নবনী এসে বসল বাবার পাশের চেয়ারে। শ্রাবণীও এল বেড়াতে খোড়াতে। শাহেদও আছে। সে একটু দূরে বসেছে। মনে হয় তেমন উৎসাহ বােধ করছে না। দুটি পাজেরাে জিপে অতিথি যারা এসেছিলেন তাঁদের একদল চলে গেছেন। অন্য একটা দল এখনাে আছেন । মনে হয় তারা থেকে যাবেন।
শ্রাবণী বলল, ব্যাপার কি?
সুরুজ মিয়া বলেন, ব্যাপার নিজের কানে শুনেন আম্মা। এর নাম মােতা হরবােলা। দুনিয়ার যত ডাক আছে মােস্তাক জানে। বাড়ি নবীনগর, খবর দিয়া আছি।
মােস্তাক কদমবুসি করতে এগিয়ে এল। নবনী কি সর্বনাশ!‘ বলে লাফিয়ে সরে যেতে গিয়েও সরে যেতে পারল না। মােস্তাক শুধু যে নবনী এবং শ্রাবণীকে সালাম করল তা নয়, উপস্থিত সবাইকে আরেকদফা করল। কেউ তেমন আপত্তি করছে না। সবাই মজা পাচ্ছে।
সুরুজ মিয়া বললেন, মােস্তাক, শুরু কর।
মােস্তাক দু‘হাত দিয়ে মুখ ঢাকল। হরবােলার ডাক দেবার সময় মুখ দেখানাের নিয়ম নেই। হাত দিয়ে মুখ ঢেকে রাখতে হয়। মােস্তাক যন্ত্রের মত গলায় বলল,
উপস্থিত হাজেরাইন। আমার নাম হবোেলা মােস্তাক। বাড়ি নবীনগর। পিতার নাম ইসহাক আলি। মা আমেনা বেগম। এক্ষণ শুনবেন পাখির ডাক । পাখির মধ্যে সেরা পাখি হইল কাউয়া । দ্ৰ সমাজ যারে বলেন কাক।
কা কা কা ।
মােস্তাক কাক ডাকতে লাগল । নবনী এবং শ্রাবণী স্তম্ভিত। এ তাে সত্যি কাকের ডাক। মানুষের ডাক এ হতেই পারে না। কোন মানুষের পক্ষে কাকের এমন ডাক
অনুকরণ সব নয় ।
ভদ্র সমাজ, কাকের বন্ধু হইল গিয়া আফনের কোকিল পক্ষী । দেখতে কাকের মত। চেহারা আসল না, দ্ৰসমাজ-আসল হইল গুণ। এইবার শুনেন কোকিল পক্ষীর ডাক।
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৭
মােস্তাক কোকিলের ডাক ডাকতে শুরু করল । শ্রাবণী মুগ্ধ গলায় বলল, আশ্চর্য! খুবই আশ্চর্য হবার মত ব্যাপার!
দ্ৰ সমাজ, উপস্থিত হাজেরাইন। কোকিল পক্ষীর ডাক এক মতন না। একেক সমুয়ে একেক মত। শীতকালে এক ডাক ডাকে, গরম কালে। পৃথক এক ডাক ডাকে ।।
হরবােলা মােস্তাক বিভিন্ন ঋতুতে কোকিলের ডাক ডাকল। শ্রাবণী আবার বলল, “আশ্চর্য! খুবই আশ্চর্য হবার মত ব্যাপার।”
পাখির পর হল পশুর ডাক—গরু, ছাগল, শেয়াল ।। তারপর হল পতঙ্গের ডাক—ঝিঝি পােকা, মৌমাছি, মশা, বােলতা। জামিল সাহেব বললেন, তুমি বাঘের ডাক পার না? জি না স্যার। বাঘের ডাক কোন দিন শুনি নাই। শুনলে পারব।’
সুরুজ মিয়া বললেন, একবার শুনলেই পারবে। বড়ই ওস্তাদ। এ সার মানুষের ডাকও পারে।
নবনী বলল, মানুষের ডাক আবার কি? মােস্তাক আলি বলল, আছে, মানুষের ডাকও আছে। শ্ৰবণী বলল, দেখি শােনান তাে। আমি মানুষের ডাক শুনতে চাই।
শুনলে আফনে রাগ হইবেন।’ শ্রাবণী বিস্মিত হয়ে বলল, কি অদ্ভুত কথা, শুনলে রাগ হব কেন?
মােস্তাক সঙ্গে সঙ্গে অবিকল শ্রাবণীর মত গলায় বলল, “কি অদ্ভুত কথা শুনলে রাগ। ইব কেন?”
সবাই বিস্ময়ে দীর্ঘ সময় চুপ করে রইল । সবার আগে কথা বললেন জামিল সাহেব। তিনি হতচকিত গলায় বললেন, মানুষের ভয়েসের এমন রিপ্রডাকশন যে হতে পারে,
আমার ধারণার বাইরে ছিল। অবিশ্বাস্য,
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৭
তিনি মানিব্যাগ বের করে দুটা নতুন একশ’ টাকার নােট এগিয়ে দিলেন। মােস্তাক আবার কদমবুসি করে টাকা নিল। কদমবুসি একজনকে করল না, সবাইকে করল ।
সুরুজ মিয়া তৃপ্ত গলায় বললেন, এর চেহারা ভাল মানুষের মত, কিন্তু আসলে বিরাট বদ। কেউ মারা গেলে সে করে কিরাত-দূপুরে ঐ বাড়িতে উপস্থিত হয়। মরা মানুষের গলায় ঐ বাড়ির লােকজনদের নাম ধরে ডাকে। বাড়ির ভেতরে তখন ভয়ে কান্দাকাটি শুরু হয়ে যায় । কত মার খেয়েছে বলার নাই । একবার তাে মারতে মারতে হাত ভেঙে দিল।
মােস্তাক আলি মনে হচ্ছে তার মার খাওয়ার কথা শুনে খুব মজা পাচ্ছে । খিক খিক করে হাসছে।
শ্রাবণী বলল, বাবা, আমি উনার পারফরমেন্সে মুগ্ধ হয়েছি। আমি কি আমার নিজের পক্ষ থেকে উনাকে কিছু গিফট দিতে পারি।
অবশ্যই পার।
তুমি আমায় ডেকেছিলে ছুটির নিমন্ত্রণে-খন্ড-১৭
শ্রাবণী গিফট আনার জন্যে উঠে গেল। নবনী লক্ষ্য করল, শ্রাবণী এখন আর খুঁড়িয়ে হাঁটছে না। ঠিকমতই হাঁটছে। মনে হয় পায়ের ব্যথা সেরে গেছে। শ্রাবণী সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এল। তার হাতে দু’টা পাঁচশ’ টাকার নােট । সে মােস্তাক আলির দিকে নােট দু’টি
এগিয়ে দিয়ে বলল, আমার এই উপহার গ্রহণ করলে আমি খুব খুশি হব।
মােস্তাক চোখ বড় বড় করে সবার দিকে তাকাচ্ছে। হাত বাড়াচ্ছে না। সে পুরাে পুরি হকচকিয়ে গেছে। জামিল সাহেব বললেন, ও দিচ্ছে, তুমি নি না কেন? নাও।
মােস্তাক টাকা নিয়ে তৎক্ষণাৎ শিশুদের মত শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল । সে তার দীর্ঘ জীবনে এক সঙ্গে কখনাে এতটাকা পায়নি। শ্রাবণী দাঁড়াল না, নিজের ঘরে চলে গেল।
সুরুজ মিয়া ব্ৰিত গলায় বললেন, কাঁদছিস কেন রে গাধা? কান্না বন্ধ কর। মােস্তাক আলি আরাে শব্দ করে কাঁদতে লাগল। সুরুজ মিয়া মােস্তাকের হাত ধরে তাকে বাইরে নিয়ে এলেন।
শ্রাবণীর ঘরের দরজা বন্ধ। জামিল সাহেব দরজায় টোকা দিয়ে বললেন, আসব মা? শ্রাবণী বলল, এসাে বাবা।
Read More