তখনই চোখে পড়লাে রাহেলা দোতলার বারান্দায় একটা সাদা চাদর গায়ে দিয়ে দাড়িয়ে আছে। ঠাণ্ডায় এমন পাতলা একটা চাদর গায়ে দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে ? নিউমােনিয়া বাঁধবে নাকি? রাহেলা উপর থেকে ডাকলেন,
চা খেয়ে যাও। চা খেয়ে আমিন সাহেবের মনে হল তার শরীর ভাল লাগছে না। নিঃশ্বাস নিতে একটু যেন কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু তিনি কিছুই বললেন না। রাহেলা বললেন, আজকের এই দিনটি একটি
বিশেষ দিন। তােমার মনে আছে ?
আজ রুনকির জন্মদিন।
আমিন সাহেব বড়ই অবাক হলেন। এতবড় একটা ব্যাপার তিনি ভুলেই বসে আছেন। উফ কী ঝামেলাই না হয়েছিল। বরফে চারদিক ঢাকা। বেশির ভাগ রাস্তাঘাটই বন্ধ। এর মধ্যে রাহেলার ব্যথা শুরু হল। অ্যাম্বুলেন্সে খবর দিলেই হতাে তা না তিনি গাড়ি নিয়ে বের হলেন। ফিফটিনথ স্ট্রিট থেকে উঠিয়ে নিলেন নিশানাথ বাবুকে। কী দূরবস্থা ভদ্রলােকের। ব্যাপার ট্যাপার দেখে এই ঠাণ্ডাতেও তার কপাল দিয়ে টপটপ করে ঘাম পড়ছে।
রাহেলা একবার বললেন আমার মনে হচ্ছে গাড়িতেই কিছু একটা হয়ে যাবে। নিশানাথ বাবু বললেন— মা কালীর নাম নেন, চেঁচামেচি করবেন না। রাহেলা ধমকে উঠলেন মা কালীর নাম নেব কেন, মা কালী আমার কে? এই সময় গাড়ি স্কিড করে খাদে পড়ে গেল। উহ্ কী ভয়াবহ সময়ই না গিয়েছে।
আমিন সাহেব বললেন, আমাকে আরেক কাপ চা দাও। তােমার কি শরীর খারাপ লাগছে?
সবাই গেছে বনে -পর্ব-২৩
তুমি ঘামছে। না শরীর ঠিক আছে।
রাহেলা বললেন, আমি রুনকির জন্মদিন উপলক্ষে ছছাট্ট একটা কেকের অর্ডার দিতে চাই।
আমিন সাহেব অবাক হয়ে তাকালেন। রাহেলা চোখ নিচু করে বললেন, আমি, তুমি আর নিশানাথ বাবু।
বেশতাে। রাহেলা মৃদু স্বরে বললেন, রুনকির প্রতি আমি অবিচার করেছি।
আমিন সাহেব জবাব দিলেন না। রাহেলা বললেন, নিজেদের মত ওকে আমরা বড় করেছি। ক্যাম্পিং এ যেতে দেই নি। ডেট করতে দেই নি।
বাদ দাও ওসব।
আমেরিকায় থাকব অথচ বাংলাদেশী সাজব সেটা হয় নাকি বল ? | আমিন সাহেব জবাব দিলেন না। রাহেলা বললেন, কাল রাত্রে আমি রুনকিকে স্বপ্নে দেখেছি। যেন ছােট খালার বাসায় ওকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছি। ছােট খালা বলছেন— রাহেলা তাের মেয়েতাে পরিষ্কার বাংলা বলছে। আর তুই বললি ও বাংলা জানে না। ছােট খালাকে মনে আছে তােমার ?
আমাদের বিয়েতে তােমাকে মুক্তা বসানাে আংটি দিয়েছিলেন। সেই আংটি তােমার হাতে বড় হয়েছে শুনে ছােট খালা দুঃখে কেঁদে ফেলেছিলেন।
মনে পড়ছে। খুব মােটা–সােটা মহিলা তাই না ?
হ্যা। কী যে ভালােবাসতেন আমাকে। এখন তার শুনেছি খুব দুঃসময়! ছেলেদের সংসারে থাকেন। ছেলেরা দু‘চক্ষে দেখতে পারে না। অসুখ বিসুখে চিকিৎসা করায় না। আমি
ছােট খালার নামে কিছু টাকা পাঠাতে চাই।
বেশতাে। ভাল এমাউন্টের টাকা। ছােট খালা নিশ্চয়ই খুব খুশি হবেন।
তা হবেন। আমি পাঁচশ‘ ডলার পাঠাতে চাই। আমিন সাহেব বললেন, আমি একটা ব্যাংক ড্রাফট করে আনব। রাহেলার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলাে। কাঁদছাে কেন ? কই কাঁদছি না তাে। রাহেলা মৃদু স্বরে বললাে, তােমাকে একটা কথা বলিনি। গত মাসে রুনকি এসেছিল।
সবাই গেছে বনে -পর্ব-২৩
আমিন সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন। রাহেলা বললাে, রুনকির বাচ্চা হবে । ও বলেছে তােমাকে ? হ্যা। টম কি আছে এখনাে তার সঙ্গে ? আছে। রুনকি কী জন্যে এসেছিল ? ওর বাচ্চার জন্যে দুটি নাম চায়। একটি ছেলের নাম অন্যটি মেয়ের। আমিন সাহেব দীর্ঘ সময় চুপ থেকে বললেন, মেয়ে হলে ওর নাম রাখব বিপাশা। বিপাশা?
হ্যা, পাঞ্জাবের একটা নদীর নাম। পাঞ্জাবে ওরা বলে বিয়াস। তােমার কি শরীর খারাপ লাগছে, তুমি খুব ঘামছাে । আমিন সাহেব ক্লান্ত স্বরে বললেন, আমার শরীরটা খারাপ লাগছে।
গাড়ি বের করার দরকার নেই। তুমি শুয়ে থাক। আর নিশানাথ বাবুকে টেলিফোন করে দাও সন্ধ্যাবেলা যেন আসেন আমাদের এখানে পাবেন। | আমিন সাহেব নিজের ঘরে ফিরে গেলেন। তার শরীর বেশ খারাপ লাগছে। এই বয়সে বরফ না কাটাই ভাল। বড় বেশি চাপ পড়ে। শরীর দুর্বল হয়েছে এখন আর আগের মত চাপ সহ্য করতে পারেন না। পরীক্ষা করলে হয়ত দেখা যাবে ব্লাডে সুগার আছে।
নিশানাথ বাবুকে টেলিফোন করবার আগে কী মনে করে যেন দরজা বন্ধ করে দিলেন। নিশানাথ বাবু ঘরেই ছিলেন ।
নিশানাথ বাবু আমি আমিন।
Read more