বেঁটে এ ওয়্যারলেস সেটের নব ঘোরাচ্ছে। কমুনিকেশন ফ্রিকোয়েন্সির নব ঘোরাচ্ছে, যদি কিছু ধরা পড়ে। কিছুই ধরা পড়ছে না। জেনারেল ডোফা এদের সঙ্গে যোগাযোগর প্রয়োজন এখনো বোধ করেন নি। তবে শিগগিরই হয়তো করবেন। জেনারেল ডোফা চেষ্টা করবেন তাদের ঘিরে ফেলতে। তাঁকে অতি দ্রুত সৈন্য সমাবেশ করতে হবে। প্যারাট্রুপার নামাতে হবে হয়তো।
ফোর্টনক এবং এই পরিত্যক্ত এয়ারপোর্ট ছাড়া প্যারাট্রুপার নামাবার জায়গা নেই। গাছপালায় চারদিক ঢাকা।ওয়্যারলেস সেট বিপ-বিপ করছে। ফকনার বলল, বেঁটে এ, কিছু আসছে? মনে হচ্ছে। সিগন্যাল ক্লিয়ার না। প্রচুর ব্যাকগ্রাউন্ড নয়েজ।চেষ্টা করে যাও।
এফ এম এ দেখবে কিছু পাওয়া যায় কি না? এল ইশারায় চুপ করতে বলল। সিগন্যাল পাওয়া যাচ্ছে।পরিষ্কার সিগন্যাল।হ্যালো হ্যালো…….ব্রিগেডিয়ার ক্রিন্তা। হ্যালো।অ্যালবোর্ট জিরান।মিশন ফোর্টনক? হ্যালো, ফোর্টনক? ফকনার এগিয়ে এল। ক্লান্ত গলায় বলল, ফকনার কথা বলছি–ব্রিগেডিয়ার ক্ৰিন্তা, সুপ্ৰভাত।
সুপ্রভাত কি না বোঝা যাচ্ছে না।…………..তোমাদের জন্যে তো সুপ্রভাত বটেই।……….ফকনার বিস্মিত ভঙ্গি করল, যেন খুবই অবাক হয়েছে।………………..আমি যা বলব তুমি তা করবে না?…………..আমরা কেউ করব না।
বহুবচনে কথা বলছ কেন? তুমি তোমার নিজের কথা বল। যা করতে বলব তা করবে না? না।খুবই ভালো কথা। সাধাসাধি আমার পছন্দ না। ভয় দেখিয়ে রাজি করানোতেও আমার বিশ্বাস নেই। আমি সহজ-সরল লোক। যেহেতু তুমি আমার কোনো কাজে আসছ না, কাজেই তোমাকে বাঁচিয়ে রাখার কোনো যুক্তি দেখছি না।
ফকনার ঠোঁটের সিগারেট খুঁড়ে ফেলে দুপা এগিয়ে খাপ থেকে পিস্তল টেনে বের করল। তার মুখের রেখা একটুও বদলাল না। ঠোঁটের ফাঁকে যে-হাসি লেগে ছিল, সেই হাসি লেগে রইল। পরপর দুবার গুলির শব্দ হল। শব্দ মেলাবার সঙ্গে-সঙ্গেই তার শান্ত গলা শোনা গেল, বেঁটে এল, ডেডবডি সরিয়ে নিয়ে যাও। আর এদের কফি দেওয়ার ব্যবস্থা কর।তোমরা যারা এখনো বেঁচে আছ, তাদের বলছি—কোনো রকম জোরজবরদস্তি নেই। আমার কথা যারা শুনতে চাও না, তাদের শুনতে হবে না। তবে যারা শুনবে তারা ভালোমতো শুনবে এইটুকু আশা করি।
মাওয়া ভাঙা-ভাঙা গলায় বলল, জেনারেল ডোফাকে কি বলতে হবে?………….বলছি। তার আগে কফিপর্ব শেষ হয়ে যাক।
নিশো একদৃষ্টে এদের দিকে তাকিয়ে আছেন। এত দূর থেকে কথাবার্তা তিনি কিছুই শুনতে পান নি। হত্যার দৃশ্যটি শুধু দেখেছেন। এত সহজে, এত শান্ত ভঙ্গিতে মানুষ খুন করা যায়, তা তাঁর কল্পনাতেও ছিল না। তিনি শব্দ করে বমি করলেন। তাঁর নাড়িতুড়ি যেন উঠে আসতে চাইছে। মনে-মনে বললেন, হে ঈশ্বর, এ কী দেখলাম। তাঁর মনেই রইল না যে তিনি ঈশ্বর বিশ্বাস করেন না। স্বৰ্গ-নরক বিশ্বাস করেন না।
জেনারেল ডোফা বিস্মিত গলায় বললেন, মাওয়া, তুমি যা বলছ তা কি সত্যি?…………হ্যাঁ, সত্যি।…………….ফকনার মারা পড়েছে?…………………….হ্যাঁ, পড়েছে।……………….আর নিশো? নিশোর কী অবস্থা?……………মারা গেছে স্যার।…………তোমার গলা এমন শুকনো শোনাচ্ছে কেন?………….আমি আহত। হাঁটুতে গুলি লেগেছে। হাতের আঙুল উড়ে গেছে।
শুনে অত্যন্ত দুঃখিত হলাম। তবে দেশের জন্যে সবাইকে কিছু-না-কিছু ত্যাগ করতে হয়। তুমি কয়েকটা আঙুল ত্যাগ করলে।জ্বি স্যার।আমাদের দিকের হতাহতের সংখ্যা কেমন? অনেক।তাতে কোন অসুবিধা নেই। নিহতদের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা হবে। বিরাট ক্ষতিপূরণ। তাদের সবাইকে জাতীয় বীর ঘোষণা করা হবে।ইনফ্যানট্রি লেফটেন্যান্ট নুখতা আপনার সঙ্গে কথা বলতে চায়। সে বীরের মতো যুদ্ধ করেছে।শুনে সুখী হলাম। শোন, নিশোর মৃতদেহ কি লুকানো হয়েছে? হ্যাঁ।
ভালো, খুব ভালো। অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ। দেশের সর্বোচ্চ সামরিক খেতাব তোমার জন্যে ব্যবস্থা হবে।আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ স্যার। আপনার পক্ষে কি এখানে আসা সম্ভব হবে? সৈন্যরা আপনাকে দেখতে পেলে অত্যন্ত আনন্দিত হবে। তারা বীরের মতো যুদ্ধ করেছে।আমি আসব। সৈন্যরা আমার সন্তানের মতো। আমি অবশ্যই আসব। সামরিক হেলিকপ্টারে করে আসব।কখন রওনা হবেন স্যার?
ধর দশ মিনিট। দশ মিনিটের মাথায় রওনা হচ্ছি।জেনারেল ডোফা রিসিভার নামিয়ে পাশে দাঁড়ানো মিলিটারি এ্যাটাচির চোখে চোখ রেখে হাসলেন। মুহূর্তের মধ্যেই হাসি সামলে নিয়ে মৃদু গলায় বললেন, মাওয়া মিথ্যা কথা বলছে। সাজানো কথা বলছে।মিলিটারি এ্যাটাচি অবাক হয়ে বলল, আমার কাছে কিন্তু স্যার সাজানো কথা বলে মনে হয় নি।
তোমার বুদ্ধি একটি গরিলার বুদ্ধির চেয়ে খুব বেশি নয় বলেই কিছু বুঝতে পারছ না। ও ধরা পড়েছে ফকনারের হাতে। ব্যাটা যা বলতে বলছে, তাই সে বলছে। বানরের মতো ভীরু একদল মানুষ নিয়ে আমার সৈন্যবাহিনী।মিলিটারি এ্যাটাচি এক বার ভাবল জিজ্ঞেস করে—স্যার, কি করে বুঝলেন মাওয়া মিথ্যা কথা বলছেন? কিন্তু জিজ্ঞেস করার মতো সাহস সঞ্চয় করে উঠতে পারল না।
সে আসলেই ভীরু।ঘড়িতে বাজছে এগারটা একুশ। রবিনসন এগিয়ে গেল ফকনারের দিকে। নরম গলায় বলল, ফকনার, আমি কি তোমার সঙ্গে কিছু কথা বলতে পারি? নিশ্চয়ই পার।তোমার পরিকল্পনা আমার পছন্দ হয় নি।জানি। এবং পছন্দ না-হবার কারণও জানি। আমার পরিকল্পনা বেশি সহজ। সহজ বলেই পছন্দ হয় নি। জটিল কিছু হলে তোমার পছন্দ হত।আমাদের সঙ্গেই আছে।আমরা তাকে ফেরত চাই।ভালো কথা, ফেরত দেওয়া হবে।
তার পরিবর্তে আমরা কি পাব? কি চাও? একটা বিমান, যা আমাদের নিয়ে যাবে। আমরা কোনো রকম ঝামেলা চাই না।কেন চাও না তা বোঝার মতো বুদ্ধি আমাদের আছে।তোমরা বিমান পাঠাবে এখানকার এয়ারপোর্টে। আমরা প্রথমে পরীক্ষা করে দেখব সব ঠিক আছে কি না। তোমাদের দিক থেকে দুজনকে আমরা হোস্টেজ হিসেবে সঙ্গে নিয়ে যাব।
দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি, যেমন ধর মিনিস্টার অব ডিফেন্স।হোস্টেজ নিয়ে যাবার ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম না।হোষ্টেজ এই জন্যেই নিতে চাই, যাতে বিমান আকাশে ওঠার পর তোমরা কোনো ঝামেলা না-কর। এয়ার টু এয়ার-মিসাইল তোমাদের আছে বলে শুনেছি।ঠিকই শুনেছ। তবে কথা কী জান, আমাদের সঙ্গে দরদান করার মতো অবস্থায় তোমরা নেই বলেই মনে হয়।
মিনিস্টার অব ডিফেন্সকে হোস্টেজ হিসেবে দিতে না-চাও, তোমাকে পেলেও চলবে। ব্রিগেডিয়ার মন্দ কি? নিশোকে তোমাদের প্রয়োজন, এইটুকু বুঝতে পারি।আমাদের যতটা প্রয়োজন বলে তুমি ভাবছ, তত প্ৰয়োজন কিন্তু না। যাই হোক, এই ফ্রিকোয়েন্সিতেই পরে তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করব।কত পরে? মনে হচ্ছে খুব ব্যস্ত? হ্যাঁ, কিছুটা।
নিশো কেমন আছে? এখনো টিকে আছে, বেশিক্ষণ থাকবে বলে মনে হচ্ছে না। তবে এই মুহূর্তে তাকে দেখে মোটামুটি সুখী বলেই মনে হচ্ছে কবিতা লিখছে সম্ভবত।ওপাশের কথা বন্ধ হয়ে গেল। ফকনার বেঁটে এলের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, আমি আরেক মগ কফি খাব, ব্যবস্থা কর। জনাথনকে আসতে বল।জনাথন সঙ্গে-সঙ্গে উঠে এল। ফকনার জনাথনকে আড়ালে নিয়ে গেল।
আড়ালের প্রয়োজনীয়তাটা জনাথন ঠিক বুঝতে পারছে না। ফকনার ফিসফাস করবার মতো লোক নয়।ব্যাপার কি ফকনার?ব্যাপার খুবই খারাপ। ওদের ভাবভঙ্গি অন্য রকম।তোমার ধারণা, আমাদের আটকে ফেলতে চাইছে? তাই।কি করতে বল? ফোর্টনকে অফিসারশ্রেণীর কেউ-কেউ নিশ্চয়ই জীবিত আছে? থাকার তো কথা। কারাপ্রধান মাওয়া জীবিত আছে বলে আমার ধারণা।
জীবিত থাকলে অবশ্যি তাকে আনতে হবে। কত জন তোমার লাগবে? দশ জন।পনের জন নিয়ে যাওয়া পছন্দমতো পনের জন। এবারকার অপারেশন আগের বারের মতো হবে না। যত দূর সম্ভব ক্ষতি করবার চেষ্টা করবে। ওদের যোগাযোগের কেন্দ্র পুরোপুরি নষ্ট করে দিতে হবে।তোমার পরিকল্পনাটা কি? মজার পরিকল্পনা। জেনারেল ডোফাকে বড় ধরনের ধোঁকা দিতে চাই।
আমরা কি এখনি রওনা হয়ে পড়ব? হ্যাঁ, রওনা হয়ে যাও। কতক্ষণ লাগবে বলে তোমার ধারণা? ঘন্টা দুই।তোমাকে এক ঘন্টা সময় দেওয়া হল। এক ঘন্টার ভেতর মাওয়াসহ কমপক্ষে তিন জনকে এখানে চাই। দরকার হলে আরো পাঁচ জন নিয়ে যাও।তোমার পরিকল্পনাটা কী বল তো শুনি।এতটা সময় নষ্ট করা কি উচিত হবে? মাত্র এক ঘন্টা সময় তোমাকে দেওয়া হয়েছে।
এর দুমিনিট তুমি নষ্ট করে ফেলে।এক ঘন্টা একুশ মিনিটের মাথায় কারারক্ষী মাওয়া, এক জন আর্টিলারির ক্যাপ্টেন, দুজন সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট এবং এক জন হাবিলদার মেজরকে নিয়ে জনাথন উপস্থিত হল। মাওয়া জীবিত হলেও গুরুতর আহত। গুলি লেগে তার বাঁ হাতের তিনটি আঙুল উড়ে গেছে। ডান পায়ের উরুতেও গুলি লেগেছে।
তাকে কাঁধে করে বয়ে নিয়ে আসতে হয়েছে। বাকি অফিসাররা সুস্থ, তবে তারা বড় ধরনের ধাক্কা খেয়েছে। চোখে-মুখে দিশাহারার ভাব। অপ্রকৃতস্থ দৃষ্টি। চোখ রক্তবর্ণ।ফকনার বলল, মাওয়া, কেমন আছ তুমি? মাওয়া জবাব দিল না। ফকনার বলল, তোমাদের ওপর দিয়ে সামান্য একটু ঝামেলা গিয়েছে বুঝতে পারছি। আমি দুঃখিত। তোমাদের জন্যে কফি হচ্ছে।
কফি খাও, ভালো লাগবে। তোমাদের কারোর যদি ধূমপানের অভ্যাস থাকে, তা হলে চুরুট নিতে পার। ভালো চুরুট আছে।কেউ কোনো উত্তর দিল না। আর্টিলারি ক্যাপ্টেন একদলা থুথু ফেলল।তোমাদের এখানে আনার উদ্দেশ্যটা ব্যাখ্যা করা দরকার। আমি জেনারেল ডোফাকে বড় রকমের একটা ধোঁকা দিতে চাই। তোমাদের সাহায্য ছাড়া তা সম্ভব হচ্ছে না।
তোমরা যা করবে তা হচ্ছে, জেনারেল ডোফার সঙ্গে যোগাযোগ করবে। আমি যা শিখিয়ে দিই, ওয়্যারলেসে তাই তাকে বলবে। খুব বিশ্বাসযোগ্যভাবে বলবে। আমি তোমাদের কাছ থেকে প্রথম শ্রেণীর অভিনয় চাই।বলতে-বলতে ফকনার হাসল। প্যান্টের পকেট থেকে সিগারেট বের করল।তোমরা যা বলবে তা হচ্ছে…. ফকনারের কথা শেষ হবার আগেই আর্টিলারি ক্যাপ্টেন কঠিন গলায় বলল, তুমি যা বলবে আমরা তাই করব, এরকম মনে করার কোনো কারণ আছে কি? পছন্দ না-হবার কারণ হচ্ছে, ডোফা কোনো শিশু নয়।
তার আচার-আচরণ শিশুর মতো, কথাবার্তা শিশুর মতো, কিন্তু সে শিশু নয়। তুমি তা ভালো করেই জান। সে ধুরন্ধর মানুষ।ধুরন্ধর মানুষরা মাঝেমাঝে হাস্যকর ভুল করে। করে না? তা করে। তবে….. কোনো তবে নয়। এই সুযোগ আমি নিতে চাই।নিতে চাচ্ছ না, কিন্তু আমার পরামর্শ শোন, একটা বিকল্প ব্যবস্থা রাখ।কি-রকম বিকল্প ব্যবস্থা? ধর, ডোফা তোমার পরিকল্পনামতো কাজ করল না।
এক দল কমান্ডো বিমান বোঝাই করে পাঠিয়ে দিল। তোমার ফাঁদে সে পা দিল না। যদি তাই করে, তখন আমরা কি করব? কি করতে চাও? আগে থেকে তৈরি থাকতে চাই।বেশ, তৈরি হও। শোন রবিনসন, তোমার মাথার চুল বেশি পেকে গেছে। দড়ি দেখলেই সাপ ভাবছ।তা ভাবছি। তাতে ক্ষতি তো কিছু নেই। আমি গোটা দলকে দুভাগে ভাগ করে দেব। এক ভাগ থাকবে ফোর্টনকে। অন্য ভাগ নিশোকে নিয়ে গ্রামে লুকিয়ে থাকবে।
যদি দেখি ডোফা তোমার ফাঁদে পা দিয়েছে, একটা হেলিকপ্টার নিয়ে নিজেই নেমেছে, তখন আমরা হেলিকপ্টার দখল করে নেব। হেলিকপ্টার নিয়ে পালিয়ে যাব। আর যদি তা না হয়, তা হলে এক দল ওদের মোকাবেলা করবে, অন্য দল নিশোকে নিয়ে আরো ভেতরের দিকে পালিয়ে যাবে। কি, রাজি আছ? ফকনার জবাব দিল না।
একদলা থুথু ফেলল। রবিনসনের পরিকল্পনা তার পছন্দ হচ্ছে না। দল দুটি ভাগে ভাগ করা মানেই ক্ষমতা কমিয়ে দেওয়া।কি ফকনার কথা বলছ না কেন? রাজি? হ্যাঁ, রাজি।গুড। ভেরি গুড। তুমি নিশোকে নিয়ে গ্রামে চলে যাও। এখানকার ব্যাপারটা আমি সামলাব।আমি যাব? হ্যাঁ, তুমি যাবে।
পরিকল্পনার প্রথম অংশ তুমি করেছ, বাকিটা আমাকে করতে দাও। তুমি ভালো করেই জান, প্ল্যানিং-এর ব্যাপারটা আমি ভালো করি।এক সময় করতে, এখন কর কি না জানি না।এখনো করি। সময় নষ্ট করে লাভ নেই, রওনা হয়ে যাও।দুটি দল যদি কোনো কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, তখন? একটিমাত্র ওয়্যারলেস সেট।
ওয়্যারলেস সেট তোমার সঙ্গেই থাকবে ফকনার। আর আমরা যদি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি, তা হলে বিচ্ছিন্নভাবেই টিকে থাকার চেষ্টা করব। চেষ্টা চালাতে হবে কত দ্রুত দেশ থেকে বের হয়ে যাওয়া যায়।ফকনার কিছু বলছে না। বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে যাবার ইচ্ছা খুব একটা নেই।রবিনসন বলল, সময় নষ্ট করছ ফকনার। রওনা হয়ে যাও।
কত জন সঙ্গে নেব?……………………….সাত জন নাও।…………………….বাকি সব রেখে যাও।……………..বেশ, তাই হবে।…………………………………….সময় বারটা পঁচিশ।
দুটি ট্যান্সপোর্ট হেলিকপ্টার ফোর্টনকের ওপর দিয়ে চক্কর দিচ্ছে।জেনারেল র্যাবি নিজেই এসেছে। তাঁর সঙ্গে এক শ সতের জনের একটি সুসজ্জিত কমান্ডো দল। হেলিকপ্টার দুবার নামার মতো ভঙ্গি করেও ওপরে উঠে গেল। র্যাবি পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারছে না। জেনারেল ডোফার ধারণা যদি সত্যি হয়, তা হলে হেলিকপ্টার নিয়ে নাম হবে একটা বড় ধরনের বোকামি। সরাসরি বাঘের মুখে পড়ে যাওয়া। তার চেয়ে আকাশে থাকা ভালো।
ফোর্টনকের সাঁইত্রিশ মাইল উত্তরে প্যারাট্রুপার নামানো হয়েছে। ইতোমধ্যে তারা এসে পড়কে। ব্যস্ততার কিছু নেই। জেনারেল র্যাবির চোখে ফিল্ড টেলিস্কোপ। ফিল্ড টেলিস্কোপে দেখা যাচ্ছে বিরান জনভূমি। এর মানেও সে বুঝতে পারছে না। র্যাবি হেলিকপ্টার-পাইলটের পেছনে বসে ছিল। পাইলটের কাঁধে টোকা দিয়ে বলল, কিছু বুঝতে পারছ? পাইলট মাথা না ঘুরিয়ে বলল, একটা জিনিসই বুঝতে পারছি।
সেটা হচ্ছে, ফোর্টনকে কেউ নেই।ঘাপটি মেরে বসে আছে হয়তো।তা থাকতে পারে।তুমি ফায়ারিং রেঞ্জের বাইরে আছ তো? তা আছি।দশ মিনিটের মাথায় প্যারাট্রুপাররা ফোর্টনকে ঢুকল। গ্রাউন্ড থেকে জানানো হল, অল ক্লিয়ার। জেনারেল র্যাবিকে নিয়ে হেলিকপ্টার নেমে এল।
জেনারেল র্যাবি প্রথম যে-কথাটি বলল, তা হচ্ছে, এ তো দেখি ভয়াবহ অবস্থা! এরা করেছে কী!ফোর্টনক মোটামুটি একটি ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়েছে। যেখানে-সেখানে মৃতদেহ পড়ে আছে। ফ্যামিলি কোয়ার্টারগুলি থেকে মহিলা এবং শিশুদের কান্ন শোনা যাচ্ছে। জেনারেল র্যাবি কঠিন গলায় বলল, ফোর্টনকে কেউ নেই, এ-সম্পর্কে পুরোপুরি নিশ্চিত হবার পর আমাকে জানাও, আমরা পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেব।
প্রতিটি ঘর দেখা হয়েছে স্যার।ভালো কথা। এক শ ভাগ অ্যালার্ট থাকতে হবে। বাঙ্কারগুলিতে পজিশন নাও।নেওয়া হয়েছে স্যার।চমৎকার! ফ্যামিলি কোয়ার্টারে যারা আছে, তাদের নিয়ে এস। তাদের কাছ থেকে শুনি, কী হয়েছে। আর ডেডবডিগুলির একটা ব্যবস্থা কর। কজন মারা গেছে, তাদের লিস্ট তৈরি করতে হবে।লিস্ট করা হচ্ছে স্যার।
ভেরি গুড। ওয়্যারলেস অপারেটরকে বল—জেনারেল ডোফার সঙ্গে যোগাযোগ করতে, আমি কথা বলব।জ্বি আচ্ছা স্যার।শোন, জেনারেল ডোফার সঙ্গে কথা বলার আগে আমি মাওয়ার স্ত্রী এবং কন্যার সঙ্গে কথা বলতে চাই। আশা করি তারা সুস্থ আছে।আমি এক্ষুনি খোঁজ নিচ্ছি স্যার।প্যারাট্রুপার বাহিনীর কমান্ডার কে? কর্নেল ফাতা।সে কোথায়? আমার কাছে কি ইতমধ্যেই তার রিপোর্ট করার কথা নয়?
স্যার, আমি ওঁকে খবর দিচ্ছি।জেনারেল র্যাবি বিরক্তিতে ভ্রূ কোঁচকাল, আর ঠিক তখনি ভয়াবহ বিস্ফোরণ হল। ফোর্টনকের গুদামঘরটি বিস্ফোরণের চাপে কয়েক ফুট শূন্যে উঠে গিয়ে প্রচণ্ড শব্দে গুড়িয়ে পড়ল, আর তার সঙ্গে-সঙ্গে একসাথে গর্জে উঠল বেশ কিছু এলএমজি র্যাবি শুধু বলল, কি হচ্ছে? এর বেশি কিছু বলতে পারল না। কারণ, তার কথা শেষ হবার আগেই দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটেছে। মাথার ওপরে বিম-দেওয়া উঁচু ছাদ খুলে আসছে।
Read more
