সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৬)

লাল হচ্ছে আমার সবচেফেভারিট কালার অথচ লাল রঙের ব্যবহারটা এখনাে শিখতে পারলাম নাএরকম জীবনের কোনাে মানে হয়

সবাই গেছে বনেএই জাতীয় কথাবার্তার কোনাে অর্থ হয় না বলাই বাহুল্যতবু রুনকির ভয় করেবড় শিল্পী না হওয়াই ভালটম আর দশজন মানুষের মত সহজ স্বাভাবিক মানুষ হােকসংসারে ভালােবাসা থাকুক সুখ থাকুকখ্যাতির কি সত্যি কোনাে প্রয়ােজন আছে ? | টম অবশ্যি রুনকিকে খুব পছন্দ করে। তবু রুনকির ভয় কাটে নাসব সময় মনে হয়একদিন সে হয়ত ভাল মানুষের মত ঘর থেকে বেরুবে আর ফিরবে নাপৃথিবীতে এক ধরনের মানুষ আছে যাদের ভালােবাসা দিয়ে ধরে রাখা যায় না। 

রুনকি নিজেকে মানিয়ে নিল খুব সহজেইবাজার করা, রান্না করা, কোনাে কিছুই আর আগের মত জটিল মনে হল না তার কাছেবাইরে বেরুলে একটি ক্ষীণ অস্বস্তি অবশ্যি থাকে মনের মধ্যে যদি পরিচিত কারাের সঙ্গে দেখা হয়সবচেভাল হত যদি টমকে নিয়ে বহু দূরে কোথাও চলে যাওয়া যেতপ্রশান্ত মহাসাগরের ছােট কোনাে একটি দ্বীপেযেখানে জনমানুষ নেইসারাক্ষণ হুহু করে হাওয়া বইছেসন্ধ্যাবেলা আকাশ লাল করে সূর্য ডুবে হঠাৎ করে চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়। 

সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৬

টমের এই বাড়িটিও অবশ্যি দ্বীপের মতইশহরের বাইরে খােলামেলা একটা বাড়িকেউ ঠিকানা জানে না বলেই কেউ আসে নারুনকি মাকে টেলিফোন করে ঠিকানা দিতে চেয়েছিলরাহেলা শান্ত স্বরে বলেছেন, তােমাদের ঠিকানার আমার কোনাে প্রয়ােজন নেই। 

রুনকিতােমার ঠিকানা তােমার কাছেই থাকুক। 

ঠিকানা না রাখলে টেলিফোন নাম্বার রাখ । 

রাহেলা উত্তর না দিয়ে টেলিফোন নামিয়ে রেখেছেন| কেউ জানে না রুনকি কোথায় আছে তবু একদিন সফিক তার ভাঙা ডজ গাড়ি নিয়ে এসে উপস্থিতরুনকির বিস্ময়ের সীমা রইলাে নাসফিক গাড়ি থেকে নেমেই বললাে, বাংলাদেশী কায়দায় তােমাদের একটা বিয়ের ব্যবস্থা করবার জন্যে আসলামগায়ে হলুদ টলুদ সব হবেবরের বাড়ি থেকে কনের বাড়িতে রুই মাছ যাবেগায়ে হলুদের তত্ত্বদেশের একটা পাবলিসিটি হয়ে যাবেমেলা লােকজনকে বলা হবে কী বল

রুনকি বহু কষ্টে হাসি সামলায়টম বুঝি রাজি হবে! তােমার যে কী সব চিন্তাভাবনা সফিক ভাই। 

রাজি হবে না মানে ? টমের ঘাড় রাজি হবেব্যাটা দেশের একটা বেইজ্জতি করে ফেলেছেবাংলাদেশী মেয়েকে ভাগিয়ে নিয়ে এসে...। 

রুনকি গম্ভীর মুখে বললাে, সফিক ভাই, টম কাউকে ভাগিয়ে টাগিয়ে আনে নিআমি নিজেই এসেছিআর আমার জন্যে তােমার বাংলাদেশের কোনাে বেইজ্জত হয় নিআমি বাংলাদেশী নইআমি বাই বার্থ আমেরিকানআমার বাবা মার মত নেচারালাইজড সিটিজেন না। 

সফিক সারাদিন তাকলাে রুনকির ওখানেদি মেঘনা রেস্টুরেন্ট খােলার ব্যাপারে তার রুনকির সাহায্যের দরকার হুলস্থুল কাণ্ড করতে হবে সেখানেলাঞ্চ ডিনারের টাইমে পল্লীগীতির সুর বাজবেবাংলাদেশের বিখ্যাত সব শিল্পীদের তেল রঙের নিসর্গ দৃশ্যের ছবি দিয়ে সাজানাে হবে লবিখাওয়ার শেষে হাতে তুলে দেয়া হবে এক খিলি পান এবং খাঁটি বাংলায় বলা হবে আবার আসবেন। 

সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৬

কিন্তু টাকাটা তুমি পাচ্ছ কোথায়

সবার কাছ থেকে চেয়ে চিন্তে যােগাড় হবেতােমাকেও দিতে হবেছাড়াছাড়ি নেইআমার কাছে আছেই কুল্যে একশডলারদাও একশডলারই সইতােমাকে দিয়েই শুরু। 

সারাদিন অপেক্ষা করেও টমের দেখা পাওয়া গেল নাসে আসবে রাত আটটায়রুজভেল্ট স্কুলের কী একটা ডেকরেশনের কাজ নাকি পেয়েছেশেষ করে ফিরবে। 

 অক্টোবর মাস। 

বরফ পড়ার সময় নয় কিন্তু আবহাওয়া অফিস বলেছে তুষারপাত হতে পারেসম্ভাবনা শতকরা বিশ ভাগআকাশ অবশ্যি পরিষ্কারঝকঝকে রােদসন্ধ্যার আগে আগে দেখা গেল সব ঘােলাটে হয়ে আসছেসাড়ে টা থেকে ঝুর ঝুর করে বরফ পড়তে শুরু করলাে। 

বৎসরের প্রথম বরফ, খুশীর ঢেউ খেলে গেলাে চারদিকেছেলে বুড়াে সবাই চোখ বড় বড় করে বলছেআহ্ কী চমৎকার তুষার পড়ছেহাউ লাভলী। 

রাত নটার খবরে বললােকানাডা থেকে ঠাণ্ডা হাওয়া দিচ্ছে আর উষ্ণ হাওয়া আসছে সাউথ থেকে কাজেই সারারাত ধরে ব্লিজার্ড হতে পারেইতিমধ্যে এক ফুটের মত বরফ পড়েছেরাস্তাঘাট পিছলকেউ যেন বিনা প্রয়ােজনে বাইরে না যায়হাইওয়ে আই নাইন্টি বন্ধবড়ই ফুর্তির সময় এখনশুরু হবে ব্লিজার্ড পার্টিউপকরণ সামান্য বিয়ার, বাদাম ভাজা এবং চড়া মিউজিকবৎসরের প্রথম ব্লিজার্ডকে স্বাগত জানানাের এই হচ্ছে ফার্গোর সনাতন পদ্ধতি। 

আনিস মােটা একটি কম্বল গায়ে জড়িয়ে সােফায় আরাম করে বসলাে ঘরে একটি ফায়ার প্লেস আছেফায়ার প্রেসে আগুন জ্বালানাের কায়দা কানুন তার ভাল জানা নেইচিমনি পরিষ্কার আছে কিনা কে জানেএর চেয়ে কম্বল জড়িয়ে থাকাই ভাল

 

Read more

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-১৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *