হুমায়ূন আহমেদের লেখা শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৯

খুশি খুশি গলায় বলেন, তুই বড়াে লেটরাইজারস্বাস্থ্য খারাপ হয় এতেদেখ না আমার স্বাস্থ্য আর তাের স্বাস্থ্য মিলিয়ে। 

সত্যি চমৎকার স্বাস্থ্য বাবাররিটায়ার করার পর আরাে ওজন বেড়েছেআমি সপ্রশংস চোখে তাকাই বাবার দিকেবাবা হেসে হেসে বলেন, এত রােগা তুই! কলেজের ছেলেরা তাের কথা শােনে?

শঙ্খনীল কারাগার 

তা শােনেরাবেয়া রান্নাঘর থেকে চাচায়, না বাবা, মােটেই শােনে না। 

বাবা খুব খুশি হনঅনেকক্ষণ ধরে আপন মনে হাসেনবেশ বদলে গেছেন তিনিবাবা ছিলেন নিরীহ, নির্লিপ্ত মানুষসকালে অফিসে যাওয়া, বিকেলে ফেরাসন্ধ্যায় একটু তাস খেলতে যাওয়া, দশটা বাজতেনাবাজতে ঘুমিয়ে পড়া

খুবই চুপচাপ স্বভাবআমাদের কাউকে কোনাে কারণে সামান্য ধমক দিয়েছেন, এও পর্যন্ত মনে পড়ে নাসংসারে বাবার যেন কোনাে অস্তিত্ব নেইআমাদের নিয়ে আর মাকে নিয়েই আমাদের সংসারবাবার ভূমিকা নেপথ্য কোলাহলের। 

কেউ আমাদের দাওয়াত করতে এলে মাকেই বলতবাড়িওয়ালা ভাড়া নিতে এসে বলত, খােকা তােমার মাকে একটু ডাক তেঅথচ বাবা হয়তো বাইরে মােড়ায় বসে মন্টুকে অঙ্ক দেখিয়ে দিচ্ছেন। 

এখন বাবা ভীষণ বদলেছেনসবার সঙ্গে প্রচুর উৎসাহ নিয়ে আলাপ চালানসেদিন ওভারশীয়ার কাকুর সঙ্গে মাছ ধরতে গিয়ে সারা দিন কাটিয়ে এসেছেনখবরের কাগজ রাখেন দুটিপ্রতিটি খবর খুটিয়ে খুটিয়ে পড়েনরাজনীতি নিয়েও আলােচনা চলে। 

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৯

খােকা, তাের কী ধারণা? আওয়ামী লীগ পপুলারিটি হারাবে? আমার? না, আমার কোনাে ধারণা নেই‘ 

ভালাে করে পেপার পড়া চাই, না পড়লে কি কিছু বােঝা যায়? রাজনীতি বুঝতে হলে চোখকান খােলা রাখা চাই, বুঝলি? কি, বিশ্বাস হল না, না?‘ 

হবে না কেন

বিশ্বাস যদি না হয়, কাগজকলম নিয়ে আয়, তিন বৎসর পর পার্টির কি অবস্থা হবে লিখে দিইসীল করে রেখে দেতিন বৎসর পর অক্ষরের সাথে অক্ষর মিলিয়ে দেখবি। 

বাবার রূপান্তর খুব আকস্মিক। আর আকস্মিক বলেই বড় চোখে পড়েপ্রচুর মিথ্যে কথাও বলেন বানিয়ে বানিয়েসেদিন যেমন শুনলামওভারশীয়ার কাকুর ছেলের বউয়ের সঙ্গে গল্প করছেন পাশের ঘরেঘর থেকে সমস্ত শােনা যাচ্ছে, কাউকে যেন বলাে না মা, গতকাল রাতে একটা অদ্ভুত ব্যাপার হয়েছে। 

কী ব্যাপার চাচাজান? | অনেক রাত তখনআমি বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে আছিহঠাৎ ফুলের গন্ধ পেলামবকুল ফুলের গন্ধঅবাক হয়ে চোখ তুলে তাকিয়ে আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে যাবার যােগাড়দেখি কি, খােকার মা হাল্কা হলুদ রঙের একটা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছে আমগাছটার নিচে। 

বলেন কি চাচা!হ্যাঁরে মা, মিনিট তিনেক দেখলামরাত কত তখন? বারােটার মতাে হবে

শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-৯

 গল্পটি যে সম্পূর্ণই মিথ্যা, এতে কোনাে সন্দেহ নেইগতরাতে আমার এক ফোঁটা ঘুম হয় নিসারা রাতই আমি বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে কাটিয়েছি। 

অথচ যেবাবা কোনােদিন অপ্রয়ােজনে সত্য কথাটিও বলেন নি, তিনি কেন এমন অনর্গল মিথ্যা বলে চলেন, ভেবে পাই না। 

রাবেয়া এক দিন বলছিল, মা মারা যাবার পর বাবা খুব ফ্রী হয়েছেন। 

তার মানে ? মানে আর কি, মনে হয় বাবা মার সঙ্গে ঠিক মানিয়ে নিতে পারেন নিতুই কী সব সময় বাজে বকিস

আহা এমনি বললামকে বলেছে বিশ্বাস করতে

বিশ্বাস না করলে অবশ্যি চলে, কিন্তু বিশ্বাস না করাইবা যায় কী করে? কিন্তু মার মতাে মেয়ে তেইশ বছর কী করে মুখ বুজে এইখানে কাটিয়ে দিয়েছেন ভেবে পাই নাবাবা মার সঙ্গে হাস্যকর আচরণ করতেনযেন মনিবের মেয়ের সঙ্গে দিয়ে দেয়া প্রিয় খানসামা এক জনভালােবাসার বিয়ে হলে রকম হয় না

সেখানে অসামঞ্জস্য হয়, অশান্তি আসে, কিন্তু মূল সুরটি কখনাে কেটে যায় নাঅথচ যতদূর জানি ভালােবেসেই বিয়ে হয়েছিল তাঁদেরকিছুটা খালা বলেছেন, কিছু বলেছেন বাবা, রাবেয়াও বলেছে কিছু কিছু {হয়তাে শুনেছে মার কাছ থেকেই)সব মিলিয়ে ধরনের চিত্র কল্পনা করা যায়। 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা শঙ্খনীল কারাগার খন্ড-১০

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *