হিমুর আছে জল পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

হিমুর আছে জল

কাদের সাহেব ইংরেজি থেকে বাংলায় ফিরে এলেন। বিড়বিড় করে বললেন, হালারপুতে কয় কী? কথা শেষ করেই আবার বমির প্রস্তুতি নিলেন। বমি ভিডিও করার কিছু নেই। তারপরেও কিছুক্ষণ ভিডিও করলাম। মৃত্যু আতঙ্কে লোকজন বমি করছে—এই ফুটেজ তৃষ্ণা কাজে লাগাতে পারে।কাদের সাহেব বললেন, এই হালারপুত ছবি তুলবি না। ছবি তুললে ফ্রেস বমি খাওয়ায়ে দিব।

ফ্রেস বা বাসি বমির কোনোটাই খাওয়া ঠিক হবে না ভেবে চলে এলাম।ছিনতাইকারী এখনো দড়ি বাঁধা অবস্থায়। চোখে ভরসা হারানো দৃষ্টি।আমি বললাম, আছেন কেমন? আছি ভালোই কিন্তু আমার খাওন দেয় নাই। খাওয়া নাকি শেষ।নতুন করে রান্না হবে।ভাত রানতে পারে। চাউল আছে। হুদা ভাত খাব।আপনি একাই খাওয়া পান নাই? হ্যাঁ আমি বাদ পড়েছি।আপনার সাথে চায়ের দোকানের মালিক বাধা ছিল, সে কোথায়?

জানি না কই। তারে ছেড়ে দিয়েছে, আমি একা আটকা আছি।ছিনতাইয়ের কাজ কোথায় শিখেছেন? নিজে নিজে শিখেছি। এর জন্য তো স্কুল-ইউনিভার্সিটি নাই।ছিনতাই করে সবচেয়ে বেশি উপার্জন কবে করেছেন? এইবারই করলাম। লাভ কী হয়েছে বলেন? সব নিয়ে গেছে। আনসাররা ভাগ বাটোয়ারা করে নিবে। এখন সাংবাদিক ভাই আপনি বলেন তারা ছিনতাইকারী না? টাকাটা তো তারা আমার কাছ থেকে ছিনতাই করল। ঠিক বলেছি না মিথ্যা বলেছি?

ঠিক বলেছেন। পড়াশোনা কতদূর করেছেন? এসএসসি পাস দিয়েছিলাম। অংকে কত পেয়েছিলাম শুনলে ফাল দিয়ে পানিতে পড়ে যাবেন।কত পেয়েছিলেন? ৭৮। আর দুই পেলে লেটার হয়ে যেত। আমার সামনে সিটি পড়েছিল। সলিলের। ক্লাসের ফাস্ট বয়। তার খাতা দেখে দেখে লিখেছি। একটা অংক, সে আর দেখায় না। আমি বললাম, মালাউনের বাচ্চা, খাতা দেখা। না যদি দেখাস ভুঁড়ি গলায়ে ফেলব।খাতা দেখায়েছে?

না।খাতা জমা দিয়ে বাড়ি চলে গেছে।তার ভূঁড়ি গালানোর ব্যবস্থা করেছিলেন? না, মাফ দিয়েছি। ৭৮ তো কম না। লেটারের কাছাকাছি। বিয়ারিং লেটার বলা যায়।সলিলের কোনো খোঁজ জানেন? ইন্ডিয়া চলে গেছে। ওদের যাওয়ার জায়গা আছে। ঝামেলা হলেই ইন্ডিয়া। আমাদের কোনো উপায় নাই। আফসোস। সাংবাদিক ভাই, দেখেন না আমার কোনো ফুডের ব্যবস্থা করা যায় কি না।

লঞ্চ তো কিছুক্ষণের মধ্যে ড়ুবেই যাবে। খাওয়া নিয়ে চিন্তা করে লাভ কী? আপনি তো সাঁতারও জানেন না যে কিছুক্ষণ সাঁতরাবেন।আমি সাঁতার জানি না। আপনারে কে বলেছে? অনুমানে বলছি।আপনার অনুমান ঠিক আছে। একবার পুসকুনির পানিতে পড়ে মরতে বসেছিলাম। কে জীবন বাঁচায়েছে অনুমান করুন তো!

সলিল।আপনার অনুমান সঠিক হয়েছে। মালাউনের বাচ্চা না থাকলে সেই দিনেই সব শেষ হতো।সেটা কিন্তু খারাপ হতো না। তখন আপনি মারা যেতেন স্কুলের ছাত্র হিসাবে। এখন কলঙ্ক নিয়ে মারা যাবেন। ছিনতাইকারী হিসাবে মারা যাবেন।সাংবাদিক ভাই আমি আপনার সঙ্গে আর কথা বলব না। নো টক। আপনার সঙ্গে কথা বলার আর সার্থকতা নাই।

পীর কুতুবি নদী সাঁতরানোর কারণে উনার অবস্থা এখন কাহিল। জিকির শুরু করে দিয়ে উনি এখন হয় করে ঘুমুচ্ছেন। তার মুখের সামনে স্বাস্থ্যবান দুটা মাছি ভিনভন্ন করছে। দুটা মাছির মধ্যে একটার মতলব ভালো না। সে মনে হয় যে-কোনো মুহুর্তে কুতুবির মুখে ঢুকে যাবে। ওসি সাহের কুতুবির পাশেই শুয়ে আছেন। তিনি কি এখনো অচেতন নাকি চেতনা ফিরেছে তা বোঝা যাচ্ছে না। দুজনের গায়ের ওপর কম্বল। এক কম্বলের নিচে দুজন দৃশ্যটা দেখতে ভালো লাগছে।ড. জিল্লুর খানের ছাত্রী সীমা ক্যামেরা মুখের সামনে ধরলে সীমা পালিয়ে যাবে ভেবেছিলাম। সীমা চোখমুখ শক্ত করে দাঁড়িয়ে রইল।

আমি : সীমা কেমন আছ?

সীমা : (নিচুপ)

আমি : তুমি কি শুধু স্যারের সঙ্গেই প্রমোদ ভ্ৰমণে যাও, নাকি অন্যদের সঙ্গেও যাও?

সীমা : (চাপা অর্থহীন শব্দ করল)

আমি : বলা হয়ে থাকে প্রসটিটিশন বাংলাদেশে নেই বলে ট্যুরিজমে আমরা পিছিয়ে আছি। ট্যুরিজমকে এগিয়ে নিতে তুমি এবং তোমার মতো মেয়েরা কী করতে পার এটা বলো। দেশের জন্যে সবার কাজ করতে হবে, তাই না?সীমা দাঁড়ানো অবস্থা থেকে বসে পড়ল। ইন্টারভ্যুর এখানেই সমাপ্তি।

আনসার বাহিনী প্ৰধান

আব্দুল খালেক

(জাতীয় ক্রীড়া প্ৰতিযোগিতায় পোলভল্টে স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত)

আমি আব্দুল খালেক। জাতীয় ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় স্বর্ণপদকপ্রাপ্ত। এখন আমার অবস্থা দেখেন ছাতার এক ভাঙা লঞ্চে ডিউটি পড়েছে। কারণ কী জানেন? আনসার এডজুটেন্টের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হয়েছে। উনি আমার সম্মানটা দেখলেন না, লঞ্চে ডিউটি দিয়ে এমন বিপদে ফেলেছেন। জীবন নিয়ে ফিরব তা মনে হয় না। নিজের হাতে ছিনতাইকারী ধরে এতগুলি টাকা উদ্ধার করেছি। সেই ঘটনা কেউ জানবে না।

না জানাই তো ভালো। ছিনতাইয়ের টাকা আপনারা ফেরত দেন নাই। আপনাদের হাত থেকেও টাকা ছিনতাই হয়েছে। আপনাদের একটা রাইফেলও পানিতে পড়ে গেছে বলে শুনেছি।এইসব উড়া খবর কার কাছ থেকে পেয়েছেন? আমরা সাংবাদিক মানুষ, খবর সংগ্ৰহ করাই আমাদের কাজ। শুনেছি আপনার রাইফেলাটাই নাকি মিসিং।কে বলেছে? আপনার রাইফেল কই?

সেই কৈফিয়োত আপনাকে দিব কেন? রাইফেল সেফ কাস্টডিতে আছে। ক্যামেরা বন্ধ করেন প্লিজ। আপনার সঙ্গে আর কথা বলব না।শেষ একটা কথা শুধু বলুন। জাতীয় ক্ৰীড়া প্রতিযোগিতায় আপনি স্বর্ণপদক বিজয়ী। তরুণ খেলোয়াড়দের উদ্দেশে কিছু বলুন।

আব্দুল খালেক গম্ভীর গলায় বললেন, খেলোয়াড়কে হতে হবে শারীরিকভাবে ফিট। তাকে সবসময় অনুশীলনের মধ্যে থাকতে হবে। হারজিৎ নিয়ে মাথা ঘামালে চলবে না। জয় এবং পরাজয় দুটাই হাসিমুখে গ্ৰহণ করতে হবে। তাদের মনে রাখতে হবে, জীবন হলো জয়-পরাজয়ের ফুল দিয়ে গাঁথা এক মালা।আমি বললাম, মুখস্থ বলেছেন বলে মনে হচ্ছে।

হ্যাঁ। এক ফটো সাংবাদিক ভাই আমার জন্যে লিখে দিয়েছিলেন। মুখস্থ করে রেখেছি। টেলিভিশনেও একই কথা বলেছি। চ্যানেল আইয়ের খেলাধুলা অনুষ্ঠানে দুবার দেখায়েছে। বিকাল চারটায় একবার পরদিন সন্ধ্যাবেলায় আরেকবার।স্বর্ণপদকটা কোথায়?

এটার কথা ভাই আর বলবেন না। বিরাট ঝামেলা হয়েছে। ক্যামেরাটা বন্ধ করেন। তারপর বলি।আমি ক্যামেরা বন্ধ করলাম।আব্দুল খালেকের মুখ এখন উজ্জ্বল। চোখ চকচক করছে।আমার ছোট শ্যালিকার নাম রেশমা। সে আমার বিশেষ ভক্ত। আমি তাকে ছোটবোনের মতো স্নেহ করি। এর বেশি কিছু না। আমার স্ত্রী আবার অত্যন্ত সন্দেহ বাতিকগ্রস্ত মহিলা। আমরা দুজন একসঙ্গে নরমাল গল্পগুজব করছি দেখলেও সে উত্তেজিত হয়ে যায়, বোনকে অকথ্য ভাষায় গালাপালি করে।

স্বর্ণপদক নিয়ে বাসায় ফিরেছি, আমার স্ত্রী দাঁত তুলতে ডেনটিক্টের কাছে গিয়েছে। ঘরে আমি আর রেশমা। রেশমাকে স্বর্ণপদকটা দেখালাম। সে পদক হাতে নিয়ে আনন্দে কেঁদে ফেলল। ঘটনাটা দেখে এত আনন্দ পেলাম! রেশমাকে বললাম, এটা তুমি রেখে দাও। তোমাকে দিলাম।

এই ঘটনার ফলাফল কী বুঝতেই পারছেন। আমার স্ত্রী বঁটি নিয়ে গেছে রেশমাকে মারতে। এতবড় পদক পেয়েছি কোথায় আমোদ-ফুর্তি হবে তা না বঁটি নিয়ে দৌড়াদৌড়ি।পদক এখন কার দখলে? রেশমার দখলে। তার এক কথা—দুলাভাই আমাকে আদর করে দিয়েছেন, এটা আমি মরে গেলেও দিব না। প্রয়োজনে হাতের কব্জি কেটে দিব। তার কথায় যুক্তি আছে। আপনি কী বলেন?

যুক্তি আছে। পদকটা তো আপনার। আপনি যাকে ইচ্ছা দিবেন। আমার ভোট আমি দিব যাকে ইচ্ছা তাকে দিব। অনেকটা এইরকম।এই তো আপনি বুঝেছেন।রেশমার সঙ্গে মোবাইলে কথা হয়েছে? না। আমি বিপদে আছি শুনলেই কেঁদে বুক ভাসাবে। তাকে কষ্ট দিয়ে লাভ কী?ভাবিকে জানিয়েছেন? মুটকিকে কিছু বলা না-বলা একই। তাকে কথা বললে এক্সট্রা একশ টাকা খরচ হবে।কেন?

সে মুরগি ছদকা দিবে। একশ টাকার কমে মুরগি মিলে? তার স্বভাব হলো একটা খারাপ স্বপ্ন দেখেছে। সকালে উঠে মুরগি ছদকা। মুরগিতে কাজ হয় বলেন? ঝড় যেভাবে উঠছে আমার মনে হয়। দুজনের সঙ্গে শেষ কথা বলে নেওয়া ভালো।রেশমাকে সব জানাব আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। মুটকিকে জানানোর কিছু নাই।ভাবি কি বেশি মোটা?

গ্র্যান্ডের কী জানি সমস্যা। প্রতিদিনই মোটা হচ্ছে। কোনো রিকশা তাকে নিতে রাজি হয় না।পান ব্যবসায়ী তালেব মুনশি আপনার টাকাই ছিনতাই হয়েছে? জি।এই নিয়ে আপনাকে কখনোই চিন্তিত দেখলাম না।চিন্তু করে লাভ কী বলেন? আমি ধরে নিয়েছি। টাকাটা ব্যবসায়ে লোকসান হয়েছে।টাকা ফেরত পাবেন বলে আপনার মনে হচ্ছে না?

কুমির যখন মুরগি গিলে তখন কি মুরগি পাওয়া যায়।কুমিরের পেট কাটলে পাওয়া যায়। আমার ধারণা আপনি টাকাটা ফেরত পাবেন। লঞ্চ ড়ুবে গেলে টাকাটা কাজে লাগবে না এটাই যা সমস্যা।তালেব মুনশি বললেন, কারোর না। কারোর কাজে লাগবে। পানি থেকে ডেডবডি তুলবে। মানিব্যাগ টাকার সন্ধানে শরীর হাতাহাতি করবে। শুনেন সাংবাদিক ভাই? লঞ্চভুবি হয়ে বহু লোক মারা গেছে। তাদের ডেডবডি উদ্ধার হয়েছে। কারও কাছে মানিব্যাগ পাওয়া যায় নাই।

ঝড় হঠাৎ করেই প্রবল আকার ধারণ করল। একসঙ্গে চার-পাঁচজন আযানে দাঁড়িয়েছে। মহা বিপদের সময় আযান দিলে নাকি বিপদ কাটে।আমি আযানের কিছু দৃশ্য ভিডিও করলাম। ফুটেজ হিসাবে তৃষ্ণার কাজে লাগবে। শেষ ইন্টারভ্যু নিতে গেলাম বুড়োমিয়ার।বুড়ো লাঠি হাতে আগের জায়গাতেই বসে আছে। লঞ্চ দুলছে। লঞ্চের সঙ্গে সঙ্গে সেও দুলছে।বুড়ো মিয়া

আমি বুড়ো মিয়ার সামনে বসতে বসতে বললাম, এই নিন আপনার চাদর। এখন খুশি? বুড়ো বলল, চাদর দিয়ে কী করব! লঞ্চ যাবে তলায়ে।ভয় পাচ্ছেন? ভয় পাব কোন দুঃখে? অনেকদিন বাঁচলাম। একজীবনে যা দেখার সবই দেখছি। খালি উড়োজাহাজে উঠি নাই।এই নিয়ে কি আফসোস আছে? সামান্য আছে।রাতে তো কিছু খান নাই। ক্ষুধা লাগে নাই?

বেজায় ভুখ লাগছে। ভুখ কঠিন জিনিস। আপনারে বলতে লজ্জা নাই, আমার স্ত্রী মারা গিয়েছিলেন শেষরাতে। দুপুরে এমন ভুখ লাগছে। কাউরে কিছু বলতে পারি না। বাড়িভর্তি আত্মীয়স্বজন। কান্দাকাটি চলছে। শেষে না পাইরা বাজারে এক ভাতের হোটেলে ভাত খাইলাম। আমার মনে হয় আমার জীবনের সবচেয়ে মজার খানা ছিল সেইটা।আইটেম কী ছিল মনে আছে?

মনে অবশ্যই আছে। শিং, মাছ আলু দিয়া ব্লানছে। ইলিশ মাছের ডিম পটল দিয়ে। কঁঠালের বিচি। আর হিন্দল দিয়ে একটা ভর্তা বানায়েছে, এমন স্বাদের ভর্তা বেহেশতে আছে কি না কে জানে।বেহেশতের খাওয়া খাদ্য কেমন হবে বলে আপনার ধারণা? বৃদ্ধ দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মুনশি মাওলানার কাছে শুনেছি। আমরার মতো গরিব মানুষের জন্যে খুব ভালো মনে হয় না।মুনশি মাওলানার কাছে কী শুনেছেন?

ধরেন। আপনার সামনে দিয়ে সুন্দর একটা পাখি উইড়া যাইতেছে। সেই পাখির মাংস খাইতে ইচ্ছা হইল, তখনই পাখিটা রোস্ট হইয়া মুখের সামনে ঝুলতে থাকবে। আপনি মাংস খায়া হাড্ডি ফেলবেন সঙ্গে সঙ্গে সেই হাড্ডি পাখি হইয়া উইড়া যাবে।

চলুন খেতে যাই।কই খাব? খাওয়ার ব্যবস্থা আছে।বৃদ্ধকে হাত ধরে তুলছি ঠিক তখনি আতর মিয়া উপস্থিত। তার ভাব-ভঙ্গি বিজয়ীর।আতর বলল, হিমু ভাই ঘটনা শুনেছেন? না।রশিদ খানের অ্যাসিসটেন্ট হামজা দশ হাত পানির নিচে।তুমি ফেলেছ? নিজে নিজেই পা পিছলায়া পড়ছে।ক্ষমতা এখন তোমার হাতে? অবশ্যই। সত্য কথা বলতে কী, ক্ষমতা সবসময় আমার হাতেই ছিল। আর কেউ না বুঝুকি আপনার বুঝার কথা।

আমি হাসলাম। ক্ষমতাধর মানুষের সামনে কারণে অকারণে হাসতে হয়।আতর বলল, এখন আপনারে শেষ বারের মতো জিগাই, লঞ্চ কি ড়ুবাব? সব খবর আপনি এডভান্স পান। এই খবর পাবেন না তা হবে না।আমি নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, এই খবর আমি এখনো পাই নাই। তবে ভাব ভঙ্গিতে মনে হয় ড়ুবে যাবে।কী ভাব ভঙ্গি?

যেসব লঞ্চ, জাহাজ বা বিমানে প্রচুর শিশু থাকে সেগুলি বিচিত্র কোনো কারণে ক্ষতিগ্ৰস্ত হয় না। এই লঞ্চে শিশু নাই বললেই হয়। আমি মাত্র দুজন মাকে দেখেছি তাদের বাচ্চা জড়িয়ে ধরে বসে আছে। মা তাদের জড়িয়ে আছে বলে বাচ্চাগুলি মোটেই ভয় পাচ্ছে না।আজিব দুনিয়া! ঠিক না হিমু ভাই? অবশ্যই আজিব দুনিয়া।

গণ তওবার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তওবা পড়াচ্ছেন পীর কুতুবি। কুতুবি বললেন, হিন্দু ভাইরাও সামিল হয়ে যান। মহাপ্রলয়ের দিনে হিন্দু-মুসলমান কিছু নাই, সব সমান। মানুষ মানুষে সম্পর্কও শেষ। অমুক আমার স্ত্রী, অমুক বোন এইসবও নাই। সবাই অজু করে আসেন। যাদের কাপড়াচোপড় নিয়া সন্দেহ আছে, তারা মাথায় তিন বালতি পানি ঢেলে আসেন। নাপাকি দূর হবে।

শরীফ খান বললেন, একজন ফাঁসির আসামি, তিনটা খুন করেছে, সে আমাদের তওবা পড়াবে এটা কেমন কথা! আর কেউ কি নাই? পীর কুতুবি বললেন, আপনি পড়ান। আপনি তো আমার চেয়ে লোক ভালো। আপনার চেহারা ছবিও খারাপ না। আল্লাহপাকের কাছে চেহারা ছবির দাম আছে।আমি নিয়মকানুন জানি না।

নিয়মকানুন আমি বলে দিব। সূরা ফাতেহা দিয়ে শুরু তারপর দরূদশরিফ পাঠ।আমি দরূদ জানি না।পীর কুতুবি বললেন, আমি বলব। আপনি শুনে শুনে বলবেন। পারবেন না? মঞ্চনাটকে যেমন হয়। আমি প্রমট করব আপনি মূল পাঠ গাইবেন।না পারব না।গণ তওবার আয়োজন চলছে। আমি চলে এসেছি তৃষ্ণার কেবিনে। কেবিনের দরজা-জানালা বন্ধ। টেবিলের ওপর মোমবাতি জ্বলছে। আমি বললাম, মোমবাতি কোথায় পেয়েছে?

তৃষ্ণা বলল, হাবলু নামের ছেলেটা দিয়ে গেছে। অদ্ভুত ছেলে। মহা বিপদের সময় তার মুখভর্তি হাসি। নকল হাসি না, আসল হাসি।আমি বললাম, মহা বিপদের সময় অনেক মানুষই হাসে। তামাশা করে। মজার মজার গল্প করে। ফরাসি বিপ্লবের সময় কী হয়েছিল শোন। একজন অংকবিদ ছিল, নাম মেইনি। রাজপ্রাসাদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ আছে—এই কারণে গিলোটিনে তাঁর মাথা কাটা যাবে। তিনি গিলোটিনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন। উৎসুক জনতা তাকে ঘিরে আছে।

তিনি জনতার দিকে তাকিয়ে হাত নাড়লেন তারপর হাসিমুখে বললেন, আমি আপনাদের একটা ধাঁধা জিজ্ঞেস করব। ধাঁধার উত্তর যিনি দিতে পারবেন তার জন্যে পুরস্কার আছে। ভালো পুরস্কার।সবাই চেঁচিয়ে উঠল, কী পুরস্কার? মেইনি বললেন, আমার কাটা মাথাটা বাড়িতে নিয়ে যাবেন। এই হলো পুরস্কার। চারদিকে হাসির ধুম পড়ে গেল। একসময় জনতা চেঁচাতে লাগল, উনকে ছেড়ে দিন। উনাকে ছেড়ে দিন।তৃষ্ণা বলল, ছেড়ে দেওয়া হলো?

না। যথাসময় গিলোটিনে মাথা কেটে আলাদা করা হলো।তৃষ্ণা বলল, মরবিড গল্প বাদ দাও। মজার গল্প করো। মহা দুর্যোগে মজার মজার গল্প করতে হয়। মরবিড সময়ে আনন্দের গল্প, আর আনন্দের সময়ে মরবিড় গল্প। চা খাবে? না।না বললে হবে না। ফ্লাস্কে চা আছে। এখন আমরা দুজনে মিলে চা খাব।তুমি যে একগাদা খাবার এনেছ তার কি হবে? যথাসময়ে খাবার খাব।যথাসময়টা কখন? তৃষ্ণা সহজ গলায় বলল, লঞ্চ যখন ড়ুবতে শুরু করবে তখন।আমি বললাম, লঞ্চ ড়ুববে?

তৃষ্ণা বলল, হ্যাঁ ড়ুববে। আমার সিক্সথ সেন্স তাই বলছে। আচ্ছা এই প্রসঙ্গ থাক এখন বলো, তুমি কি কখনো কোনো মেয়েকে বলেছ, I love you? না।বলো নি কেন? বলার মতো কাউকে পাও নি? পেয়েছি কিন্তু এই বাক্যটি বলার বিষয়ে নিষেধাজ্ঞা ছিল। আমার বাবা বলে গেছেন দুটি বাক্য কখনোই বলা যাবে না। একটা হলো, I love you. আরেকটা হলো। hate you. তাঁর মতে, দুটি বাক্যের অর্থ একই।তোমার বাবা কী করতেন?

তিনি কিছুই করতেন না। তাঁর একটা স্কুল ছিল। তিনি স্কুলের একমাত্র শিক্ষক ছিলেন। আমি সেই স্কুলের একমাত্র ছাত্র। আমার যা কিছু শিক্ষা সবই বাবার কাছ থেকে।তাঁর স্কুলের নাম কী? মহাপুরুষ বানানোর স্কুল। তিনি তাঁর একমাত্র পুত্রকে মহাপুরুষ বানাতে চেয়েছিলেন।কী বলছি এসব? মহাপুরুষ বানানো যায়? বাবার ধারণা, ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ারের মতো মহাপুরুষও বানানো যায়।তৃষ্ণা বলল, মহাপুরুষরা কী করেন?

মহাপুরুষদের কাজ তো একটাই। মাঝে মাঝে বাণী দেন। ভক্তদের সুন্দর কথা বলেন।তুমি দয়া করে একটা বাণী দাও।মহাপুরুষ হতে পারি নি কাজেই বাণী নেই।তৃষ্ণা হাসতে হাসতে বলল, পুরো বাণী না দিলে অর্ধেক দাও।আমি বললাম, একজন ড়ুবন্ত মানুষের চেতনা থাকে ভাসন্ত।এর মানে কী?

আমি বললাম, মহাপুরুষদের বাণীর কোনো স্পষ্ট অর্থ থাকে না। সবই অস্পষ্ট এবং ধোঁয়াটে। যে যার মতো অর্থ করে নেয়। তুমি তোমার মতো অর্থ করে নাও।তৃষ্ণা বলল, আমি কি আমার সামনে বসে থাকা মহাপুরুষের হাতে হাত রাখতে পারি? আমি কিছু বলার আগেই দরজা ধাক্কা দিয়ে আতর ঢুকল। বাতাসের ঝাপটায় মোমবাতি নিভে গেল। আতর শান্ত গলায় বলল, খারাপ খবর আছে।আমি বললাম, লঞ্চ ড়ুবে যাচ্ছে?

হুঁ।আমি বললাম, তাহলে আমরা ডিনার সেরে ফেলি। তৃষ্ণা তুমি টিফিন কেরিয়ার আতরের কাছে দাও। খাবার গরম করে আনুক। এই ফাঁকে আমরা চা খাব।আতর বিক্ষিত গলায় বললেন, এখন খানা খাবেন? খানা মুখে রুচবে? অবশ্যই রুচবে। দুর্যোগের সময় ক্ষুধা বেশি পায়। মুখের টেস্টবাড়ি খুব এনার্জেটিক থাকে।আতর টিফিন কেরিয়ার নিয়ে চলে গেল। তৃষ্ণা বলল, তুমি কি টাইটানিক ছবিটা দেখেছ?

আমি না-সূচক মাথা নাড়ুলাম।তৃষ্ণা বলল, ঐ ছবিতে দেখেছি টাইটানিক যখন ভুবছে তখন মিউজিশিয়ানরা অদ্ভুত সুন্দর মিউজিক করছিল।আমি বললাম, ছবিতে করছিল। বাস্তবে ওরা প্ৰাণ বাঁচানোর জন্যে ছোটাছুটি করছিল।তৃষ্ণা বলল, আমাদের জীবন ছবির মতো হলে ভালো হতো। তাই না? তৃষ্ণার কথা শেষ হওয়ার আগেই হঠাৎ করে বাতাস বৃষ্টি দুইই থেমে গেল। তৃষ্ণা মোমবাতি জ্বালাল। বাতির শিখা কাঁপছে না। স্থির হয়ে আছে।

তৃষ্ণা বলল, অবাক কাণ্ড। ঝড় থেমে গেছে।আমি নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, লক্ষণ খুবই খারাপ। প্রবল বিপর্যয়ের আগে আগে প্রকৃতি শান্ত পরিবেশ তৈরি করতে ভালোবাসে। হিরোশিমায় অ্যাটম বোমা পড়ার আগের সময়টা ছিল অপূর্ব সুন্দর। কন্যা-সুন্দর আলোয় শহর ভেসে যাচ্ছিল। গাছে গাছে পাখি ডাকছিল। মিষ্টি বাতাস বইছিল।তোমাকে কে বলেই?

বোমার হাত থেকে বেঁচে যাওয়া একজন জাপানির আত্মকাহিনী থেকে জেনেছি।কাজেই আমরা ড়ুবছি? হ্যাঁ। তবে আমাদের হাতে সময় আছে। আমরা ভালো মতো ডিনার শেষ করব। যা ঘটার তারপর ঘটবে।হাবলু এসে ঢুকল। তার মুখভর্তি হাসি।আমি বললাম, ঘটনা কিরে হাবলু?

হাবলু সব দাঁত বের করে বলল, লঞ্চ ড়ুবতাছে স্যার। একতলায় কোমর পানি। কান্নাকাটির ধুম পড়ছে।আমি বললাম, খুব আনন্দ পাচ্ছ, তাই না হাবলু? হাবলু হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ল।তৃষ্ণা বলল, হাবলু সাঁতার জানো? হাবলু বলল, জে-না। বলেই খিকখিক করে হাসি।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *