সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৮)

বনবিহারীবাবু তাঁর পাইপে তামাক ভরতে ভরতে বললেন, “কেন লাগবে না বলুন ? ভয়টা কীসের? এককালে কত বাঘ ভালুক মেরেছি জানেন ? ওয়াইল্ড অ্যানিম্যাল ছাড়া মারতুম 

 অব্যর্থ টিপ ছিল। একবার কী যে ভীমরতি ধরল। চাঁদার জঙ্গলে এক মার্কিনি সাহেবকে বড়াই করে টিপ দেখাতে গিয়ে দেড়শাে গজ দূর থেকে এক হরিণ মেরে ফেললুম।

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড আর তারপর সে কী অনুতাপ ! সেই থেকে শিকার ছেড়ে দিয়েছি। তবে জানােয়ার ছাড়াও থাকতে পারব না, তাই চালান দেবার ব্যবসা ধরলুম। ব্যবসা যখন ছাড়লুম, তখন বাধ্য হয়েই বাড়িতে চিড়িয়াখানা করলুম। এদের নিয়ে বাস করার কী আনন্দ জানেন ? এরা যে হিংস্র ও বিষাক্ত, সেটা সকলেরই জানা। এরা তাে নিরীহ ভালমানুষ বলে চালাতে চাইছে না নিজেদের ! অথচ মানুষের মধ্যে দেখুন—একজনকে আপনি ভাবছেন সৎ লােক, শেষে হঠাৎ বেরিয়ে গেল সে আসলে একটা ক্রিমিনাল।

অন্তরঙ্গ বন্ধুকেই কি আর আজকের দিনে বিশ্বাস করার জো আছে ? তাই স্থির করেছি জানােয়ার পরিবেষ্টিত হয়েই বাকি জীবনটা কাটাব—তাতে শান্তি অনেক বেশি। আমি মশাই সাতেও নেই পাঁচেও নেই। নিজের সম্পত্তি একা নিজে ভােগ করছি—তাতে কে কী ভাবছে না ভাবছে সেই নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কী হবে ? তবে শুনিচি আমার এ চিড়িয়াখানার দৌলতে পাড়ায় নাকি চুরিচামারি বন্ধ হয়ে গেছে। তা হলে বলতে হয় অজান্তে আমি লােকের উপকারই করছি ! 

এই শেষ কথাটা শুনে আমি প্রথমে ধীরুকাকার দিকে, তারপর ফেলুদার দিকে চাইলাম। বনবিহারীবাবু কি তা হলে শ্রীবাস্তবের বাড়ির ঘটনাটা জানেন না ? 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৮)

এই প্রশ্নের উত্তরের জন্য বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হল না, কারণ বনবিহারীবাবুর বেয়ারা কফি আর মিষ্টি এনে দেবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই শ্রীবাস্তব এসে হাজির হলেন। | সকলকে নমস্কার-টমস্কার করে ধীরুকাকাকে বললেন, আপনাদের বাড়ির কাছেই | কেলভিন রােডে একটি ছেলে গাছ থেকে পড়ে হাত ভেঙেছে। তাকে দেখে আপনার বাড়ি 

গিয়ে দেখি আপনারা ফেরেননি। তাই এখানে চলে এলাম।’ ৩৪ 

 ধীরুকাকা শ্রীবাস্তবের দিকে চোখ দিয়ে একটা ইশারা করে বুঝিয়ে দিলেন যে তাঁর আংটি ঠিকই আছে। 

বনবিহারীবাবুর সঙ্গে দেখলাম শ্রীবাস্তবের যথেষ্ট আলাপ। ছােট শহরে পাড়ার লােকেদের পরস্পরের মধ্যে আলাপটা বােধহয় সহজেই হয় । 

শ্রীবাস্তব ঠাট্টার সুরে বললেন, বনবিহারীবাবু, আপনার পাহারাদারেরা কিন্তু আজকাল ফাঁকি দিচ্ছে।’ 

বনবিহারীবাবু একটু অবাক হয়েই বললেন, “কী রকম ? কাল আমার বাড়িতে চোর এল, আর আপনার একভি জানােয়ার কিছু সাড়াশব্দ করল।’ ‘সে কী ? চোর ? আপনার বাড়িতে ? কখন ? 

‘রাত তিনটের কাছাকাছি। নেয়নি কিছুই। ঘুমটা ভেঙে গেল আমার, তাই পালিয়ে গেল।’ | না নিলেও—খুব এক্সপার্ট বলতে হবে । আমার ‘বাদশা’ অন্তত খুবই সজাগ। দুশাে গজের মধ্যে আপনার বাড়ি—আর চোর এলেও আমার কম্পাউন্ডের পিছন দিয়েই তাকে যেতে হবে।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৮)

যাক গে ! আপনাকে ঘটনাটা জানিয়ে রাখলাম। 

কফির সঙ্গে একরকম মিষ্টি দিয়ে গিয়েছিল প্লেটে । শ্রীবাস্তব বললেন সেটার নাম সান্ডিলা লাড্ড। 

‘সান্ডিলা লাড়ু, গুলাবি রেউরি, আর ভুনা পেঁড়া—এই তিন মিষ্টি হল লখনৌয়ের স্পেশালিটি। 

আমার নিজের মিষ্টি জিনিসটা খুব ভাল লাগে না, তাই আমি ও সব কথায় বিশেষ কান না দিয়ে বনবিহারীবাবুকে লক্ষ করছিলাম। ওঁকে যেন একটু অন্যমনস্ক মনে হচ্ছিল। ফেলুদা কিন্তু দেখি এর মধ্যেই দুটো লাড্ড শেষ করে নিয়ে, আমার কফির পেয়ালার উপর মাছি তাড়াবার মতাে করে হাত নাড়িয়ে দারুণ কায়দায় আমার প্লেট থেকে আরেকটা লাড়ু তুলে নিল ।বনবিহারীবাবু হঠাৎ শ্রীবাস্তবের দিকে ফিরে বললেন, আপনার সেই বাদশাহী আংটি ঠিক আছে তাে ? | শ্রীবাস্তবের হঠাৎ বিষম লেগে গেল। তারপর কোনওরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে শশিটাকে হাসিতে চেঞ্জ করে বললেন—ও বাবা—আপনার দেখি মনে আছে 

বনবিহারীবাবু পাইপের ধোঁয়া ছেড়ে বললেন, ‘মনে থাকবে না ! আমার যদিও ও সব ব্যাপারে কোনও ইন্টারেস্ট নেই, তবুও ওরকম আংটি তাে সচরাচর দেখা যায় না।’ 

শ্রীবাস্তব বললেন, আংটি ঠিকই আছে । ওর ভ্যালু আমার জানা আছে।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৮)

বনবিহারীবাবু এবার হঠাৎ উঠে পড়ে বললেন, ‘এক্সকিউজ মি—আমার বেড়ালের খাবার সময় হয়ে গেছে।’ 

এ কথার পর আর থাকা যায় না—তাই আমরাও উঠে পড়লাম। বাইরে এসে একজন লােককে হাতে একটা ব্যাগ নিয়ে বনবিহারীবাবুর গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতে দেখলাম। তার যে দারুণ মাসল সেটা গায়ে জামা থাকলেও বােঝা যায়। শুনলাম তার নাম নাকি গণেশ গুহ। বনবিহারীবাবুর যখন জানােয়ার চালান দেবার কারবার ছিল 

তখন থেকেই নাকি ইনি আছেন ; এখন নাকি চিড়িয়াখানা দেখাশােনা করেন। 

বনবিহারীবাবু বললেন, ‘গণেশকে ছাড়া আমার চিড়িয়াখানা মেনটেন করা হত না। ওর 

ভয় বলে কোনও বস্তুই নেই। একবার ওয়াইল্ড ক্যাটের আঁচড় খাওয়া সত্ত্বেও ও আমার চাকরি ছাড়েনি। 

আমরা যখন গাড়িতে উঠছি তখন বনবিহারীবাবু বললেন, আপনারা আসাতে খুব ভাল লাগল। মাঝে মাঝে এসে পড়বেন না হয়। এখন এখানেই আছেন তাে ? 

বাবা বললেন, ‘কদিন আছি। তারপর ভাবছি এদের একবার হরিদ্বারটা দেখিয়ে আনব।’  ‘বটে ? লছমনঝুলা থেকে একটা বারাে ফুট পাইথনের খবর এসেছে। আমিও তাই একবার ওদিকটায় যাব যাব করছিলাম। | শ্রীবাস্তবকে আমরা ওঁর বাড়ির সামনে নামিয়ে দিলাম। ঠিক সেই সময় বনবিহারীবাবুর বাড়ির দিক থেকে একটা বিকট চিৎকার শুনতে পেলাম। 

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-১৯)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *