হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-২

দরজার ওপাশে খন্ড-২

ভেতর থেকে দরজা বন্ধ থাকে । ছুটির ‍দিনগুলিতে মেসে একটু ভাল খাওয়া-দাওয়া হয় । সবাই একসঙ্গে বসে খায় । তিনি কখনো বসেন না । সবার খাওয়া হয়ে গেলে এক সময় চুপি চুপি খেতে যান । মাথা নিচু করে অতি দ্রুত খাবার পর্ব শেষ করেন । যেন খাওয়া একটা অন্যায় কাজ । যত দ্রুত শেষ করা যায়, তত ভাল । এই লোক আমাকে দেখে এতগুলি কথা বলবে, ভাবা যায় না ।

আমি তাঁর দিকে খানিকটা এগিয়ে বললাম, ‘বেহেশতের জানালা খোলার ব্যাপার যখন আছে তখন দোজখের জানালা খোলার ব্যাপারও থাকার কথা । ঐটা কখন খোলা থাকে জানেন?’

‘রাত বারোটা থেকে সুবেহ সাদেকের আগ পর্যন্ত । এই জন্যে এই সময় ঘরের ভেতরে থাকার বিধান আছে । সবই অবশ্য শোনা কথা । সত্যি মিথ্যা জানি না ।’ আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘সত্যি হলে আমার জন্যে খুব মুসকিল । আমার অভ্যাস হল গভীর রাতে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করা’।

বায়েজিদ সাহেব ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, ‘আমি জানি । তবে আপনার জন্যে কোন সমস্যা নাই’।

‘সমস্যা নেই কেন?’

‘আপনি সঠিক মানুষ’।

‘আমি সঠিক মানুষ আপনাকে কে বলল? রাত-বিরাতে রাস্তায় হাঁটলেই মানুষ সঠিক হয়ে যায় ? তাহলে তো চোর পুলিশ সবচে বড় সঠিক’।  বায়েজিদ সাহেব আবার মাথা নিচু করে ফেললেন । সম্ভবত তিনি আর কথা বলবেন না । একদিনে বেশি কথা বলে ফেলেছেন । তাঁর সঙ্গে আমার কথা বলতে ভাল লাগছে । ভদ্রলোক দু’বছরের উপর আমার পাশের ঘরে আছেন । এই দু’বছরে তাঁর সঙ্গে আমার তিন চার বারের বেশি কথা হয়নি । সেই সব কথাও- “কেমন আছেন বায়েজিদ সাহেব?” “এই আছি ।’ এর মধ্যে সীমাবদ্ধ ভদ্রলোক কি করেন, তাঁর দেশ কোথায়, তাঁর চোখ সবসময় টকটকে লাল থাকে কেন কিছুই জানি না ।              ‘বায়েজিদ সাহেব।’

দরজার ওপাশে খন্ড-২

‘জ্বি’।

‘কাল রাতে অনেকক্ষণ জেগেছিলাম । রেসকোর্সের ভেতরে হেঁটে হেঁটে দোজখের হাওয়া লাগাচ্ছিলাম । বৃষ্টি যখন শুরু হল তখন ঘরে এসেছি । এত সকালে আমার ঘুম ভাঙ্গার কথা না । স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙ্গেছে । স্বপ্নটা পুরোপুরি দেখতেও পারিনি । মনে হচ্ছিল দুঃস্বপ্ন দেখান না ।

‘তাই না-কি ?’

‘জি । সুবেহ সাদেক খুব একটা ভাল সময় । এই সময় আল্লাহপাক মানুষের মঙ্গলের কথা বলেন, আনন্দের কথা বলেন ।’

‘এটাও কি মওলানার কাছ থেকে শোনা কথা?’

‘জ্বি-না, আমার স্ত্রীর কথা । সে জীবিত থাকার সময় অদ্ভুদ অদ্ভুদ কথা বলত । তখন হাসাহাসি করতাম । এখন করি না । এখন করি না । এখন তার সব কথাই সত্যি মনে হয় ।’

‘বেহেশত এবং দোজখের জানালার কথাও কি তাঁর কথা?’’

‘জ্বি’।

‘আপনার স্ত্রীর মৃত্যুর পর আপনি আর বিয়ে করেন নি ।’

‘জ্বি-না’।

‘আপনার মেয়েটির বয়স তাহলে এখন উনিশ?’

‘জ্বি’।

‘তার কি বিয়ে হয়েছে?’

‘জ্বি-না।’

‘সে থাকে কোথায়?’

‘তার মামাদের কাছে থাকে । নিজের কাছে এনে রাখতে চেয়েছিলাম। সামর্থ্য হল না । অতি ছোট চাকরি করি । বেতন যা পাই তা দিয়ে ঢাকার ঘর ভাড়া করে থাকা সম্ভব না।’

‘আমি আপনাকে অনেক ব্যক্তিগত প্রশ্ন জিজ্ঞেস করে ফেললাম । কিছু মনে করবেন না।’

‘জিনা-’ । আমি কিছুই মনে করি নি । আমি খুব খুশি হয়েছি । অনেক দিন থেকে আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছিলাম । সাহসে কুলায়নি।’ ‘আমাকে বলতে চাচ্ছিলেন কেন?’

‘আপনি মহাপুরুষ ধরণের মানুষ । আপনি আমার মেয়েটার জন্যে একটু প্রার্থনা করলে তার মঙ্গল হবে, এই জন্যে । মেয়েটার বিয়ে দিতে পারছি না ।দুষ্ট লোকজন আমার মেয়েটার নামে বাজে একটা দুর্নাম ছড়িয়েছে ।

পুরে ব্যাপারটা যে মিথ্যা সবাই জানে, কেউ বিশ্বাস করে না, আবার সবাই বিশ্বাস করে । মেয়েটা খুব কষ্টে আছে ভাই সাহেব । আমি জানি, আপনি মেয়েটার কষ্ট কমাতে পারবেন ।

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড-৩

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *