আতর বলল, মহা বিপদে লিড়ার লাগে। একজন। দুই-তিনজন লিডার মানে দুই-তিন রকম চিন্তাভাবনা। মহা বিপদে আমাদের একটাই চিন্তা—বাঁচতে হবে। ] চিৎকার দিয়ে বলেন, বাঁচতে হবে।লঞ্চ কঁপিয়ে চিৎকার, বাঁচতে হবে! চিৎকারের কারণেই হয়তো লঞ্চ ডানদিক থেকে বাঁ দিকে কত হলো।
অধ্যাপক ডক্টর জিলুর খান পিএইচডি (গ্লাসগো) হতাশ চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছেন। তাঁর ফ্রেঞ্চকািট আগেই খানিকটা ঝুলে ছিল, এখন আরও স্কুলে পড়ল। দুজন তাঁকে দুপাশ থেকে ধরে ফাঁকা জায়গায় দাঁড় করিয়ে দিল।জিলুর খান বললেন, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। আপনারা আমার কাছে কী চান।
আতর মিয়া বলল, বড় বড় পাপ কী করেছেন সেটা বলবেন। তারপর তওবা করবেন। Why? সমাজের এইটাই সিদ্ধান্ত। সিদ্ধান্ত না মানলে লিখি দিয়ে পানিতে ফেলে। দেওয়া হবে। এইটাও সমাজের সিদ্ধান্ত।সমাজটা কী? আমরাই সমাজ। দেরি করবেন না। তাড়াতাড়ি বলেন। আমি অপরাধ করার মানুষ না। টুকটাক মিথ্যা হয়তো বলেছি, এর বেশি কিছু না।এর বেশি কিছু না? অবশ্যই না।
তাহলে স্যার কিছু মনে করবেন না। আপনাকে এখন আমি লাখি দিয়ে পানিতে ফেলব। কেউ যেন মনে না করে সমাজ একজন নির্দোষ মানুষকে শাস্তি দিচ্ছে। এই জ্ঞানী প্রফেসর অসামাজিক কার্যের জন্য তার এক ছাত্রী নিয়ে এসেছে। ছাত্রী নিজের মুখে কী ঘটনা ঘটেছে বলবে, তারপর সমাজ সিদ্ধান্ত নিবে। ছাত্রীর নাম সীমা। সীমা সিস্টার উপস্থিত আছেন। সিস্টার আসেন কিছু বলেন।সীমা আতরের কাছে এগিয়ে গেল।আতর বলল, আপনার ভয়ের কিছু নাই। আপনি আপনার স্যারের ফান্দে পড়েছেন। ভুল করেছেন। এখন বলেন। আপনি কি ভুল করেছেন?
সীমা হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল। আমরা যদি প্রফেসর সাহেবকে পানিতে ফেলে দেই আপনার আপত্তি আছে? সীমা চুপ করে রইল।আতর বলল, সিস্টার, আমরা আপনার স্যারকে দুদিক থেকে ধরে রাখব। আপনি ধাক্কা দিয়ে আপনার স্যারকে পানিতে ফেলবেন। পারবেন না? সীমা ভীত চোখে তাকিয়ে রইল। জবাব দিল না। আতর বলল, চোখ বন্ধ করে পীর বদরের নামে এক ধাক্কা। যাত্রীরা মহা উৎসাহে বলা শুরু করল, ধাক্কা ধাক্কা ধাক্কা।
ডক্টর জিল্লুর বললেন, এটা কোনো মগের মুলুক না। এখানে বিচার-আচার আছে। ধাক্কা দিয়ে পানিতে ফেলে দেওয়া কোনো বিচার না।আতর বলল, সাঁতার জানেন না। স্যার? না।পানিতে না নামিলে কেহ শিখে না সাঁতার। আপনি পানিতে নেমে সাঁতার শিখবেন। মাইনাস টু ফর্মুলা আপনাআপনি হয়েছে। আপনাকে দিয়ে হবে মাইন্যাস থ্রি ফর্মুলা।যাত্রীরা মহা উৎসাহে চিৎকার শুরু করল, মাইনাস থ্রি। মাইনাস থ্রি।
ডক্টর জিলুর বললেন, এখানে বিচক্ষণ কেউ আছেন যিনি মাস হিস্টরিয়া বন্ধ করতে পারেন? প্লিজ হেলপ। প্লিজ।তৃষ্ণা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি যাও। আতর মিয়া তোমার কথা শুনবে। আমি বললাম, এখনো সময় হয় নি।তৃষ্ণা বলল, সময় কখন হবে? পানিতে ফেলে দেওয়ার পর? হতে পারে।মানুষ ধরে ধরে পানিতে ফেলবে। আর তুমি নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবে?
আমি বললাম, মানুষের একটাই ভূমিকা। দর্শকের ভূমিকা। প্রকৃতি মানুষকে তৈরি করেছে শুধুই দেখার জন্যে। আশেপাশে নানা ঘটনা ঘটবে, সে দেখবে।তৃষ্ণা বলল, মানুষ ঘটনায় অংশগ্রহণ করবে না? না করাই বাঞ্ছনীয়।কোঁকর কোঁ করে মোরগ ডেকে উঠল। আমরা চমকে তাকালাম। রশীদ খানকে ধরে আনা হয়েছে। তার পকেটের মোরগ ডেকেই যাচ্ছে।
রশীদ বুদ্ধিমান মানুষ। কী ঘটনা আঁচ করতে পারছে। ধনবান মানুষরা নিজের ধন রক্ষা করার প্রবণতাতেই সর্ব সমস্যায় আপোষে চলে যায়। রশীদ ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমাকে কী জন্যে ডেকেছেন বলুন।আতর বলল, আপনি সারা জীবনে যা যা পাপ করেছেন এইসব আমরা শুনব।রশীদ খান বললেন, আপনারা ভালো কথা শুনবেন। খারাপ কথা কেন শুনবেন? বরং আপনি দুটা ভালো কথা বলেন আমরা শুনি।
আতর খানিকটা হকচকিয়ে গেল। রশীদ খান বললেন, লঞ্চ ড়ুবে যাচ্ছে এরকম একটা গুজব উঠেছে। এই গুজবের কারণে সবার মাথা এলোমেলো। লঞ্চ সত্যি সত্যি ড়ুবে গেলে আমরা কীভাবে সবাই বাঁচব এখন সেই চেষ্টা করা উচিত। কে কী পাপ করেছে এইসব নিয়ে আলোচনা না। পাপ তো সবাই করে। কেউ ছোট পাপ, কেউ বড় পাপ। পাপের বিচারের মালিক তো আপনি না। বিচার হবে রোজহাশরে। ঠিক বলেছি?
ড. জিলুর উঁচু গলায় বললেন, অবশ্যই ঠিক বলেছেন। Right words at the right time. রশীদ খানের পকেটে আবারও কোঁকর কোঁ শুরু হয়েছে। তিনি পকেট থেকে মোবাইল বের করে পানিতে ছুঁড়ে ফেলে বললেন, যা ব্যাট পানিতে ড়ুবে কোঁকর কোঁ করতে থাক।
তার এই নাটক ভালো কাজ করল। দর্শকদের অনেকেই হেসে উঠল। বোঝা যাচ্ছে রশীদ খান তার দিকের পাল্লা ভারী করছেন। মাস সাইকোলজি বলে, মহা বিপদে জনতার সিদ্ধান্ত অতি ক্ষুদ্র ঘটনায় মুহূর্তের মধ্যে বদলায়। বড় বড় ঘটনায় তেমন কিছু হয় না। মোবাইল পানিতে ফেলে দেওয়া ক্ষুদ্র ঘটনা কিন্তু তার প্রভাব বড়।
রশীদ খান বললেন, আমাদের মহা বিপদ। এর মধ্যে এক ভাইকে দেখি বন্দুক নিয়ে ভয়ভীতি দেখাচ্ছেন। একে পানিতে ফেলবেন তাকে পানিতে ফেলবেন বলে হামকি-ধামকি। আরে ভাই, বন্দুক কি আপনার একার আছে? অন্যের নাই? আমি চারটা গার্মেন্টসের মালিক। আমি কোনো প্রকেটশন ছাড়া লঞ্চে উঠব? হামজা কই?
হামজা এগিয়ে এল। বাংলা সিনেমার ফাইটারদের মতো তার চেহারা। মাথা চকচক করে কমানো। গলায় রুমাল বাধা। পরনে জিন্সের শার্ট-প্যান্ট। রশীদ খান বললেন, আমার বডিগার্ড। এর পকেটে একটা লুগার পিস্তল আছে। পিস্তলটা আমার। লাইসেন্স করা। হামজা, পিস্তলটিা বের করে পাবলিককে দেখা।
হামজা ওস্তাদের আদেশ মান্য করল। ফ্যাসফ্যাস গলায় বলল, কারো উপর ফায়ারিং করতে যদি হয় ইশারা দিবেন।রশীদ খান বললেন, এখন খুন-খারাবির সময় না। এখন জানে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। আমি সবার সহযোগিতা চাই। আপনারা আছেন আমার সঙ্গে?
বিকট ধ্বনি উঠল, আছি! আছি! শিশু এবং মহিলাদের বাঁচানোর চেষ্টা আগে করতে হবে। টিনের কিছু কাটা ড্রাম আমি লঞ্চে উঠার সময় দেখেছি। শিশুদের এইসব ড্রামে তুলে দেওয়া হবে। তাদের বাবা-মা ড্রাম ধরে ভাসবেন।রুস্তম আবার উদয় হয়েছে। তার চোখেমুখে আনন্দের ঝালকানি। আহত নেতার প্রত্যাবর্তন।
রশীদ খান বললেন, লঞ্চে আমি বেশকিছু অতি বৃদ্ধ যাত্রী দেখেছি। তাদের বিষয়ে কী করা যায় সেটা নিয়ে আমি চিন্তা করছি। আপাতত তারা এক জায়গায় গোল হয়ে বসে দোয়া ইউনুস পড়তে থাকুন। এই দোয়ার কারণে ইউনুস নবী মাছের পেট থেকে নাজাত পেয়েছিলেন। আমরাও ইনশাল্লাহ লঞ্চের পেট থেকে নাজাত পাব।আতর মিয়া পিছিয়ে পড়েছে। পিছিয়ে পড়া ছাড়া গতি নাই। তার আবারও উদয় হওয়ার সম্ভাবনা শূন্যের কোঠায়, যদি না বড় ধরনের কোনো অঘটন ঘটে।
ঝড়-বৃষ্টি দুটাই সাময়িক কমেছে। সাময়িক বলছি কারণ আকাশে মেঘের স্তুপ বাড়ছে। বিদ্যুৎ চমকাতেই মেঘের স্তুপের দেখা পাওয়া যাচ্ছে।আমি এবং তৃষ্ণা এখন কেবিনে। কেবিনের দরজা খোলা। বাতাসে ৰূপাং করে একেকবার দরজা আছড়ে পড়ছে। আবার বন্ধ হচ্ছে।তৃষ্ণা বলল, একের পর এক নাটক হচ্ছে। আমার কী যে অদ্ভুত লািগছে! আমি নিজে এক ঝড়ের কারণে কী পরিমাণ বদলেছি ভেবে অবাক হচ্ছি। কী রকম বদলেছি শুনতে চাও?
চাই।আমি ক্লাস নাইনে যখন পড়ি তখনই ঠিক করেছি। জীবনে কখনো বিয়ে করুব না। এখন কী আশ্চর্য বর সঙ্গে নিয়ে ঘুরছি।বর বলছি কেন? বিয়ে তো এখনো হয় নি! হয় নি, হবে। যে কাজি ভেসে চলে গেছে সে আবারও ভেসে ফিরে আসবে। আমার সিক্সথ সেন্স তাই বলছে। আমার সিক্সথ সেন্সের ব্যাপারটা তুমি তো বিশ্বাসই করো না। পীর কুতুধি ফিরে এলে বিশ্বাস হবে তো?
আমি বললাম, কেউ যদি প্রবলভাবে বিশ্বাস করে আমার এই ক্ষমতা আছে তাহলে প্রকৃতি তাকে সেই ক্ষমতা দিয়ে দেয়। কেউ যদি মনে করে আমার মিরাকল ঘটানোর ক্ষমতা আছে, তাহলে প্রকৃতি এই ক্ষমতা তাকে দিয়ে দেয়।মিরাকল কিন্তু ঘটে। আমার জীবনে কয়েকবার ঘটেছে। শুনতে চাও? চাই।চা খেতে খেতে শুনবে? আমার ফ্রাস্কে চা আছে।চা খাওয়া যেতে পারে।তৃষ্ণা চা বানাতে বানাতে বলল, দুটা মিরাকল আমার জীবনে ঘটেছে। আজকেরটা হবে তৃতীয়।আজকের কোন মিরাকল?
তৃষ্ণা জবাব দেওয়ার আগেই লঞ্চের সামনের দিক থেকে হৈচৈ, চেচামেচি শুরু হলো। আমরা দুজনই ছুটে বের হলাম। তৃষ্ণর হাতে ভিডিও ক্যামেরা। তেমন কোনো দৃশ্য হলে ভিডিও করে ফেলবে।ভিডিও করার মতোই দৃশ্য। কাঠের তক্তা ধরে দুজন ভাসছে। একজন পীর কুতুবি, অন্যজন ওসি সাহেব। বাতাসের ধাক্কায় তারা লঞ্চের দিকে ফিরে আসছে।তৃষ্ণা বলল, ওরা দুজন যে কাঠের টুকরা ধরে ভেসে ভেসে আসছে এটাকে কি তুমি মিরাকল বলবে না?
আমার জবাব দেওয়ার আগেই পীর কুতুবির ক্লান্ত গলা শোনা গেল, জ্বিন কফিলের বদমাইশি। আমি সাঁতরায়া পাড়ে উঠতে পারতাম। বদ জ্বিন আমারে এক কাঠের টুকরা ধরায়া দিল। তাকায়া দেখি কাঠের টুকরার অন্যদিকে ওসি সাহেব।
তেমন কোনো ঝামেলা ছাড়াই দুজনকে লঞ্চে তোলা হলো। ওসি সাহেব পানি খাব বলেই অচেতন হয়ে পড়ে গেলেন। পীর কুতুবি স্বাভাবিক গলায় বললেন, একটা গামছা দিয়ে কেউ আমার মাথাটা মুছায়ে দেন। আর এক কাপ হট টি দেন। দেশি বেনসন সিগারেট থাকলে ধরায়ে আমার ঠোঁটে দেন।পীর কুতুবির প্রতিটি নির্দেশ পালিত হলো।
সবাই এই দুজনকে ঘিরে আছে। লঞ্চ ড়ুবে যাওয়ার চিন্তা এখন মাথায় নেই। মানুষ টেনশন বেশিক্ষণ নিতে পারে না। পীর কুতুবি এবং ওসি সাহেব কিছুক্ষণের জন্যে হলেও সবার টেনশন দূর করেছেন।পীর কুতুবি বললেন, ওসি সাহেবের শার্টের পকেটে হাতকড়ার চাবি আছে। চাবি দিয়ে হাতকড়া খুলেন। কতক্ষণ আর বান্ধা থাকব? হাত তুলে মোনাজাত করতে হবে। হাত বান্ধা অবস্থায় মোনাজাত কবুল হয় না।
কুতুবির হাতকড়া খুলে দেওয়া হলো। তিনি বললেন, হাজেরান ভাই ও বোনেরা! এখন জিকিরা হবে। জিকির ছাড়া আমাদের উদ্ধার নাই। সবাই বামদিকে বুকে হাত দিয়ে নিঃশ্বাস নিতে নিতে বলবেন, আল্লাহ। হাত নামিয়ে নিঃশ্বাস ছাড়তে ছাড়তে বলবেন, ইহঁ। বড় পীর সাহেব আব্দুল কাদের জিলানি সাহেব এইভাবে জিকির করতেন।
জিকির শুরু হয়ে গেছে। আমি তৃষ্ণকে নিয়ে চলে আসব তখন দেখি ডিরেক্টর শাকুর ভাই চোখের ইশারায় আমাকে ডাকছেন। আমি কাছে এগিয়ে গেলাম। শাকুর ভাই বললেন, আপনার সঙ্গের মেয়েটা কে?
ওর নাম তৃষ্ণা।চেহারা ছবি, ফিগার তো মারাত্মক।কথা সত্য।তাকে জিজ্ঞেস করে দেখেন তো ভিডিও নাটকে অভিনয় করবে। কি না। রাজি হলে পারুলির ক্যারেক্টর পেয়ে যাবে। নাটক চ্যানেল আইতে ইনশাল্লাহ প্রচার হবে। চ্যানেল আইয়ের একজন ক্যামেরা ক্রু আমার আপন মামাতো ভাই। তার মাধ্যমেই যোগাযোগ হবে।আমি জিজ্ঞেস করে দেখব।আপনার কি মনে হয়। রাজি হয়ে যাবে? আমি বললাম, মহা বিপদে মানুষের মাথার ঠিক থাকে না। রাজি হয়ে যেতে পারে।ভাই, একটু চেষ্টা চালান।
তৃষ্ণার কোলে ল্যাপটপ। ভিডিও ক্যামেরায় যেসব ছবি তোলা হয়েছে তা ঢুকানো হচ্ছে ল্যাপটপে। সেখানেই এডিটিং হবে। হল্যান্ডের এক ভিডিও ফিল্ম ফেষ্টিবলে পাঠানো হবে। ফেষ্টিবলের নাম R Byte. সেখানে শুধু সত্যি ঘটনা নিয়ে বানানো ছবির প্রদর্শনী হয়। তৃষ্ণর ধারণা প্রথম পুরস্কার সে পেয়ে যাবে। পুরস্কারের অর্থমূল্য দশ হাজার ইউরো।
আমার ওপর দায়িত্ব পড়েছে মহাবিপদ নিয়ে কিছু ইন্টারভ্যু নিয়ে আসা। ফাঁকে ফাঁকে এইসব ইন্টারভ্যু যাবে। ভিডিও ক্যামেরা কীভাবে চালাতে হয়, টেলিলেন্স কীভাবে ব্যবহার করতে হয় সব শিখিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমি ইন্টারভ্যু নেওয়া শুরু করেছি। প্রথমেই সারেঙের অ্যাসিসটেন্ট হাবলু।
হাবলু
হাবলু, ক্যামেরার লেন্সের দিকে তাকিয়ে কথা বলো।জি আচ্ছা।তোমার কি ধারণা লঞ্চ ড়ুবে যাবে? ড়ুবিতে পারে, সবই আল্লাহপাকের ইচ্ছা। উনার ইচ্ছা হলে ড়ুববে। উনার ইচ্ছায় ভাইস থাকবে। আবার উনি ইচ্ছা করলে লঞ্চ আসমানে উড়াল দিবে।আসমানে উড়াল দিবে?
অবশ্যই। স্যার, উড়ালপঙ্খি গান শুনছেন? ও আমার উড়ালপঞ্জিখরে ফিল্মের গান? না।শুনবেন? পুরাটা জানি।এই সময় উড়ালপঞ্জিখ শোনাবে? আপনে বললে শুনাব। ভিডিওতে একটা স্মৃতি থাকল।পুরো গান শোনাতে হবে না। চার লাইন শোনালেই হবে।হাবলু গানের চার লাইন গাইল! মুগ্ধ হয়ে শুনবার মতোই গান।সারেং খালেক বিস্ময়ের কথা সারেঙের জ্বর নেমে গেছে। এখন তিনি বিছানায় আধাশোয়া। তার হাতে সিগারেট। শরীর যে এখন সুস্থ তার বড় প্রমাণ হাতের সিগারেট। অসুস্থ শরীর নিকোটিন নিতে পারে না।কেমন আছেন?
আমি তো ভালোই আছি। লিঞ্চ যায় যায়।এখন আমরা আছি কোথায় বলতে পারেন? কিছুই বলতে পারি না।কম্পাস নাই? লঞ্চ যাচ্ছে দক্ষিণে। এটা বলার জন্য কম্পাস লাগে না। ঘুরপাক খেতে খেতে সাগরে গিয়ে পড়বে।ডুববে না।স্টিল বডি ড়ুববে কেন?
টাইটানিকেরও স্টিল বডি ছিল। টাইটানিক ড়ুবে গেছে।টাইটানিক কী লঞ্চ আমি জানি না, তয় এই লঞ্চ ড়ুববে না। লঞ্চের একতলা মালামাল ভর্তি। বাতাসের ধাক্কায় লঞ্চ কান্ত হয়ে পড়বে না। আপনি নিশ্চিন্তে ঘুমান। ঘুম থেকে উঠে দেখবেন সব ঠিকঠাক। আমি আঠার বছরের সারেং। পানির হিসাব, ঝড়ের হিসাব, লঞ্চের হিসাব আমার জানা।
আঠার বছরের সারেং-জীবনে কখনো লঞ্চ ড়ুবি হয় নি? দুইবার হয়েছে। প্রথম ড়ুবল ছোট একতলা লঞ্চ। নাম এম এম এল মেঘনা! মানুষ মারা গিয়েছিল? মানুষ মারা যাবে না? যাত্রী যা উঠেছিল তার অর্ধেক সাফ। একজন ব্রিফকেস ভর্তি টাকা নিয়ে কাপ দিয়েছিল। তার কাছ থেকে ব্রিফকেস নেওয়ার জন্য সাত আটজন ঝাপ দিয়া পড়ল।
জীবন বাঁচানোর দিকে নজর নাই ব্রিফকেস নিয়ে হাতাহাতি! সব তলায়া গেল, ব্রিফকেইস ভাইসা রইল। সেই ব্রিফকেইস পাইল আমারই অ্যাসিসটেন্ট কামরুজ্জামান। টাকা কত ছিল বলে নাই। লঞ্চের চাকরি ছেড়ে রাড়-সিমেন্টের দোকান দিয়েছে। গাবতলীতে তিনতলা বাড়ি করেছে। বিয়ে করেছে দুটা।দ্বিতীয় দফার এক্সিডেন্টের বিষয়ে বলুন।এইটা ছিল বড় এক্সিডেন্ট। দোতলা লঞ্চ। নাম এম ভি নাইলতাবাড়ি। এম ভি কী বুঝেন?
না।এম ভি হলো মোটর ভেসিকেল আর এম এল মোটর লঞ্চ। এক্সিডেন্ট হয়েছে ঘন কুয়াশার কারণে। সাহেবরা এই কুয়াশারে বলে ফগ। এক হাত দূরের জিনিসও দেখা যায় না। এর মধ্যে লঞ্চ চলছে। লঞ্চের মালিক সঙ্গে আছেন। বরিশালে তাঁর নাকি জরুরি কাজ, পৌঁছাতেই হবে। তাঁর কারণেই এক ঘণ্টা আগে লঞ্চ ছেড়েছি। আমার বেকায়দা অবস্থা। ঘনঘন বদর বাবার নাম নিতেছি।বদর বাবাটা কে?
খোয়াজ খিজির। উনার কারবার পানিতে। লঞ্চে এক নতুন জামাই বউ নিয়ে যাচ্ছে। ডেকে তারা আমোদ-ফুর্তির বাজার বসায়েছে। আমি তাদের এক নজর দেখেও এসেছি। বর যেমন সুন্দর তার স্ত্রীও সুন্দর। সচরাচর এরকম দেখা যায় না। বউ সুন্দর হলে জামাই হয় বান্দরের খালাত ভাই।
এক্সিডেন্টের কথা শুনেন। অন্ধকারের মধ্যে আজাদহা এক ট্যাংকার সামনে থেকে দিল ধাক্কা। লঞ্চ দুই ভাগ হয়ে গেল। ড়ুবে গেল দশ থেকে পনের মিনিটের মধ্যে। সর্বমোট তিনশ ছাব্বিশজন মারা গেছে। ছয়-সাত বৎসর আগের কথা। সব পত্রিকায় উঠেছে। পত্রিকা পড়ার অভ্যাস থাকলে নিশ্চয় পড়েছেন।জামাই বউ কি বেঁচে ছিল?
বউ বেঁচে ছিল। সাঁতার দিয়ে এক চরে উঠেছে। জামাই সাঁতার জানে না। প্ৰাণে বাঁচার জন্য বউকে জাপাটিয়ে ধরেছিল; বউ অতি চালাক মেয়ে, লাথি দিয়ে জামাইকে আগে সরায়েছে। শাড়ি গায়ে সাঁতার দেওয়া যায় না। শাড়ি খুলে সাঁতার শুরু করেছে।আপনি এত কথা জানলেন কীভাবে? ঐ মেয়ে আর আমি একই চরে উঠেছিলাম। মেয়ের নাম সালমা। তাকে পরে বিবাহ করি।ইনিই কি সকিনার মা?
জি না; সকিনার মা আমার প্রথম স্ত্রী। আমার তিন স্ত্রী। তিনজনের মধ্যেই আন্তরিক মিল মহব্বত। প্ৰথমজন সংসার দেখে, দ্বিতীয়জন রান্না দেখে। আর সালমা থাকে তার নিজের মতো।আপনি তো ভাগ্যবান মানুষ। আপনার দুই লঞ্চ পানির নিচে চলে গেল, আপনি টিকে রইলেন।
আমাকে ভাগ্যবান অবশ্যই বলা যায়। যে দুইবার লঞ্চড়ুবি হয়েছে সেই দুইবারই মক্কায় হজ করে এসেছি। আমি ডাবল হাজি।শুনুন হাজি সাহেব! সবকিছু তিনবার করে ঘটে। এই জন্যেই কথা দানে দানে তিন দান। এই লঞ্চ ড়ুববে, আপনার তিন দান পূর্ণ হবে। হজ করতে যাবেন। আপনি, হবেন ট্রিপল হাজি।ডাবল হাজি আমার কথা গুরুত্বের সঙ্গে নিলেন বলেই মনে হলো। তিনি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন।
লঞ্চমালিকের কনিষ্ঠপুত্ৰ
কাদের সাহেব
কাদের সাহেবের নেশার ঘোর সামান্য কেটেছে। তিনি বিছানায় আধাশোয়া হয়ে বসা। চোখ সত্যিকার অর্থেই জবাফুলের মতো লাল। ঘরে বমি এবং এলকোহলের মিশ্রণে তৈরি বিষাক্ত গন্ধ।ভিডিও ক্যামেরা হাতে আমাকে দেখে বললেন, হু ইউ?
বোঝা গেল তাঁর ইংরেজি জ্ঞান সীমাবদ্ধ এবং তিনি সীমাবদ্ধ ইংরেজি জ্ঞানেই কথা বলতে ভালোবাসেন।আমি বললাম, স্যার আমি পত্রিকার লোক। আপনার একটা মিনি ইন্টারভ্যু নেব।তিনি হুঙ্কার দিয়ে বললেন, Go Hell. লঞ্চ ড়ুবে যাচ্ছে এই খবর কি পেয়েছেন স্যার? সাঁতার নিশ্চয়ই জানেন? লুঙ্গি খুলে একটা প্যান্ট বাঁ পায়জামা পরে নিলে ভালো হয়। পানিতে লুঙ্গি খুলে গেলে বেকায়দা অবস্থা হবে। আমার অনুরোধ ড্রেসটা বদলান।