সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-৯)

নয়ন রহস্য

তরফদার যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও চাকরকে ডেকে পাঠালেন। নারায়ণ, আরেকবার যাও ত—খােকাবাবুকে ডেকে আন। নয়ন মিনিট খানেকের মধ্যে হাজির। ‘সাে দিস ইজ দ্য বয় ? হজসন নয়নের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, “আমাদের এখানে ঘােড়দৌড় হয় তুমি জান ?তরফদার সেটা বাঙলা করে নয়নকে বললেন। জানি’, পরিষ্কার গলায় বলল নয়ন । গত শনিবার রেস ছিল, বলল হজসন। তিন নম্বর রেসে কত নম্বর ঘােড়া জিতেছিল বলতে পার ? এটাও অনুবাদ হল নয়নের জন্য। ‘ফাইভ’—এক মুহূর্ত না ভেবে বলে দিল নয়ন। 

এক জবাবেই কেল্লা ফতে। সােফা থেকে উঠে প্যান্টের দু পকেট হাত ঢুকিয়ে ভেরি স্ট্রেঞ্জ, ভেরি স্ট্রেঞ্জ’ বলে এপাশ ওপাশ পায়চারি করতে লাগলেন হজসন সাহেব । তারপর হঠাৎ থেমে তরফদারের দিকে সােজা দৃষ্টি দিয়ে বললেন, ‘অল আই ওয়ান্ট ইজ দিস—আমি সপ্তাহে একবার করে এখানে এসে এর কাছ থেকে জেনে যাব সামনের শনিবার কোন রেসে কত নম্বর ঘােড়া জিতবে।

নয়ন রহস্য (পর্ব-৯)

সােজা কথায় বলছি-রেস আমার নেশা । অনেক টাকা খুইয়েছি, তাও নেশা যায়নি। কিন্তু আর হারলে দেনার দায়ে আমাকে জেলে পুরবে। তাই এবার থেকে শিওর হয়ে বেট করতে চাই। দিস বয় উইল হেলপ মি।’ ‘হাউ ক্যান ইউ বি সাে শিওর? ঠাণ্ডা গলায় জিজ্ঞেস করলেন তরফদার । ‘হি মাস্ট, হি মাস্ট, হি মাস্ট! বাঁ হাতের তেলাের ওপর ডান হাত দিয়ে পর পর তিনটে ঘুষি মেরে বললেন হজসন সাহেব। 

‘নােহি মাস্ট নট’, দৃঢ়স্বরে বললেন তরফদার । অসাধু উদ্দেশ্যে। কোনােরকমে ব্যবহার করা চলবে না এই বালকের ক্ষমতা। এ ব্যাপারে আমার কথার এক চুল নড়চড় হবে না।’ | এবারে হজসনের চেহারা হয়ে গেল ভিখিরির মতাে । হাত দুটো জোড় করে ভদ্রলােক কাতর সুরে বললেন, ‘অন্তত আগামী রেসের উইনারের নামগুলাে বলে দিক! প্লীজ ! নাে হেলপ ফর গ্যাম্বলারস, নাে হেল্প ফর গ্যালারস্ ! আশ্চর্য শুদ্ধ ইংরিজিতে ঘন ঘন মাথা নেড়ে বললেন জটায়ু। 

হজসন সােফা ছেড়ে উঠে পড়লেন, তাঁর মুখ বেগুনি| ‘তােমাদের মতাে এমন ঢ্যাঁটা আর মূখ লােক আমি আর দেখিনি, ড্যাম ইট । কথাটা বলে আর একমুহুর্ত অপেক্ষা না করে হজসন গটগটিয়ে সদর দরজার দিকে চলে গেলেন| ‘বিশ্রী লােক ! হরি ম্যান! নাক কুঁচকে চাপা গলায় বললেন জটায়ু

তরফদার নয়নকে ঘরে পাঠিয়ে দিলেন ‘বিচিত্র সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট, বলল ফেলুদাহজসন অবিশ্যি শুধু জুয়াড়ি নন, তিনি নেশাও করেনআমি কাছে বসেছিলাম তাই গন্ধটা সহজেই পাচ্ছিলাম ওঁর যে দৈন্যদশা সেটা ওঁর কোটের আস্তিনের কনুই দেখলেই বােঝা যায়ভাঁজ খেয়ে খেয়ে কোটের ওইখানটাই সবচেয়ে আগে জখম হয়।

একে তাপ্পি লাগাতে হয়েছে, কিন্তু নতুন কাপড়ের সঙ্গে পুরােনর রং বা কোয়ালিটি কেনােটাই মেলেনি। তাছাড়া ভদ্রলােককে যে বাসে বা ট্রামে আসতে হয়েছে সেটা ওর ডান পায়ের কালাে জুতাের ডগায় অন্য কারুর জহাের আংশিক ছাপ দেখেই বােঝা যায় ! এ জিনিস ট্যাক্সি বা মেট্রোতে হয় না

নয়ন রহস্য (পর্ব-৯)

এগুলাে অবিশ্যি শুধু ফেলুদারই চোখে ধরা পড়েছে বাইরে একটা গাড়ি থামার শব্দ পেয়ে আমরা আবার টান হয়ে বসলাম । নাম্বার ফোর’, বলল ফেলুদা। সেকস মিনিট খানেক পরেই নারায়ণ এক অদ্ভুত প্রাণীকে এনে হাজির করল। পুরােন জুতাের বুরুশের মতাে দাড়ি, শুয়ােপােকার মতাে গোঁফ। কুলঝাড়ার মতাে চুল, পরনে ঢিলে হয়ে যাওয়া গেরুয়া সুট, আর বিশ্রী ভাবে প্যাঁচ দেওয়া সবুজ টাই।

ছােটখাটো মানুষ। বয়স ষাট-পয়ষট্টি হবে, যদিও সেই তুলনায় চোখ দুটো অস্বাভাবিক রকম উজ্জ্বল। ঘরে ঢুকে এদিক ওদিক দেখে মিহি অথচ কর্কশ গলায় বললেন, ‘তরফদার, তরফদার-এইচ ওয়ান ইজ তরফদার ? তরফদার উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করে বললেন, ‘আমিই সুনীল তরফদার।। ‘আল্ড বীজ থ্রী ? আমাদের তিনজনের উপর দিয়ে একটা ঝাড়-দৃষ্টি দিয়ে জিজ্ঞেস করলেন ভদ্রলােক। 

‘আমার নি অন্তরঙ্গ বন্ধু’, বললেন তরফদার। ‘নেস ? নে ? ‘ইনি প্রদোষ মিত্র, ইনি লালমােহন গাঙ্গুলী, আর ইনি তপেশ মিত্র। ‘অল রাইট। এবার কাজের কথা। কাজের কথা। বলুন। ‘আমার নাম জানেন ? ‘আপনি ত টেলিফোনে শুধু আপনার পদবীটাই বলেছিলেন—ঠাকুর। সেটাই জানি। ‘তারকনাথ। তারকনাথ ঠাকুর। টি এন টি— ট্রাইনাইট্রোটোলুঈন -হাঃ হাঃ হাঃ হাঃ। ভদ্রলােকের হাসির দমকে চমকে উঠলাম।

ট্রাইনাইট্রোটোলুঈন বা টি এন টি যে এক প্রচণ্ড বিস্ফোরকের উপাদান সেটা আমি জানতাম। ‘আপনার বাড়িতে কি একজন অসম্ভব বেঁটে বামুন থাকে ?’ ফেলুদা। প্রশ্ন করল।  ‘কিচোমাে। কোরিয়ান, বললেন তারকনাথ। এইট্টি টু  সেন্টিমিটার। বিশ্বের খতম প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি। ‘এ খবরটা মাস কয়েক আগে কাগজে বেরিয়েছিল। ‘এবার গিনেস বুক অফ রেকর্ডসে স্থান পাবে। ‘একে আপনি জোগাড় করলেন কী করে? প্রশ্ন করলেন জটায়ু।

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর নয়ন রহস্য (পর্ব-১০)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *