণ ঠোঁটে, চিবুকে, চােখে, সারা মুখে।শিউলি মৃদু গলায় বললো, রাস্তায় দাঁড়িয়ে ঝগড়া না করে, আসুন রিক্সায় উঠুন। ভয় নেই আপনাকে নিয়ে আমি কোথাও পালিয়ে যাবো না, অফিসে নামিয়ে দিয়ে আমার হোস্টেলে ফিরে যাবো।কাসেদ বললো, আমি রোজ হেঁটে যাই, আজও যেতে পারবো।শিউলি বললো, দেখুন মেয়েমানুষের মত রাগ করবেন না, উঠন, রিক্সায় উঠুন। শিউলির চোখের দিকে তাকিয়ে এবার আর না করতে পারলো না কাসেদ, নীরবে উঠে বসলো সে।

রিক্সাওয়ালাকে যাবার জন্যে নির্দেশ দিয়ে শিউলিও উঠে বসলো পাশে। আজ একটু ছোট হয়ে বসতে চেষ্টা করলো কাসেদ।শিউলির গায়ে গা লাগতে পারে সেই ভয়ে।শিউলি আড়চোখে এক পলক দেখে নিয়ে মৃদু হাসলো। হেসে বললো, আপনারা পুরুষ মানুষগুলো এত সহজে বদলে যেতে পারেন যে কি বলবো! কাসেদ চুপ করে থাকবে ভেবেছিলো, কিন্তু জবাব না দিয়ে পারলো না। অন্য পুরুষের কথা আমি বলতে পারবো না। নিজে আমি সহসা বদলাই নে। আমি যা ছিলাম। তাই আছি, তাই থাকবো।তাই নাকি?

চোখজোড়া বড় বড় করে ওর দিকে তাকালো শিউলি। শুনে বড় খুশি হলাম। কিন্তু জনাব, একটা কথা যদি জিজ্ঞেস করি তাহলে রাগ করবেন না তো? মুখ টিপে হাসছে শিউলি।কাসেদ বললো, বলুন।ক্ষণকাল চুপ করে থেকে শিউলি ধীরে ধীরে বললো, সেদিন বিকেলে সেই একসঙ্গে রিক্সায় চড়ে হাতে হাত রেখে বেড়ানো আর মাঝে মাঝে একটা কি দুটো কথা বলা এর সবটুকুই কি মিথ্যা। মুখখানা নুইয়ে ওর চোখে চােখে তাকাতে চেষ্টা করলো শিউলি।সহসা কোন উত্তর দিতে পারলো না সে।একটু পরে কি ভেবে বললো, আপনি যা ভাবছেন সে অর্থে মিথ্যে।আমি কি ভেবেছি তা আপনি বুঝলেন কি করে?

কারণ আমি শুনেছি সব। কাসেদ বিরক্তির সঙ্গে বললো : জাহানারা এসেছিলো বাসায়, কাল বিকেলে।শিউলি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলো।অনেকক্ষণ চুপচাপ কি যেন ভাবলো সে।রিক্সাটা কাসেদের অফিসের কাছাকাছি এসে পৌঁছেছে।শিউলি আস্তে করে বললো, সেদিন আপনি একটা অনুরোধ করেছিলেন, আমি রেখেছিলাম। আজ আমার একটা কথা। আপনি রাখবেন? ওর কণ্ঠস্বরে আশ্চৰ্য আবেগ।নড়েচড়ে বসে কাসেদ শুধালো, কি কথা বলুন? শিউলি ধীর গলায় বললো, আজ বিকেলে আমি নিউ মার্কেটের মোড়ে আপনার জন্যে অপেক্ষা করবো, আপনি আসবেন, কিছু কথা আছে আপনার সঙ্গে। আসবেন তো?

রিক্সা থেকে নেমে কিছুক্ষণ নীরবে দাঁড়িয়ে রইলো কাসেদ।তারপর মৃদুস্বরে বললো, চেষ্টা করবাে।চেষ্টা করবো নয়, অবশ্যই আসবেন।ততক্ষণে অফিসের দৌড়গোড়ায় পা দিয়েছে কাসেদ।শিউলি রিক্সা নিয়ে তখনো দাঁড়িয়ে রইলো, না চলে গেলো, একবার ফিরেও দেখলো না সে।অফিসে এখন আর সে উত্তেজনা নেই।সব শান্ত।মকবুল সাহেব পক্ষাঘাত রোগে এখনও বিছানায় পড়ে আছেন। ভালো হবার কোন সম্ভাবনা নেই।পরস্পরের কাছ থেকে শোনা যায়। আজকাল আর আগের সে আর্থিক অনটন নেই তাঁর। বড় সাহেবের শ্বশুর এখন, বেশ সুখেই আছেন। বড় সাহেবও বেশ সুখী।

রোজ দুপুরে মকবুল সাহেবের মেয়ে বাড়ি থেকে খাবার নিয়ে আসে তাঁর জন্যে। পরনে সুন্দর একখানা শাড়ি, মাথায় ছোট একটা ঘোমটা, হাতে একটা টিফিন ক্যারিয়ার, পায়ে পাতলা স্যাণ্ডেল। নিঃশব্দে মেয়েটি উঠে আসে ওপরে। হাল্কা পায়ে সে এগিয়ে যায় বড় সাহেবের কামরার দিকে। তারপর দু’জনে একসঙ্গে খায়। খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেলে নীরবে। আবার বাড়ি ফিরে যায় মেয়েটি।প্রথম প্রথম অফিসের সবাই মুখ টিপে হাসতাে।

চাপা ঘরে আলােচনা চলতাে ওদের আজকাল তাও বন্ধ।শুধু মেয়েটি যখন আসে আর সামনে দিয়ে হেঁটে বড় সাহেবের ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। তখন কি একটা অস্বস্তিতে ভোগে কাসেদ।ইচ্ছে করে মেয়েটিকে দেখতে।কিন্তু ও যখন আসে তখন ওর মুখের দিকে তাকাতে গিয়েও পারে না সে। কোথা থেকে একটা জড়তা এসে সারা দেহ গ্ৰাস করে নেয় ওর। মেয়েটি ওর বউ হতে পারতো।ইচ্ছে করলে ওকে বিয়ে করতে পারতো। কাসেদ।হয়তো ওকে নিয়ে বেশ সুখী হতে পারতো সে। আজ বড় সাহেবের জন্যে খাবার নিয়ে আসে, সেদিন কাসেদের জন্যে আসতো মেয়েটি।

দু’জনে এক সঙ্গে খেতে ওরা।

কথা বলতো।

গল্প করতো।

কত না আলাপ করতো খেতে বসে।

কিন্তু জাহানারা।

জাহানারা, একি করলে তুমি?

অফিসের কাজ করতে বসে একটুও মন বসল না। ওরা। গতদিন বিকেলের ছবিটা বার বার ভেসে উঠছে চােখে। জাহানারার প্রতিটি কথা আবার নতুন করে কানে বাজছে এখন। টাইপরাইটারটা একবার কাছে টেনে নিয়ে আবার দূরে ঠেলে দিলো সে। হঠাৎ সামনে টেবিলের উপর বিছানো কাগজের দিকে চোখ পড়তে চমকে উঠল কাসেদ।জাহানারার নাম লিখে সম্পূর্ণ কাগজটা ভরিয়ে তুলেছে সে।চারপাশে দ্রুত তাকিয়ে নিয়ে একটা কলম দিয়ে ধীরে ধীরে নামগুলো কেটে ফেললো সে।কাটতে গিয়ে একটুখানি স্নান হাসলো সে।ওর জীবনে থেকেও জাহানারার নামটাকে হয়তো এমনি করে কেটে ফেলতে হবে একদিন।

অফিস থেকে বেরুবার আগে মন স্থির করে নিয়েছিলো কাসেদ। বিকেলে যাবে জাহানারার ওখানে। কাল যে ভুল বুঝাবুঝির মধ্য দিয়ে সে চলে এসেছে তা দূর করে আসবে আজ।যে কথাটা এতদিন বলে নি, বলতে গিয়েও পিছিয়ে এসেছে। আজ সে কথাটা ওকে খুলে বলবে সে। হয়তো শুনে হাসবে জাহানারা। শব্দ করে হেসে উঠবে, তবু বলবে কাসেদ।যা হবার হােক।জীবনে একটা চরম সিদ্ধান্ত নিতে চায় সে।জাহানারাদের বাসার বারান্দায় দাঁড়িয়ে ওর মনে হলো কে জানে হয়তো আজ এখানে এই শেষ আসা।বুড়িটা বাচ্চা কোলে নিয়ে বারান্দায় বসেছিলো। ডেকে এনে ওকে বসালো ভেতরে।

বললো, বয়েন, উনি উপরে আছেন, খবর দিই গিয়া। বলে সে চলে গেলো ভেতরে। সেই যে গেলো অনেকক্ষণ আর তার দেখা নেই, একা ঘরে বসে বসে ক্লান্তিবোধ করলো সে। উঠে দাঁড়িয়ে বারকয়েক পায়চারী করলো। বসলো, আবার উঠে দাঁড়ালো।জাহানারা এলো না, এলো সেই বুড়ি। ওর মুখের দিকে সন্ধানী দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে শুধালো, আপনার নাম কি?কাসেদ নাম বলতে আবার ভেতরে চলে গেলো বুড়ি।আবার সব চুপ।অনেকক্ষণ হলো কারো আসার লক্ষণ দেখা গেলো না।চোখ মেলে প্রতিনিয়ত দেখা দেয়াল আর কড়িকাঠগুলো দেখতে লাগলো কাসেদ।কিভাবে জাহানারার সঙ্গে আলোচনা করা যেতে পারে, মনে মনে একবার তার মহড়া করে নিলো।

তবু কেউ আসে না।

অবশেষে এল।

জাহানারা নয়। বুড়িটিও নয়। ওদের বাচ্চা চাকরিটা।চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো কাসেদ।চাকরাটা মৃদু হেসে বলল, আপাজানের শরীর খারাপ, আজ দেখা হবে না। অন্যদিন আসতে বলেছে।শরীর খারাপ বলে নিচে নেমে এসে একবার কাসেদের সঙ্গে দেখাও করতে পারলো না জাহানারা? এর আগে জুর নিয়েও ওর সঙ্গে বাইরে বেরিয়েছে সে, কাসেদ নিষেধ করলেও আমল দেয়নি।

আর আজ!

কথাটা সহসা বিশ্বাস হতে চাইলো না ওর।

চাকরটা মৃদু হেসে চলে গেলো ভিতরে।

হাসলো না, যেন বিদ্রুপ করে গেলো ওকে।

আবার একা।

ঘরের মধ্যে বারিকয়েক পায়চারি করলো কাসেদ। ভালো লাগছে না, বারবার করে মনে হলো, জাহানারা আজ ইচ্ছে করে অপমান করলো তাকে। সে কোন অপরাধ করে নি। তবু তাকে শাস্তি দিলো জাহানারা। কাসেদের মনে হলো পুরো দেহটা জুলছে ওর।অপমান আর অনুশোচনার তীব্ৰ জ্বালা যেন পাগল করে তুলেছে তাকে। কেন ওকে ভালবাসতে গেল সে!সামান্য ভদ্রতা আর সহজ মানবিক বৃত্তিগুলোও হারিয়ে ফেলেছে জাহানারা। অতি নিচে নেমে গেছে সে।ওর তুলনায় সালমা অনেক বড়ো।

অনেক উদার মনের মেয়ে সে। দেখতে শুনতেও সে খারাপ নয়। প্রাণভরে কাসেদকে ভালবাসতো সালমা। মুহুর্তের জন্যে কাসেদের মনে হলো সালমার ডাকে সেদিন সাড়া না দিয়ে মস্ত বড় ভুল করেছে সে।আর শিউলি? শিউলির কথা মনে হতে কাসেদের মনে পড়লো, সন্ধ্যার আগে আগে শিউলি ওর জন্যে অপেক্ষা করবে বলেছে নিউমার্কেটের মোড়ে।শিউলির পাশে জাহানারাকে আজ অনেক ছোট মনে হলো কাসেদের। শিউলির হাসি। কথা। আলাপের ভঙ্গী আর বাচ্চা মেয়ের মতো ব্যবহার সব সুন্দর। অন্তত জাহানারার চেয়ে।সন্ধ্যার স্বল্প আলোয় শিউলিকে ছায়ার মত মনে হলো।

রাস্তার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে সে।

উচ্ছাস নেই। উচ্ছলতা নেই।

মৃদু হেসে শুধু শুধালো, এলেন তাহলে? ভেবেছিলাম হয়তো আর আসবেন না।কাসেদ বললো, আমি তো না করিনি।ওর এলোমেলো চুল, ছন্নছাড়া দৃষ্টি আর ক্লান্ত মুখের দিকে সন্ধানী চােখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো শিউলি।কাসেদ স্নান গলায় জিজ্ঞেস করলো, অমন করে কি দেখছেন? হাতের ব্যাগটা এ হাত থেকে অন্য হাতে সরিয়ে নিতে নিতে শিউলি বললো, আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে যেন এইমাত্র লড়াইয়ের ময়দান থেকে পালিয়ে এসেছেন।

কাসেদ বললো, অনেকটা তাই।

শিউলি বললো, তার মানে?

কাসেদ বললো, লড়াই শুধু রাজার সঙ্গে রাজার, এক জাতের সঙ্গে অন্য জাতের আর এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশেরই হয় না। একটি মনের সঙ্গে অন্য একটি মনেরও লড়াই হয়।শিউলি মুখ টিপে হাসলো, তার মানে আপনি এতক্ষণ অন্য একটি মনের সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছিলেন, তাই না? শিউলি থামলো। থেমে আবার বললো, সে মনটি কার জানতে পারি কি? কাসেদ নীরবে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো ওর দিকে। তারপর ধীরে ধীরে বললো, সে মনও আমার। আমার নিজের। একজন চায় স্বার্থপরের মত শুধু পেতে। অন্যজন পেতে জানে না, জানে শুধু দিতে। বিলিয়ে দেয়ার মধ্যেই তার আনন্দ।শেষেরটাকেই আমার ভালো লাগে।

কথার মাঝখানে বাধা দিয়ে শিউলি বললো, আমার আপনার মধ্যে কোথায় যেন একটা মস্ত বড় মিল আছে।কোথায়? আস্তে করে শুধালো কাসেদ।শিউলি মিষ্টি করে বললো, তা তো জানি না।ওর শান্ত মুখখানার দিকে তাকিয়ে বড় ভালো লাগলো কাসেদের। মৃদু গলায় সে বললো, একটা কথা বলবো মনের সঙ্গে অনেক লড়াই করেছি।কি কথা?

শিউলি চােখ তুলে তাকালো ওর দিকে।কাসেদ কি ভেবে শুধালো, আপনি কেন ডেকেছিলেন তাতো বললেন না। কেন ডেকেছি তাতো আমি নিজেও জানি না। শুধু জানি ডাকতে ইচ্ছে করছিলো। হয়তো কিছু বলবো ভেবেছিলাম, কিন্তু- সহসা চুপ করে গেলো শিউলি।কাসেদ বললো, আমি কিন্তু বলবো বলেই এসেছি।বলুন।চলুন আমরা দু’জনে বিয়ে করি। এক নিঃশ্বাসে কথাটা বলে ফেললো কাসেদ। সে কথাটা জাহানারাকে বলার জন্যে দীর্ঘ দিন ধরে মনের সঙ্গে লড়াই করছিলো, সে কথাটা শিউলিকে মুহুর্তেই বলে দিলো সে।

শিউলি চমকে উঠলো।

দু’জনে নীরব।

কারো মুখে কথা নেই।

কাছে, দূরে অনেক লোক। হাঁটছে। হাসছে। কথা বলছে। চিৎকার করে ডাকছে একে অন্যকে। তবু মনে হলো গোরস্তানের নির্জনতা যেন আচ্ছন্ন করে রেখেছে চারপাশের মুখরতাকে।শিউলির ঠোঁটের একটি কোণে এক সুতো হাসি জেগে উঠলো সহসা। সে হাসি ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়লো। তার পুরো ঠোঁটে, চিবুকে, চােয়ালে, চোখে, সারা মুখে।মুহুর্তে শব্দ করে হেসে উঠলো শিউলি। আপনি কি আজ অসুস্থ?

না, মোটেই না।

তাহলে এসব কি বলছেন?

যা তুমি চাও, আজ সকালেও চেয়েছিলে, আমি তাই বলছি শিউলি।শিউলি আবার হাসলো, মনে হচ্ছে আমার চাওয়া না চাওয়া সবটুকুই আপনি জানেন।আজকের সকালটা যদি মিথ্যে না হয়ে থাকে, তাহলে বলবো জানি এবং সবটুকুই জানি।আর আমি বলি আপনি কিছুই জানেন না। শিউলি গম্ভীর হয়ে এলো। মুখে এখন হাসির চিহ্নটুকুও নেই। স্নান গলায় সে বললো, আমাকে আজ পর্যন্ত কেউ চিনতে পারলো না।কেন জানি না, সবাই ভুল বোঝে আমায়। হয়তো এই আমার ভাগ্যে লেখা ছিলো।এসব কি বলছে শিউলি?

কাসেদ অবাক হলো, কথা বলতে গিয়ে গলাটা কেঁপে উঠলো ওর।শিউলি বললো, আপনাকে অন্য আর পাঁচজনের চেয়ে ভিন্ন মনে করতাম বলেই হয়তো এতো সহজভাবে মিশতাম। কিন্তু–বলতে গিয়ে থামলো সে। কপালে ভাজ ফেলে কি যেন ভাবলো, ভেবে বললো, আপনিও শেষে ওদের মতো হয়ে যাবেন এ আমি ভাবিনি কোন দিন।কাসেদের বুঝতে আর বিলম্ব হলো না সন্ধেবেলার এই শিউলির সঙ্গে সকালের সেই শিউলির কোন মিল নেই। এরা যেন দুটি ভিন্ন মেয়ে। সম্পূর্ণ আলাদা।

কিন্তু কেন?

কেন এমন হলো?

শিউলি!

বলুন।

একটি দিনের মধ্যেই কি মানুষ এত বদলে যেতে পারে? আমিও তাই ভাবছি। সকালের সঙ্গে বিকেলের আপনার যেন কোন মিল নেই।আর তুমি? তুমি কি সেই সকালের মেয়েটি আছো? আমি? আমার কথা বাদ দিন। আমি যে কখন কি অবস্থায় থাকি, সে আমি নিজেও জানি না।বাহ্‌ চমৎকার।কাসেদের দিকে চমকে তাকালো শিউলি। অনেকক্ষণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো সে। তারপর ধীরে ধীরে বললো, আমার দিক থেকে যদি কোন অন্যায় হয়ে থাকে তাহলে তার জন্যে আমি মাফ চাইছি কাসেদ সাহেব।

সত্যি আমি অপারগ, নইলে–।কথাটা শেষ করলো না সে।কাসেদের মনে হলো শিউলি হাসছে।তীক্ষ্ণ বিদ্রুপে ঠোঁটের কোণজোড়া জ্বলছে ওর।কাসেদ হেরে গেলো।

প্রথম পরাজয়ের গ্রানি মুছে যাবার আগেই দ্বিতীয় বার পরাজিত হলো সে। নিজের বোকামির জন্যে নিজেকে ধিক্কার দিতে ইচ্ছে হলো ওর। আগুনে হাত বাড়ালে পুড়বে জানতো।তবু কেন সে এমন করলো?

রাত বাড়ছে।রাস্তাঘাট নির্জন হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।আরো অনেক ক্ষমা চেয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেছে শিউলি।শিউলি আর জাহানারা, ওরা দুই নয়, এক।একের এপিঠ আর ওপিঠ।বাসায় ফিরতে অনেক রাত হলো ওর।খালু এসে দরজা খুলে দিলেন।

এত রাতে তাকে দেখে অবাক হলো কাসেদ। মুখখানি ক্লান্ত আর বিমর্ষ।কোন প্রশ্ন করার আগে খালু চাপাস্বরে বললেন, তুমি এসেছে? এসো, শব্দ করো না।খোলা দরজায় দাঁড়িয়ে ঘরের সবটুকু দেখতে পেলো কাসেদ। মা বিছানায় শুয়ে। মাথার একপাশে নাহার বসে। অন্য পাশে খালাম্মা। চাপাস্বরে মাকে কি যেন বলছেন খালা।খালু বললেন, বড়বু’র শরীরটা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেছে। ভাগ্যিস আমরা এসেছিলাম, নইলে কি যে হতো, কথা বলতে বলতে বিছানার পাশে এসে দাঁড়ালো ওরা।

মা এতক্ষণে চোখ বন্ধ করে শুয়েছিলেন। ধীরে ধীরে তাকালেন এবার। বেশ কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে রইলেন। ইশারায় তাকে কাছে ডাকলেন। নাহার উঠে দাঁড়িয়ে কাসেদকে বসবার জায়গা করে দিলো। মায়ের পাশে এসে বসলো কাসেদ।রুগ্ন হাতখানা ওর দিকে বাড়িয়ে আস্তে করে বললেন, এসেছিস বাবা। শীর্ণ ঠোঁটে স্নান হাসলেন তিনি। ফিসফিস করে আবার বললেন, এত রাত হােল কেন তোর? অনিয়ম করে শরীরটাকে তো শেষ করলি বাবা। মায়ের কপালে হাত বুলাতে বুলাতে কাসেদ বললো, তুমি এখন ঘুমোও মা।

মা চুপ করে গেলেন।খালা একটা শিশি থেকে ওষুধ ঢেলে খাওয়ালেন তাঁকে।কাসেদ উঠতে যাচ্ছিলো, শার্টে টান পড়ায় আবার বসে পড়লো।মা বললেন, যাচ্ছিস কোথায়? আমার পাশে বোস।আর কোন কথা বললেন না মা। নীরবে শুধু চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলেন। ওকে।রাত বেড়ে চললো।আরো, রাত হলে পরে, মাকে দেখাশোনার ব্যাপারে প্রচুর উপদেশ দিয়ে খালা খালু বিদায় নিলেন।নিজের ঘরে এসে নীরবে অনেকক্ষণ বসে রইলো কাসেদ।বইপত্র নিয়ে নাড়াচাড়া করলো কিছুক্ষণ।আকাশ-পাতল অনেক ভাবলো। কি যে ভাবলো সে নিজেও বলতে পারে না।

মাঝে একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়েছিলো সে।

নাহার এসে দাড়ালো দরজায়।

মা ডাকছেন। আপনাকে।

হুঁ। কাসেদ উঠে দাঁড়ালো।

মা শান্তভাবে শুয়ে আছেন বিছানায়। দেহটা সাদা লেপে ঢাকা। একটুও নড়ছেন না তিনি।কাছে আসতে মা বললেন, বোস, তোকে কতগুলো কথা বলার জন্যে ডেকেছি। কাসেদ বললো, একি কথা বলার সময় মা, তোমার এখন ঘুমোনো উচিত। নইলে শরীর খারাপ করবে যে।মা স্নান হাসলেন, বললেন, শরীর আমার ঠিক আছে বাবা। বলে কিছুক্ষণ থামলেন তিনি। কপালে ফোঁটা ফোঁটা ঘাম জমেছিলো। আঁচল দিয়ে সেগুলো মুছে নিয়ে বললেনএকটা কথা মনে রাখিস, খোদা আমাদের এ দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন।

মারা যাবার পরে আমরা তার কাছেই ফিরে যাবো। খোদা তাদেরই ভালো চোখে দেখেন যারা ধর্মকর্ম করে। কোরান-হাদিস মেনে চলে। তোর বাবা–বলতে গিয়ে গলাটা ধরে এলো তাঁর। একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, তোর বাবা এসব কোনদিনও মানেননি। তুই তাঁর মত হবি আমি চাই নে। আবার থামলেন মা। কড়িকাঠের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে কি যেন ভাবলেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, দুনিয়াটা কিছু না বাবা, এখানে লোভ করতে নেই, তাহলে আখেরে ঠকতে হয়।মায়ের গলার স্বরটা ধীরে ধীরে ছোট হয়ে আসছে।

কষ্ট হচ্ছে কথা বলতে।

নাহার পায়ের কাছে বসে।

কাসেদ তাঁর মুখের কাছে ঝুঁকে পড়ে বললো, তুমি এখন চুপ করো মা, ঘুমাও।মা শুনলেন কিনা বোঝা গেলো না। অন্যমনস্ক চোখজোড়া কড়িকাঠ থেকে নামিয়ে এনে তিনি বললেন, আরেকটা কথা বাবা, আমি যখন মারা যাবো তখন লক্ষ্য রাখিস আমি যেন কলেমা পড়তে পড়তে মরি। আর আমি মরে গেলে, কবর দেবার সময় বাইরের কোন লোককে আমায় দেখাসনে বাবা। মা থামলেন।অনেকক্ষণ ধরে ঘামানোর পর এখন ঘাম একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে তাঁর। গায়ের লেপটা টেনে নিতে নিতে ক্লান্ত স্বরে মা বললেন, যাও বাবা, এবার তুমি ঘুমোও গিয়ে।

কিন্তু ঘুমোনো হলো না তার। ভোররাতের দিকে ঈষৎ তন্দ্ৰায় চোখজোড়া জড়িয়ে এসেছিলো। নাহারের ডাকে চমকে জেগে গেলো। সে।দেখে যান। মা কেমন করছেন। নাহারের কণ্ঠস্বর উৎকণ্ঠায় ভরা। কাসেদের বুকের ভেতরটা আতঙ্কে মোচড় দিয়ে উঠলো।সহসা উঠে দাঁড়িয়ে ছুটে মায়ের ঘরে গেলো সে। সেই মাঝরাতে যেমনি ছিলেন তেমনি শুয়ে মা। চােখজোড়া খোলা, কড়িকাঠের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তিনি। কাসেদ সামনে এসে দেখলো দু’চোখের কোণ বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা পানি ঝরছে।

জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছেন মা।শুকনো ঠোঁটজোড়া নেড়ে কি যেন বলতে চেষ্টা করছেন তিনি। কিন্তু কোন কথা বেরুচ্ছে না, শুধু একটা কর্কশ আওয়াজ বেরুচ্ছে ভেতর থেকে। কাসেদ ডাকলো, মা! মা আবার চেষ্টা করলেন কিছু বলতে। বলতে পারলেন না।অসাহায়ের মত চারপাশে এক পলক তাকালো কাসেদ। সহসা দেহটা কেঁপে উঠলো। তার। ভয় করতে লাগলো।একটা বাটি থেকে মায়ের মুখে এক চামচ পানি তুলে দিতে দিতে নাহার কাঁপা গলায় বললো, মা কলেমা পড়, মা কলেমা পড়।হঠাৎ মায়ের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়লো কাসেদ, ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় সেও বললো, মা শুনছো? মা কলেমা পড়ো, মা গো।কিছু বলবার জন্যে মা আপ্রাণ চেষ্টা করছেন।

নাহার বললো, মা কলেমা পড়ো। কাসেদ বললো, মা, মাগো, কলেমা। সহসা মায়ের কণ্ঠ শোনা গেলো। মা বললেন, বাবা। আমি চললাম, তোরা সাবধানে থাকিস।মা চুপ করে গেলেন।চামচে করে দেয়া পানি মুখ থেকে চিবুক বেয়ে গড়িয়ে পড়লো বিছানার ওপর।মা, মাগো, বলে নাহার চিৎকার করে কেঁদে উঠলো।কাসেদ হতভম্বর মত দাঁড়িয়ে রইলো বিছানার পাশে। বাইরে রাত ভোর হচ্ছে এখন। একটু আগে এখানে তিনটি প্রাণী ছিলো।এখন দুটি। একটি হারিয়ে গেছে সময়ের স্রোতে।কাসেদ কাঁদলো না। কান্না এলো না তার। হঠাৎ যেন পাথর হয়ে গেছে সে।

আজ সকালে খালু এসে নাহারকে নিয়ে গেছেন ওদের বাড়িতে। কাল ওর বিয়ে।মা মারা যাবার পর ক’দিন মেয়েটা একটানা কেঁদেছে। শেষের দিকে শুধু চােখ দিয়ে পানি ঝরতে কোন আওয়াজ বেরুতো না।মায়ের শূন্য বিছানার পাশে বসে বসে কি যেন ভাবতো সে।আজ সেও চলে গেছে।যাবার আগে পা ছুঁয়ে সালাম করে গেছে তাকে।বলেছে, ছোট্ট করে বলেছে, যাই।

এখন এ বাড়িতে কাসেদ একা।

চারপাশটা কেমন ফাঁকা লাগছে ওর।

মনটা শূন্য।

সারাদিন বাইরে বেরুলো না কাসেদ।বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাটালো। একবার এপাশ আর একবার ওপাশ। আর সারাক্ষণ অনেক কিছু কথা ভাবলো সে। অনেকের কথা মনে পড়লো।মায়ের বড় ইচ্ছে ছিলো জাহানারাকে বউ করে আনবে ঘরে। মুখ ফুটে কোনদিন না বললেও বেশ বুঝতে পারতো কাসেদ। মায়ের ইচ্ছাটা গোপন ছিলো না।কিন্তু জাহানারা?

থাক, যার নাম জীবন থেকে মুছে গেছে তাকে স্মৃতির পাতায় ঠাঁই দিয়ে ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই। ওকে নিয়ে অনেক ভেবেছে কাসেদ। শিউলিকে নিয়েও কম ভাবেনি সে। দুই দেহ, এক মন। মেয়ে জাতটাই বোধ হয় আমনি।না, তা নয়? সালমা তো ওদের মত নয়। আর মকবুল সাহেবের মেয়ে? কত শান্ত, কত সরল। বড় সাহেবের জীবনটাকে কি সুন্দর করে তুলেছে সে। ওরা কত সুখী।

না, কাসেদ বিয়ে করবে না।

একা থাকবে।

মাঝে একটু তন্দ্ৰা এসেছিলো। একটা বড় ইঁদুরের কিচ কিচ শব্দে তন্দ্ৰা ছুটে গেলো ওর। বিছানা ছেড়ে উঠে বসলো সে।খোলা জানােলা দিয়ে এক টুকরো রোদ এসে পড়েছে। ঘরের মাঝখানে। কাসেদ বিছানা ছেড়ে দাঁড়িয়ে জানালার পাশে সরে গেলো। বাইরের আকাশটা মেঘে ছেয়ে আছে।কোথাও মেঘের রঙ কালো, কোথাও সাদা, কোথাও ঈষৎ লাল। এখন শেষ বিকেল।লাল সূৰ্যটা হারিয়ে গেছে উঁচু উঁচু দালানের ওপাশে। ওটাকে এই জানােলা থেকে দেখা যাচ্ছে না।

শুধু তার শেষ আভাটুকু বাড়িগুলোর মাথার ওপর দিয়ে আকাশে ছড়িয়ে আছে। মনে হচ্ছে দূরের দিগন্তে কোথাও যেন আগুন লেগেছে। তার উত্তাপ থেকে বাঁচবার জন্যে টুকরো টুকরো মেঘগুলো উর্ধ্বশ্বাসে ছুটছে আরেক দিগন্তের দিকে।বাতাস বইছে জোরে।পাশের বাড়ির ছাদে মেলে দেয়া কুমারী মেয়ের হাল্কা নীল শাড়িখানা বাতাসে পতাকার মতো উড়ছে পতপত করে।আরো দূরের আকাশে একটা চিল একা একা ঘুরছে। শেষ বিকেলের সোনালি আভায় মসৃণ পাখাটি চিকচিক করছে তার।পুরো শহরটা একটা থমথমে ভাব নিয়ে রাত্রির অপেক্ষা করছে। সহসা বাইরের দরজায় কড়াটা নড়ে উঠলো।

একবার।

দু’বার।

তিনবার।

কাসেদ ঠিক ভেবে উঠতে পারলো না। এ সময়ে তার কাছে কে আসতে পারে। মা মারা যাবার প্রথম দুদিন আত্মীয়-স্বজন অনেকে দেখা করতে এসেছিলো। আজকাল তারা আসে না।তবে কে আসতে পারে এমনি বিকেলে? দরজাটা খুলে দিতে কাসেদ অবাক হয়ে দেখলো নাহার দাঁড়িয়ে। এক হাতে খোলা কপাটটা ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে রয়েছে সে।পরনের সাদা শাড়িটায় হলুদ মাখানো।

হলুদ ছড়ানো সারা দেহে তার। হাতে মেহেদি, গাঢ় লাল।কাসেদ বিস্মিত গলায় বললো, একি নাহার তুমি! কোন কথা না বলে নিঃশব্দে ভেতরে এলো নাহার। তারপর আলতো চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললো, এতকাল যার সাথে ছিলাম, তাকে ছেড়ে থাকতে পারলাম না বলে চলে এসেছি। যেতে বলেন তো আবার ফিরে যাই।কাসেদ বিস্ময় বিমূঢ় স্বরে বললো, কাল তোমার বিয়ে আর আজ হঠাৎ এখানে চলে আসার মানে?

নাহার নির্বিকার গলায় বললো, বিয়ে আমার হয়ে গেছে।কার সাথে? কাসেদ চমকে উঠল যেন।ক্ষণকাল ওর দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো নাহার। তারপর অত্যন্ত সহজ কণ্ঠে বললো, যার সাথে হয়েছে তার কাছেই তো এসেছি আমি। তাড়িয়ে দেন তো চলে যাই। কাসেদ বোবার মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলো ওর হলুদ মাখানো মুখের দিকে। কিছুতেই সে ভেবে পেলো না, সেই চাপা মেয়েটা আজ হঠাৎ এমন মুখরা হয়ে উঠলো। কেমন করে?পেছনের দরজাটা বন্ধ করতে করতে সে শুধু মৃদু গলায় বললো, চলো, ও ঘরে চলো।

 

Read more

ম্যাজিক মুনশি পর্ব:১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *