সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৩)

তখনই চোখে পড়লাে রাহেলা দোতলার বারান্দায় একটা সাদা চাদর গায়ে দিয়ে দাড়িয়ে আছেঠাণ্ডায় এমন পাতলা একটা চাদর গায়ে দিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে ? নিউমােনিয়া বাঁধবে নাকি? রাহেলা উপর থেকে ডাকলেন

সবাই গেছে বনেচা খেয়ে যাও। চা খেয়ে আমিন সাহেবের মনে হল তার শরীর ভাল লাগছে নানিঃশ্বাস নিতে একটু যেন কষ্ট হচ্ছেকিন্তু তিনি কিছুই বললেন নারাহেলা বললেন, আজকের এই দিনটি একটি 

বিশেষ দিনতােমার মনে আছে

আজ রুনকির জন্মদিন। 

আমিন সাহেব বড়ই অবাক হলেনএতবড় একটা ব্যাপার তিনি ভুলেই বসে আছেনউফ কী ঝামেলাই না হয়েছিলবরফে চারদিক ঢাকাবেশির ভাগ রাস্তাঘাটই বন্ধএর মধ্যে রাহেলার ব্যথা শুরু হলঅ্যাম্বুলেন্সে খবর দিলেই হতাে তা না তিনি গাড়ি নিয়ে বের হলেনফিফটিনথ স্ট্রিট থেকে উঠিয়ে নিলেন নিশানাথ বাবুকেকী দূরবস্থা ভদ্রলােকেরব্যাপার ট্যাপার দেখে এই ঠাণ্ডাতেও তার কপাল দিয়ে টপটপ করে ঘাম পড়ছে।

রাহেলা একবার বললেন আমার মনে হচ্ছে গাড়িতেই কিছু একটা হয়ে যাবেনিশানাথ বাবু বললেনমা কালীর নাম নেন, চেঁচামেচি করবেন নারাহেলা ধমকে উঠলেন মা কালীর নাম নেব কেন, মা কালী আমার কে? এই সময় গাড়ি স্কিড করে খাদে পড়ে গেলউহ্ কী ভয়াবহ সময়ই না গিয়েছে। 

আমিন সাহেব বললেন, আমাকে আরেক কাপ চা দাওতােমার কি শরীর খারাপ লাগছে?

সবাই গেছে বনে -পর্ব-২৩

তুমি ঘামছেনা শরীর ঠিক আছে। 

রাহেলা বললেন, আমি রুনকির জন্মদিন উপলক্ষে ছছাট্ট একটা কেকের অর্ডার দিতে চাই। 

আমিন সাহেব অবাক হয়ে তাকালেনরাহেলা চোখ নিচু করে বললেন, আমি, তুমি আর নিশানাথ বাবু। 

বেশতােরাহেলা মৃদু স্বরে বললেন, রুনকির প্রতি আমি অবিচার করেছি। 

আমিন সাহেব জবাব দিলেন নারাহেলা বললেন, নিজেদের মত ওকে আমরা বড় করেছিক্যাম্পিং যেতে দেই নিডেট করতে দেই নি। 

বাদ দাও ওসব। 

আমেরিকায় থাকব অথচ বাংলাদেশী সাজব সেটা হয় নাকি বল ? | আমিন সাহেব জবাব দিলেন নারাহেলা বললেন, কাল রাত্রে আমি রুনকিকে স্বপ্নে দেখেছিযেন ছােট খালার বাসায় ওকে নিয়ে বেড়াতে গিয়েছিছােট খালা বলছেনরাহেলা তাের মেয়েতাে পরিষ্কার বাংলা বলছেআর তুই বললি বাংলা জানে নাছােট খালাকে মনে আছে তােমার

আমাদের বিয়েতে তােমাকে মুক্তা বসানাে আংটি দিয়েছিলেনসেই আংটি তােমার হাতে বড় হয়েছে শুনে ছােট খালা দুঃখে কেঁদে ফেলেছিলেন। 

মনে পড়ছে। খুব মােটাসােটা মহিলা তাই না

হ্যাকী যে ভালােবাসতেন আমাকেএখন তার শুনেছি খুব দুঃসময়! ছেলেদের সংসারে থাকেনছেলেরা দুচক্ষে দেখতে পারে নাঅসুখ বিসুখে চিকিৎসা করায় নাআমি 

ছােট খালার নামে কিছু টাকা পাঠাতে চাই। 

বেশতােভাল এমাউন্টের টাকাছােট খালা নিশ্চয়ই খুব খুশি হবেন। 

তা হবেনআমি পাঁচশডলার পাঠাতে চাইআমিন সাহেব বললেন, আমি একটা ব্যাংক ড্রাফট করে আনবরাহেলার চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলােকাঁদছাে কেন ? কই কাঁদছি না তােরাহেলা মৃদু স্বরে বললাে, তােমাকে একটা কথা বলিনিগত মাসে রুনকি এসেছিল

সবাই গেছে বনে -পর্ব-২৩

আমিন সাহেব তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেনরাহেলা বললাে, রুনকির বাচ্চা হবে বলেছে তােমাকে ? হ্যাটম কি আছে এখনাে তার সঙ্গে ? আছেরুনকি কী জন্যে এসেছিল ? ওর বাচ্চার জন্যে দুটি নাম চায়একটি ছেলের নাম অন্যটি মেয়েরআমিন সাহেব দীর্ঘ সময় চুপ থেকে বললেন, মেয়ে হলে ওর নাম রাখব বিপাশাবিপাশা

হ্যা, পাঞ্জাবের একটা নদীর নামপাঞ্জাবে ওরা বলে বিয়াসতােমার কি শরীর খারাপ লাগছে, তুমি খুব ঘামছাে আমিন সাহেব ক্লান্ত স্বরে বললেন, আমার শরীরটা খারাপ লাগছে। 

গাড়ি বের করার দরকার নেইতুমি শুয়ে থাকআর নিশানাথ বাবুকে টেলিফোন করে দাও সন্ধ্যাবেলা যেন আসেন আমাদের এখানে পাবেন| আমিন সাহেব নিজের ঘরে ফিরে গেলেনতার শরীর বেশ খারাপ লাগছেএই বয়সে বরফ না কাটাই ভালবড় বেশি চাপ পড়েশরীর দুর্বল হয়েছে এখন আর আগের মত চাপ সহ্য করতে পারেন নাপরীক্ষা করলে হয়ত দেখা যাবে ব্লাডে সুগার আছে। 

নিশানাথ বাবুকে টেলিফোন করবার আগে কী মনে করে যেন দরজা বন্ধ করে দিলেননিশানাথ বাবু ঘরেই ছিলেন । 

নিশানাথ বাবু আমি আমিন

 

Read more

সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(পর্ব-২৪)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *