সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১)

ফেলুদাকে বেশ কিছুদিন থেকেই মনমরা দেখছি। আমি বলছি মনমরা। সেই জায়গায় লালমােহনবাবু অন্তত বারাে রকম বিশেষণ ব্যবহার করেছেন—একেক দিনে একেক রকম। তার মধ্যে হতােদ্যম, বিষন্ন, বিমর্ষ, নিস্তেজ, নিষ্প্রভ ইত্যাদি আছেই ।

এমন কি মেদামারা পর্যন্ত আছে । এর কোনােটাই অবিশ্যি উনি ফেলুদাকে বলেননি, বলেছেন আমাকে । আজ আর থাকতে না পেরে সােজাসুজি ফেলুদাকেই প্রশ্ন করে বসলেন, ‘মশাই, আপনাকে কদিন থেকে এত ম্রিয়মাণ দেখছি কেন ?

নয়ন রহস্যফেলুদা সােফায় হেলান দিয়ে সামনের কফি টেবিলের উপর পা ছড়িয়ে বসেছিল মেঝের দিকে তাকিয়ে , লালমােহনবাবুর প্রশ্নের ও সেই একইভাবে বসে রইল। | ‘এটা কিন্তু মশাই আনফেয়ার’, অভিমানের সুরে বললেন জটায়ু। ‘আমার এখানে আসার একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া।

আপনি দিনের পর দিন এমন বেজার ভাব করলে ত আসা বন্ধ করে দিতে হয় ! একটু আলােকপাত করুন, যাতে কী হয়েছে আঁচ করতে পারি। এমন ত হতে পারে যে আপনার এই কন্ডিশনের রেমিডি হয়ত আমি সাপ্লাই করতে পারি। আগে ত আমি ঘরে ঢুকলেই আপনার ভুরু নেচে উঠত, আজকাল দেখছি আমাকে দেখলেই মুখ ঘুরিয়ে নেন। 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১)

‘সরি’, মেঝের দিকে চেয়েই মৃদুস্বরে বলল ফেলুদা। | ‘নাে নীড টু অ্যাপলজাইজ, ফেলুবাবু ; আপনি কেন গুমরােচ্ছেন সেইটে বলুন, তারপর বাকি কথা হবে । কাইন্ডলি বলুন। এত আনন্দের স্মৃতিভরা ঘর এমন গুমােট মেরে যাবে এটা বরদাস্ত করা যায় না। বলবেন কী হয়েছে ? 

‘চিঠি’, বলল ফেলুদা। ‘চিঠি ? ‘চিঠি । ‘কার চিঠি ? এমন কী থাকতে পারে চিঠিতে যা আপনার মনে অন্ধকার মানবে ? কার চিঠি মশাই ? 

‘পাঠক। “কিসের পাঠক ? ‘শ্রীমান তপেশের লিপিবদ্ধ করা প্রদোষচন্দ্র মিত্রের কীর্তিকলাপ। ‘পাঠক কি তাতে অবজেকশন নিয়েছে ? 

‘পাঠক সিঙ্গুলার নয়, লালমােহনবাবু ; পাঠক প্লুরাল। গুনে দেখেছি ছাপ্পান্নখানা চিঠিতে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে একই কথা। | আমি কিন্তু এইসব চিঠিপত্রের কথা কিছুই জানি না। ফেলুদা রােজ চার-পাঁচটা করে চিঠি পায় সেটা জানি, কিন্তু সেগুলাে কী চিঠি সেটা কোনােদিন জিজ্ঞেস করিনি। 

‘একই কথা মানে ? জিজ্ঞেস করলেন জটায়ু। কী কথা ? ‘ফেলু মিত্তিরের মামলা আর তেমন জমাটি হচ্ছে না, জটায়ু আর তেমন হাসাতে পারছেন না, তপেশের বিবরণ বিবর্ণ হয়ে আসছে…’ লালমােহনবাবু হঠাৎ খেপে উঠলেন । হাসাতে পারছেন না ? জটায়ু হাসাতে পারছেন না ? আমি কি সং ? 

 ‘না না’, ফেলুদা বলে উঠল, “আপনি সং হতে যাবেন কেন ? সং, ভাঁড়, ক্লাউন, জোকার—এসব অত্যন্ত অপমানকর কথা। আপনি হলেন বিদূষক। এইভাবে নিজেকে কল্পনা করে নিলে দেখবেন আর কোন ঝঞ্জাট নেই। | কথাটায় লালমােহনবাবুর রাগ ত গেলই না, বরং তিনি বেশ বিরক্তির সঙ্গে ফেলুদার দিকে পিঠ করে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘আই অ্যাম রিয়েলি ডিস্যাপয়েন্টেড । ছ্যা ছ্যা ছা—এইসব চিঠি আপনি জমিয়ে রেখেছেন ? পাওয়ামাত্র দলা পাকিয়ে ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটে নিক্ষেপ করেননি ? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১)

না, করিনি’, গম্ভীরভাবে বলল ফেলুদা, কারণ এইসব পাঠকই এতকাল আমাকে সাপাের্ট করেছে । এখন যদি তারা বলে যে, খ্রী মাসকেটিয়ার্স-এর অকাল বার্ধক্য দেখা দিয়েছে, তাহলে কথাটা আমি উড়িয়ে দিতে পারি না।’ 

‘অকাল বার্ধক্য । হাঁটুতে চাপড় মেরে চোখ কপালে তুলে বললেন জটায়ু। তপেশের কথা ছেড়েই দিলাম—আপনি ত সুপারফিট চিরতরুণ। তপেশও আপনারই মতাে রেগুলার যােগব্যায়াম করে। শরীরে মেদের লেশমাত্র নেই। আর আমি যে আমি এখনও—এই সেদিনও—আমার পড়শী—সেভেনটীন ইয়ারস মাই জুনিয়র-সােমেশ্বর হাজরাকে পাঞ্জায় কাত করে দিলুম–সেটা কি বার্ধক্যের লক্ষণ ? বয়স ত মানুষের বাড়বেই, কিন্তু সেই সঙ্গে যে আক্কেলও বাড়ে, অভিজ্ঞতাও বাড়ে তার কি কোনাে দাম নেই ? | ‘এটা বােঝাই যাচ্ছে যে, সে সবের কোনাে পরিচয় পাঠকরা পাচ্ছে। 

‘এও ত এক রহস্য। এর কিনারা করতে পারলেন ? ফেলুদা টেবিল থেকে পা দুটো নামিয়ে সােজা হয়ে বসল। ‘শুনুন, লালমােহনবাবু-জনপ্রিয়তার লেজুড় হিসেবে বেশ কিছু ঝক্কি এসে পড়ে সেটা আপনারও অজানা নয়। প্রকাশকের চাপ আপনাকে ভােগ করতে হয় না ? 

নয়ন রহস্য (পর্ব-১)

‘ওরেব্বাস—সে ত ট্রিমেভাস ব্যাপার।  ‘জানি। কিন্তু ফেলুদার জনপ্রিয়তা আর প্রখর রুদ্রের জনপ্রিয়তা এক জিনিস নয়। আপনার উপর চাপ এলে আপনি কল্পনার আশ্রয় নিয়ে সাপ ব্যাঙ-বিচ্ছু যা হয় একটা দাঁড় করিয়ে প্রকাশকের চাহিদা মেটাতে পারেন।

কিন্তু তােপশের উপর যখন চাপ আসে তখন কল্পনার আশ্রয় নিলে চলে না। বাস্তবে আমার মামলায় যা ঘটেছে, সেটাকেই একটু পালিশ করে উপন্যাসের আকারে প্রকাশকের হাতে তুলে দিতে হয়। তার মাস খানেকের মধ্যেই ফেলুদার একটি টাটকা নতুন অ্যাডভেঞ্চার বইয়ের বাজার দখল করে বসে।

তার একটা ফল হয় এই ছাপ্পান্নখানা চিঠিকারণ আর কিছুই নয় ; প্রতি বছরই যে আমার হাতে এমন একটি মামলা আসবে যা থেকে জমাটি উপন্যাস হয় তার কী গ্যারান্টি আছে ? এটা ভুললে চলবে না যে, আমার পাঠক প্রধানত কিশাের-কিশােরী। আমার এমন অনেক মামলার উদাহরণ দিতে পারি যেগুলাে চিত্তাকর্ষক হলেও তাতে এমন সব উপাদান থাকে যা কখনওই কিশােরদের পাতে দেওয়া চলে না।‘যেমন লখাইপুরের সেই জোড়া খুনের মামলা ? 

 ‘তা ত বটেই! সেটাতে ত তােপশেকে আমার ধারে-পাশেই আসতে দিইনি—যদিও সে এখন আর খােকাটি নেই, এবং বয়সের তুলনায় অনেক বেশি জানে-বােঝে। | ‘তার মানে আপনি বলতে চান যে, তােপশের বাছাইয়ে গলদ রয়েছে ? 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *