হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-৯)

গুলী লেগে আবু ভাইয়ের ডান হাতের দুটি আঙুল উড়ে গেল। আবু ভাই তারপর একেবারে ক্ষেপে গেলেন। পাঁচ দিন পরই আবার দল নিয়ে এলেন মেথিকান্দায়। সেবারও দুটি ছেলে মারা গেলরাতদিন কড়া পাহারা। গুজব রটে গেল, মেথিকান্দা মুক্তিবাহিনীর মৃত্যুকূপ।

শ্যামল ছায়া সতীশ বলত, “যদি বলেন তাহলে গভর্ণর হাউসে বােমা মেরে আসব, কিন্তু মেথিকান্দায় যাব না, ওরে বাপ রে।’  কিন্তু আবু ভাইয়ের মুখে অন্য কথা, মেথিকান্দা আমিই কজা করব। যদি না পারি, তাহলে গু খাই। চতুর্থ বারের মতাে তিনি বিরাট দল নিয়ে গেলেন সেখানে। সবাই ফিরল, আৰু ভাই ফিরলেন না পঞ্চম বারের মতাে যাচ্ছি আমরা।

আমার কি ভয় লাগছে নাকি? ছিঃ হুমায়ুন ছিঃ, একটির পর একটি জায়গা তােমাদের দখলে চলে আসছে, মেথিকান্দায় ঘাঁটি করে এক বার যদি সােনারদির রেলওয়ে ব্রীজ উড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে বিরাট একটা অংশ তােমাদের হয়ে যাবে। আর এত ভয় পাওয়ারই-বা কী? মৃত্যুকে এত ভয় পেলে চলে?’ একটা গল্প আছে নাএক নাবিককে এক জন সংসারী লােক জিজ্ঞেস করল, আপনার বাবা কোথায় মারা গেছিলেন?” 

‘তিনি নাবিক ছিলেন। সমুদ্রে জাহাজডুবি হয়ে মরেছেন। 

আর আপনার দাদা? ‘তিনিও ছিলেন নাবিক। মরেছেন জাহাজডুবিতে। 

সংসারী লােকটি আৎকে উঠে বলল, “কী সর্বনাশ! আপনিও তাে মশাই নাবিক। আপনিও তাে জাহাজডুবি হয়ে মরবেন! 

নাবিকটি বলল, তা হয়তাে মরব। কিন্তু নাবিক না হয়েও আপনার দাদা ” 

শ্যামল ছায়া (পর্ব-৯)

বেশ বড়াে দল আমাদের। সবাই ছড়িয়েছিটিয়ে আছি। দলের নেতা হচ্ছেন আবু ভাই। কথা আছে পশ্চিম দিক থেকে আৰু ভাই প্রথম গুলী চালাতে শুরু করবেন, তার পরই মাথা নিচু করে খালের ভেতর দিয়ে চলে আসবেন আমাদের কাছে। আমরা সবাই কে বসে আছি। আনিস আর রমজান উত্তরে একটা মাটির টিবির আড়ালে চমৎকার পজিশন নিয়েছে। রমজান খুব ভালাে মেশিনগানার। বসে আছি তাে আছিই, আবু ভাইয়ের গুলী কার কোনাে লক্ষণই দেখি না। সবাই অধৈর্য হয়ে উঠেছি।

আচমকা আমাদের উপর ঝাঁকে ঝাঁকে গুলীবর্ষণ হতে লাগল। আমরা হতবুদ্ধি। অবশ্যি সবারই পজিশন ভালাে। গায়ে গুলী লাগবার প্রশ্নই ওঠে না। তবু একদল ভয় পেয়ে পালিয়ে গেল আর তার পরই মর্টারে গােলাবর্ষণ হতে লাগল। আমাদের দিকে সবাই চুপচাপ। হতভম্ভ হয়ে গিয়েছি। রমজান মিয়া এই সময় উচু গলায় চেচিয়ে উঠল, ‘কেউ ভয় পাবেন , কেউ ভয় পাবেন না।’

শ্যামল ছায়া (পর্ব-৯)

তার পরই রমজান মিয়ার মেশিনগানের ক্যাটক্যাট শব্দ শােনা যেতে লাগল। সতীশকে বললাম, ‘শুরু কর দেখি, আল্লাহ্ ভরসা।’ আর তখনি মর্টারের গােলা এসে পড়ল। বারুদের গন্ধ ও ধোঁয়ায় চারিদিক আচ্ছন্ন হয়ে গেল। ধোঁয়া পরিষ্কার হতেই দেখি আমি আনিসের কাঁধে শুয়ে। আনিস প্রাণপণে দৌড়াচ্ছে। সবাই যখন পালিয়েছে, সে তখন জীবন তুচ্ছ করে খোঁজ নিতে এসেছে আমার। মেথিকান্দার সেই যুদ্ধে আমাদের চার জন ছেলে মারা গেল। রমজান মিয়ার মতাে দুর্ধর্ষ যােদ্ধা হারালাম। তৃতীয় দফায় আবার এলেন। সেবারও তাই হল। মিলিটারিরা তত দিনে মেথিকান্দাকে দুর্ভেদ্য দুর্গে পরিণত করিয়েছে। চারিদিকে বড়াে বড়াে বাঙ্কারবিছানায় শুয়ে মরেছেন, ঠিক নয় কি? 

 ‘আপনার বাবাও বিছানাতেই মরেছেন, নয় কি? “হাঁ, হাসপাতালে। ‘আপনিও সেইভাবেই মরবেন। তাহলে বেশকমটা হল কোথায়? 

আসল কথা, আমার ভয় লাগছে। সাহস সঞ্চয়ের চেষ্টা করছি। ভয় পাওয়াতে লজ্জার কিছু আছে কি? আমার লজ্জা পাওয়ার কিছু নেই, এই মনে করে গুনগুন করে গান গাইতে চেষ্টা করলাম‘সেদিন দুজনে। শিস দিয়ে আমি বেশ ভালাে সুর তুলতে পারি।

 

Read more

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-১০)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *