পেছনের দরজা দিয়ে ঢোকার সময় প্রথমই শ্রাবণীর ঘর পড়ে। ঘরে বাতি জ্বলছে। দরজা খােলা। শ্রাবণী মােরায় বসে আছে। টিনের গামলা ভর্তি গরম পানিতে তার বাঁ পা ডুবানাে। শ্রাবণীর হাতে বই, তবে গল্পের বই না। পাঠ্যবই। ফিজিক্সের বই। নবনী বলল, তাের কি হয়েছে? ‘পা মচকে ফেলেছি। শাহেদ ভাইয়ের একটা রং সার্ভিস রিটার্ন করতে গিয়ে – পা পিছলে আলুর দম।
“বেশি ব্যাথা পেয়েছিস?” “সিরিয়াস ব্যাথা পেয়েছি। বিকট চিৎকার। মার ধারণা, পা ভেঙ্গে ফেলেছি। সঙ্গে সঙ্গে তার বুক ধরফর শুরু হল। ইন্টারেস্টিং এক সিচুয়েশন। শাহেদ ভাই এমন মন খারাপ করালেন যেন তিনি নিজেই ব্যাডমিন্টন যাঁকেট দিয়ে বাড়ি মেরে আমার পা ভেঙ্গেছেন। নবনী বলল, তােকে দেখে তাে কিছু বােঝা মুশকিল। আসলে পা ভাঙ্গেনি তাে?”

না ভাঙ্গেনি। ফোলা কমে গেছে। ভাঙ্গলে এত তাড়াতাড়ি ফোলা কমত না। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে নবনী বলল, আচ্ছা ভাল কথা ইংরেজ মহিলার কবরটা যেন কোথায়?”
শ্রাবণী হাই তুলতে তুলতে বলল, কাছেই।
নিয়ে যাবি আমাকে? ‘পা ফেলতে পারি না। নিয়ে যাব কিভাবে?
মহিলার কবর যে বুঝলি কি করে?’ নাম লেখা আছে। মারিয়া স্টোন না কি যেন। নামের শেষে কবিতা আছে। ‘কি কবিতা?’
The bells will ring
The birds will sing. “রি-এর সঙ্গে সিং-এর সহজ মিল।
শ্রাবণী বলল, স্বামী বেচারা নিজেই বােধহয় লিখেছে, ভাল মিল পায়নি। কবর ত্রি এত কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?
‘এমনি।’
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৬
নবনী মা’র খােজে গেল । জাহানারা রান্নাঘরে ছিলেন না। বিছানায় শুয়েছিলেন। ধর অন্ধকার। তাঁর মাথার কাছে মিলু বুয়া দাঁড়িয়ে আছে। সন্ধ্যার পর থেকে সে সব সময় মার কাছে থাকবে । নবনী বলল, মা তুমি রান্নাঘর থেকে নির্বাসিত। ব্যাপার কি বলতাে?
জাহানারা ক্লান্ত গলায় বললেন, মাথাটা হঠাৎ ঘুরে উঠল। প্রেসার বেড়েছে বােধহয়। ‘প্রেসার মেপে দেব?’
না। তুই আমাকে ঠাণ্ডা এক গ্লাস পানি খাওয়া।’
নবনী ঠাণ্ডা পানি নিয়ে এল । জাহানারা পানি খেয়ে আবার শুয়ে পড়লেন। নবনী বসল মার পাশে। জাহানারা মেয়ের কোলে একটা হাত রাখলেন। নরম গলায় বললেন, এতক্ষণ শাহেদ ছিল । তুই আসার একটু আগে গেল। তাের খোঁজেই বােধহয় গিয়েছে।
আমাকে কোথায় খুঁজবে?’ “কি না-কি এক বটগাছ আছে। তাের সেখানে যাবার কথা। শ্রাবণী ওকে তাই বুঝিয়েছে।’
মা, শ্রাবণী যে প্রচুর মিথ্যা কথা বলে তুমি জান? এই বয়সে সবাই মিথ্যা বলে।’ ‘আমি বলতাম?’
বলেছিস নিশ্চয়ই । এখন মনে নেই।’
‘শ্রাবণী বানিয়ে বানিয়ে বলেছে—এখানে কোন জঙ্গলের মধ্যে না-কি এক ইংরেজ মহিলার কবর আছে। মারিয়া ষ্টোন নাম।
‘আমাকেও বলেছে।’ ‘ওর হাবভাব আমার ভাল লাগছে না, মা।’
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৬
‘ওকে নিয়ে চিন্তা করিস না। ও ঠিকই আছে। আয়, আমরা অন্য কিছু নিয়ে কথা বলি।’
“কি নিয়ে কথা বলতে চাও?’ ‘তােকে নিয়ে বলি। আজ শাহেদ তাের বিয়ের ব্যাপারে কথা বলল। “ নিজ থেকেই বলল, না-কি তুমি জিজ্ঞেস করলে?’ ‘নিজ থেকেই বলল, তার মা খুব অসুস্থ। তার মা চাচ্ছেন বিয়েটা তাড়াতাড়ি হােক।
সে তাে তার মায়ের অসুখের কথা কিছু বলেনি।’ শাহেদ কখনাে তার সমস্যার কথা বলে না। ও অনেকটা আমার মত। নবনী হাসতে হাসতে বলল, তােমার কি কোন সমস্যা আছে, মা?’
‘আছে।’
কি সমস্যা? শুনতে চাস?
ওঁ চাই। আমার ধারণা, তুমি এই পৃথিবীর একমাত্র সমস্যাবিহীন মহিলা। এটা পরিষ্কার রান্নাঘর। রান্নার জিনিসপত্র এবং ফ্রিজের ঠাণ্ডা পানি। এই টা মিনি নেন তােমার হয়ে গেল।
জাহানারা বিছানায় উঠে বসলেন। নবনী লক্ষ্য করল, তার মানােয় কাপছেন। নবনী বলল, কি ব্যাপার মা।
না, কোন ব্যাপার না। তুই আমার সমস্যার কথা শুনতে চেয়েছি। সমস্যা অনে যা।’
‘থাক মা, আমি কিছু শুনতে চাৰি না। তুমি এরকম , আমার ভাল লাগছে না। মিলু বুয়া, তুমি মা’কে এক গ্লাস ঠাণ্ডা পানি এনে দাও তাে।’
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৬
জাহানারা আবার শুয়ে পড়লেন। ক্লান্ত গলায় বললেন, তাের এবং প্রাকদীর বিয়ে হবার জন্যে আমি অপেক্ষা করছি। বিয়ে হয়ে গেলেই আমার দায়িত্ব শে—তন…’
তখন কি।’ জাহানারা বললেন, এখন ঘর থেকে যা। কথা বলতে ভাল লাগছে না।
জামিল সাহেব খুবই উত্তেজিত ভঙ্গিতে বসে আছেন। উত্তেজিত এবং আনন্দিত। সুরু মিয়া চেয়ারম্যান একজন হবােলা খবর দিয়ে এনেছেন। চরিশ পঁয়তাল্লিশের মত বয়স। বড় বড় চোখ। ভয়ংকর রােগা। অতিরিক্ত লম্বার কারণেই বােধহয় খানিকটা কুঁজাে। খালি পা। সবুজ একটা লুঙ্গি পরনে । এই শীতে ও গায়ে পাতলা একটা ফতুয়া ছাড়া কিছু নেই।
Read More