চমকদার সুনীল তরফদার। এবার তরফদার তাঁর গতি না কমিয়ে হাত দুটো সামনে বাড়িয়ে সাপের ফণার মতাে দোলাতে লাগলেন—তাঁর বিস্ফারিত দৃষ্টি সটান আমাদের যিনি বগলদাবা করেছেন তাঁর দিকে।এই চাউনি, এই ঝুঁকে পড়া, হাতের এই ঢেউ খেলানাে—এ সবই আমার চেনা। এ হল তরফদারের সম্মােহনের কায়দা। | তারকনাথ হঠাৎ উন্মাদের মতাে লাঠি উচিয়ে তরফদারের দিকে ধাওয়া করতেই পিছন থেকে এক লাফে এগিয়ে এসে শঙ্করবাবু বুডাের হাত থেকে লাঠিটা ছিনিয়ে নিলেন।
এবার বুঝলাম আমাদের গতি কমে আসছে। আকাশে আবার মেঘের গর্জন।তারকনাথ এবার দুহাতে নিজের মাথার চুল টেনে ধরে ঘড়ঘড়ে গলায় একটা অনুত অচেনা ভাষায় গাওয়ালিকে কী জানি বললেন। গাওয়াঙ্গি আর তরফদার এখন মুখখামুখি।আমি বগলদাবা অবস্থাতেই কোনােরকমে ঘাড় ঘুরিয়ে গাওয়ারি মুখের দিকে চাইলাম ! এমন মুখ আমি আর দেখিনি। চোয়াল স্কুলে পড়ে দাঁত বেরিয়ে গেছে, আর চোখ দুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে।
বগলদাবা করা বিশাল হাত দুটো এবার ধীরে ধীরে নেমে এল । আমার। পা এখন মাটিতে। ওদিকে লালমােহনবাবুও মাটিতে। | ‘আপনারা গাড়িতে গিয়ে উঠুন ! চোখের পাতা না ফেলে গাওয়ারি দিক থেকে দৃষ্টি না সরিয়ে চেঁচিয়ে বললেন তরফদার। আমরা এক্ষুনি আসছি । উল্টোদিকে দৌড় দেবার আগের মুহূর্তে দেখলাম তারকনাথ মাথায় হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়লেন। | ফেলুদা এখনাে গঙ্গাবতরণের সামনে দাঁড়িয়ে। আমাদের তিনজনকে রুদ্ধশ্বাসে দৌড়ে আসতে দেখে যেন ও আপনা থেকেই ব্যাপারটা আঁচ করে নিল।
নয়ন রহস্য (পর্ব-২৩)
আমাদেরও আগে ও দৌড়ে গিয়ে গাড়ির দরজা খুলে দিল। আমরা চারজন হুড়মুড়িয়ে উঠে পড়লাম। ‘টার্ন ব্যাক ! টার্ন ব্যাক! চেচিয়ে আদেশ দিল ফেলুদা । এই ড্রাইভার হিন্দি জানে না ; কেবল অমিল আর ভাঙা ভাঙা ইংরিজি।গাড়ি উল্টোমুখাে হতেই ফেলুদা আবার বলল, ‘নাউ ব্যাক টু ম্যাড্রাস-ফাস্ট ! গাড়ি বিদ্যুদ্বেগে রওনা দেবার পর শুধু একজনই কথা বলল। সে হল নয়ন। ‘দৈত্যটার বেয়াল্লিশটা দাঁত।
বেশ জমিয়ে লাঞ্চ খাওয়া হচ্ছে কলােমণ্ডলের মােগলাই ডাইনিং রুম মাইসােরে। অবিশ্বাস্য ব্যাপার হল–আজকের খানার পুরাে ভার নিয়েছেন লালমােহনবাবু। আসলে তরফদার যে সম্মােহনের জোরে ওঁর প্রাণ বাঁচিয়েছিল তাতে~-ওঁরই ভাষায়—উনি সবিশেষ কৃতজ্ঞ। | খেতে খেতে ফেলুদার দিকে ফিরে বললেন, ‘অনেক থ্রিলিং ঘটনার মধ্যে পড়িচি মশাই—থ্যাঙ্কস টু ইউ—কিন্তু আজকেরটা একেবারে ফাইভস্টার অভিজ্ঞতা।
দানবের বগলবন্দী হওয়াটা কী ভাবে ঘটল সেটা ফেলুদা আগেই জিজ্ঞেস করেছিল। আর লালমােহনবাবু সেটা বলেওছিলেন। তার ভাষাতেই ঘটনার বর্ণনাটা এখানে দিচ্ছি । | ‘আর বলবেন না, মশাই—আমি ত খােকাকে গপ্পো শােনাতে মশগুল, গুহায় ঢুকছি আর বেরােচ্ছি, পল্লব-টপ্লব মাথা থেকে হাওয়া হয়ে গেছে। একটা গুহায় ঢুকে দেখলুম সামনেই মহিষাসুর ! বেরিয়ে আসব, এমন সময় দেখলুম—আরেকটা মূর্তি রয়েছে যেটা বিশাল, বীভৎস।
এটার চোখ বােজা, আর মিশকালাে রঙের উপর লাল-সাদা ডােরা। মনে মনে। ভাবছি—এই বাতিক্রমের কারণটা কী ?—এও ভাবছি-একি ঘটোৎকচের মূর্তি নাকি ?কারণ মহাভারতের অনেক কিছুই ত এখানে। দেখছি। এমন সময় মূর্তিটা চোখ খুলল। ভাবতে পারেন ?-ধুমশােটা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ঘুমােচ্ছিল !
নয়ন রহস্য (পর্ব-২৩)
‘চোখ খুলেই অবশ্য আর এক মুহুর্ত দেরি করল না। আমি নয়ন | দুজনেই ব্যোমকে গেছি, সেই অবস্থাতেই আমাদের দুজনকে বগলদাবা। করে নিয়ে দে ছুট।ফেলুদা মন্তব্য করেছিল যে বােঝাই যাচ্ছে গাওয়াঙ্গির মনটা খুব সরল । এমনকি এও হতে পারে যে তার বুদ্ধি বলে কিছু নেই ; যা আছে সে শুধু শারীরিক বল। নাহলে সুনীল তাকে হিপনােটাইজ করতে পাবত । তরফদার আর শঙ্করবাবু কোথায় গিয়েছিলেন জিজ্ঞেস করাতে
তরফদার বললেন, শঙ্করের হবি হচ্ছে আয়ুর্বেদ। ও শুনেছিল যে মহাবলীপুরমে সর্পগন্ধা গাছ পাওয়া যায়, তাই আমরা দুজনে খুঁজতে গিয়েছিলাম। গাছ পেয়ে ফিরতি পথে দেখি এই কাণ্ড। ‘সর্পগন্ধা ত ব্লাড প্রেশারে কাজ দেয়, তাই না ?’ বলল ফেলুদা। ‘হা’, বললেন শঙ্করবাবু। এই সুনীলের প্রেশার মাঝে মাঝে চড়ে যায়। ওর জন্যই এই গাছ আনা।
এর পরেই জটায়ু প্রস্তাব করেন যে তিনি সকলকে খাওয়াবেন। মােগলাই খানার কথাও উনিই বলেন, আর তাতে সকলেই রাজি হয়। | এখন এক টুকরাে চিকেন টিক্কা কাবাব মুখে পুরে চিবােতে চিবােতে ভদ্রলােক ফেলুদার দিকে মুচকি হেসে বললেন, ‘আপনার প্রয়ােজনীয়তা যে ফুরিয়ে গেছে সেটা আজ প্রমাণ হল। ফেলুদা ঠাট্টাটাকে খুব একটা আমল না দিয়ে বলল, তার চেয়েও বড় কথা হল-~গাওয়াঙ্গি বাতিল হয়ে গেল।’ ‘ইয়েস’, বললেন জটায়ু। এখন বাকি শুধু মিস্টার ব্যাস্যাক।
নয়ন রহস্য (পর্ব-২৩)
আমাদের সঙ্গে আজ মিঃ রেডিও খাচ্ছেন—অবিশ্যি নিরামিষ। পরশু বড়দিনে তার রােহিণী থিয়েটারে তরফদারের শাে শুরু বিজ্ঞাপনের ব্যাপারে বেডিড যে কোনাে কার্পণ্য করেননি সেটা ফেরার পথে রাস্তার দুপাশে তামিল আর ইংরিজি পােস্টার দেখেই বুঝেছি । প্রত্যেকটাতেই যাদুকরের পােশাক পরে তরফদারের ছবি আর সেই সঙ্গে ‘জ্যোতিষ্কম্-দ্য ওয়ান্ডার বয়’-এর নাম । রেড্ডি জানালেন যে এর মধ্যেই প্রথম দু দিন হাউসফুল হয়ে গেছে।
‘আমি বলছি আজ আর কোথাও বেরােবেন না, বললেন মিঃ রেড্ডি । ‘আর কালকের দিনটাও রেস্ট করুন । আপনাদের আজকের এক্সপিরিয়েন্স ত শুনলাম ; ওই ছেলেকে নিয়ে আর কোনাে রিস্ক নেবেন না। ওর কিছু হলে যারা টিকিট কেটেছে তারা সবাই টাকা ফেরত চাইবে। তখন কী দশা হবে ভেবে দেখুন—আমারও, আপনারও। থিয়েটারে অবিশ্যি আমি পুলিশ রাখছি, কাজেই শােয়ের সময় কোনাে গণ্ডগােল হবে না ।
গাওয়াঙ্গির ঘটনার ফলে তরফদার আর শঙ্করবাবু দুজনেই বুঝেছেন যে। নয়নকে সামলানাের ব্যাপারে কোনাে গাফিলতি চলবে না। ফেলুদা ওদের কাছে ক্ষমা চেয়ে বলল, মহাবলীপুরম দেখে ওর মাথা ঘুরে গিয়েছিল-“না হলে আমি কখনই মিস্টার গাঙ্গুলীর হাতে নয়নকে ছাড়তাম না। এখন শিক্ষা হয়েছে, এবার থেকে আর কোনাে গণ্ডগােল হবে না।’জটায়ুর গল্প শেষ। তাই নয়ন আজ খাবার পরে তরফদারের সঙ্গেই ঘরে চলে গেল। এখনাে যে চমকের শেষ সীমায় পৌছইনি, সেটা ঘরে ফেরার মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই-অথাৎ আড়াইটে নাগাত-প্রমাণ হল ।
নয়ন রহস্য (পর্ব-২৩)
ফেলুদা আজ রগড়ের মুড়ে ছিল । জটায়ুকে বলছিল—এবার থেকে আপনিই সামাল দিন, আমার দিন ত ফুরিয়ে এল’—ইত্যাদি। লালমােহনবাবু ব্যাপারটা রীতিমতাে উপভােগ করছিলেন, এমন সময় টেলিফোনটা বেজে উঠল । ফেলুদা মিনিটখানেক ইংরিজিতে কথা বলে ফোনটা রেখে বলল, ‘চিনলাম না। কিছুক্ষণের জন্য আসতে চায়।
‘আসতে বললে ? আমি জিজ্ঞেস করলাম । ‘হ্যা, বলল ফেলুদা । হােটেলে এসেছে, নীচ থেকে ফোন করল । জটায়ু—প্লীজ টেক ওভার।। ‘মানে ?’ লালমােহনবাবুর মুখ হাঁ । ‘আমার প্রয়ােজনীয়তা ত ফুরিয়েই গেছে। দেখাই যাক না আপনাকে দিয়ে চলে কিনা। লালমােহনবাবু কিছু বলার আগেই দরজার বেল বেজে উঠল।আমি দরজা খুলতে একজন মাঝারি হাইটের বছর পঞ্চাশের ভদ্রলােক ঘরে ঢুকলেন।
মাথার চুল পাতলা এবং সাদা হয়ে এসেছে, তবে গোঁফটা কালাে এবং ঘন। ভদ্রলােক একবার জটায়ু আর একবার ফেলুদার দিকে চেয়ে ইংরিজিতে বললেন, আপনার নামের সঙ্গে আমি পরিচিত, মিঃ মিটার, কিন্তু আপনার চেহারার সঙ্গে নয় । হুইচ ওয়ান অফ ইউ ইজ– ? ফেলুদা সরাসরি লালমােহনবাবুর দিকে দেখিয়ে বলল, “দিস ইজ মিস্টার মিটার।
Read More
