ওই জানালাটা বন্ধ করে দেওয়া উচিত ছিল। গেট থেকে জানালা দিয়ে ঘরের ভিতরটা পরিষ্কার দেখা যায়। ইলেকট্রিক লাইট হলে তাও বা কথা ছিল, কিন্তু তোর কাকা আবার লাগিয়েছেন ফ্লুয়ােরেসেন্ট। “তাতে কী হয়েছে ? ‘তাের বাবাকে দেখতে পাচ্ছিস ? ‘শুধু মাথাটা। উনি যে চেয়ারে বসে আছেন।’ ‘ওই চেয়ারে দশ মিনিট আগে কে বসেছিল ? ‘ডক্টর শ্রীবাস্তব। ‘আংটির কৌটোটা তাের বাবাকে দেবার সময় উনি উঠে দাঁড়িয়েছিলেন মনে পড়ে ?
এর মধ্যেই ভুলে যাব ? ‘সেই সময় এই গেটের কাছে কেউ থেকে থাকলে তার পক্ষে ঘটনাটা দেখে ফেলা অসম্ভব নয়।
‘এই রে! কিন্তু কেউ যে ছিল সেটা তুমি ভাবছ কেন ?
ফেলুদা নিচু হয়ে নুড়ি পাথরের উপর থেকে একটা ছােট্ট জিনিস তুলে আমার দিকে এগিয়ে দিল। হাতে নিয়ে দেখলাম সেটা একটা সিগারেটের টুকরাে ।
‘মুখটা ভাল করে লক্ষ কর।’
আমি সিগারেটটা চোখের খুব কাছে নিয়ে এলাম, আর রাস্তার ল্যাম্পের অল্প আলােতেই যা দেখবার সেটা দেখে নিলাম।
ফেলুদা হাত বাড়িয়েই সিগারেটটা ফেরত নিয়ে নিল। ‘কী দেখলি ? ‘চারমিনার। আর যে লােকটা খাচ্ছিল, তার মুখে পান ছিল, তাই পানের দাগ লেগে আছে।’
‘ভেরি গুড । চ’ ভেতরে চ’। রাত্রে শােবার আগে ফেলুদা ধীরুকাকার কাছ থেকে আংটিটা চেয়ে নিয়ে সেটা আরেকবার ভাল করে দেখে নিল। ওর যে পাথর সম্বন্ধে এত জ্ঞান ছিল সেটা আমি জানতাম না। ল্যাম্পের আলােতে আংটিটা ধরে সেটাকে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বলতে লাগল ‘এই যে নীল পাথরগুলো দেখছিস, এগুলােকে বলে সাফায়ার, যার বাংলা নাম নীলকান্ত মণি।
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৫)
লালগুলাে হচ্ছে চুনি অথাৎ রুবি, আর সবুজগুলাে পান্না—এমারেল্ড। অন্যগুলি যতদূর মনে হচ্ছে পােখরাজ—যার ইংরেজি নাম টোপ্যাজ। তবে আসল দেখবার জিনিস হল মাঝখানের ওই হিরেটা। এমন হিরে হাতে ধরে দেখার সৌভাগ্য সকলের হয় না।’
তারপর ফেলুদা আংটিটা বাঁ হাতের কড়ে আঙুলের পাশের আঙুলে পরে বলল, ‘আওরঙ্গজেবের আঙুল আর আমার আঙুলের সাইজ মিলে যাচ্ছে, দেখেছিস।
সত্যিই দেখি ফেলুদার আঙুলে আংটিটা ঠিক ফিট করে গেছে।
ল্যাম্পের আলােতে ঝলমলে পাথরগুলির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থেকে ফেলুদা বলল, ‘কত ইতিহাস জড়িয়ে আছে এ আংটির সঙ্গে কে জানে। তবে কী জানিস তােপসে–এর অতীতে আমার কোনও ইন্টারেস্ট নেই। এটা আওরঙ্গজেবের ছিল কি আলতামসের ছিল কি আক্রম, খাঁর ছিল, সেটা আনিম্পরট্যান্ট । আমাদের জানতে হবে‘এর ভবিষ্যৎটা কী, আর বর্তমানে কোনও বাবাজি সত্যি করেই এর পেছনে লেগেছেন কি না, আর যদি লেগে থাকেন তবে তিনি কে এবং তাঁর কেন এই দুঃসাহস।’
তারপর ফেলুদা আংটি হাত থেকে খুলে নিয়ে আমার হাতে দিয়ে বলল, “যা, ফেরত দিয়ে আয়। আর এসে জানালাগুলাে খুলে দে ।
পরদিন দুপুরে একটু তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে আমরা ইমামবড়া দেখতে বেরিয়ে পড়লাম। বাবা আর ধীরুকাকা মােটরে গেলেন। গাড়িতে যদিও জায়গা ছিল, তবু ফেলুদা আর আমি দুজনেই বললাম যে আমরা টাঙ্গায় যাব।
সে দারুণ মজা। কলকাতায় থেকে তাে ঘােড়ার গাড়ি চড়াই হয় না। সত্যি বলতে কী, আমি কোনও দিনই কোনওরকম ঘােড়ার গাড়ি চড়িনি। ফেলুদা অবিশ্যি চড়েছে। ও বলল কলকাতার ঠিকা গাড়ির চেয়ে টাঙ্গায় নাকি অনেক বেশি ঝাঁকুনি হয়, আর সেটা নাকি হজমের
পক্ষে খুব ভাল। ‘তাের কাকার বাবুর্চি যা ফার্স্ট ক্লাস রাঁধে, বুঝছি এখানে খাওয়ার ব্যাপারে হিসেব রাখাটা খুব মুশকিল হবে। কাজেই মাঝে মাঝে এই টাঙ্গা রাইডটার এমনিতেই দরকার হবে।
নতুন শহরের রাস্তাঘাট দেখতে দেখতে আর টাঙ্গার ঝাঁকুনি খেতে খেতে যে জায়গাটায় পৌছলাম, গাড়ােয়ানকে জিজ্ঞেস করাতে ও বলল সেটার নাম কাইজার–বাগ। ফেলুদা বলল, ‘জমান আর উর্দুতে কেমন মিলিয়েছে দেখছিস ?
ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৫)
নবাবি আমলের যত প্রাসাদ–টাসাদ সব নাকি এই কাইজারবাগের আশেপাশেই রয়েছে। গাড়ােয়ান এদিকে ওদিকে আঙুল দেখিয়ে সব নাম বলে দিতে লাগল।
‘উয়াে দেখিয়ে বাদশা মনজিল...উয়াে হ্যায় চাঁদিওয়ালি বরাদরি...উসকো বােলতা লাখুফটক...‘।
কিছুদূর গিয়ে দেখি রাস্তাটা গেছে একটা বিরাট গেটের মধ্যে দিয়ে। গাড়ােয়ান বলল, ‘রুমি দরওয়াজা ।‘
রুমি দরওয়াজা পেরিয়েই ‘মচ্ছি ভওয়ন আর মচ্ছি ভওয়নেই হল বড়া–ইমামবড়া ।
ইমামবড়ার সাইজ দেখে আমার মুখের কথা বন্ধ হয়ে গেল। এত বড় প্রাসাদ যে হতে পরে সেটা আমার ধারণাই ছিল না। | টাঙ্গা থেকেই ধীরুকাকার গাড়িটা দেখতে পেয়েছিলাম । গাড়ােয়ানকে ভাড়া ঢুকিয়ে দিয়ে আমরা বাবাদের দিকে এগিয়ে গেলাম। বাবা আর ধীরুকাকা একজন লম্বা মাঝবয়সী লােকের সঙ্গে কথা বলছেন।
ফেলুদা হঠাৎ আমার কাঁধে হাত দিয়ে চাপা গলায় বলল, “ব্রাক স্ট্যার্ড হেরাল্ড।’ সত্যিই তাে ! ধীরুকাকার গাড়ির পাশে একটা কালাে স্ট্যান্ডার্ড গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ‘মাডগার্ডে একটা টাটকা ঘষটার দাগ দেখছিস ?
টাটকা কী করে জানলে ? · ‘চুনের গুঁড়াে সব ঝরে পড়েনি এখনও-লেগে রয়েছে। রং-করা পাঁচিল কিংবা গেটের গায়ে ঘষটে ছিল বােধ হয়। আজ সকালে যদি গাড়ি ধােওয়া না হয়ে থাকে, তা হলে ও দাগ কাল রাত্রে লেগে থাকতে পারে।’
Read More