সন্ধ্যাবেলা রাবেয়া রিক্সা থেকে পাংশু মুখে নামল। ভীত গলায় বলল, বাসায় কিছু হয়েছে?
‘না, কী হবে?

আরে মন্টটা এমন গাধা, কলেজে আমার কাছে স্লিপ পাঠিয়েছে, বাসায় এসাে, খুব জরুরী। আমি তাে ভয়ে মরি। না জানি কার কি হল!’
‘না, কী আর হবে। মায়ের রেকর্ডটা দিয়ে গেছে। ‘তাই নাকি, বলবি তাে।‘
বাবা দামী দু’টি জরির মালা নিয়ে এলেন। ফুলের মালা পেলাম না রে, অনেক খুঁজেছি।‘ মালা দু’টি অনেক বড়াে হল! ফটোতে দিতেই ফটো ছাড়িয়ে নিচে অব্দি ঝুলতে লাগল।
বসার ঘরটা সুন্দর করে সাজান হল। চেয়ার–টেবিল সরিয়ে মেঝেতে বিছানা করা হল। ধূপ পােড়ান হল। স্মৃতি হিসেবে মায়ের পার্কার কলমটা রাখা হল। এটি ছাড়া তাঁর স্মৃতিবিজড়িত আর কিছুই ছিল না বাসায়।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৩০
ঠিক আটটায় কিটকি এল। সঙ্গে খালাও এসেছেন। বেশ কতগুলি ছবিও এনেছে কিটকি।।
উৎসবটা কিন্তু যেমন হবে ভেবেছিলাম, তার কিছুই হল না। খালার সঙ্গে ভােলা মায়ের ছােটবেলাকার ছবিগুলি দেখলাম সবাই।
মার কথা কিছু বলবার জন্যে অনুরােধ করতেই খালা তাঁর নিজের কথাই বলতে লাগলেন। ছােটবেলায় কেমন নাচতে পারতেন, কেমন অভিনয় করতে পারতেন। তাঁর করা ‘ইন্দ্রাণী‘র পার্ট দেখে কোন ডাইরেক্টর তাঁকে ছবিতে নামার জন্যে ঝােলাঝুলি করেছিল––এই জাতীয় গল্প। খারাপ লাগছিল খুব। খালার থামার নাম নেই। শেষটায় কিটকি বলল, আপনি একটু রেস্ট নিন মা, আমরা খালুজানের কথা শুনি।‘
বাবা থতমত খেয়ে বললেন, ‘না–না, আমি কী বলব? আমি কী বলব? তােমরা বল মা, আমি শুনি।
‘না খালুজান, আপনাকে বলতেই হবে। আমরা ছাড়ব না।‘
বাবা বিব্রত হয়ে বললেন, ‘তােমাদের মা খুব বড়ঘরের মেয়ে ছিল। আমাকে সে নিজে ইচ্ছে করেই বিয়ে করেছিল। তখন তার খুব দুর্দিন। আমি খুব সাহস করে তাকে বললাম আমাকে বিয়ে করতে। হ্যাঁ, আমি তাকে খুব পছন্দ করতাম। সে খুব।
অবাক হয়েছিল আমার কথা শুনে। কিন্তু রাজি হয়েছিল সঙ্গে সঙ্গে। না, আমি ৩; কোনাে অযত্ন করি নি। হ্যাঁ, আমার মনে হয় সে শেষ পর্যন্ত খুশিই হয়েছিল। ২–“, কী আর জানি আমি। তােমরা বরং গানটা শােন। চোখে আবার কি পড়ল। কি মুশকিল।
শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৩০
বাবা চোখের সেই অদৃশ্য জিনিসটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। মন্টু রেকর্ড চালিয়ে দিল। পুরনাে রেকর্ড, তবু খুব সুন্দর বাজছিল। আমরা উৎকর্ণ হয়ে রইলাম। অল্পবয়সী কিশােরীর মিষ্টি সুরেলা গলা। ‘এই তাে এত পথ এত যে আলাে....‘। অদুত লাগছিল। ভাবতেই পারছিলাম না, আমাদের মা গান গাইছেন। ফ্রক–পরা
স্ত্রীর মতাে একটি মেয়ে হারমােনিয়ামের সামনে বসে দুলে দুলে গান গাইছে, এমন একটি চিত্র চোখে ভাসতে লাগল।
বাবার দিকে তাকিয়ে দেখি, তাঁর চোখের সেই অদৃশ্য বস্তুটি ফোঁটা ফোঁটা অশ্রুকণা হয়ে ঝরে পড়ছে মেঝেতে।।
বাবার হঠাৎ কেন জানি শখ হয়েছে, রান্নার বই লিখবেন একটি। রকমারি রান্নার কায়দা–কানুন নােট বইয়ে লিখে রাখছেন। বাজার থেকে অনেক বইপত্রও কিনে এনেছেন। পুরানাে‘বেগম’ থেকে ঘেটে ঘেটে নারকেল–ইলিশ বা ছানার ডালনার রন্ধনপ্রণালী অসীম আগ্রহে খাতায় তুলে ফেলেছেন। এ ব্যাপারে তাঁকে সাহায্য করছে নিলু আর ওভারশীয়ার কাকুর ছেলের বউ। মাঝে মাঝে দু‘–একটি রানা বাসায়ও রাধা হয়। সেদিন যেমন ‘নােয়াপতি মিষ্টি বলে একটা মিষ্টি তৈরি হল।
খেতে ভালাে হয়েছে বলায়, সে কী ছেলেমানুষি খুশি।
ভালােই হয়েছে, কিছু একটা নিয়ে ব্যস্ত থাকছেন। রাবেয়াও তার পড়াশােনা নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। তার দেখা পাওয়াই মুশকিল। যদি বলি ‘ আয় রাবেয়া একটু গল্প করি’, রাবেয়া আৎকে ওঠে, দু দিন পরেই আমার পরীক্ষা––এখন তাের সাথে আড্ডা দিই! পাগল আর কাকে বলে!
মন্টু রাতে বাসায় ফেরাই বন্ধ করে দিয়েছে। কয়েক জন বন্ধু মিলে নাকি এক ঘর ভাড়া করেছে। সেখানে গল্পগুজব হয়। কাজেই বাসায় তার বড়াে একটা আসা হয় না, হঠাৎ এক–আধ দিন আসে। মেহমানের মতাে ঘুরে বেড়ায়, বাবাকে গিয়ে বলে, ‘মােট ক‘রকম রান্নার যােগাড় হল বাবা?
এক শ’ বারাে।‘ ‘ও বাবা, এত! একটা রান্না কর না আজ, খাই। কী–কী লাগবে বল, আমি বাজার থেকে নিয়ে আসি।‘
Read More