সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১২

ভদ্রলােক শুধু বললেন,—দেখা যাক।… 

কালিকাপুর স্টেশনে নামবার পর একদল বরযাত্রী বর-কনে নিয়ে হইহই করে ট্রেনে উঠছিল। সেই ভিড়ে ভদ্রলােককে আর দেখতে পেলুম না।

ভৌতিক গল্পসমগ্র 

কথাটা ছােটমামাকে বললুম। ছােটমামা বিরক্ত হয়ে বললেন,—ছেড়ে দে তাে পাগলের কথা। দেখেই বুঝেছিলুম বদ্ধপাগল। পা চালিয়ে চল। সাড়ে ছ’টার ট্রেনে আমাদের বাড়ি ফিরতে হবে। 

কিছুক্ষণ পরে ছােটমামা হাঁটার গতি কমালেন। সামনেই ধ্বংসস্তুপ আর ঘন জঙ্গল। জঙ্গলের ভেতরে উঁচু ভাঙা পাঁচিল দেখা যাচ্ছিল। সেটা লক্ষ করে দুজনে জঙ্গলে ঢুকলুম। তারপর বটগাছটাও চোখে পড়ল। ছােটমামা একটা ঝােপের আড়ালে বসে ফিসফিস করে বললেন, কুইক পুঁটু! মাটিটা বৃষ্টিতে নরম হয়ে আছে। এই রুমালটা নে। যতটা পারবি, খাবলে মাটি তুলে নিবি। চলে যা।। 

ভয়ে-ভয়ে এগিয়ে গেলুম। উঁচু ভাঙা পাঁচিলের পাশে বটগাছটার কাছে গিয়ে দেখলুম, খুঁড়ির নিচে একটা প্রকাণ্ড ইটের চাঙড়। তার ওপর একটা মড়ার খুলি। 

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১২

খুলিটা দেখামাত্র আঁতকে উঠে কয়েক পা পিছিয়ে এলুম। কিন্তু দিদিমার বাতের কষ্টের কথা মনে পড়ল। তখন সেখানেই গুড়ি মেরে বসে রুমাল বিছিয়ে কয়েক খাবলা মাটি তুলে নিলুম। তারপর মাটিগুলাে রুমালে বেঁধে সবে উঠে দাঁড়িয়েছি, তখনই দেখলুম ট্রেনের সেই ভদ্রলােক পাঁচিলের পাশ দিয়ে চুপিচুপি আসছেন। তার দৃষ্টিটা মড়ার খুলির দিকে। 

তারপর দেখলুম, ভদ্রলােক তার কাঁধের ব্যাগ থেকে একটা মড়ার খুলি বের খুলি যদি বদলে যায় করলেন এবং ইটের চাঙড়ে সেই খুলিটা রেখে থানের মড়ার খুলিটা তুলে নিয়ে পাঁচিলের আড়ালে উধাও হয়ে গেলেন। 

ছােটমামা ঝােপের আড়ালে থেকে ব্যাপারটা দেখছিলেন। এবার ঝােপ থেকে বেরিয়ে এসে বললেন,—আয় তাে পুটু! ব্যাপারটা দেখি। 

 ছােটমামা তখন বেপরােয়া। বাবা কন্ধকাটার কথা ভুলে ভাঙা পাচিলের পাশ দিয়ে দৌড়ে গেলেন। আমিও ছােটমামাকে অনুসরণ করলুম। কিছুটা দৌড়ে গিয়েই ভদ্রলােককে দেখা গেল। তিনি সামনের দিকে হনহন করে এগিয়ে চলেছেন। ছােটমামা চেঁচিয়ে উঠলেন,-~-ও মশাই! ও মশাই! শুনুন! শুনুন! 

ভদ্রলােক মুখটা ঘােরালেন। দেখে চমকে উঠলুম। এ মুখ তাে সেই মুখ নয়। লম্বা চুল নেই। প্রকাণ্ড গোঁফ আছে। ট্রেনের তিনি ছিলেন ফরসা। ইনি কুচকুচে কালাে। অথচ সেই ছাইরঙা পাঞ্জাবি, পরনে ধুতি। 

ছােটমামার একরােখা জেদি স্বভাব আমার জানা। দৌড়ে তার কাছাকাছি গিয়ে আবার যেই বলেছেন,—ও মশাই। ব্যাপারটা কী? অমনি ভদ্রলােক আবার মুখ ঘােরালেন। বিকেলের রােদ পড়েছিল সেখানে। আতঙ্কে হতবুদ্ধি হয়ে দেখলুম, এবার আর মানুষের মুখ নয়। আস্ত মড়ার খুলি।

ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১২

ছােটমামা থমকে দাঁড়িয়ে গিয়েছিলেন। আর তারপরই ঘটল এক অদ্ভুত ঘটনা। আমার পাশ দিয়ে কী একটা ছুটে গেল। আমি আতঙ্কে প্রায় কেঁদে উঠে ডাকলুম, ছােটমামা! ছােটমামা! 

ছােটমামাও যেন হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমার ডাক শুনে দৌড়ে চলে এলেন। তারপর দেখলুম, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা সেই কঙ্কালের সঙ্গে গেরুয়া খাটো লুঙ্গিপরা আর একটা কঙ্কালের ঘুমােঘুষি চলেছে। ছােটমামা হাঁফাতে-হাঁফাতে বললেন, কী বিচ্ছিরি ব্যাপার! ছ্যা-ছা! মরে গিয়েও কি মারামারি করা উচিত? বল তাে পুটু! 

কান্নাজড়াননা গলায় বললুম,—ছােটমামা। আমরা পালিয়ে যাই। 

ছােটমামা আমার হাত থেকে রুমালে বাঁধা মাটিগুলাে নিয়ে বললেন,—পালাব কেন রে? আস্তেসুস্থে যাব। মরুক ব্যাটাচ্ছেলেরা মারামারি করে! ছা-ছা! এ কি ভদ্রলােকের কাজ? বাবা কন্ধকাটা হয়তাে মজা দেখছেন। 

চলে আসবার আগে দেখলুম, ধুতি-পাঞ্জাবি পরা কঙ্কাল আর গেরুয়া খাটো লুঙ্গিপরা কঙ্কাল পরস্পরকে জাপটে ধরে একটা ঝােপের মধ্যে প্রচণ্ড লড়ে যাচ্ছে। আর ঝােপটা খুব নড়ছে।… এসবের চেয়েও অদ্ভুত ব্যাপার, বাবা কন্ধকাটার থানের মাটি দিদিমার কোমরে মাখিয়ে রাখার পরদিনই তিনি বিছানা ছেড়ে উঠতে পেরেছিলেন।

মােনা-ওঝা এসে ছােটমামার মুখে সব ঘটনা শুনে বলেছিল,লড়াইটা খুলি বদলের। বুঝলেন ছােটবাবু? গত বছর অনেক জায়গায় খুব বানবন্যা হয়েছিল। অনেক মানুষ জলে ডুবে মারা পড়েছিল। সে-ও তাে অপঘাতে মরণ। আর অপঘাতে মরলেই মানুষ ভূত হয়ে যায়। 

 

Read More

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের ভৌতিক গল্পসমগ্র খণ্ড-১৩

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *