তার গলা শুনলে যখন দরজা খুলে দেয়, তখন গলাটা একটু আগে শােনালেই হয়। জাফর বলল, ‘বিরক্ত করলাম, কিছু মনে করবেন না। এই ছেলেটার শােওয়ার বলােবস্ত করেন। আমাদের ভাত খাওয়াতে পারবেন?
ঞ্জি জি, নিশ্চয়ই পারব।” “আপনার নাম কি? গনি। আব্দুল গনি। ‘ডাক্তার আছে এদিকে?
‘আছে, হােমিওপ্যাথ।’ ‘দুত্তোরি হােমিওপ্যাথ।
গনি সাহেব ছাড়া আরাে দু জন লােক জড়াে হয়েছে। তারা চোখ বড়াে বড়াে করে তাকিয়ে আছে। আনিস তােষকহীন একটি চৌকিতে শুয়ে পড়েছে। গনি সাহেব বললেন, কী হয়েছে ওনার? গুলী লেগেছে নাকি?
‘না। আপনি ভেতরে গিয়ে আমাদের খাওয়ার ব্যবস্থা করেন। ‘জি জ্বি।’
বুড়াে ভদ্রলোেক ব্যস্তসমস্ত হয়ে চলে গেলেন। দেখতে–দেখতে বাড়ি জেগে উঠল। কত রকম ধ্বনি শােনা যাচ্ছে—মিনা আমিনা ‘হারিকেনটা কই? ‘দূর ধুমসী, ঘুমায় কি? | ভাগ্য ভালাে, বাড়িটি এক পাশে পাড়ার লােক সেই কারণেই ভেঙে পড়ল
গনি সাহেব একধামা মুড়ি আর গুড় দিয়ে গেলেন। বললেন, ‘অল্পক্ষণের মধ্যেই রান্না হবে। আনিসকে তুলতে গিয়ে দেখি সে অচৈতন্য। মুখ দিয়ে ফেনা ভাঙছে।
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৪)
আনিসের শরীর যে এতটা খারাপ, ধারণা করি নি। নৌকায় ওঠার সময় অবশ্যি এক বার বলেছিল বমি বমি লাগছে। কিন্তু এ রকম অসুস্থ হয়ে পড়বে, কে ভেবেছিল? আনিসটা মেয়েমানুষের মতাে চাপা।
দেখতে পাচ্ছি, আনিসকে নিয়ে ব্যস্ততা শুরু হয়েছে। হাসান আলি পানি ঢালছে মাথায়। জাফর প্রবল বেগে হাতের তালুতে গরম তেল মালিশ করছে। বাড়ির কর্তা, মােক্তার সাহেব বিপন্ন মুখে দাঁড়িয়ে আছেন। এতক্ষণ লক্ষ করি নি পেছন থেকে দেখলে মােক্তার সাহেবকে অনেকটা আমার বাবার মতাে দেখায়। ঠিক সেরকম ভরাট শরীর, প্রশস্ত কাঁধ। আশ্চর্য মিল। আনিসের জ্ঞান ফিরল অক্ষণেই এবং সে লজ্জিত হয়ে পড়ল। ইমায়ূন ভাই বললেন, ‘নাও, দুধটা খাও আনিসা
দুধ লাগবে না, দুধ লাগবে না। “আহা খাও।’
আনিস বিব্রত মুখে দুধের গ্লাসে চুমুক দিল। আনিসকে কিম্ভুতকিমাকার দেখাচ্ছে। তার ভেজা মাথা থেকে পানি গড়িয়ে পড়ছে সারা শরীরে। মুখময় দীড়ি গোঁফের জঙ্গল। তার মধ্যে সরু একটা নাক ঢাকা পড়ে আছে।
জাফর বলল, আনিস খাক এখানে।’ হুমায়ুন ভাই বললেন, ‘নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই।
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৪)
রাত দুটো বাজতে বেশি দেরি নেই। রামদিয়ায় আমাদের জন্যে টুনু মিয়ার দল অপেক্ষা করছে। হুমায়ূন ভাই বললেন, ‘আনিস, কয়টা বাজে দেখ তাে।”
‘একটা পঁয়ত্রিশ।
‘বুল কী। ‘মােক্তার সাহেব, রামদিয়া কত দূর এখান থেকে? ‘দুর না। দশ মিনিটের পথ।’
হাসান আলি বলল, ‘দুইটার আগে পৌছাইয়া দিমু। ভুলেই গিয়েছিলাম যে হাসান আপির মতাে এক জন করিৎকর্মা লােক আছে আমাদের সঙ্গে। সে নাকি যা বলে, তাই করে। প্রমাণ তাে দেখতেই পাচ্ছি।
বাড়ির ভেতরে রান্নাবান্না শুরু হয়েছে, বুঝতে পারছি। চিকণ গলায় কে এক জন মেয়ে ঘনঘন ডাকছে—ও হালিমা, ও হালিমা। সেইসঙ্গে দমকা হাসির আওয়াক্স। একটা উৎসব উৎসব ভাব। বেশ লাগছে। | সেয়েছে। আনিস দেখি বমি করছে! ব্যাপার কি? চোখ হয়েছে টকটকে লাল। নিঃশ্বাস পড়ছে ঘনঘনমরেটরে যাবে না তাে আবার? দুক্টোরি, কি শুধু আজেবাজে কথা ভাবছি। বুঝতে পারছি, অতিরিক্ত পরিশ্রম আর মানসিক দুশ্চিন্তায় এ রকম হয়েছে। আজ রাতটা রেস্ট নিলেই সব ঠিক হয়ে যাবে। একটি ছেলে পাখা করছে আনিসের মাথায়। খুব বাহারে পাখা দেখি। চারিদিকে রঙিন কাপড়ের ঝালর।
ফরও শুয়েছে লম্বা হয়ে। জাফরের শোওয়া মানেই ঘুম। ঘুম তার সাধা, কোনােমতে বিছানায় মাথাটি রাখতে পারলেই হল। ভাত রান্না হাতে–হতে সে তার সেকেও রাউণ্ড ঘুম সেরে ফেলবে। ফার্স্ট রাউণ্ড তাে নৌকাতেই সেরেছে। জাফরের ঘুম আবার সুরেলা। ফুরুৎ ফুরুৎ করে নাক ডাকবে। এই কথা বলেছিলাম বলে এক দিন কী রাগ।
Read More