ভুলবি কেন? রুনুকে কি আমরা ভুলতে পারি, না ভােলা উচিত ? কিটকি ভারি ভালােমানুষ। মেয়েটি যেন সুখী হয়। এখনাে তাে তার বয়স হয় নি, বুঝতেও শেখে নি কিছু। কষ্ট লাগে ভেবে।মার কথা তাের মনে পড়ে খােকা? চেহারা মনে করতে পারিস? আমি কিন্তু পারি না।
স্বপ্নেও দেখি না বহু দিন। খুব দেখতে ইচ্ছে হয়। জানি, মার প্রতি তােদের সবার একটা অভিমান আছে। তােদের ধারণা, মা কাউকে ভালােবাসতে পারে নি। হয়তাে সত্যি, হয়তাে সত্যি নয়। ছােটখালা এক দিন মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, ‘শিরিন, তুমি তােমার ছেলেমেয়েদের একটুও দেখতে পার না!”
মা জবাবে হেসে বলেছেন, এদের এমন করে তৈরি করে দিচ্ছি, যাতে ভালােবাসার অভাবে কখনাে কষ্ট না পায়। ……মা বড় দুঃখী ছিল রে খােকা! মেয়েমানুষের দুঃখ তাে বলে বেড়াবার নয়, ঢেকে রাখবার, চিরদিন তিনি তাই রেখে গেছেন। তােরা জানতেও পারিস নি। এত গানপাগল মা তেইশ বছরে একটি গানও গাইল না। প্রথম স্বামীকে ভুলতে পারে নি। যদি পারত, তবে জানত সুখের স্বাদ কত তীব্র। যাই হােক, যা চলে গেছে তা গেছে। যারা বেঁচে আছে তাদের কথাই ভাবি।
শঙ্খনীল কারাগার শেষ খণ্ড
কিছুক্ষণ আগে নিচে ঘন্টা দিয়েছে, খেতে যাবার সংকেত। আমার খাবার ঘরেই দিয়ে যায়। তবু নিচে গিয়ে এক বার দেখে আসি। আজ আর খাব না। শরীরটা ভালাে নেই। একটু যেন জ্বরজ্বর লাগছে। মাঝে মাঝে অসুখ হলে মন্দ লাগে না। অসুখ হলেই অনেক ধরনের চিন্তা আসে, যেগুলি অন্য সময় আসে না।
হােস্টেলের খুব কাছ দিয়ে নদী বয়ে গিয়েছে। সুন্দর নাম। এই মুহূর্তে মনে আসছে না। রাতের বেলা সার্চলাইট ফেলে ফেলে লঞ্চ যায়, বেশ লাগে দেখতে। দেখতে পাচ্ছি লঞ্চ যাচ্ছে আলাে ফেলে। তােরা ঢাকায় থেকে তাে এ–সব দেখবি
আজ এই পর্যন্ত থাক। শরীরের দিকে লক্ষ রাখিস। বাজে সিগারেট টানবি না। কম খাবি, কিন্তু দামী হতে হবে। টাকার ভাবনা তাে নেই। ছােটবেলা চুমু খেতাম হাের কপালে, এখন তাে বড়াে হয়ে গেছিস। তবু দূর থেকে চুমু খাচ্ছি।
তাের, রাবেয়া আপা। ……….ঠিকানাঃ সুপারিনটেনডেন্ট, গার্লস হােস্টেল আদর্শ হাইস্কুল পােঃ অঃ কলসহাটি জেলা–ময়মনসিংহ। ……….গভীর রাতে ঘুম ভেঙে যায় প্রায়ই। ছাড়া ছাড়া অর্থহীন স্বপ্ন দেখতে দেখতে হঠাৎ জেগে উঠি। পরিচিত বিছানায় শুয়ে আছি, এই ধারণা মনে আসতেও সময় লাগে। মাথার কাছের জানালা মনে হয় সরে গিয়েছে পায়ের কাছে। তৃষ্ণা বােধ হয়। টেবিলে ঢাকা–দেওয়া পানির গ্লাস। হাত বাড়িয়ে টেনে নিলেই হয়, অথচ ইচ্ছে হয় না।
শঙ্খনীল কারাগার শেষ খণ্ড
কোনাে কোনাে রাতে অপূর্ব জোছনা হয়। সারা ঘর নরম আলােয় ভাসতে থাকে। ভাবি, একা একা বেড়ালে বেশ হ‘ত। আবার চাদর মুড়ি দিয়ে নিজেকে গুটিয়ে ফেলি। যেন বাইরের উথালপাথাল চাঁদের আলাের সঙ্গে আমার কোনাে যােগ নেই।
মাঝে মাঝে বৃষ্টি নামে। একঘেয়ে কান্নার সুরের মতাে সে–শব্দ। আমি কান পেতে শুনি। বাতাসে জামগাছের পাতায় সরসর শব্দ হয়। সব মিলিয়ে হৃদয় হা–হা করে ওঠে। আদিগন্ত বিস্তৃত শূন্যতায় কী বিপুল বিষন্নতাই না অনুভব করি। জানালার ওপাশের অন্ধকার থেকে আমার সঙ্গীরা আমায় ডাকে। একদিন যাদের সঙ্গ পেয়ে। আজ নিঃসঙ্গতায় ডুবছি।*
Read More
