সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৬)

দোকানদার বলল, আমরা আজ বিকেলে কিন্তু এক লট মাল পাচ্ছি। তার মধ্যে ভাল একা পাবেন। 

আজই পাচ্ছেন ? আজই ।’ ‘এ খবরটা তাহলে রাজেনবাবুকে জানাতে হয়। 

মিস্টার মজুমদার ? ওনার তাে জানা আছে। রেগুলার খদ্দের যে দু-তিন জন আছেন, তাঁরা সকলেই নতুন মাল দেখতে বিকেলে আসছেন।’

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড 

অবনীবাবুও খবরটা পেয়ে গেছেন ? মিস্টার ঘােষাল ? 

আর বড় খদ্দের কে আছে আপনাদের ? 

আর আছেন মিস্টার গিলমাের—চা বাগানের ম্যানেজার। সপ্তাহে দু দিন বাগান থেকে আসেন। আর মিস্টার নাওলাখা। উনি এখন সিকিমে। 

বাঙালি আর কেউ নেই ? না স্যার। “আচ্ছা দেখি, বিকেলে যদি একবার ঢু মারতে পারি।’ 

তার পর আমার দিকে ফিরে বলল, তােপসে, তুই একটা মুখােশ চাস ? – তােপসে যদিও আমার আসল ডাকনাম নয়, তবু ফেলুদা তপেশ থেকে ওই নামটাই করে নিয়েছে। 

মুখােশের লােভ কি সামলানাে যায় ? ফেলুদা নিজেই একটা বাছাই করে আমাকে কিনে দিয়ে বলল, এইটেই সবচেয়ে হরেনডাস্ কী বলিস ? 

সে বলে “হরেনডাস বলে আসলে কোনও কথা নেই। ট্রিমেনডাস’ মানে সাংঘাতিক, আর ‘হরিবল’ মানে বীভৎস। এই দুটো একসঙ্গে বােঝাতে নাকি কেউ কেউ হরেনডাস ব্যবহার করে। মুখােশটা সম্বন্ধে যে ওই কথাটা দারুণ খাটে, সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৬)

দোকান থেকে বেরিয়ে ফেলুদা আমার হাত ধরে কী একটা বলতে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল । এবারও দেখি ফেলুদা একজন লােকের দিকে দেখছে। বােধ হয় কাল রাতে, যাকে দেখেছিল, সেই লােকটাই। বয়স আমার বাবার মতাে, মানে চল্লিশ-বেয়াল্লিশ, গায়ের রং ফরসা, চোখে কালাে চশমা। যে সুটটা পরে আছে সেটা দেখে মনে হয় খুব দামি ।। ভদ্রলােক ম্যালের মাঝখানে দাঁড়িয়ে পাইপ ধরাচ্ছেন। আমার দেখেই কেমন যেন চেনা চেনা মনে হল, কিন্তু কোথায় দেখেছি ঠিক বুঝতে পারলাম না। 

ফেলুদা সােজা লােকটার দিকে এগিয়ে গিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে ভীষণ সাহেবি কায়দার উচ্চারণে বলল, ‘এক্সকিউজ মি, আপনি মিঠা ছাঠাঝি ? 

ভদ্রলােকও একটু গম্ভীর গলায় পাইপ কামড়ে বলল, “নাে, আই অ্যাম নঠ। | ফেলুদা খুবই অবাক হবার ভান করে বলল, ‘স্ট্রেঞ্জ—আপনি সেন্ট্রাল হােটেলে উঠেছেন ?ভদ্রলােক একটু হেসে অবজ্ঞার সুরে বললেন, ‘না। মাউন্ট এভারেস্ট। অ্যান্ড আই ডােন্ট হ্যাভ এ টুইন ব্রাদার। 

এই বলে ভদ্রলােক গটগটিয়ে অবজারভেটরি হিলের দিকে চলে গেলেন। যাবার সময় ক্ষ করলাম যে তার কাছে একটা ব্রাউন কাগজে মােড়া প্যাকেট, আর কাগজটার গায়ে লেখা ‘নেপালি কিউরিও শপ। 

আমি চাম্পা গলায় বললাম, ‘ফেলুদা, উনিও কি মুখোশ কিনেছেন নাকি ? ‘তী কিনতে পারে। মুখােশটা তাে আর তাের-আমার একচেটিয়া নয়।…চ, কেভেন্টার্সে গিয়ে একটু কফি খাওয়া যাক। 

 ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৬)

কেভেনটাসের দিকে যেতে যেতে ফেলুদা বলল, “লােকটাকে চিনলি ? 

আমি বললাম, তুমিই চিনলে না, আমি আর কী করে চিনি বলাে তবে চেনা চেনা লাগছিল।’ 

“আমি চিনলাম না ? ‘বা রে কোথায় চিনলে ? ভুল নাম বললে যে ? ‘তাের যদি এতটুকু সেন্স থাকে। ভুল নাম বলেছি হােটলের নামটা বের করার জন্য, সেটাও বুঝলি না ? লােকটার আসল নাম কী জানিস ? 

কী ? ‘প্রবীর মজুমদার।

ও হাে ! হ্যাঁ ঠিক বলেছ, ঠিক বলেছ । রাজেনবাবুর ছেলে, তাই না ? যার ছবি রয়েছে তাকের উপর ? অবিশ্যি বয়সটা এখন অনেক বেড়ে গেছে তো।’  ‘শুধু যে চেহারায় মিল তা নয়—গালের আচিলটা নিশ্চয় তুইও লক্ষ করেছিস—-আসল কথাটা হচ্ছে, ভদ্রলােকের জামা কাপড় সব বিলিতি ! সুট লন্ডনের, টাই প্যারিসের, জুতাে ইটালিয়ান, এমন কী রুমালটা পর্যন্ত বিলিতি। সদ্য বিলেত-ফেরত সে বিষয়ে কোনও সন্দেহ নেই। 

‘কিন্তু ওঁর ছেলে এখানে রয়েছে সে খবর রাজেনবাবু জানেন না ? ‘বাপ যে এখানে রয়েছে, সেটা ছেলে জানে কি না সেটাও খোঁজ নিয়ে দেখা দরকার।’ 

রহস্য ক্রমেই ঘনিয়ে আসছে, এই কথাটা ভাবতে ভাবতে কেভেন্টারের দোকানে পৌছলাম । 

দোকানের ছাতে যে বসার জায়গাটা আছে, সেটা আমার ভীষণ ভাল লাগে। চারদিকে দার্জিলিং শহরটা, আর ওই নীচে বাজারটা দারুণ ভাল দেখায়। 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *