হুমায়ূন আহমেদের লেখা শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-২৮

আমি কোনাে কথা বললাম নামামা বললেন, শিরিনের অনেক গুণ ছিলসাধারণত মেয়েদের থাকে নাযখন সে এখানে চলে আসল, তখন সবাই দুঃখিত হয়েছিলামগুণ বিকাশে পরিবেশের প্রয়ােজন হয় তাে

শঙ্খনীল কারাগার 

নিনু চা নিয়ে ঢুকলমামা চায়ে চুমুক দিয়ে চমকালেন, একি খুকি, চিনি দিয়ে এনেছ যে

নিনু আধহাত জিভ বের করে ফেললমামা বললেন, ঠিক আছে, ঠিক আছেএক দিন একটু অনিয়ম হােক না হয়তােমার এক ভাই শুনেছি খুব নাম করেছেআমি ঠিক চিনতাম নাকিটকি আমাকে বললকিটকি আমার ভাগ্নী, চিনেছ?‘ 

জ্বি। 

মাের বাবা আসলে সবাইকে নিয়ে যাবে আমাদের বাসায়আমিই নিয়ে যাবতােমার মার অনেক গয়না ছিলসব ফেলে এসেছিল, সেগুলিও নিয়ে আসবে। 

মামা নিকে কাছে ডেকে আদর করতে লাগলেন, ফুলের মতাে মেয়েতুমি যাবে মা আমার বাসায়? তােমাকে একটা জিনিস দেব। 

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-২৮

কী জিনিস? একটা ময়ূরহিন্ট্রাক্টে থাকেএক বন্ধুআমাকে দিয়েছিলপেখম হয়? হয় বােধকরিআমি অবশ্যি পেখম হতে দেখি নি। 

আমি বললাম, মামা, মার একটা পুরনাে রেকর্ড ছিল নাকি?হ্যাঁ হ্যাঁ, আছে এখনােতুমি চাও সেটি? শুনতে ইচ্ছে হয় খুব‘ 

নিশ্চয়ই নিশ্চয়ইমার গান শুনতে ইচ্ছে তাে হবেইপাঠিয়ে দেব আমি, আমার মনে থাকবে। 

ঝুনুকে শেষ পর্যন্ত আসতে দিল তারা। 

 তিন বৎসর পর দেখছিমা হতে যাবার আগের শারীরিক অস্বাভাবিকতায় একটু যেন লজ্জিতছেলেবেলার উচ্ছ্বলতা ঢাকা পড়েছে অপরূপ কমনীয়তায়মােটা হওয়াতে একটু যেন ফর্সা দেখাচ্ছে। 

দুপুরবেলা সে যখন এসেছে, তখন আমি কলেজেমটু পাশের বাড়ি থেকে ফোন করল আসতেপরীক্ষাসংক্রান্ত জরুরী মীটিং ছিল, আসতে পারলাম নাসারাক্ষণই ভাবছিলাম, কেমন না জানি হয়েছে বুনুটাসেদিনও একটা চিঠি পেয়েছি, তুমি তাে মনে কর বিয়ে করে ঝুনু বদলে গেছেবাসার কারাে সঙ্গে কোনাে যােগ নেইতাই বাসার কোনাে খবরই আমাকে দাও না

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-২৮

রাবেয়া আপার যে জ্বর হয়েছিল, সে তাে তুমি কিছু লেখ নিবাবার চিঠিতে জানলামআর আমি এত কেঁদেছি, তােমরা সবাই আমাকে পর মনে করছ, এই জন্যেমন্টুর কবিতার বই বেরিয়েছে, মন্টু আমায় পাঠায় নিআমি নিজে যখন একটা কিনেছি, তার দশ দিন পর সে বই পাঠিয়েছেকেন, আগে পাঠালে কী এমন ক্ষতি ? মন্টু তার বইয়ে পেন্সিল দিয়ে লিখেছে, সুক্রন্দসী বন্ধু ঝুনুকেআমি বুঝি সুক্রন্দসী? মন্টুকে হাতের কাছে পেলে কাঁদিয়ে ছাড়ব..‘ 

সন্ধ্যাবেলা বাসায় এসে শুনি ঝুনু পাশের বাড়ি বেড়াতে গেছেচায়ের পেয়ালা হাতে বারান্দায় একা একা বসে পেপার দেখছি, এমন সময় সে এলকি একটা ব্যাপারে ভীষণ খুশি হয়ে হাসতে হাসতে আসছেআমায় লক্ষ করে নি দেখে নিজেই ডাকলাম, ঝুনু, আয় এদিকে। 

ঝুনু প্রথমে থতমত খেলতারপর কিছু বােঝবার আগেই তার হাতের ধাকায় আমার হাত থেকে চায়ের পেয়ালা ছিটকে পড়লএবং প্রথমেই যা বুঝতে পামি, তা হচ্ছে ঝুনুটা আমায় জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে কাঁদছেপ্রথম উচ্ছ্বাসটা কাটল অল্পক্ষণেই, কান্না থামল নাঅনেক দিন পর প্রিয় জায়গায় ফিরে আসা, রুনুর মৃত্যু, নিজের জীবনের অশান্তিসব মিলিয়ে যে কান্না, তা একটু দীর্ঘস্থায়ী তাে হবেইআমি বললাম, ঝুনু, চা খা, তারপর আবার কান্না শুরু করমন্টু তােকে সুক্রন্দসী কি আর শুধু শুধু লিখেছে?

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-২৮

কাঁদুক, মুনু কাঁদুকঅনেক দিন বাড়িতে কেউ কাঁদে নাসেই কবে রুনু মারা গেলখুব কাঁদল সবাইবাবা গলা ছেড়ে কাঁদলেন, মটু আর রাবেয়া ছেলেমানুষের মতাে কাঁদলনিনু চুপি চুপি আমার গলা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়লতারপর আর বাড়িতে কান্না কই? নিন পর্যন্ত ভুলেও কাঁদে নারাবেয়া হয়তাে কাঁদে, আমার তাে কখনাে চোখে পড়ে নাকাঁদুক ঝুনআমি দেখি তাকিয়ে তাকিয়ে সুক্রন্দসী ঝুনুকে| ঝুনুর সঙ্গে সঙ্গে মনে হল পুরনাে দিনগুলি যেন ফিরে এসেছে

আগের মতাে হৈহল্লা হতে লাগলনিনুর চুল ঘন হয়ে উঠবে বলে এক দিন ঝন মহাউৎসাহে নিনুর মাথা মুড়িয়ে দিলনিনু তার কাটা চুল লুকিয়ে রাখল তার পুতুলের বাক্সেএই নিয়ে ফুর্তি হল খুবমন্টু ছড়া লিখল একটানিনুর চুলনিজের পত্রিকায় ছবি দিয়ে ছাপিয়ে ফেলল সেটিনিনুও মন্টুর খাতায় গােপনে লিখে রাখল মন্টু ভাই একটা বােকা রােজ খায় তেলাপােকাঝুনু সবাইকে এক দিন সিনেমা দেখালরােববারে পিকনিক হল আমগাছের তলায়সময় কাটতে লাগল বড় সুখে। 

সেদিন সন্ধ্যাবেলা মাথার যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে শুয়ে আছিঝুনু এসে বলল, মাথায় হাত বুলিয়ে দেব দাদা

না, এমনি সারবেআহা, দিই না একটু

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-২৯

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *