কিছুদিন আগেই পুলিশ এসে ছ‘নম্বর ঘর থেকে একটি লােককে ধরে নিয়ে গেল। এ জায়গা ছেড়ে কোথাও যেতে পারলে হাঁপ ছেড়ে বাঁচা যায়। কিন্তু যাবার উপায় নেই। এরচে‘ সস্তায় ফার্গোতে অ্যাপার্টমেন্ট পাওয়া যাবে না। টম নিজেও অনেক খোঁজাখুঁজি করেছে। কিন্তু ওর হাত একেবারেই খালি। অবস্থা এরকম চললে আন–এমপ্লয়মেন্ট বেনিফিটের জন্যে হাত পাততে হবে। টমের তাতে খুবই আপত্তি।
আমি কি ভিখিরি যে আন–এমপ্লয়মেন্ট নেব ? যখন কিছুই থাকবে না তখন কী করবে? তখন অন্য কোথাও যাব। এই নিয়ে তােমাকে ভাবতে হবে না।
কোনাে কাজ টাজ করে টমকে সাহায্য করার ইচ্ছা হয় রুনকির কিন্তু শীতের সময়টায় কাজ পাওয়া খুব মুশকিল। একটি কাজ পাওয়া গিয়েছিল দক্ষিণ ফার্গোতে। গাড়ি ছাড়া এতদুর যাওয়ার কোনােই উপায় নেই। বাস ঐ লাইনে যায় না। টমের গাড়িও নেই। দিন রাত ঘরেই বসে থাকতে হয় রুনকির। ইনিভার্সিটির ক্লাশ বাদ দিতে হয়েছে। উইন্টারকোয়ার্টারে নাম রেজিস্ট্রি করা হয় নি। ধারে সাতশ‘ ডলার যােগাড় করা গেল না।
টম কাজের খোঁজে সারাদিন ঘুরাঘুরি করে। রুনকি ঘরেই থাকে। ভাল লাগে না। টম সেদিন বললাে, তুমি বাবা–মার কাছে ফিরে যাও রুনকি।
কেন ? তােমার এখানে আর মন লাগছে না। আমি কি বলেছি মন লাগছে না ?
বলতে লজ্জা লাগছে বলে বলছ না। বাবা–মা‘র কাছে ফিরে যেতেও তােমার লজ্জা লাগছে। লজ্জার কিছু নেই রুনকি।
তুমি বড় বাজে কথা বল টম।।
টম হেসে বলেছে, এইটি তুমি ভুল বললে রুনকি। বাজে কথা আমি কখনাে বলি না। তােমার মধ্যে দ্বিধা দেখতে পাচ্ছি বলেই বলছি।
সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৯
তােমার কি ধারণা আমি আর তােমাকে ভালােবাসি না ? সে কথা আমি বলি নি রুন।। তুমি কি আমাকে ভালােবাস? তুমি খুব চমক্কার একটি মেয়ে। তােমাকে যে কেউ ভালােবাসবে। তুমি কিন্তু আমার কথার জবাব দাও নি। আমি তােমাকে খুবই ভালােবাসি রুমকি। যদি সত্যি ভালােবাস তাহলে প্লিজ চল অন্য কোথাও যাই। আর কয়েকটা দিন, প্রকৃতির কাছে শহরের পরাজয়ের ছবিটা শেষ করেই রওনা হব।
রুনকির এখন মাঝে মাঝে ইচ্ছা করে মা‘র সঙ্গে গিয়ে কথা বলে কিন্তু সাহস হয় না। তার দিকে তাকিয়েই মা নিশ্চয়ই বুঝে ফেলবেন ব্যাপারটা। মায়েরা অনেক কিছু বুঝতে পারে।
সফিক এসেছিল সেদিন, সে শুধু বললাে, বাহ্ স্বাস্থ্য ভাল হয়েছে তােমার রুনকি।। রুনকি একবার ভাবলাে সফিককে বলবে ব্যাপারটা ? কিন্তু বলতে বলতেও সামলে
গেল। টমকে আগে জানানাে উচিত। টমের আগে অন্য কারাের জানা ঠিক নয়।
সফিক আসলেই অনেক খবর পাওয়া যায়। সমস্তই বাংলাদেশের খবর ।
বুঝলে রুনকি, জিয়াউর রহমান সাহেবের নাম হয়েছে এখন ‘জিয়াউর রহমান খাল কাটি‘। শুধুই খাল কাটছে।
জিয়াউর রহমান কে ? মাই গড়। আমাদের প্রেসিডেন্ট। ফেরেশতা আদমি। তাই নাকি ! বেচারার একটা হাফ শার্ট আর দুটো ট্রাউজার আর কিছুই নাই। কী যে তুমি বল সফিক ভাই ।
এইতাে বিশ্বাস হলাে না। মিথ্যা বলব কেন খামাখা। একটা পয়সা বেতন নেয় না গভর্নমেন্টের কাছ থেকে।
বেতন না নিলে চল কী করে?
চলে আর কোথায় ?
সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৯
কিছুই চলে না। দেশের জন্য লােকটার জান। নিজের দিকে তাকাবার সময় আছে ?
সফিক এলে রুনকি কিছুতেই যেতে দেয় না। বাংলাদেশী রান্না রাঁধতে চেষ্টা করে। ভাত রান্না হয় সেদিন।
রান্না কেমন হয়েছে সফিক ভাই ? মা’র মত হয়েছে ? চমৎকার। ফাস্ট ক্লাস। ভাতটা বেশি নরম হয়ে গেছে না ?
নরমই আমার কাছে ভাল লাগে। চাবানাের দরকার হয় না। মুখে ফেললেই হড় হড় করে নেমে যায়।
চাকরি পেয়েছেী সফিক ভাই ? না জোসেফাইনকে খুব তেলাচ্ছি, কাজ হচ্ছে না। অন্য কোথাও চেষ্টা কর। গ্রিন কার্ড নেই কাজ দেবে কে আমাকে? গভীর সমুদ্র। সেবার যে বলেছিলে ফার্মেসি ডিপার্টমেন্টে একটা কাজ পাবে ?
সম্ভাবনা চল্লিশ পারসেন্ট। বাঁদরের দেখাশােনা। খাচা পরিষ্কার রাখা। ওদের ব্যালেন্সড ডায়েট দেয়া । ডঃ লুইসের হাতেই সব, দেখি ব্যাটাকে ভজানাে যায় কিনা। শালার দয়া মায়া কিছুই নাই শরীরে। দুঃখের কথা বলেও লাভ হয় না।
পরাজিত শহরের ছবি টমের আঁকা হলাে না। মন্টানার ছােট্ট একটি শহরে কাজ পাওয়া গেল। এক ভদ্রলােক পাহাড়ের ওপর চমক্কার একটি শীতাবাস বানিয়েছেন তার লবির ডেকোরেশন। কাজটি লােভনীয়। কারণ যতদিন কাজ শেষ না হচ্ছে ততদিন শীতাবাসে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থা। পাশেই কি করবার স্পট। জমে যাওয়া একটি হ্রদ আছে। সেখানে উইন্টার ফিসিং–এর ব্যবস্থা আছে। বরফ খুঁড়ে ছিপ ফেললেই প্রকাণ্ড সব কার্প ধরা পড়ে। টম রাজি হয়ে গেল। পরাজিত শহরের ছবি পরেও আঁকা যাবে।
সবাই গেছে বনে -পর্ব-১৯
রুকিকে অবাক করে দিয়ে এক সন্ধ্যায় শ্যাম্পেনের একটি বােতল নিয়ে আসলাে, এসাে কুনকি সেলিব্রেট করা যাক।
কীসের সেলিব্রেশন ? তােমার বাচ্চা আসছে সেই সেলিব্রেশন। রুনকি দীর্ঘ সময় কোনাে কথা বলতে পারলাে না। তুমি কখন জানলে ? সেটা কি খুব ইম্পর্টেন্ট ?
শ্যাম্পেনে মুখ খােলা মাত্রই কর্কটি বহুদূর ছুটে গেল। টম হেসে বললাে, আমার বাচ্চা খুব ভাগ্যবান হবে। আর শােন রুনকি আমার মনে হয় আমাদের বিয়ে করা উচিত। ম্যারেজ লাইসেন্স এখান থেকেই নিয়ে যাব। হানিমুন হবে মন্টানায় ঠিক আছে ? না কি তুমি আন মেরিড হতে চাও? | রুনকি জবাব দিল না। টম বললাে, তােমাকে বিয়ের পর আমার বাবা–মার কাছে নিয়ে যাব। সিয়াটলে থাকেন তারা। তাদের ছােট একটা ফার্ম আছে তােমার ভাল লাগবে। তবে যেতে হবে গরমের সময়। তখন ওয়েদার ভাল থাকে। ও কী রুনকি কাদছাে কেন ?
মন্টানায় যাবার আগে রুনকি দেখা করতে গেল মা’র সঙ্গে। রাহেলা দরজা খুলে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে রইলেন।
কী মা ঘরে ঢুকতে দেবে না ? রাহেলা কথা বললেন না দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ালেন। বাবা কোথায় ? মেনিয়াপলিস গিয়েছে। কবে ফিরবে ? সােমবার ।
ও তাহলে আর দেখা হচ্ছে না। আমরা মন্টানা চলে যাচ্ছি মা।
Read more