মহিম মণ্ডলের পয়সা আছে, পয়সার গরমও আছে। হঠাৎ হুঙ্কার দিয়ে উঠল, তাই পাবে। লেগে পড়ো, বুধবার বেলা বারোটার মধ্যে কাজ সারা চাই। জামাই আসবে সাড়ে পাঁচটায়। তার আগে এমন করে সব সারতে হবে যে, সদ্য হয়েছে বলে বোঝা না যায়।তা হয়ে যাবে।আজ রাত থেকেই শুরু করে দাও।
আমি ইলেকট্রিক মিস্ত্রি সাধনকে খবর দিচ্ছি, সে এসে একটা ডুম জ্বালানোর ব্যবস্থা করে দিক লাইন টেনে।যে আজ্ঞে।ও ঘটু, পচা আর হাঁদুকে দৌড়ে গিয়ে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। বেশিদূর যায়নি বোধ হয়।তারানাথের হাঁক শুনে ঘটু উঠে ছুটল। আর ছুটতে ছুটতে তার মনে হল, এই অবস্থায় একখানা সাইকেল থাকলে? আঃ, শুধু প্যাডেল মারো আর উড়ে যাও।
পচা আর হাঁদু গাঁ পেরোনোর আগেই ধরে ফেলল ঘটু। বৃত্তান্ত শুনে তারা পড়ি–কি–মরি করে ছুটে এল। সাজো সাজো রব।মহিম মণ্ডল ভারী খুশি হয়ে বলল , এই তো চাই। ভালো করে কাজ করো বাবাসকল, আজ রাতে খাসির মাংস খাওয়াব।ব্রজমাস্টার হাত জোড় করে বলল , ওটি করবেন না। গুরুভোজন হয়ে গেলে সবাই চুলবে, কাজ এগোবে না।
বরং রুটি তরকারির বন্দোবস্ত করুন। ঊন–পেটে থাকলে রাত জাগতে সুবিধে হয়।পুবের আকাশে সূয্যি ঠাকুরের মতো মাংসটা উদয় হচ্ছিল, কিন্তু অস্তও হয়ে গেল। বেজার মুখে ঘটু কাজে নেমে পড়ল।কাজও বড় সোজা নয়। কার্তিক মাস, হিমেল হাওয়া দিচ্ছে। দু-খানা ডুমের আলোয় বড় বড় ছায়া ফেলে তারা কেসিং-এর পাইপ পুঁততে লাগল।
হ্যামার মারতে মারতে হাঁদু, পচা আর ঘটুর গা ঘেমে গেল কয়েক মিনিটেই। তা ঘামুক, মণ্ডলের পো পুষিয়ে দিচ্ছে।ভোর হতে না হতেই চারখানা পাইপ নেমে গেল নীচে।ব্রজমাস্টার একখানা ঢিবির ওপর বসে দেখছিল সব। বলল , এবার যাও, চোখেমুখে জল দিয়ে একটু জিরিয়ে নাও। মুড়িটুড়ি যা জুটবে খেয়ে ঘণ্টা দুই ঘুমোও। একেবারে না ঘুমোলে। শরীর দেবে না। কাজটা তোলা চাই।
শরীর পাত হয়ে গেলে কাজ তুলবে কে? মুড়ি এল, সঙ্গে সেই গুড় তো আছেই, মণ্ডলের পো একধামা বেগুনিও পাঠিয়েছে গরমাগরম। কিন্তু ব্রজমাস্টার। বেগুনির ধামা সরিয়ে নিল। বলল , ও জিনিস চলবে না। খাটুনির পর এসব ভাজাভুজি পেটে গেলে আর দেখতে হবে না।শেষ অবধি দয়াপরবশ হয়ে দু-খানা করে দিল।দুপুর অবধি কাজ অনেকটাই এগোল।
দুপুরে যখন পেটে খাণ্ডবদাহনের খিদে তখন যা জুটল তা ব্রজমাস্টারের হুকুমেই। তেতোর ডাল, একটা ঘ্যাঁট আর ভাত। সঙ্গে আলু সেদ্ধ। ব্রজমাস্টার বলল , গুরুপাক খেলে শরীর দেবে না। উন খাওয়াই ভালো। কাজ তুলে দে, তারপর বিয়ের ভোজ তো আছেই।খাওয়ার পর ফের ঘণ্টাখানেক ঘুমিয়ে নিলে তারা। তারপর ফের কাজ। পাইপ নামছে।
কাজ এগোচ্ছে। তবে রাতের মধ্যেই ঘটু বুঝতে পারল শরীরের নাম মহাশয়। চোখে ঢুলুনি। হাত পায়ে সেই দুনো জোর আর নেই। তিনশো টাকা আর তিন ডবল মজুরিতে তার সাইকেলখানা হয়ে যাবে, এই আশায় হ্যামার মারতে লাগল ঘটু। গুরুপদ খাটছে, দু-হাজার টাকার খানিক উশুল করবে বলে। সাধু গায়েন বউকে উঞ্ছবৃত্তি থেকে রেহাই দেবে। তারানাথ বিয়ে বসবে।
পচা আর হাঁদু টাকাটা ওড়াবে ইচ্ছেমতো, কিছু বাড়িতেও দেবেথোবে। নানান ধান্ধায় মহিম মণ্ডলের শ্যালো নামছে মাটিতে। গভীরে।সোমবার উদয়পুরের হাট। মহিম মণ্ডলের বাড়ির পাশের মাঠ থেকেই হাটের শুরু। রবিবার বিকেল থেকেই ব্যাপারীরা এসে হাজির হচ্ছিল পিলপিল করে। সোমবার সকালে হাঁকেডাকে জমজমাট।
খাওয়াটা তেমন জুতের হচ্ছে না, বুঝলে? আরে খাটলে পিটলে একটু পোস্টাইও তো চাই। এই বলে পচা আর হাঁদু যখন ব্রজমাস্টার সকালে মাঠপানে গেছে, তখন হাটে গিয়ে ভরপেট ঘুগনি মেরে এল। মহিম মণ্ডলের চারটে মোষ আর বারোটা গরু। পিছনের উঠোনে সকাল বিকেল যখন দোয়ানো হয় তখন মচ্ছব লেগে যায়।
পচা আর হাঁদু এক ফাঁকে গিয়ে এক ঘটি করে মোষের দুধ কাঁচাই গিলে এল। রাখাল লোকটা দিলও, কারণ বাবুর গুরুতর কাজ হচ্ছে, মিস্তিরিরা জান কয়লা করে খাটছে, না দেবেই বা কেন? বিকেলের মধ্যেই দুজনের পেট নামল সাংঘাতিক। কাজ করবে কি, হাতের জলই শুকোয় না। তার ওপর তারানাথের এল কম্প দিয়ে জ্বর।
এঃ, এ যে তীরে এসে তরী ডুবতে বসল দেখছি। বলে মুখ বেজার করল ব্রজমাস্টার।মহিম মণ্ডল বলল , গতরে খাটার লোক দিতে পারব। তবে তারা এ ব্যাপারে আনাড়ি।তাই দিন। কাজ তো চালাতে হবে।দুটো মুনিশ আর ঘটু মিলে ফের লেগে পড়ল। সোমবার মাঝরাতে কেসিং-এর পাইপ তিনশো ফুট নামল বটে, কিন্তু ঘটুর তখন হাতে–পায়ে সাড়া নেই।মাঝখানের পাইপ নামানো সাবধানের কাজ।
রেঞ্চ দিয়ে ঠিকমতো আটকে না রাখলে একখানা পাইপও যদি পিছলে ভিতরে পড়ে যায় তো চিত্তির। সব পরিশ্রমই বৃথা যাবে। এ কাজ আনাড়ি দিয়ে হওয়ার নয়। জ্বর গায়েই তারানাথ এসে হাত লাগাল। পচা আর হাঁদুও লেগে পড়ল ফের। হাঁদু চুপিচুপি ঘটুকে বলল , আমার ঠাকুরদা রক্ত আমাশায় মারা গিয়েছিল। আমারই সেটাই হয়েছে, তলপেটে বড় যন্ত্রণা।
সাত-আট ঘণ্টা খাটার পর দু-ঘণ্টা ধরে ঘুমোচ্ছে তারা। কিন্তু তাতে শরীরের আবল্যি যাচ্ছে না। পাইপ নামানোর সময় রেঞ্চ ধরা হাত দু-খানা থরথর করে কাঁপছিল ঘটুর। দাঁতে দাঁত চেপে ধরে রইল। চোখ বুজলেই সাইকেল। সাইকেলখানা দেখতে পেলেই বুকখানা যেন ভরে যায়। নীচু হ্যান্ডেল, শ্যাওলা সবজে রং, ঝকঝকে ক্যারিয়ার।
হড়াক করে একটা শব্দ হওয়ায় চটকা ভাঙল ঘটুর। সবাই চেঁচাচ্ছে, গেল! গেল! রেঞ্চ তার ঘুমন্ত হাত থেকে আলগা মেরে পাইপ সরসর করে নেমে যাছিল। ঘটু প্রাণ হাতে নিয়ে দুহাতে সাপটে ধরল পাইপ। কাদা জলে পিছল হাত। আর চারখানা জোড়ের ভারী পাইপ। ধরে রাখতে হাতির জোর চাই। তবু ধরে রইল ঘটু। অন্য সবাই হাত না লাগালে হয়ে যেত।
না, ব্রজমাস্টার বকল না। বরং বলল , ওর দোষ কী? শরীর বলে কথা। ও ঘটু, যা বরং জর্দা দিয়ে একটা পান খেয়ে আয় ঘুমের চটকাটা যাবে।পান আর খেতে হল না। দু-খানা হাতের তেলোর দিকে চেয়ে ঘটু জলভরা চোখে দেখল, হাত দু-খানা ছড়ে কেটে একশা। ভারী পাইপ ধরে রাখতে গিয়ে কেসিং-এর কানায় চেপে গিয়ে গর্ত হয়ে কেটেছে পঞ্জার তলার দিকটা। কলের মতো রক্ত পড়ছে।
সাধু গায়েন রেঞ্চটা নিজের হাতে নিয়ে বলল , যা, ঘাস ঘেঁতো করে লাগা।তাই লাগাল ঘটু। বাবুভাইদের হাত হলে ভোগাত। মিস্তিরির হাত বলে তেমন গা না করলেও চলে। তবে বসে থাকতে ভয় হচ্ছে ঘটুর। মহিম মণ্ডল যদি কথা তোলে, আমার মুনিশ খাটছে, তোমার লোক বসে আছে, আমি মজুরি কাটব। মুনিশ দুটোকেও তো দিতে হবে।
তারা তো মাগনা খাটছে না! কথাটা তারানাথের কানে দিল ঘটু। তারানাথ বলল , না রে, মহিম দিলদরিয়া লোক। কাটবে না।মঙ্গলবার রাতে যখন পাইপ নেমে গেল, আর মুখ সিল করা হল তখন ঘটুর হাতে বড় বড় ফোস্কা। লেবুকাঁটা দিয়ে ফোস্কা গেলে মরা চামড়া সরিয়ে দিল সে নিজেই। তারপর বিষহরি তেল লাগাল।
গরিবের হাত এতেই সারে। না সারলে কি চলে? সারারাত জল ঢালা হল পাইপে। প্রথমে গোরবগোলা, তারপর সাদা জল। পাম্প চালিয়ে জল বের করা হতে লাগল। সবাই টান টান। জলের প্রেশার যেমন, ঠিকমতো মোটা নালে ওঠে কি না। ওঠে।বুধবার ভোরবেলা ভোগবতী মহিম মণ্ডলের পাইপ বেয়ে উঠে এলেন। ফুরফুরে জল। পরিষ্কার ঝকঝকে।
বিয়েবাড়ির তুমুল হইরইয়ের মধ্যেও মহিম ছুটে এসে পিঠ চাপড়ে দিল ব্রজমাস্টারের কাজ দেখালে বটে বাপু! তাজ্জব! জল ট্যাঙ্কে উঠে যাচ্ছে ডিজেল পাম্পে। বিয়েবাড়ি ভাসাভাসি।কাজ শেষ করে তারা বাইরের দিককার ঘরের বারান্দায় বসে আছে পাশাপাশি। সামনের ফাঁকা মাঠে রাতারাতি মস্ত ম্যারাপ বাঁধা হয়ে গেছে। এই ম্যারাপের নিচেই সাঁঝবেলায় বিয়ের আসর বসবে।
মণ্ডলের পো জামাইকে ঢেলে দিচ্ছে। স্কুটার, টিভি, আরও কী-কী সব যেন। জামাইও জম্পেশ। মস্ত চাকরি।কাজের মেয়ে বলে গেছে আজ মুড়ির সঙ্গে গরম বোঁদে দেওয়া হবে, আর দুখানা করে সন্দেশ। আর বেগুনিও। কিন্তু কারোই তেমন গা নেই। শরীর নিংড়ে দিতে হয়েছে গত চার দিনে। কাজটা উঠে গেছে এই যা একটা ভালো খবর।
গুরুপদ হিসেব কষছিল। কষে বলল , আরও হাজারখানেক হলেই হয়ে গেল।সাধু গায়েন দেওয়ালে হেলান দিয়ে চোখ বুজে বসেছিল। বলল , আমার এখনও ঢের দেরি। যতীন মজুমদারের জমিটা আড়াই কাঠা। তাও দশ হাজার চাইছে।এইসব কথাবার্তা হচ্ছিল। সকলেরই দমসম অবস্থা। গড়িয়ে নিতে পারলে হয়। হঠাৎ একটা শোরগোল মতো শোনা গেল ভিতরবাড়ি থেকে।
গুরুপদ সোজা হয়ে বসে বলল , গোল কীসের? তারানাথ বলল , বিয়েবাড়িতে অমন হয়। আত্মীয়স্বজনের মধ্যেই পুরোনো খার থাকে কিনা।একটু বাদেই হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে এল ব্রজমাস্টার, ওরে, সর্বনাশ হয়েছে। বাবুর মেয়ে পালিয়ে গেছে।সবাই সোজা হয়ে বসল।ব্রজমাস্টার উত্তেজিত হয়ে বলল , সকালে কুয়োপাড়ে মুখ ধোয়ার নাম করে গিয়েছিল। সেখান একটা ছোঁকরা সাইকেল নিয়ে তৈরি ছিল।
রডে তুলে নিয়ে হাওয়া।তারানাথ বলল , তা হলে কী হবে? কী আর হবে। মহিমবাবু মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়েছেন। গিন্নি মূৰ্ছা গেছেন। চারদিকে লোক গেছে মেয়ে খুঁজতে। কিন্তু খুঁজে পেলেও লাভ নেই। রা পড়ে গেছে। পাত্রপক্ষ গায়ে হলুদের তত্ব নিয়ে এসেছিল, তারাও জেনে গেছে। বিয়ে ভেস্তেই গেল ধরে নাও।
ঘটু উঠে সোজা হয়ে বসে বলল , সাইকেল? ব্রজমাস্টার অবাক হয়ে বলে, সাইকেল! সাইকেলের কথা উঠছে কেন? ঘটু একগাল হেসে বলল , সাইকেলের কথাই তো বললেন! সাইকেলে করেই তো পালিয়েছে! হ্যাঁ। তাতে কী? ঘটু উজ্জ্বল চোখে চেয়ে রইল। একখানা সাইকেল হলে কত কী না করা যায়!
( সমাপ্ত )
Read more
