সবাই গেছে বনে- হুমায়ূন আহমেদ -(শেষ-পর্ব)

চেস ম্যানহাটনে যাবার পথে ডেনিস বেয়ার শান্ত স্বরে বললাে, মিস মালিশা আমি বুঝতে পারছি আপনার খুব বিরক্তি লাগছেকিন্তু উপায় নেই। 

সবাই গেছে বনেচেস ম্যানহাটনে আজ না গেলে হয় না ? নাআমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি। 

মালিশা চুপ করে গেলজিম বললাে, চমক্কার ওয়েদার তাই না মিস্টার বেয়ার ? ডেনিস বেয়ার সে কথার জবাব না দিয়ে মালিশার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বললাে, আমার মনে হয়, আইবিএমতােমার যে শেয়ার আছে সেগুলি বিক্রি করে ফেলা উচিতআইবিএম ফল করতে শুরু করেছেতুমি কি ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল পড়

এখন থেকে নিয়মিত পড়বেআমি একজন অ্যানালিস্টও ঠিক করে রেখেছিসে সপ্তাহে একদিন এসে তােমাকে ওয়াল স্ট্রিটের ব্যাপারগুলি এক্সপ্লেইন করবে। 

মালিশা শুকনাে গলায় বললাে, গাড়িটা একটু রাখতে বল, আমার বমি আসছেগাড়ি থামাবার আগেই মুখ ভর্তি করে বমি করলাে মালিশা আই অ্যাম সরিসরি হবার কিছুই নেইএখন কি ভালাে লাগছে ? নাহ্ বড় খারাপ লাগছেপ্লিজ আমাকে হােটেলে নিয়ে চল । 

ইন্টারস্টেটে আসা মাত্র হাইওয়ে পেট্রল পুলিশ গাড়ি থামালোফার্গো মুরহেড এলাকায় তুষার ঝড় হবার সম্ভাবনা প্রচুর বরফ পড়ছেহাইওয়ে ক্লোজ করে দেয়া হয়েছেটম নেমে এলাে গাড়ি থেকে। 

সবাই গেছে বনে-শেষ-পর্ব

অফিসার, আমাকে যেতেই হবেএই মেয়েটির বাবা মারা যাচ্ছেএই সময় মেয়েটির তার বাবার কাছে থাকা দরকার। 

রাস্তা অত্যন্ত খারাপঅনেক গাড়ি স্কিড করে পথের পাশে পড়ে আছে। 

আমি খুব কেয়ারফুল ড্রাইভারবিশ মাইলের উপর স্পিড তুলবাে না, প্লিজ অফিসার প্লিজ। 

তুমি বুঝতে পারছ না দারুণ রিস্কি ব্যাপার। 

অফিসার প্লিজ! এই মেয়েটিকে আমি যে করেই হােক তার বাবার কাছে নিয়ে যেতে চাই। 

গাড়ি চলছে খুব ধীর গতিতে। টম সমস্ত ইন্দ্রিয় সজাগ করে স্টিয়ারিং হুইলের উপর ঝুঁকে আছেসে এক সময় শান্ত স্বরে বললাে, ভাল মত কম্বল জড়িয়ে নাও রুনহিটিং কাজ করছে না। 

রুনকি পায়ের উপর কম্বল টেনে দিলকোনাে কথা বললাে নাটম নিচু ভলমে একটি ক্যাসেট চালু করেছেরাতের বেলা গাড়ি চালাতে হলে ঘুম তাড়াবার জন্যে এটা করতে হয়মিষ্টি সুরে পােলকা বাজছেরুনকি জানালা দিয়ে তাকিয়ে আছে বাইরেমাইলের পর মাইল ফাঁকা মাঠবরফের চাদরে ঢাকা পড়েছে সবকী ভয়ংকর সুন্দর

আনিস এসেছে একা একা । 

তুষারপাত হচ্ছেরাস্তা জনমানবশূন্যথার্মোমিটারের পারা নিচে নামতে শুরু করেছেস্ট্রিট লাইটের আলাে অস্পষ্ট হয়ে আসছেকে জানে তুষার ঝড় হবে কি নাউত্তর দিক থেকে বাতাস দিচ্ছেলক্ষণ মােটেই ভাল নয়আনিস এমিলি জোহানের ঘরের কড়া নাড়লাে। 

এমিলি জোহান তুমি কি আমাকে চিনতে পারছাে ? মেমােরিয়াল ইউনিয়নে তােমার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিলাে। 

হা চিনতে পারছিখুব কম মানুষের সঙ্গে আজকাল আমার দেখা হয়আমি সবাইকে মনে রাখি। 

সবাই গেছে বনে-শেষ-পর্ব

আমি একটা মেয়ের খোঁজ করছিলাম মালিশা গিলবার্টওকে আমার বিশেষ প্রয়ােজন। 

এমিলি জোহান শান্ত স্বরে বললাে, তুমি কি ওর জন্যে গােলাপ ফুল এনেছিলেল্যান্ড লেডি আমাকে বলেছিল। 

আনিস জবাব দিল নাএমিলি জোহান থেমে থেমে বললেন, আমরা আমেরিকানরা খুব অদ্ভুত জাতযখন কোনাে কিছু চাই মন প্রাণ দিয়ে চাইযখন সেই জিনিসটি পাওয়া যায় তখন জীবন অর্থহীন হয়ে যায়। 

আনিস কিছু বুঝতে পারলাে নাএমিলি জোহান থেমে থেমে বললেন, মালিশা গিলবার্ট ঘুমের অসুধ খেয়ে ঘুমিয়েছেদীর্ঘ বিরতিহীন ঘুমআনিস, তুমি কি আমার ঘরে এসে বসবে? নক্ষত্র নিয়ে আমি একটি চমৎকার কবিতা লিখেছি। 

আনিস বেরিয়ে আসলােবরফে বরফে চারদিক ঢাকা পড়ে গেছেএকটি পরাজিত শহর। 

তুষার ঝড় হবেনিশ্চয়ই তুষার ঝড় হবে  আনিস পায়ে হেঁটে বাড়ির পথ ধরলােভূতে পাওয়া শহরের জনশূন্য পথ ঘাটকী অদ্ভুত লাগে হাঁটতেব্রডওয়ের কাছে ছাতা মাথায় একটি রােগা মেয়েকে দেখা গেলসিগারেটের আলােয় তার ক্লান্ত মুখ চোখে ভাসলাে ক্ষণিকের জন্যেমেয়েটি ক্ষীণস্বরে বললাে, হ্যালাে মিস্টার, কী নেস্টি ওয়েদার। 

আনিস জবাব দিল নামেয়েটি থেমে থেমে বললাে, আজ রাতের জন্যে তােমার কোনাে ডেট লাগবে

সবাই গেছে বনে-শেষ-পর্ব

নাহু ধন্যবাদমেয়েটি এগিয়ে এলাে তবুমুখের সিগারেট দূরে ছুঁড়ে ফেলে সরু গলায় বললাে, তুমি কি আমার জন্যে এক মগ বিয়ার কিনবে ? কী দুঃসহ শীত। 

একদিন এই দুঃসহ শীত শেষ হবেআসবে রােদ উজ্জ্বল সামার ছুটি কাটানাের জন্যে আমেরিকানরা গাড়ি নিয়ে নেমে আসবে হাইওয়েতেমন্টানা, সল্ট লেক, ইয়েলাে স্টোন পার্ক কত কিছু আছে দেখবারসামারের রাতগুলি এরা বনের ধারে তাঁবু খাটিয়ে কাটাবেপ্রচণ্ড জ্যোৎস্না হবে রাতেযুবক যুবতীদের বড় বনে যেতে ইচ্ছা করবে। 

সবাই গেছে বনের সমস্ত চরিত্র কাল্পনিকপাত্রপাত্রীদের কাউকেই আমি কোনােদিন দেখি নি

 

Read more

রূপালী দ্বীপ-হুমায়ূন আহমেদ-(পর্ব-১)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *