মিলিটারি কমছে কই? বন্যার জলের মতাে শুধু বাড়ছে। রাজাকার পয়দা হচ্ছে হু ই করে। যে অবস্থা, একদিন দেখব আমরা কয় জন ছাড়া সবাই রাজাকার হয়ে বসে আছে। আর হবে নাই–বা কেন? প্রাণের ভয় নেই? রাজাকার হলে তাও প্রাণটা বাঁচে। তাছাড়া মাসের শেষে বাধা বেতন। সুপারে ঢালাও বন্দোপ্ত। দেখেশুনে মনে হয়, দুর শালা রাজাকার হয়ে যাই।
কী আবােল তাবােল ভাবছি! সােহরাব সাহেবের মতো মাথাটাই খারাপ হয়ে গেল নাকি? সােহবার সাহেবকে দেখে কে বলবে, তার মাথাটা পুরাে ফরটি নাইন হয়ে বসে আছে। দিব্যি ভালাে মানুষ, মাঝে মাঝে শুধু বলবে, ‘ইস, গুলীটা শেষে কপালেই লাগল।
দু মাস ছিল বেচারা মুক্তিবাহিনীতে। সাহসী বেপরােয়া ছেলে। আমগাছ থেকে একবার মিলিটারি জীপে গ্রেনেড মেরে এক জন আর্টিলারি ক্যাপ্টেনই সাবাড় করে দিল। দারুণ ছেলে। এক দিন খবর পাওয়া গেল, কোন বাজারে গিয়ে নাকি ধুমসে দিশী মদ গিলে ভাম হয়ে পড়ে আছে। মদের ঝোঁকে ভেউ ভেউ করে কাঁদছে আর বলছে, হায় হায়, ঠিক কপালে গুলী লেগেছে।
আবু ভাইয়ের হুকুমে জাফর গিয়ে খুব বানাল। দুই রদ্দা খেয়ে নেশা ছুটে গেল, কিন্তু ঐ কথাগুলি আর গেল না। রাতদিন বলত, ‘ইস কী কাণ্ড, শেষ পর্যন্ত ঠিক কপালে গুলী! ঘুম নেই খাওয়া নেই, শুধু এই বুলি। এখন কোথায় আছে কে জানে? চিকিৎসা হচ্ছে কি ঠিকমতাে? আমার যদি এরকম হয় তবে তাে বিপদের কথা।
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৩)
‘দাঁড়ান, সবাই দাঁড়ান।
কে কথা বলে? হাসান আলি নাকি? ব্যাটা আবার হুকুম দিতে শুরু করল কবে থেকে? জায়গাটা ঘুপচি অন্ধকার, চারদিকে বুনাে ঝােপঝাড়। পচা গােবরের দম আটকান গন্ধ আসছে। হুমায়ূন ভাই বললেন, কী হয়েছে হাসান আলি?
‘কিছু হয় নাই।
কী হয়েছে তা নিজ চোখেই দেখতে পেলাম। আনিস লম্বালম্বি পড়ে রয়েছে মাটিতে। এত বড়াে একটা জোয়ান চোখের সামনে আছাড় খেয়ে পড়ে গেল, আমি দেখতেও পেলাম না? আশ্চর্য! কী ভাবছিলাম আমি? হাসান আলি ধরাধরি করে তুলল আনিসকে। কাদায়পানিতে সারা শরীর মাখামাখি। হুমায়ূন ভাই অবাক হয়ে বললেন, ‘কী হয়েছে আনিস?”
‘কি জানি, মাথাটা হঠাৎ ঘুরে উঠল। ‘দেখি তােমার হাত। আরে, এ যে ভীষণ জ্বর। কখন জ্বর উঠল?
কি জানি কখন।’ ‘আস, আশেপাশের কোনাে বাড়িতে তােমাকে রেখে যাই। ‘আমি হাঁটতে পারব।” ‘পারতে হবে না। মজিদ, তুমি ওর হাতটা ধর।
গায়ে হাত দিয়ে দেখি, সত্যি গা পুড়ে যাচ্ছে। ব্যাটা বলদ, বলবি তাে শরীর খারাপ।
হাসান আলি বলল, ‘সামনেই মুক্তার সাহেবের বাড়ি। আসেন, সেই বাড়িতেই উঠি।
জাফর বলল, ‘কত দূর হে সেটা কাছেই, এক–পােয়া মাইল। জুম্মঘরের দক্ষিণে হাঁটতে হাঁটতে পা ব্যথা হয়ে যায়; মাঘরও আসে না, এক–পােয়া মাইলেরও ফুরাবার নাম নেই। যতই জিজ্ঞেস করি, ‘কত দূর হাসান আলি ?’ হাসান আলি বলে, ‘ঐ যে দেখা যায়।
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৩)
মােক্তার সাহেবের বাড়িটি প্রকাণ্ড। গরিব গ্রামের মধ্যে বাড়ির বিশাল চট করে চোখে পড়ে। বাড়ির সামনে প্রশস্ত পুকুর। তার চার পাশে সারি-বাঁধা তালগাছ। আমরা বাড়ির উঠোনে দাঁড়াতেই রাজ্যের কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করল। কী ঝামেলা
রে বাবা। বাড়ির ভেতর থেকে কেউ এক জন পরিত্রাহি চেচাতে লাগল, আসগর মিয়া, আসগর মিয়া, ও আসগর মিয়া।’
জাফর তার স্বভাব সুলভ উচু গলায় ডাকল, বাড়িতে কে আছেন? দরজা খােলেন।
হঠাৎ করে বাড়ির সব শব্দ থেমে গেল। আর কোনাে সাড়াশব্দ নেই। জাফর আবার বলল, ‘ভয় নাই, আমরা মুক্তিবাহিনীর লােক। তাও কোনাে সাড়াশব্দ নেই। শেষ পর্যন্ত হাসান আলি বলল, ‘গনি চাচা, আমি হাসান।’ তখনি খুট করে দরজা খুলে গেল। একটি ভয় পাওয়া মুখ বেরিয়ে এল হারিকেন হাতে।
হাসান আলির কারবার দেখে গা জ্বলে যায়।
Read More