সূর্যের দিন খন্ড-১-হুমায়ূন আহমেদ

সূর্যের দিন খন্ড-১-হুমায়ূন আহমেদ

এ বাড়ির নিয়ম হচ্ছে যাদের বয়স বারোর নিচে তাদের বিকেল , পাঁচটার অগে ঘরে ফিরতে হবে। যাদের বয়স আঠারাের নিচে তাদের ফিরতে হবে ছটার মধ্যে।……..খোকনের বয়স তেরাে বছর তিন মাস। কাজেই তার বাইরে থাকার মেয়াদ ছটা। কিন্তু এখন বাজছে সাড়ে সাতটা। বাড়ির কাছাকাছি এসে খোকনের বুক শুকিয়ে তৃষ্ণা পেয়ে গেল। অজি বড় চাচীর সামনে পড়ে গেলে ভূমিকম্প হয়ে যাবে। 

অবশ্যি চমৎকার একটি গল্প তৈরি করা আছে। খোকন ভেবে রেখেছে সে মুখ কালাে করে বলব……….—“সাজ্জাদের সঙ্গে স্কুলে খেলছিলাম, হঠাৎ দেখলাম বিরাট একটা মিছিল আসছে। সবাই খুব শ্লোগান দিচ্ছ………….—“জাগো বাঙালী জাগাে” আমরা দূর থেকে দেখছি।

এমন সময় গণ্ডগোল লেগে গেলো। পুলিশের গাড়ির ওপর সবাই ইট-পাটকেল মারতে লাগলো। চারদিকে হৈ চৈ ছোটাছুটি। আমি সাজ্জাদকে সঙ্গে নিয়ে ছুটতে লাগলাম। পেছনে পটাপট শব্দ হচ্ছে, বোধ হয় গুলি হচ্ছে। আমরা আর পেছন ফিরে তাকাইনি, ছুটছিতো ছুটছিই। ফিরতে দেরি হলো এইজন্যে।

সূর্যের দিন খন্ড-১ 

খুব বিশ্বাসযােগ্য গল্প। অজিকাল রোজই মিছিল হচ্ছে। আর রোজই গণ্ডগোল হচ্ছে। মিছিলের ঝামেলায় পড়ে যাওয়ার কথা সবাই বিশ্বাস করবে। ……কিন্তু মুশকিল হচ্ছে বড়চাচাকে ঠিক সাধারণ মানুষের পর্যায়ে ফেলা যায় না। তার সম্ববত তিন নম্বর চোখ বলে কিছু আছে, যা দিয়ে তিনি অনেক দূর পর্যন্ত দেখে ফেলেন।

কথা বলতে শুরু করেন তবে একতলার সবচে বাঁ দিকের ঘরটিতে আলো জ্বলছে। এটা একটা সূক্ষণ। এর মানে হচ্ছে বড়চাচার কাছে মককেল এসেছে। তিনি মামলার নথিপত্র নিয়ে ব্যস্ত। খােকন এত রাত পর্যন্ত বাইরে এটা বোধ হয় এখনাে ধরতে পারেন নি। যা হবার হবে, খোকন খোলা দরজা দিয়ে ঢুকে পড়লো। 

কিন্তু আশ্চর্য, কিছুই হলো না। সবাই যেন কেমন খুশি খুশি। উৎসব উৎসব একটা ভাব। ছোটরা চিৎকার চেঁচামেচি করছে, কেউ তাদের বকছে না। বড়চাচী পান বানাতে বানাতে কি গল্প বলে হেসে গড়িয়ে পড়ছেন। ঈদের আগের রাতে যে রকম একটা অনিন্দ ভাব থাকে, চারিদিকের অবস্থা সে রকম কিছু ঘটেছে, কিন্তু এখুনি কাউকে কিছু জিজ্ঞেস করা ঠিক হবে না।

সূর্যের দিন খন্ড-১ 

খোকন এমন ভঙ্গিতে ঘুরে বেড়াতে লাগলো যেন সে সরাক্ষণ বাড়িতেই ছিল। অনজু আর বিলু সাপলুডু খেলছিলো। গুদের পাশে কিছুক্ষণ দাঁড়ালো। বিলুটা মহা চোর। তার পড়েছে চার কিন্তু সে পাঁচ চেলে তরতর করে মই বেয়ে উঠে গেলো। পরের বার উঠলো পাঁচ, একেবারে সাপের মুখে। সে আবার চাললো চার। অনজুটা এমন বোকা, কিছুই বুঝতে পারছে না। খোকন বললো—এইসব কি হচ্ছে বিলু? 

ও কিছুই হচ্ছে না। তুমি মেয়েদের খেলায় কথা বলতে এসেছ কেন? কোথায় ছিলে সারা সন্ধ্যা? ………ও ঘরেই ছিলাম। যাবাে আবার কোথায় ? ……খোকন সেখানে আর দাঁড়াল না। চলে এলো দোতলায়। বাবার ঘরে গিয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করলো–প্যাথলজি’ শব্দের মানে কি। যাতে বাবা বুঝতে পারেন সে পড়াশোনা নিয়েই আছে। 

বাবাকে কিছু জিজ্ঞেস করা মুশকিল। তিনি অল্প কথায় কোনাে জবাব দিতে পারেন না। প্যাথলজি শব্দের মানে বলতে তিনি পনেরো মিনিট সময় নিলেন। চিকিৎসা শাস্ত্রের কথা বললেন, ভেষজ বিজ্ঞানের ইতিহাস বললেন, শারীরবিদ্যায় প্রাচীন গ্রীকদের অবদানের কথা বল লেন। খোকন চোখ বড় বড় করে শুনলো। তার ভঙ্গিটা এরকম, যেন সে খুব মজা পাচ্ছে। বাবা বক্তৃতা শেষ করে বললেন-~-যা যা বললাম সব খাতায় লিখে রাখবে।  জি রাখব। 

ও লিখবার আগে ছোটদের এনসাইক্লোপিডিয়াটাও দেখে নেবে। আমি হয়ত অনেক পয়েন্টস মিস করেছি………….পঁয়ত্রিশ পয়সা এবং একটা হেঁড়া হলুদ রঙের সোয়েটার পেয়ে গেলেন। গম্ভীর হয়ে বললেন, “পেশা হিসেবে ভিক্ষাবৃত্তি খুব খারাপ না। যে লোক এমন একটা কাণ্ড করে তাকে ভাল না বেসে পারা যায় ? 

 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা সূর্যের দিন খন্ড-২

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *