হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-১১)

‘ভেরি গুড নিউজটা পরশু শােনাবমিষ্টি যােগাড় করি আগে, তার পর। পরশু সন্ধ্যায় সবাইকে মিষ্টি খাওয়াব।সেই গুড নিউজটি শােনা হয় নিদারুণ ব্যস্ততা শুরু হল হঠাৎ। ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়লাম সবাই। এবং সবশেষে আবু ভাই গেলেন মেথিকান্দা। | আবু ভাইয়ের লাশ হাসান আলি বয়ে এনেছিল। বিশেষ কোনাে কথাবার্তা বলে নিহাউমাউ করে কাঁদেও নি। অথচ সবাই সেদিন বুঝেছিলাম, হাসান আলির মন ভেঙে গেছে।

শ্যামল ছায়ামজিদ ডাকল, পা চালিয়ে হুমায়ুন ভাই, আপনি বারবার পিছিয়ে পড়ছেন! হাসান আলি দেখি হনহন করে এগিয়ে চলছে। এত চুপচাপ থাকে কেন লােকটা?

 হাসান আলি চেয়ারম্যান সাব কইলেন, হাসান আলি রাজাকার হইয়া পড়। সপুর টাকা মাসমাইনা, তার সাথে খোরাকি আর কাপড়। 

চেয়ারম্যান সাব আমার বাপের চেয়ে বেশি। নেকক্ত পরহেজগার লােক। তার ঘরের খাইয়া এত বড়াে হইলাম। আমাচামড়া দিয়া চেয়ারম্যান সাহেবের জুতা বানাইলেও ঋণ শােধ হয় না। তাঁর কথা ফেলতে পারি না। রাজাকার হইলাম। 

জুম্মাবাদ চেয়ারম্যান সাব আর তাঁর বিবিরে কদমবুসি কইরা গাঁটরি মাথায় লইলাম। চেয়ারম্যান সাব কইলেন, আল্লাহর হাতে সােপর্দ হাসান আলি, আল্লাহু নেকবান। সাক্ষা দিলে কাম করবা। হালাল পয়সা খাইবা।” 

যাওনের আগে মসজিদে গেলাম দোয়া মাঙতে। গিয়া দেখি মাবুদে এলাহিমসজিদের মাথার উপর শকুন বইয়া আছে। দুই কুড়ির উপরে বয়স আমার, এত বড়াে শকুন দেখি নাই। মনডা বড়াে টানল। বুকের মধ্যে ছ্যাৎ কইরা উঠল।

শ্যামল ছায়া (পর্ব-১১) 

আরাে একবার মসজিদের উপরে শকুন বইছিল। আমি তখন ছােড়। চেয়ারম্যান সাহেবের বাড়িতে গরুরাখালের কাম করি। বাপজান কইলেন, ‘হাছান, শকুন বইছে মসজিদে। বড়াে খারাপ নিশানা। কেয়ামত নজদিক। বালামুসিবত আইব। বাপজানের কথা মিছা হয় নাই। কলেরায় দেশটা সাফা হইয়া গেল। 

মসজিদে মওলানা সাৰ কইলেন, হাসান, তুমি রাজাকার হইতছি শুনলাম। ‘হ মৌলানা সাব। দোয়া মাঙতে আইছি। ‘বালা করছ। পাকিস্তানের খেদমত কর। কিন্তু হাসান আলি একটা কথা। 

কী কথা মৌলানা সাব‘শুনতাছি রাজাকার বড়াে অত্যাচার করে। মানুষ মারে, লুটপাট করে, ঘর জ্বালায়। দেইখ বাবা সাবধান। আত্মাহুর কাছে জবাবদিহি হইবা। আখেরাতে নবীজীর শেফায়ত পাইবা না।’ 

মনডা খারাপ হইল। কামড় বােধহয় ভুল হইল। তখনও আমরার গ্রামের মধ্যে রাজাকারদল হয় নাই। আমরা হইলাম পরথম দল। সাত দিন হইল ট্রেনিং। লেফট রাইট, লেফট রাইট। বন্দুক সাফ করণের কায়দা শিখলাম, গুলী চালাইতে শিখলাম। বায়ােনেট চারজ করতে শিখলাম। মিলিটারিরা যত্ব কইরা সব শিখাইল। তারা সব সময় কইত ‘তুম সাচ্চা পাকিস্তানী, মুক্তিবাহিনী একদম সাফা কর দো!’ মনডার মধ্যে শান্তি পাই না। বুকটা কান্দে। রাইতে ঘুম হয় না। আমরার সাথে ছিল রাধানগরের কেরামত মওলা। সে আছিল রাজাকার কমাণ্ডার। আহা, ফেরেস্তার মতাে আদমি। আর মারফতি গান যখন গাইত, চউক্ষে পানি রাখন যাইত না। মাঝেমধ্যেই কেরামত ভাইয়ের গান শুনতাম

এ মন দেহের ভিতরে অচিন পাখি অচিন সুরে গায় 

তার নাগল পাওয়া দায়” যখন হিন্দুর ঘরে আগুন দেওয়া শুরু হইল, কেরামত ভাই কইলেন, ‘এইটা কী কাণ্ড। কোনাে দোষ নাই, কিচ্ছু নাইঘরে কেন আগুন দিমু? ওস্তাদজী কইলেন‘ও তাে ইন্দু হায়, গাদ্দার হ্যায়‘ 

কেরামত ভাইয়ের সাহসের সীমা নাই। বুক ফুলাইয়া কইল, ‘আগুন নেই দে।’ | ওস্তাদজী কইলেন, ‘আশু হামারা সাথ।’ কেরামত ভাই গেলেন। দুই দিন পরে তার লাশ নদীতে ভাইস্যা উঠল। ইয়া মাবুদে এলাহি, ইয়া পরওয়ারদেগার, কী দেখলাম, কী দেখলাম। মাথা একেবারে বেঠিক হইয়া গেল। মিলিটারি যা করে, তাই করি।

শ্যামল ছায়া (পর্ব-১১) 

নিজের হাতে আগুন লাগাইলাম সতীশ পালের বাড়ি, কানু চক্রবর্তীর বাড়ি, পণ্ডিত মশাইয়ের বাড়ি। ইস, মনে উঠলেই কইলজাটা পূড়ায়। | শেষমেষ মিলিটারিরা শরাফত সাহেবের বড় পুলাডারে ধইরা আনল। আহা রে, কী কান্দন ছেলের! এখনাে চউক্ষে আসে। বি. এ. পাশ দিয়া এম. এ. পড়ত। যেমন সুন্দর চেহারা, তেমন আচারব্যাভার। ভদ্রলােকের ছেলে যেমন হওনের তেমন। এক দিন বাজারে বইয়া আছি। শরাফত সাহেবের পুলাডার সাথে দেখা।

আমারে দেইকা কইল, ‘হাছান ভাই, ভাল আছেন? আমি একটা কামলা মানুষ। আমারে আপনে কওনের কী দরকার? কিন্তু সেই ছেলে শিক্ষিত হইলে কী হইব, মড়া ছিল ফিরিশতার। আহা রে, বন্দুকের সামনে দাঁড়াইয়া কেমন কালা হইয়া গেল চেহারাটা। আমি একটু দূরে খাড়াইয়া আল্লাহ্ রসুলের নাম নিতাছি। আমার মাথার গুণ্ডগােল হইয়া গেছে। কী করতাম ভাইবা পাই না। শেষকালে ছেলে 

আমার দিকে চাইয়া কইল, হাসান ভাই আমারে বাঁচান। ক্যাপ্টেন সায়েবের পাও জড়াইয়া ধরলাম। লাভ হইল না। আহা রে, ভাই রে আমার। কইলজাড়া পুড়ায়। আমি একটা কুত্তার বাচ্চা। কিছু করবার পারলাম না। 

 

Read More

হুমায়ুন আহমদ এর শ্যামল ছায়া (পর্ব-১২)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *