মজিদ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে ক্ষীণস্বরে বলল, স্বপ্নে দেখলাম, বাবা আমার গায়ে হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন । মজিদ শুয়ে পড়ল । আমি জানি না মজিদের বাবা কীভাবে তার গায়ে হাত বুলাতেন । আমার ইচ্ছা করছে ঠিক সেই ভঙ্গিতে মজিদের গায়ে হাত বুলাতে ।
হিমু!
কী ?
আমার বাবা আমাকে আদর করত । সব বাবারাই করে । আমার বাবা খুব বেশি করত । একদিন কি হয়েছে জানিস?
বল শুনছি ।
না থাক ।
থাকবে কেন, শুনি । এই গরমে ঘুম আসছে না । তোর গল্প শুনতে ভালো লাগবে ।
আমি তখন খুব ছোট…
তারপর ?
না থাক মজিদ আর শব্দ করল না । ঘরের ভেতর অসহ্য গরম । আমি অনেক চেষ্টা করেও নদীটা আনতে পারছি না । আজ আর পারব না । আজ বরং বাবার কথাই ভাবি । আমার বাবা কি আমাকে ভালোবাসতেন ? নাকি আমি ছিলাম তার খেলার কোন পুতুল ? যে পুতুল তিনি নানাভাবের ভেঙে নতুন করে তৈরি করতে চেষ্টা করেছিলেন । কত রকম উপদেশে তিনি তার খাতা ভরতি করে রেখেছেন । মৃত্যুর আগের মুহুর্তে হয়তো ভেবেছেন– এইসব উপদেশ আমি অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলব । আমি কি সেইসব উপদেশ মানি ? নাকি মানার ভান করি ? তার খাতায় লেখা :
উপদেশ নম্বর এগার সৃষ্টিকর্তার অনুসন্ধান
সৃষ্টিকর্তার অনুসন্ধান করবে । ইহাতে আত্মার উন্নতি হইবে । সৃষ্টিকর্তাকে জানা এবং আত্মাকে জানা একই ব্যাপার । স্বামী বিবেকানন্দের একটি উক্তি এই প্রসঙ্গে স্মরণ রাখিও–
বহুরূপে সম্মুখে তোমার,
ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর ?
মজিদ আবার কাঁদছে । ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে, তবে কাঁদছে ঘুমের মধ্যে । সে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২২
সে কি প্রতিরাতেই কাঁদে?
বড়ফুপু অবাক হয়ে বললেন, তুই কোথেকে ?
আমি বললাম, আসলাম আর কী । তোমাদের খবর কী ?
পনেরোদিন পর উদয় হয়ে বললি, তোমাদের খবর কী ? তোর কত খোঁজ করছি । গিয়েছিলি কোথায় ?
মজিদের গ্রামের বাড়িতে । মজিদকে নিয়ে তার বাবার কবর জিয়ারত করে এলাম ।
মজিদ আবার কে ?
তুমি চিনবে না, আমার ফ্রেন্ড । আমাকে এত খোঁজাখুঁজি করছিলে কেন ?
বড়ফুপু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বললেন, তোকে খুঁজছি বাদলের জন্যে । ওকে তুই বাঁচা ।
অসুখ ?
তুই নিজে গিয়ে দেখ । ও তার পড়ার বইপত্র সব পুড়িয়ে ফেলেছে । এক সপ্তাহ পরে পরীক্ষা । বল কী ?
বাদলের ঘরে গিয়ে দেখি সে বেশ স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই পড়াশুনা করছে । পরিবর্তনের মধ্যে তার মাথার চুল আরো বড় হয়েছে । দাড়িগোঁফ আরো বেড়েছে । গায়ে চকচকে সিল্কের পাঞ্জাবি । বাদল হাসিমুখে আমার দিকে তাকাল । আমি বললাম, খবর কী রে ?
বাদল বলল, খবর তো ভালোই ।
তুই নাকি বই পুড়াচ্ছিস ?
সব বই তো পুড়াচ্ছি না । যেগুলি পড়া হচ্ছে সেগুলি পুড়িয়ে ফেলছি ।
ও আচ্ছা ।
বাদল হাসতে হাসতে বলল, মা–বাবার দুজনেরই ধারণা, আমার মাতা খারাপ হয়ে গেছে । তোর কি ধারণা মাথা ঠিকই আছে ?
হ্যাঁ, ঠিক আছে– তবে মাথায় উকুন হয়েছে ।
বলিস কী ?
মাথা ঝাঁকি দিলে টুপটাপ করে উকুন পড়ে ।
বলিস কী ? হ্যাঁ, সত্যি । দেখবে ?
থাক থাক, দেখাতে হবে না ।
হিমুভাই, তুমি এসেছ, ভালোই হয়েছে–বাবাকে বুঝিয়ে যাও । বাবার ধারণা, আমার সব শেষ ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ২২
ফুপা কি বাসায় ?
হ্যাঁ বাসায় ।
কিছুক্ষণ আগেই আমার ঘরে ছিলেন । নানান কথা বুঝাচ্ছেন ।
আমি ফুপার সঙ্গে দেখা করতে গেলাম । তার স্বাস্থ্য এই কুদনে মনে হয় আরো ভেঙেছে । চোখের চাউনিতে দিশেহারা ভাব । তিনি আমার দিকে বিষণ্ণ চোখে তাকালেন । যে দৃষ্টি বলে দিচ্ছে– তুমিই আমার ছেলের এই অবস্থার জন্যে দায়ী । তোমার জন্যে আমার এই অবস্থা ।
কেমন আছেন ফুপা ?
ভালো ।
রিনকি কোথায় ? শ্বশুর বাড়িতে ?
হ্যাঁ ।
সন্ধ্যাবেলায় ঘরে বসে আছেন যে ?
