সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২০)

রাহেলা চুপ করে রইলেনরুনকি ওভারকোট খুলতেই শান্ত স্বরে বললেন, মা হচ্ছে তাহলেসবাই গেছে বনে হ্যা হচ্ছিতােমার এমন মুখ কালাে করবার দরকার নেই মাআমরা বিয়ে করছিম্যারেজ লাইসেন্স যােগাড় হয়েছেবিয়েতে আসবে না জানি তবু কার্ড পাঠাব। 

রুনকি টাওয়েল দিয়ে মাথার চুল মুছলােহালকা গলায় বললাে, কফি খাওয়াবে যা ঠাণ্ডা বাইরে। 

 রাহেলা কফির পট বসালেনরান্নাঘর থেকেই থেমে থেমে বললেন, তােমার পড়াশােনার পাঠ তাহলে চুকেছে। 

আবার শুরু করবােতাছাড়া... তাছাড়া কী

পুঁথিগত পড়াশােনার তেমন দাম নেই মাপৃথিবীতে যত টেলেন্টেড লােক জন্মেছে তাদের কারাের ইউনিভার্সিটির ডিগ্রি ছিল না। 

তা ছিল না কিন্তু ওদের টেলেন্ট ছিলতােমার তা নেইরুনকি হাসলােকথার উত্তর 

দিয়ে কফির পেয়ালা হাতে নিয়ে চলে গেল দোতলায় তার নিজের ঘরেঘরটি রাহেলা চমৎকার করে সাজিয়ে রেখেছেনদেখেই মনে হবে এই বাড়ির মেয়েটি হয়ত কলেজে গিয়েছে ফিরে আসবে এক্ষুণি। 

রুনকি দেখলাে তার ব্যবহারি কাপড়গুলি পর্যন্ত ইস্ত্রি করে রাখা হয়েছেবার্বি ডল দুটি মা নিচ থেকে নিয়ে এসে তার ঘরে রেখেছেনদেয়ালে রুনকির ছােটবেলার একটি ছবি ববল গাম দিয়ে বল বানানাের চেষ্টা করছে রুনকি। 

রাহেলা শুনলেন উপরে গান বাজছেকিংস্টোন ট্রায়াের বিখ্যাত গান

We had joy we had fun We had seasons in the sun But the hills we will climb 

Where the seasons out of time তিনি নিঃশব্দে উপরে উঠে আসলেনরুনকি কার্পেটে পা ছড়িয়ে চুপচাপ বসে আছেক্লান্ত বিষন্ন একটি ভঙ্গিকঁদছে নাকি? রাহেলা বললেন, রুনকি তুমি কি দুপুর খাবে এখানে

সবাই গেছে বনে-পর্ব-২০

রুনকি চোখ মুছে ধরা গলায় বললাে, না দুপুরে আমরা রওয়ানা হবটম এসে এখান থেকে তুলে নেবে আমাকে। 

তুমি যদি তােমার কোনাে জিনিসপত্র নিতে চাও নিতে পার| মা, আমি কিছুই নিতে চাই নারুনকি চোখ মুছে বললাে, তুমি কি আমার বাচ্চাটির জন্যে দুটি নাম দেবে ? একটি ছেলের নাম একটি মেয়ের নাম । 

রাহেলা থেমে থেমে বললেন, আমার নাম তােমাদের পছন্দ হবে না রুনকিতােমরা নিজেরা নাম বেছে নাও। 

কেন তুমি এত রেগে আছ মা? তুমি কি বুঝতে পারছ না আমি অনেক দূরে চলে যাচ্ছি ? দূরে গেছ অনেক আগেইনতুন করে বােঝাবুঝির কিছু নেই। 

রুনকি বেশ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললাে, যাবার আগে পুরনাে দিনের মত তুমি কি আমাকে একটি চুমু খাবে মা? প্লিজ

নিশানাথ বাবু খুব সকালে ঘর ছেড়ে বেরিয়েছেন| উদ্দেশ্য আশেপাশের গ্যারেজসেলগুলি খুঁজে দেখাপ্রিউইন্টার গ্যারেজ সেল শুরু হয়েছেবুড়াে বুড়ির দল অপ্রয়ােজনীয় জিনিসপত্র গাড়ির গ্যারেজে সাজিয়ে বসে আছেমূল্য নামমাত্রনিশানাথ বাবু সকাল থেকেই সব দেখে বেড়াচ্ছেনগ্যারেজ সেলে ঘুরে বেড়ানাে তাঁর বাতিকের মতযে সব জিনিস তিনি গত চৌদ্দ বছরে কিনেছেন তার মধ্যে একটি প্রকাণ্ড পিয়ানাে পর্যন্ত আছেএম স্ট্রিটের দোতলা বাড়ি গ্যারেজসেলে কেনা জঞ্জাল দিয়ে তিনি ভর্তি করে ফেলেছেননতুন কিছু কিনে রাখবার জায়গা নেই তবু কিনছেন। 

 আজ তার একটি ফুলদানি পছন্দ হলজার্মান সিলভারের ফুলদানিখুব সুন্দর কাজদাম লেখা আছে এক ডলার। 

এরচেকমে দিতে পার ? এক ডলার বড় বেশি মনে হচ্ছে। 

যে বুড়াে জিনিসপত্র সাজিয়ে বসে আছে সে অবাক হয়ে বললাে, এক ডলার কি যথেষ্ট কম নয় ডঃ নিশানাথ

নিশানাথ বাবু দেখলেন বুড়াে হচ্ছে স্ট্যাটিস্টিকসের স্ট্যানলিমাংকি ক্যাপে সমস্ত মুখ ঢেকে রেখেছে বলে চেনা যাচ্ছে না। 

গুড মর্নিং স্ট্যানলি। 

সবাই গেছে বনে-পর্ব-২০

গুড মর্নিংকফি খাবে ? গ্যারাজ সেল উপলক্ষে কফি পাওয়া যাচ্ছেপঞ্চাশ সেন্ট চার্জ, ফ্রি রিফিলনিশানাথ বাবু পঞ্চাশ সেন্ট দিয়ে এক পেয়ালা কফি নিলেন। 

বিক্রি টিক্রি কেমন ? মন্দ নয় সাড়ে নডলার বিক্রি করেছিবস তুমি চেয়ারটাতে বস। 

নিশানাথ বাবু অবাক হয়ে স্ট্যানলির দিকে তাকালেনএই লােকটি মাসে চার হাজার ডলারের মত পায়দুপুরের একটা সাদাসিধা লাঞ্চের জন্যেই খরচ করে ত্রিশ চল্লিশ ডলারঅথচ সে বাড়ির যত সব জঞ্জাল সাজিয়ে সাড়ে নডলার বিক্রি করে কী খুশি । 

স্ট্যানলি ভারি স্বরে বললাে, ওল্ড হােমে যাবার প্রস্তুতি বুঝলেজিনিসপত্র সব বিক্রি টিক্রি করে হাত খালি করছি। 

প্রস্তুতি কি একটু সকাল সকাল নিয়ে ফেলছাে না

 

Read more

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *