হুমায়ূন আহমেদের লেখা শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৩০

সন্ধ্যাবেলা রাবেয়া রিক্সা থেকে পাংশু মুখে নামলভীত গলায় বলল, বাসায় কিছু হয়েছে

না, কী হবে?

শঙ্খনীল কারাগার

আরে মন্টটা এমন গাধা, কলেজে আমার কাছে স্লিপ পাঠিয়েছে, বাসায় এসাে, খুজরুরীআমি তাে ভয়ে মরিনা জানি কার কি হল!

না, কী আর হবেমায়ের রেকর্ডটা দিয়ে গেছেতাই নাকি, বলবি তাে‘ 

বাবা দামী দুটি জরির মালা নিয়ে এলেনফুলের মালা পেলাম না রে, অনেক খুঁজেছিমালা দুটি অনেক বড়াে হল! ফটোতে দিতেই ফটো ছাড়িয়ে নিচে অব্দি ঝুলতে লাগল। 

বসার ঘরটা সুন্দর করে সাজান হলচেয়ারটেবিল সরিয়ে মেঝেতে বিছানা করা হলধূপ পােড়ান হলস্মৃতি হিসেবে মায়ের পার্কার কলমটা রাখা হলএটি ছাড়া তাঁর স্মৃতিবিজড়িত আর কিছুই ছিল না বাসায়। 

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৩০

ঠিক আটটায় কিটকি এলসঙ্গে খালাও এসেছেনবেশ কতগুলি ছবিও এনেছে কিটকি। 

উৎসবটা কিন্তু যেমন হবে ভেবেছিলাম, তার কিছুই হল নাখালার সঙ্গে ভােলা মায়ের ছােটবেলাকার ছবিগুলি দেখলাম সবাই। 

মার কথা কিছু বলবার জন্যে অনুরােধ করতেই খালা তাঁর নিজের কথাই বলতে লাগলেনছােটবেলায় কেমন নাচতে পারতেন, কেমন অভিনয় করতে পারতেন। তাঁর করা ইন্দ্রাণীপার্ট দেখে কোন ডাইরেক্টর তাঁকে ছবিতে নামার জন্যে ঝােলাঝুলি করেছিলএই জাতীয় গল্পখারাপ লাগছিল খুবখালার থামার নাম নেইশেষটায় কিটকি বলল, আপনি একটু রেস্ট নিন মা, আমরা খালুজানের কথা শুনি‘ 

বাবা থতমত খেয়ে বললেন, নানা, আমি কী বলব? আমি কী বলব? তােমরা বল মা, আমি শুনি। 

না খালুজান, আপনাকে বলতেই হবেআমরা ছাড়ব না‘ 

বাবা বিব্রত হয়ে বললেন, তােমাদের মা খুব বড়ঘরের মেয়ে ছিলআমাকে সে নিজে ইচ্ছে করেই বিয়ে করেছিলতখন তার খুব দুর্দিনআমি খুব সাহস করে তাকে বললাম আমাকে বিয়ে করতেহ্যাঁ, আমি তাকে খুব পছন্দ করতামসে খুব। 

অবাক হয়েছিল আমার কথা শুনেকিন্তু রাজি হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গেনা, আমি ; কোনাে অযত্ন করি নিহ্যাঁ, আমার মনে হয় সে শেষ পর্যন্ত খুশিই হয়েছিল, কী আর জানি আমিতােমরা বরং গানটা শােনচোখে আবার কি পড়লকি মুশকিল

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৩০

বাবা চোখের সেই অদৃশ্য জিনিসটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেনমন্টু রেকর্ড চালিয়ে দিলপুরনাে রেকর্ড, তবু খুব সুন্দর বাজছিলআমরা উৎকর্ণ হয়ে রইলামঅল্পবয়সী কিশােরীর মিষ্টি সুরেলা গলাএই তাে এত পথ এত যে আলাে....অদুত লাগছিলভাবতেই পারছিলাম না, আমাদের মা গান গাইছেনফ্রকপরা 

স্ত্রীর মতাে একটি মেয়ে হারমােনিয়ামের সামনে বসে দুলে দুলে গান গাইছে, এমন একটি চিত্র চোখে ভাসতে লাগল। 

বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি, তাঁর চোখের সেই অদৃশ্য বস্তুটি ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুকণা হয়ে ঝরে পড়ছে মেঝেতে। 

বাবার হঠাৎ কেন জানি শখ হয়েছে, রান্নার বই লিখবেন একটিরকমারি রান্নার কায়দাকানুন নােট বইয়ে লিখে রাখছেনবাজার থেকে অনেক বইপত্রও কিনে এনেছেনপুরানােবেগমথেকে ঘেটে ঘেটে নারকেলইলিশ বা ছানার ডালনার রন্ধনপ্রণালী অসীম আগ্রহে খাতায় তুলে ফেলেছেনব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করছে নিলু আর ওভারশীয়ার কাকুর ছেলের বউমাঝে মাঝে দুএকটি রানা বাসায়ও রাধা হয়সেদিন যেমন নােয়াপতি মিষ্টি বলে একটা মিষ্টি তৈরি হল। 

খেতে ভালাে হয়েছে বলায়, সে কী ছেলেমানুষি খুশি

ভালােই হয়েছে, কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকছেনরাবেয়াও তার পড়াশােনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ততার দেখা পাওয়াই মুশকিলযদি বলি আয় রাবেয়া একটু গল্প করি, রাবেয়া আৎকে ওঠে, দু দিন পরেই আমার পরীক্ষাএখন তাের সাথে আড্ডা দিই! পাগল আর কাকে বলে

মন্টু রাতে বাসায় ফেরাই বন্ধ করে দিয়েছেকয়েক জন বন্ধু মিলে নাকি এক ঘর ভাড়া করেছেসেখানে গল্পগুজব হয়কাজেই বাসায় তার বড়াে একটা আসা হয় না, হঠাৎ একআধ দিন আসেমেহমানের মতাে ঘুরে বেড়ায়, বাবাকে গিয়ে বলে, মােট রকম রান্নার যােগাড় হল বাবা

এক বারাে।বাবা, এত! একটা রান্না কর না আজ, খাইকীকী লাগবে বল, আমি বাজার থেকে নিয়ে আসি‘ 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৩১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *