হুমায়ূন আহমেদের লেখা সূর্যের দিন খন্ড-৩

সাজ্জাদ এক সঙ্গে দুটো সন্দেশ মুখে পুড়ে দিল। মিষ্টির ভেতরও যে এমন সুন্দর গন্ধ থাকতে পারে তা তার জানাছিল না। এ মিষ্টিগুলো কি বাড়িতেই তৈরি হয়? সাজ্জাদের হঠাৎ করে বড়লোক হবার ইচ্ছে হলো। খোকনদের মত বড়লোক।

সূর্যের দিন

বড়চাচা বললেন, “আচ্ছা তাহলে তোমরা যাও। খোদা হাফেজ। 

বটুর ইচ্ছে হলো এগিয়ে গিয়ে পা ছুয়ে সালাম করে ফেলে। মুরব্বীদের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হলে যে রকম করা হয়। কিন্তু সাহসে কুলালো না। যখন বেরিয়ে যাচ্ছে তখন বড়চাচা আবার ডাকলেন ‘তোমাদের একটা কথা জিজ্ঞেস করা হয়নি, তোমরা কি মিছিলে যাও ? অর্থাৎ আমি জানতে চাচ্ছি ভয়াল-ছয়ের সদস্যরা মিছিলে যায় ? সাজ্জাদ ইতস্তত করে বললো, ওরা যায় না, আমি যাই। 

 কেন যাও? সাজ্জাদ জবাব দিতে পারল না। ঃ এইসবমিছিল টিছিল কেন হচ্ছে জান? ও জানি। : কেন? সাজ্জাদ জবাব দিতে পারলো না। বড়চাচা গম্ভীর মুখে বললেন, না না তুমি জান না। মিছিল টিছিল করা এখন আমাদের স্বভাব হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথায় কথায় মিছিল। সভা, শোভাযাত্রা। এইসব কি? রাতদিন রাস্তায় চেঁচামেচি করলে মানুষ কাজ করবে কখন ? 

সাজ্জাদ কিছু বললো না। বড়চাচা হঠাৎ করে কেন রেগে যাচ্ছেন সে বুঝতে পারছে না। 

সূর্যের দিন খন্ড-৩

ও আওয়ামী লীগ ইলেকশনে জিতেছে, ভাল কথা। কিন্তু এমন করছে যেন তারা যা বলবে তাই। আরে বাবা পাকিস্তানের কথাওতো শুনতে হবে। হবে কিনা বল ? 

করা নিষিদ্ধ। কেউ খেতে না চাইলে খাবে না। রতনের মা দুমিনিট পরেই আবার এসে হাজির। 

ও দাদাভাই আপনের ডাকে। ঃ কে ডাকে? : আপনার আম্মা। 

খােকনের মা’র শরীর মনে হয় আজ অন্য দিনের চেয়েও খারাপ। মাথার নিচে তিন-চারটা বালিশ দিয়ে তাকে শোয়ানো হয়েছে। মুখ রক্তশূন্য। ঘরের বুড় বড় জানালায় ভারী পর্দা ঝুলছে। চারিদিক অন্ধ কার। খােকন ঘরে ঢুকতেই তিনি নিচু গলায় বললেন, ‘কাল বিকেলে তোকে খুজছিলাম, কোথায় ছিলি?” মায়ের সামনে থােকন মিথ্যা বলতে পারে না। সে মুদুস্বরে বললো-বাইরে ছিলাম। 

ও মিছিলে টিছিলে যাসনি তো? 

ঝামেলার মধ্যে যাবি না, কেমন ? আচ্ছা। 

 বোস এখানে। দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তুই তো অামার ঘরে আসাই বন্ধ করে দিয়েছিস। 

খোকন বসলো। খোকনের মা বললেন–একটা কমলা খাবি? : না। : না কেন, খা একটা। তিনি একটি কমলা বের করে দিলেন। ও আমার কাছে দে, আমি ছিলে দিচ্ছি।আমি ছিলতে পারব। 

সূর্যের দিন খন্ড-৩

দে আমার কাছে। খোকনের মা কমলাছিলতে লাগলেন। কিন্তু দেখে মনে হলো এই টুকু কাজ করতেই তার খুব কষ্ট হচ্ছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। তিনি টেনে টেনে বললেন-মিস গ্রিফিন বল ছিলো গণ্ডগোল নাকি প্রায় মিটমাটের দিকে। ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে নাকি শেখ মুজিবের মিটমাট হয়ে গেছে। এখন নাকি শেখ মুজিব প্রধানমন্ত্রী হবে। 

খোকন কিছু বললো না। 

 জেগে ছিলে নাকি ? জ্বি। জেগে ছিলৈ অথচ কিছুই করছিলে না। 

বাবা খুবই অবাক হলেন। খোকনের বাবা রকিব সাহেব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন টিচার। ইতিহাস পড়নি। তিনি খুব সহজে অবাক হতে পারেন। তাঁর বেশ কিছু অদ্ভুত ব্যাপার আছে। যেমন প্রায়ই খোকনের সঙ্গে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নিয়ে কথা বলেন। 

সে সময় তাকে তুমি তুমি করে বলেন। অন্য সময় তুই করে। 

: খোকন ঠিক করে বল তো তােমার শরীর খারাপ করেনিতো? : জি না। ঃ দেখি এদিকে এসো, জ্বর আছে কি না দেখি। তিনি খোকনের কপালে হাত রাখলেন। : না, জ্বর নেই তো। 

রকিব সাহেব অবার অবাক হলেন। যেন জ্বর না থাকাটাও অবাক হবার মত ব্যাপার।কাল অনেক রাত পর্যন্ত জেগে ছিলে, কিছু নিয়ে চিন্তা করছিলে নাকি ? 

 হ্যা। ও আমাকে বলতে চাও? বলতে চাইলে বলতে পারি। 

খোকন ইতস্তত করতে লাগলো। বাবা বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে অাছেন তার দিকে। মাঝে মাঝে খোকনের প্রতি তার অগ্রিহ খুব বেড়ে যায়। খুব খোঁজ খবর করেন। তারপর অাবার অগ্রিহ কমে যায়। বইপত্র নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। কিছুই আর মনে থাকে না। 

 

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা সূর্যের দিন খন্ড-৪

 

 

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *