‘কাজকর্ম জানি যে করব? কাগজে কলমে এক প্লাস্টিক কোম্পানির এ্যাডভাইজার । মাসে দশ হাজার টাকা দিয়ে যায় । তাও আমার কাছে না–বাবার কাছে’। ‘তুই প্লাস্টিক কোম্পানির এ্যাডভাইজার? কি এ্যাডভাইজ করব? আমি প্লাস্টিকের জানি কি? সকালবেলা ওদের গাড়ি এসে নিয়ে যায় । আমার একটা ঘর আছে, ঐখানে বসে তিন চার কাপ কফি খাই, চলে আসি । এখন বল দোস্ত কি জন্যে এসেছিস ?
টাকা ধার চাইতে এলে কিছু করতে পারব না । হাতে একটা ফুটো পয়সাও নাই । বিশ্বাস কর । বন্ধুবান্ধবরা আসে চাকরি বাকরি নাই–বড় মায়া লাগে । চাকরির ব্যবস্থা তো দূরের কথা, ঘরে নিয়ে যে এককাপ চা খাওয়াব সেই উপায় নেই. আমার কোন বন্ধুবান্ধব ঘরে ঢুকতে পারবে না। বাবার হুকুম । কি জন্যে এসেছিস তাড়াতাড়ি বলে চলে যা দোস্ত । বাবা যে কোন সময় চলে আসবে । আজকাল তিনটার সময় আসে । দুই ঘন্টা ঘুমিয়ে আবার বিদায় । তিনটা বোধহয় বাজে । তুই কোন সুপারিশ নিয়ে আসিসনি তো?
‘না।’
‘বাঁচালি । বন্ধুবান্ধব কেউ এলেই বুকে ধাক্কা লাগে । মনে হয় সুপারিশ নিয়ে এসেছে । তোর ব্যাপারটা কি ?’
আমি গলার স্বর নিচু করে বললাম, এক জায়গায় যাবি আমার সাথে?
‘কোথায়?’’
‘জায়গার নাম ড্রেজার কলোনী । নারায়নগঞ্জের কাছাকাছি।’
‘সেখানে কি?’
দরজার ওপাশে খন্ড-৯
‘খুব ইন্টারেস্টিং জায়গা । ড্রেজার দিয়ে নদী খুঁড়ে সেই বালি জমা করে কলোনী বানানো হয়েছে। চারদিকে চিক চিক করছে বালি। চাঁদের আলো যখন সেই বালিতে পড়ে–অসাধারণ দৃশ্য আজ আবার পূর্ণিমা পড়ে গেল।’ ‘বলিস কি?’
জহিরের চোখ চকচক করতে লাগল । আমি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললাম, ইন্টারেস্টিং একটা প্লান করে রেখেছি । রফিককে তো চিনিস । ও থাকে ড্রেজার কলোনীতে । রফিক নদীর কাছাকাছি দুটা গর্ত খুঁড়ে রাখবে । গলা পর্যন্ত হাইটে গর্ত।
আমরা দু’জন গর্তে ঢুকে বসে থাকব । ঠেসে বালি দেয়া হবে । শুধু দুজনের মাথা বের হয়ে থাকবে ।
জহিরের চোখের ঝকঝকে ভাব আরো বাড়ল । কয়েকবার ঢোঁক গিলল। তার ঢোক গেলা মাছের টোপ গেলার মত । সে ফিসফিস করে বলল, এক্সইটিং হবে বলে মনে হচ্ছে ।
আমি গলার স্বর আরো নিচু করে বললাম, অবশ্যই এক্সইটিং । তাছাড়া জিনিসটাও খুবই সায়েন্টিফিক ।
‘এর মধ্যে সায়েন্টিফিক আবার কি?’
‘পুকুরে গোসল করার সময় আমরা কি করি? সারা শরীর পানিতে ডুবিয়ে মাথা বের করে রাখি। এখানেও তাই করব । সারা শরীর মাটিতে ডুবিয়ে মাথা বের করে রাখব।’
‘তাতে লাভ কি?’
মাটির সঙ্গে একাত্মতা।’
‘এটা কি তোর অরিজিনাল আইডিয়া ?’
‘না, এই আইডিয়া ধার করা । জগদীশচন্দ্র বসু এই জিনিস করতেন । শিলাইদেহে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কুঠিবাড়িতে যখন বেড়াতে যেতেন তখনি পদ্মার চরে গর্ত খুড়ে মাথা বের করে পড়ে থাকতেন । তাঁর ধারণা, এত শরীরে বায়োকারেন্ট তৈরি হয়। সেই বায়োকারেন্টের অনেক উপকারী দিক আছে ।’
দরজার ওপাশে খন্ড-৯
জহির আরো দু’বার ঢোঁক গিলে ফিসফিস করে বলল, ইন্টারেস্টিং হবে তো? অবশ্যই ইন্টারেস্টিং । কল্পনায় দৃশ্যটা দেখ। ধূ ধূ করছে বালি । মাথার উপরে পূর্ণ চন্দ্র । জোছনার বান ডেকেছে । কোথাও জনমানব নেই । চাঁদের আলোয় শুধু দুটা মাথা দেখা যাচ্ছে । দুটা মাথা না, একটা মাথা। শুধু তোরটা দেখা যাচ্ছে । আমি গর্তে ঢুকব না । ঘটনাটা কোন কারণে লিক হয়ে পড়লে বাবা সত্যি সত্যি আমাকে গর্তে ঢুকিয়ে মাটিচাপা দিয়ে দিবে । মাথা বের করে রাখার কনসেশান দেবে না । রিস্ক নেয়া ঠিক হবে না । তবে আমি অবজার্ভার হিসেবে থাকব । চল যাই।’
আমরা নারায়নগঞ্জের বাসে উঠে পড়লাম । জহির বলল, আজ সত্যি সত্যি জ্যোৎস্না তো। ‘সত্যি জ্যোৎস্না । পঞ্জিকা দেখে বের হয়েছি।’ ব্যাপারটা যেন কল্পনা করে রেখেছিলাম তেমন হল না । দেখা গেলে ড্রেজার কলোনি জায়গাটা জনবহুল । বাড়িঘর গিজগিজ করছে ।
Read more
হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-১০
