আমার জানা নেই, ফুপা । ভুলটি আমার । মেট্রিক পাস করে তুমি যখন এলে আমি ভালো মনে বললাম, আচ্ছা থাকুক । মা-বাপ নেই ছেলে-একটা আশ্রয় পাক ।
তুমি যে এই সর্বনাশ করবে তা তো বুঝিনি! বুঝতে পারলে তখনই ঘাড় ধরে বের করে দিতাম । আমি জেনেশুনে কিছু করিনি । তাও ঠিক । জেনেশুনে তুমি কিছু করনি । আই ডু এগ্রি । তোমার লাইফ-স্টাইল তাকে আকর্ষণ করছে । তুমি ভ্যাগাবন্ড না, অথচ তুমি ভাব কর যে তুমি ভ্যাগাবন্ড । জোছনা দেখানোর জন্যে চন্দ্রায় এক জঙ্গলের মধ্যে বাদলকে নিয়ে গেলে । সারারাত ফেরার নাম নেই । জোছনা এমন কী জিনিস যে জঙ্গলে বসে দেখতে হবে ? বল তুমি । তোমার মুখ থেকে শুনতে চাই । শহরের আলোয় জোছনা ঠিক বোঝা যায় না ।
মানলাম তোমার কথা । ভালো কথা, চন্দ্রায় গিয়ে জোছনা দেখ, তাই বলে সারারাত বসে থাকতে হবে? রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোছনা কীভাবে বদলে যায় সেটাও একটা দেখার মতো ব্যাপার । শেষরাতে পরিবেশ ভৌতিক হয়ে যায় । তাই নাকি ? জি । তাছাড়া জঙ্গলের একটা আলাদা এফেক্ট আছে । শেষরাতের দিকে গাছগুলি জীবন্ত হয়ে ওঠে । তোমার কথা বুঝলাম না । গাছগুলি জীবন্ত হয় মানে ? গাছ তো সবসময়ই জীবন্ত । জি না । ওরা জীবন্ত, তবে সুপ্ত ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৫
খানিকটা জেগে ওঠে পূর্ণিমা রাতে । তা-ও মধ্যরাতের পর থেকে । জঙ্গল না গেলে ব্যাপারটা বোঝা যাবে না । আপনি একবার চলুুন না, নিজের চোখে দেখবেন । দিন তিনেক পরেই পূর্ণিমা । দিন তিনেক পরেই পূর্ণিমা ? জি । এইসব হিসাব-নিকাশ সবসময় তোমার কাছে থাকে ? জি । একবার গেলে হয় । বলেই ফুপা গভীর হলে গেলেন ।
চোখ বন্ধ করে খানিকক্ষণ ঝিম ধরে বসে রইলেন । তারপর বললেন, তুমি আমাকে পর্যন্ত কনভিন্সড করে ফেলেছিলে । মনে হচ্ছিল তোমার সঙ্গে যাওয়া যেতে পারে ।অবশ্য এটা সম্ভব হয়েছে নেশার ঘোরে থাকার জন্যে । তা ঠিক । কিছু মানুষ ধরেই নিয়েছে, তারা তাই ঠিক । তাদের জগৎটাই একমাত্র সত্যি জগৎ । এরা রহস্য খুঁজবে না । এরা স্বপ্ন দেখবে না । চুপ করতো । আমি চুপ করলাম । ফুপা রাগী গলায় বললেন, তুমি ভ্যাগাবন্ডের মতো ঘুরবে আর ভাববে বিরাট কাজ করে ফেলেছ । তুমি যে অসুস্থ এটা তুমি জানো ? ডাক্তার হিসেবে বলছি – তুমি অসুস্থ । YOU ARE A SICK MAN.
ফুপা, আপনি নিজেও কিন্ত্ত অসুস্থ হয়ে পড়ছেন । বেশি খাচ্ছেন । আপনি বলেছেন আমার লিমিট সাত । আমার ধারণা, এখন নয় চলছে । তোমার কাছে সিগারেট আছে ? আছে। দাও ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৫
তিনি সিগারেট ধরালেন । খুক খুক করে কাশলেন । ফুপাকে আমি কখনো সিগারেট খেতে দেখিনি । তবে মদ্যপানের সঙ্গে সিগারেটের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আছে এরকম শুনেছি । হিমু! জি । রাস্তায় রাস্তায় ভ্যাগাবন্ডের মতো ঘুরে যদি তুমি আনন্দ পাও- তুমি অবশ্যি তা করতে পার । IT IS YOUR LIFE. কিন্ত্ত আমার ছেলেও তাই করবে তা তো হয় না ।
ও কি তা করছে না কি ? এখনো শুরু করেনি, তবে করবে । দু-বছর তুমি ওর সঙ্গে ছিলে । একই ঘরে ঘুমিয়েছ । এই দু- বছরে তুমি ওর মাথাটা খেয়েছ । তুমি আর এ বাড়িতে আসবে না । জি আচ্ছা আসব না । ঠিক আছে ।এই বাড়ির ত্রিসীমানায় যদি তোমাকে দেখি তাহলে পিটিয়ে তোমার পিঠের ছাল তুলে ফেলব । আপনার নেশা হয়ে গেছে, ফুপা । পিটিয়ে ছাল তোলা যায় না । আপনার লজিক এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে । ফুপার সিগারেট নিভে গেছে ।
সিগারেট অনভ্যস্ত লোকজন সিগারেটে আগুন বেশিক্ষন ধরিয়ে রাখতে পারে না ।আমি আবার তার সিগারেট ধরিয়ে দিলাম । ফুপা বললেন, তোমাকে আমি একটা প্রপোজাল দিতে চাই । একসেপ্ট করবে কি করবে না ভেবে দেখ । কী প্রপোজাল ? তোমাকে একটা চাকরি জোগাড় করে দিতে চাই । AS A MATTER OF FACT আমার হাতে একটা চাকরি আছে । আহামরি কিছু না । ত চলে যাবে । বেতন কত ? ঠিক জানি না । তিন হাজারের কম হবে না । বেশিও হতে পারে । তেমন সুবিধার চাকরি বলে তো মনে হচ্ছে না ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৫
ভিক্ষা করে জীবনযাপন করার চেয়ে ভালো না ? না । ভিক্ষা করে বেঁচে থাকার আলাদা আনন্দ আছে । প্রাচীন ভারতের সাধুসন্ন্যাসীদের সবাই ভিক্ষা করতেন । বাউল সম্প্রদায়ের সাধনার একটা বড় অঙ্গ হচ্ছে ভিক্ষাবৃত্তি । এরা অবশ্যি ভিক্ষা বলে না । এরা বলে মাধুকরি । আমার কাছে লেকচার ঝাড়বে না । ফুপা, আমি তাহলে উঠব ? যাও, উঠ । শুধু একটা জিনিস বল- যে ধরনের জীবনযাপন করছ তাতে আনন্দটা কী ?
যা ইচ্ছা করতে পারার একটা আনন্দ আছে না ? যা ইচ্ছা তুমি তা-ই করতে পারবে ? অবশ্যই পারব । বলুন কী করতে হবে । খুন করতে পারবে ? কেন পারব না ! খুন করা আসলে খুব সহজ ব্যাপার । সহজ ব্যাপার ? অবশ্যই সহজ ব্যাপার । যে-কেউ করতে পারে । রোজ কতগুলি খুন হচ্ছে দেখছেন না । খবরের কাগজ খুললেই দেখবেন । আমার তো রোজই একটা-দুটা মানুষকে খুন করতে ইচ্ছা করে । হিমু, YOU ARE A SICK MAN. YOU ARE A SICK MAN.
আর খাবেন না, ফুপা । আপনি মাতাল হয়ে গেছেন । কী করে বুঝলে মাতাল হয়ে গেছি ? কী করে বুঝলে ? মাতালরা প্রতিটা বাক্য দু-বার করে বলে । আপনিও তাই বলছেন । আপনি বাথরুমে গিয়ে বমির চেষ্টা করুন । বমি করলে ভালো লাগবে । বলেই আমি চেয়ার ছেড়ে সরে গেলাম । বমির কথা মনে করিয়ে দিয়েছি ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৫
কাজেই ফুপা এখন হড়হড় করে বমি করবেন । হলোও তাই । তিনি চারদিক ভাসিয়ে দিলেন । ওয়াক ওয়াক শব্দে ফুপু ছুটে এলেন। তিনি তার সাজানো ঘরের অবস্থা দেখে স্তম্ভিত । ফুপাকে দেখে মনে হচ্ছে তার নাড়িতুড়ি উল্টে আসছে । হঠাৎ হয়তো দেখব বমির সঙ্গে তার পাকস্থলী বের হয়ে আসছে । সেই দৃশ্য খুব সুখকর হবে না । আমি বারান্দায় চলে এলাম । রিনকি ছুটে এসেছে, বাদলও এসেছে ।
ফুপা চিঁ চিঁ করে বলছেন- সুরমা, আমি মরে যাচ্ছি ।ও সুরমা, আমি মরে যাচ্ছি । বমি করতে করতে কোনো মাতাল মারা যায় বলে আমার জানা নাই । কাজেই আমি রাস্তায় নেমে এলাম । সিগারেট কেনা দরকার । আকাশে মেঘের আনাগোনা । বৃষ্টি হবে কিনাকে জানে । হলে ভালোই হয় । এই বছর এখনো বৃষ্টিতে ভেজা হয়নি ।
নবধারা জলে স্নান বাকি আছে । সিগারেটের সঙ্গে জর্দা দেয়া দুটো পান কিনলাম । জর্দার নাম সবই পুংলিঙ্গে – দাদা জর্দা, বাবা জর্দা । মা জর্দা, খালা জর্দা এখনো বাজারে আসেনি, যদিও মহিলারাই জর্দা বেশি খান । কোনো একটা জর্দা কোম্পানিকে এই আইডিয়াটা দিয়ে দেখলে কেমন হয় । প্রথমবার ঢোকার সময় ফুফুকে যত গম্ভীর দেখলাম, দ্বিতীয়বারে তারচেয়েও বেশি গম্ভীর মনে হয় । ফুপু কোমরে হাতই দিয়ে দাঁড়িয়ে ।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ৫
কাজের মেয়ে বালতি আর ঝাঁটা হাতে যাচ্ছে । কাজের ছেলেটির হাতে ফিনাইল । ফুপুর কিছুটা শুচিবায়ুর মতো আছে । আজ সারারাতই বোধহয় ধোয়াধুয়ি চলবে । ফুপু বললেন,তুই তাহলে আছিস আমি ভাবলাম চলে গিয়েছিস । পান কিনতে গিয়েছিলাম । ফুপার অবস্থা কী ? অবস্থা কী জিজ্ঞেস করছিস ! লজ্জা করে না ?
তোর সামনে গিলল, তুই একবার না করতে পারলি না ? চাকর-বাকর আছে । কী লজ্জার কথা ! তুই কি আজ এখানে থাকবি ? হ্যাঁ।এখানে থাকার তোর দরকারটা কী ? এত রাতে যাব কোথায় ? ফুপু শোবার ঘরের দিকে রওনা হলেন । টেলিফোনে ক্তমাগত রিং হচ্ছে । এগিয়ে গেলাম টেলিফোনের দিকে । রিনকির ঘর পর্যন্ত টেলেফোন নেয়া যায়নি । তার এত লম্বা নয় । টেলিফোন বারান্দায় রাখা । আমি রিসিভার তুলতেই ওপাশ থেকে উদ্বিগ্ন গলা পাওয়া গেল, এটা কি রিনকিদের বাসা ? হ্যাঁ । দয়া করে ওকে একটু ডেকে দেবেন ? আপনি কে জানতে পারি ?
এ বাড়ির নিয়মকানুন খুব কড়া, অপরিচিত লোক যদি রিনকিকে ডাকে তাহলে রিনকিকে বলা যাবে না । আমি এজাজ । আপনি কি মেরিন ইঞ্জিনিয়ার ? জি । আমাকে আপনি চিনবেন না । আমার নাম… আপনি কে তা আমি বুঝতে পেরেছি- আপনি হচ্ছেন হিমুভাই । আমি সত্যি সত্যি চমৎকৃত হলাম । এর মধ্যে রিনকি আমার গল্প করে ফেলেছে ? এমনভাবে করেছে যে ভদ্রলোক চট করে আমার কয়েকটা বাক্যতেই আমাকে চিনে ফেললেন ।
Read more
