এর মধ্যেই একটা ফাঁকা জায়গায় রফিক দুটা গর্ত খুঁড়ে বিরস মুখে বসে আছে । সে একা না, তার সঙ্গে আরো লোকজন আছে । লোকজন তাকে বিরক্ত করে মারছে ।প্রশ্নে প্রশ্নে ব্যতিব্যস্ত করে ফেলছে-
‘এইখানে বিষয় কি ভাইজান? লাশ পুঁতা হবে?
‘লাশ কি দুইটা ?’
রফিক সব প্রশ্নের জবাবে হাই তুলছে । আমাদের দেখে নিশ্চিত হয়ে উঠে দাঁড়াল । যন্ত্রের মত গলায় বলল, মা’র শরীর খারাপ, আমি চলে যাব ।
কি ঘটতে যাচ্ছে তা নিয়ে তার কোন মাথাব্যথা নেই । জহির শুরু থেকে না না করছিল-গর্ত দেখে তার উৎসাহ মাথাচাড়া দিয়ে উঠল ।
সে আমার কানে কানে বলল, নিয়মটা কি ? নেংটো হয়ে ঢুকব, না আন্ডারওয়্যার থাকবে ? ’নেংটো হয়ে ঢোকার নিয়ম । তুই ইচ্ছা করলে আন্ডারওয়্যার রাখতে পারিস।’ কোন প্রয়োজন দেখছি না। করব যখন নিয়ম মাফিকই করব । নাচতে নেমে ঘোমটা দেয়ার কোন মানে হয় না । হু কেয়ারস?’
দরজার ওপাশে খন্ড-১০
আমরা তৎক্ষণাৎ গর্তে ঢুকলাম না । রাত এগারোটার দিকে লোকজন কমে যাবার পর ঢুকলাম । রফিক বিরস মুখে কোদাল দিয়ে বালি ফেলতে ফেলতে বলল, তোদের মাটিচাপা দিয়ে বাসায় চলে যাব । মা’র শরীর খুবই খারাপ । আমার মোটেই ভাল লাগছে না । মনে হচ্ছে লোকজন জমে একটা কেলেঙ্কারি হবে ।
জহির বলল, তুই চলে যা । আমরা ম্যানেজ করে নেব । শুধু ভোরবেলা এসে আমাদের মাটি খুঁড়ে বের করিস ।
রফিক বলল তোদের শার্ট-প্যান্ট কি করব? বাসায় নিয়ে যাব না পাশে রেখে দেব ?জহির বলল, শার্ট-প্যান্ট আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দে । আমার এই সবের দরকার নেই। আমি প্রকৃতির সন্তান। মাটিতে গর্ত খুঁড়ে বসে থাকা যে এমন এক্সাইটিং আগে জানতাম না । গায়ে কাঁটা দিচ্ছে ।
রাত বারোটার মধ্যে আমাদের চারপাশে হাজার খানিক লোক জমে গেল । শুধু মানুষ না, পশুরাও ব্যাপারটায় খুব উৎসাহ পাচ্ছে । দুটা কুকুর আমাদের ঘিরে ক্রমাগত ঘেউ ঘেউ করছে । লোকজনের প্রশ্নেরও কোন সীমা নেই ।
‘ভাই সাহেব,আপনারা কে?’
‘এইখানে কি করতেছেন?’
‘জিন্দা কবর নিয়েছেন?’
‘আপনারা থাকেন কোথায়?’
আমি কোন প্রশ্নের জবাব দিচ্ছি না তবে জহির প্রতিটি প্রশ্নের জবাব দিচ্ছে। উচ্চশ্রেণীর দার্শনিক জবাব । রাত একটার দিকে মনে হল পুরো নারায়নগঞ্জের মানুষ জড়ো হয়েছে । বিকট হৈ চৈ । জহির বলছে-আপনারা হৈ চৈ করছেন কেন? নিরবতা কাম্য। দয়া করে নিরব থাকুন । প্রকৃতি নিরবতা পছন্দ করে । দেড়টার দেকে পুলিশ চলে এল । ওসি সাহেব দু’জন কনস্টেবল নিয়ে নিজেই এসেছেন । ওসিরা সহজভাবে কোন কথা বলতে পারেন না । ইনিও পারলের না । হুংকার দিলেন – কি হচ্ছে এসব? আপনারা কে? জহির শীতল গলায় বলল, অত্যন্ত জটিল প্রশ্ন? মানুষ এই ফিলসফিক প্রশ্নের মীমাংসা গত দুহাজার বছর ধরে করার চেষ্টা করছে। মীমাংসা হয়নি।
দরজার ওপাশে খন্ড-১০
আপনারা আন্ডার এ্যারেস্ট। উঠে আসুন ।
জহির হিমশীতল গলায় বলল, আন্ডার অ্যারেস্ট মানে? মশকরা করছেন? আমরা দেশের কোন আইনটি ভঙ্গ করেছি দয়া করে বলুন । বাংলাদেশ পেনাল কোডের কোন ধারায় আছে যে গর্ত খুঁড়ে মাটিতে বসে থাকা যাবে না? আমরা যদি পানিতে শরীর ডুবিয়ে থাকতে পারি, তাহলে মাটিতেও পারি।
ওসি সাহেব যুক্তি-তর্কে গেলেন না । কনস্টেবল দু’জনকে হুকুম দিলেন আমাদের টেনে তুলতে । জহির হুংকার দিয়ে বলল, আমি কে পরিচয় দিলে আপনি কিন্ত্ত ভাই প্যান্ট নষ্ট করে ফেলবেন প্যান্ট পাঠাতে হবে ধোপার কাছে । ডবল চার্জ নেবে। ওসি সাহেব সেপাইকে বললেন, এই পাগলের গালে একটা চড় দাও। সেপাই সঙ্গে সঙ্গে ঝেড়ে লাথি বসিয়ে দিল । জহির হুমড়ি খেয়ে পড়ে গিয়েছিল । বালি ঝাড়তে ঝাড়তে বলল, বুঝলেন ভাই সাহেব, আপনাকে এমন জায়গায় ট্রান্সফার করা হবে যে এক পয়সা ঘুষ পাবেন না । হালুয়া টাইট হয়ে যাবে । একটা টেলিফোন নাম্বার দিচ্ছি ।
টেলিফোন করে জেনে নিন আমি কে ? পরিচয় জানার সঙ্গে সঙ্গে আদরে আদরে প্রাণ অতিষ্ঠ করে ফেলবেন । ওসি সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, পুলিশের আদর কত প্রকার ও কি কি – কিছুক্ষণের মধ্যেই জানতে পারবেন । আমরা থানার দিকে রওনা হলাম। উৎসাহ জনতার বড় একটা অংশ আসছে আমাদের পিছু পিছু । জহির আমার কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, যতটা এক্সাইটিং হবে ভেবেছিলাম তারচে দশগুন এক্সাইটিং হয়েছে। এই জাতীয় প্রোগ্রাম আরো ঘন ঘন করতে হবে । নেক্সট পূর্ণিমা কবে ? পূর্ণিমাগুলি একমাস পর পর আসে, না পনের দিন পর পর ? সিস্টেমটা কি?
দরজার ওপাশে খন্ড-১০
তেল ও জ্বালানী মন্ত্রী ব্যারিষ্টার মোবারক হোসেন সত্যি সত্যি জহিরের বাবা এই পরিচয় পাওয়ার পর ওসি সাহেবের মুখের হা তেলাপিয়া মাছের মত বড় হতে লাগল এবং ছোট হতে লাগল । তখন অধিক শোকে ওসি সাহেব পাথরের মত হয়ে গেলেন ।
খানিকক্ষণ জহিরের দিকে তাকান, খানিকক্ষণ আমার দিকে তাকান । জহির বলল,আপনি শুধু শুধু ভয় পাচ্ছেন ওসি সাহেব, আমার বাবা বাইরের মানুষের কাছে অত্যন্ত মাই ডিয়ার ধরণের লোক । আপনাকে উনি কিছুই বলবেন না । তাছাড়া আপনাকে কিছু বলার প্রশ্নও আসে না । আপনি আপনার কর্তব্য পালন করেছেন ।
এর উত্তরে ওসি সাহেব চাপা গলায় বিড়বিড় করে কি যেন বললেন, যার কিছুই বোঝা গেল না । জহির বলল, ওসি সাহেব, চা খাওয়াতে পারেন?
