মারতে আসে আমাকে বেশ লােক দেখি তুমি। ফুরুৎ ফুরুৎ করে নাক ডাকতে পারবে, আর আমরা বলতেও পারব না? করলে দোষ নয়, বললে দেশ ?
ঠিক আমার বাবার মতাে। রাত–দিন কারণে–অকারণে চেঁচাচ্ছেন, আর সেও কি চেচানি। রাস্তার মােড় থেকে শুনে লােকে খবর নিতে আসে বাসায় কী হয়েছে। মা এক দিন বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘কী রাত–দিন চেঁচাও!” অমনি বাবার রাগ ধরে গেল। ঘাড়টাড় ফুলিয়ে বিকট চিৎকার, ‘কী, আমি চেচাই?
মা সহজ সুরে বললেন, ‘এখন কী করছ, চেঁচাচ্ছ না? ‘চুপ রাও। একদম চুপ।‘
বাবার কথা মনে হলেই এই হাসির কথাটা মনে পড়ে। এমন সব ছেলেমানুষী ছিল স্ত্রীর মধ্যে। এক বার খেয়াল হল, আমাদের সবাইকে নিয়ে বেড়াতে যাবেন সীতাকুণ্ড তাঁর এক বন্ধুর বাড়ি। দু’ মাস ধরে চলল আয়ােজন। বাবার ব্যস্ততার সীমা নেই।
যাবার দিন এক ঘন্টা আগে স্টেশনে নিয়ে গেলেন সবাইকে, আর সে কি চেঁচানি, এটা ফেলে এসেছ ওটা ফেলে এসেছ।’ ট্রেন এল, সবাই উঠলাম। পাহাড়প্রমাণ মাল তােলা হল। একসময় ট্রেন ছেড়ে দিল, দেখা গেল বাবা উঠতে পারেন নি। প্রাণপণে দৌড়াচ্ছেন। হাতের কাছে যে–কোনাে একটা কামরায় উঠে বের করেছে। বিস্বাদ তেতাে চা—তাতে চুমুক দিয়ে রহমান চেঁচিয়ে উঠল, ‘ফাষ্ট ক্লাস চা। আর তখনি কেন জানি আমার মনে হল, রহমানের কিছু একটা হবে। হলও তাই। হমায়ুন ভাইয়ের বেলাও কি তাই হবে।
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৫)
হুমায়ুন ভাইয়ের ঢাকার বাসার ঠিকানা আছে আমার কাছে। ১০৭ বাবর বােড়, মােহাম্মদপুর, ঢাকা–৭। দোতলায় থাকেন তাঁর বাবা–মা। যদি সত্যি কিছু হয়, তাহলে এই ঠিকানায় খবর দিতে আমি নিজেই যাব। তাঁর মা নিশ্চয়ই জানতে চাইবেন তাঁর ছেলে কী ভাবে থাকত, কী করত। সব বলব আমি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে।
তাঁরা হয়তাে ছেলে কোথায় মারা গেছে, দেখতে চাইবেন। আমি নিজেই ভাঁদের নিয়ে আসব। আমরা আজ যে–পথে এসেছি, সেই পথেই আনব। বলব, ‘রাতটা ছিল অন্ধকার। নক্ষত্রের আলােয় আলােয় এসেছি। পথে মােক্তার সাহেবের বাড়িতে ভাত খেয়েছি।‘ হুমায়ূন ভাইয়ের মা হয়তাে মােক্তার সাহেবকে দেখতে চাইবেন। মােক্তার সাহেবকে হয়তাে তিনি বলবেন, আপনি আমার ছেলেকে শেষ বারের মতাে ভাত খাইয়েছেন। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক।
‘ক্যান কান্দেন?
আমাকে যে–ছেলেটি বাতাস করছিল, সে অবাক হয়ে আমার কাঁদবার কারণ জানতে চাইছে। ইচ্ছে করে কি আর কাঁদছি? হঠাৎ চোখে জল এল।
মাথার মধ্যে পানি দিবেন একটু? ‘না।’ ‘মাথাটা চিপা দিমু?” ‘না-না।’
সে দেখি আমার সেবা না–করে ছাড়বে না। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগল। কিন্তু আমার সহ্য হচ্ছে না। আমি তাে দিব্যি আরাম করে শুয়ে আছি। আর ওরা নিশ্চয়ই কাদা ভেঙে দ্রুত গতিতে এগােচ্ছে। রামদিয়া থেকে আরাে দু’ মাইল উত্তরে মেথিকান্দা। সেখানে তারা হাঁটা–পথে যাবে, না নৌকায়?
শ্যামল ছায়া (পর্ব-১৫)
টুনু মিয়ার দলে মােট কত জন ছেলে আছে? হুমায়ুন ভাই এক বার বলেছিলেন, কিন্তু এখন দেখি ভুলে বসে আছি। ওদের সাথে দু ইঞ্চি মর্টারও আছে। মেথিকান্দা আজ নিশ্চয়ই দখল হবে। সুজাতলির রেলওয়ে পুলও উড়িয়ে দেওয়া হবে। সমস্ত অংটা বিচ্ছিন্ন করে দিয়ে স্বাধীন বাংলার ফ্যাগ উড়িয়ে দেব। ফাইন। কে জানে, এত গােলমালে কেউ কি আর জাতীয় পতাকার কথাটা মনে রাখবে?
লােকজনের কাছে নিশ্চয়ই স্বাধীন বাংলার ফ্ল্যাগ পাওয়া যাবে। আগে তাে। ঘরে ঘরে ছিল। মিলিটারি আসবার পর সবাই হয় পুড়িয়ে ফেলেছে, নয়তাে এমন জায়গায় লুকিয়েছে যে ইদুরে খেয়ে গিয়েছে। এমন দিনে একটা ঝকঝকে নতুন ফ্ল্যাগ চাই।।
এত দিন শুধু ছােটখাটো হামলা করেছি। বিভিন্ন থানায় ছােটখাটো খণ্ডযুদ্ধের
পর রাতারাতি সরে এসেছি নিরাপদ স্থানে। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল ব্যতিব্যস্ত করে রাখা। মুহুর্তের জন্যেও যেন শান্তির ঘুম না দিতে পারে। কিন্তু আজকের ব্যাপার না। আজ আমরা খুঁটি গেড়ে বসব। আহা, আবার চোখে জল আসে কেন?
Read More