আমি কোনাে কথা বললাম না। মামা বললেন, ‘শিরিনের অনেক গুণ ছিল। সাধারণত মেয়েদের থাকে না। যখন সে এখানে চলে আসল, তখন সবাই দুঃখিত হয়েছিলাম। গুণ বিকাশে পরিবেশের প্রয়ােজন হয় তাে।
নিনু চা নিয়ে ঢুকল। মামা চায়ে চুমুক দিয়ে চমকালেন, ‘একি খুকি, চিনি দিয়ে এনেছ যে!
নিনু আধহাত জিভ বের করে ফেলল। মামা বললেন, ‘ঠিক আছে, ঠিক আছে। এক দিন একটু অনিয়ম হােক না হয়। তােমার এক ভাই শুনেছি খুব নাম করেছে। আমি ঠিক চিনতাম না। কিটকি আমাকে বলল। কিটকি আমার ভাগ্নী, চিনেছ?‘
‘জ্বি।
‘মাের বাবা আসলে সবাইকে নিয়ে যাবে আমাদের বাসায়। আমিই নিয়ে যাব। তােমার মার অনেক গয়না ছিল। সব ফেলে এসেছিল, সেগুলিও নিয়ে আসবে।
মামা নিকে কাছে ডেকে আদর করতে লাগলেন, ‘ফুলের মতাে মেয়ে। তুমি যাবে মা আমার বাসায়? তােমাকে একটা জিনিস দেব।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-২৮
কী জিনিস? একটা ময়ূর। হিন্ট্রাক্টে থাকে– এক বন্ধু–আমাকে দিয়েছিল। ‘পেখম হয়? ‘হয় বােধকরি। আমি অবশ্যি পেখম হতে দেখি নি।
আমি বললাম, মামা, মার একটা পুরনাে রেকর্ড ছিল নাকি?” ‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আছে এখনাে। তুমি চাও সেটি? ‘শুনতে ইচ্ছে হয় খুব।‘
‘নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই। মার গান শুনতে ইচ্ছে তাে হবেই। পাঠিয়ে দেব আমি, আমার মনে থাকবে।
ঝুনুকে শেষ পর্যন্ত আসতে দিল তারা।
তিন বৎসর পর দেখছি। মা হতে যাবার আগের শারীরিক অস্বাভাবিকতায় একটু যেন লজ্জিত। ছেলেবেলার উচ্ছ্বলতা ঢাকা পড়েছে অপরূপ কমনীয়তায়। মােটা হওয়াতে একটু যেন ফর্সা দেখাচ্ছে।
দুপুরবেলা সে যখন এসেছে, তখন আমি কলেজে। মটু পাশের বাড়ি থেকে ফোন করল আসতে। পরীক্ষা–সংক্রান্ত জরুরী মীটিং ছিল, আসতে পারলাম না। সারাক্ষণই ভাবছিলাম, কেমন না জানি হয়েছে বুনুটা। সেদিনও একটা চিঠি পেয়েছি, তুমি তাে মনে কর বিয়ে করে ঝুনু বদলে গেছে। বাসার কারাে সঙ্গে কোনাে যােগ নেই। তাই বাসার কোনাে খবরই আমাকে দাও না।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-২৮
রাবেয়া আপার যে জ্বর হয়েছিল, সে তাে তুমি কিছু লেখ নি। বাবার চিঠিতে জানলাম। আর আমি এত কেঁদেছি, তােমরা সবাই আমাকে পর মনে করছ, এই জন্যে। মন্টুর কবিতার বই বেরিয়েছে, মন্টু আমায় পাঠায় নি। আমি নিজে যখন একটা কিনেছি, তার দশ দিন পর সে বই পাঠিয়েছে। কেন, আগে পাঠালে কী এমন ক্ষতি হ’ত? মন্টু তার বইয়ে পেন্সিল দিয়ে লিখেছে, ‘সুক্রন্দসী বন্ধু ঝুনুকে। আমি বুঝি সুক্রন্দসী? মন্টুকে হাতের কাছে পেলে কাঁদিয়ে ছাড়ব..।‘
সন্ধ্যাবেলা বাসায় এসে শুনি ঝুনু পাশের বাড়ি বেড়াতে গেছে। চায়ের পেয়ালা হাতে বারান্দায় একা একা বসে পেপার দেখছি, এমন সময় সে এল। কি একটা ব্যাপারে ভীষণ খুশি হয়ে হাসতে হাসতে আসছে। আমায় লক্ষ করে নি দেখে নিজেই ডাকলাম, ঝুনু, আয় এদিকে।
ঝুনু প্রথমে থতমত খেল। তারপর কিছু বােঝবার আগেই তার হাতের ধাকায় আমার হাত থেকে চায়ের পেয়ালা ছিটকে পড়ল। এবং প্রথমেই যা বুঝতে পামি, তা হচ্ছে ঝুনুটা আমায় জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছে। প্রথম উচ্ছ্বাসটা কাটল অল্পক্ষণেই, কান্না থামল না। অনেক দিন পর প্রিয় জায়গায় ফিরে আসা, রুনুর মৃত্যু, নিজের জীবনের অশান্তি—সব মিলিয়ে যে কান্না, তা একটু দীর্ঘস্থায়ী তাে হবেই। আমি বললাম, ‘ঝুনু, চা খা, তারপর আবার কান্না শুরু কর। মন্টু তােকে সুক্রন্দসী কি আর শুধু শুধু লিখেছে?
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-২৮
কাঁদুক, মুনু কাঁদুক। অনেক দিন এ বাড়িতে কেউ কাঁদে না। সেই কবে রুনু মারা গেল। খুব কাঁদল সবাই। বাবা গলা ছেড়ে কাঁদলেন, মটু আর রাবেয়া ছেলেমানুষের মতাে কাঁদল। নিনু চুপি চুপি আমার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ল। তারপর আর এ বাড়িতে কান্না কই? নিন পর্যন্ত ভুলেও কাঁদে না। রাবেয়া হয়তাে কাঁদে, আমার তাে কখনাে চোখে পড়ে না। কাঁদুক ঝুন। আমি দেখি তাকিয়ে তাকিয়ে সুক্রন্দসী ঝুনুকে। | ঝুনুর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল পুরনাে দিনগুলি যেন ফিরে এসেছে।
আগের মতাে হৈ–হল্লা হতে লাগল। নিনুর চুল ঘন হয়ে উঠবে বলে এক দিন ঝন মহা–উৎসাহে নিনুর মাথা মুড়িয়ে দিল। নিনু তার কাটা চুল লুকিয়ে রাখল তার পুতুলের বাক্সে। এই নিয়ে ফুর্তি হল খুব। মন্টু ছড়া লিখল একটা––‘নিনুর চুল। নিজের পত্রিকায় ছবি দিয়ে ছাপিয়ে ফেলল সেটি। নিনুও মন্টুর খাতায় গােপনে লিখে রাখল ‘মন্টু ভাই একটা বােকা রােজ খায় তেলাপােকা। ঝুনু সবাইকে এক দিন সিনেমা দেখাল। রােববারে পিকনিক হল আমগাছের তলায়। সময় কাটতে লাগল বড় সুখে।
সেদিন সন্ধ্যাবেলা মাথার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে শুয়ে আছি। ঝুনু এসে বলল, ‘মাথায় হাত বুলিয়ে দেব দাদা?
‘না, এমনি সারবে।‘ ‘আহা, দিই না একটু।
Read More