ফরিদা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, আমার দম ফুরিয়ে গেছে। আমি একটু দম। নিয়ে নেই। আমি চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ শুয়ে থাকব। আপনি কিন্তু চলে যাবেন

আমি চলে যাব না। | ফরিদা চোখ বন্ধ করল । এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়ল। আমি বসে। আছি তার পাশে। তাকিয়ে আছি একটি ঘুমন্ত মেয়ের মুখের দিকে। দেখেই মনে হচ্ছে ফরিদা শান্তিতে ঘুমুচ্ছে। জীবনানন্দ দাশের লাশকাটা ঘরের ঘুম—
এই ঘুম চেয়েছিল বুঝি! রক্তফেনা-মাখা মুখে মড়কের ইঁদুরের মতাে ঘাড় পুঁজি আঁধার ঘুজির বুকে ঘুমায় এবার;
কোনােদিন জাগিবে না আর। ফরিদা টানা দু’ঘণ্টা ঘুমুল । সময়টা আন্দাজ করে বলছি। আমার হাতে ঘড়ি নেই। হাসপাতালের এই কেবিনেও ঘড়ি নেই। দু’ঘণ্টা আমি চুপচাপ বসে রইলাম। ঘুমের মধ্যে মানুষ নড়াচড়া করে। এপাশ ওপাশ করে।
চোখের পাতা কখনাে দ্রুত কাঁপে কখনাে অল্প কাঁপে। ফরিদার বেলায় সে-রকম কিছুই হলাে । তার নিঃশ্বাসের শব্দ হলাে না। চোখের পাতাও কাঁপল না। এক সময় জেগে উঠে বিড়বিড় করে বলল, পানি খাব।
আমি পানি খাওয়ালাম। তার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বললাম, ঘুম। ভালাে হয়েছে ?
সে আসে ধীরে খন্ড-২৩
ফরিদা বলল, হ্যা। ঘুমের মধ্যে কোনাে স্বপ্ন দেখেছ?
আমি কতক্ষণ ঘুমিয়েছি ? দু’ঘণ্টার মতাে।
ছিঃ ছিঃ আপনি দু’ঘণ্টা বসেছিলেন। আমার খুবই লজ্জা লাগছে। চলে গেলেন না কেন?
তুমি বসে থাকতে বলেছ। | থ্যাংক অ্যা। আমি যে এতক্ষণ ঘুমিয়েছি নিজেই বুঝতে পারি নি। আমার কাছে মনে হচ্ছিল— চোখ বন্ধ করেই জেগে উঠেছি। মৃত্যু কাছাকাছি চলে এলে সময়ের হিসেবে গণ্ডগােল হয়ে যায়। আমার বােধহয়…
ফরিদা কথা শেষ না করে হাসল।
আমি বললাম, তুমি আমাকে কিছু গােপন কথা বলার জন্যে বসিয়ে রেখেছিলে। আমার ধারণা কথাগুলি তুমি এখন বলতে চাও না।।
আপনার ধারণা ঠিকই আছে।
আমি কি এখন চলে যাব।
যা, চলে যান।
অনেকক্ষণ তােমার সঙ্গে ছিলাম, তুমি কিন্তু একবারও জানতে চাও নি ইমরুল কেমন আছে।
ফরিদা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ইমরুল কেমন আছে? আমি বললাম, ভালাে। ফরিদা বলল, আপনার সঙ্গে আমার আর মনে হয় দেখা হবে না। আমি বললাম, আমারও মনে হয় দেখা হবে না।
ফরিদা বলল, আপনাকে নিয়ে আমি খুবই হাসির একটা স্বপ্ন দেখেছিলাম। স্বপ্নের কথা এখন আর আপনাকে বলতে ইচ্ছা করছে না। তবে আমি একটা কাজ করব লিখে ফেলব। তারপর লেখাটা আপনাকে পাঠাব। হিমুভাই, আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আমি চেষ্টা করলে গল্প-উপন্যাস লিখতে পারব। বিছানায় শুয়ে মজার মজার সব গল্প আমার মাথায় আসে।
সে আসে ধীরে খন্ড-২৩
লিখে ফেললেই পার। লজ্জা লাগে বলে লিখতে পারি না। লজ্জা লাগে কেন?
বুঝতে পারছি না কেন। আচ্ছা ঠিক আছে, লজ্জা লাগুক বা না লাগুক আমি একটা গল্প লিখে ফেলব।
করে লিখলেন— ‘আর কতদূর?’ আমি আগের চেয়েও মধুর ভঙ্গিতে হাসলাম। মধুরতম হাসি খালু সাহেবের গায়ে মনে হলাে পেট্রোল দিয়ে আগুন ধরিয়ে দিল।
আমি বললাম, খালু সাহেব এত অস্থির হচ্ছেন কেন? দৃশ্য দেখুন। কী সুন্দর দৃশ্য! বাংলার গ্রাম। পল্লীবধূ কলসি কাঁখে নদীতে পানি আনতে যাচ্ছে। গরু অলস ভঙ্গিতে শুয়ে শুয়ে জাবর কাটছে। আকাশে দিনের শেষের কনা সুন্দর আলাে ঝলমল করছে। ঐ কবিতাটা কি আপনার মনে আছে খালু সাহেব।
সে আসে ধীরে খন্ড-২৩
তুমি যাবে ভাই- যাবে মাের সাথে আমাদের হােট গাঁয়।’ | খালু সাহেব ঘোঁৎ করে এমন এক শব্দ করলেন যে গরুর গাড়ির গারােয়ান চমকে উঠে বলল, উনার ঘটনা কী?
ঘটনা ব্যাখ্যা করলাম না, তবে আমি চুপ করে গেলাম। খালু সাহেবকে আর ঘটানাে ঠিক হবে না। যে-কোনাে সময় দুর্ঘটনা ঘটে যাবে। | আমরা গরুর গাড়ি থেকে নামলাম সন্ধ্যা মিলাবার পর। এখন হাঁটাপথ। ক্ষেতের আল বেয়ে হাঁটা। খালু সাহেবের ইটালিয়ান জুতা কাদাপানিতে মাখামাখি হয়ে গেল।
তার চেয়েও ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটল বিল পার হওয়ার সময়। খাল সাহেবের বাঁ পা হাঁটু পর্যন্ত কাদায় ডেবে গেল। পা সহজেই টেনে তােলা গেল কিন্তু সেই পায়ের জুতা কাদার ভেতর থেকে গেল। আমি শান্ত গলায় খাল সাহেবকে বললাম, এক পায়ের জুতা কি থাকবে? না-কি এটা ফেলে আমার মতাে খালি পায়ে যাবেন? খালু সাহেব আমার দিকে তাকিয়ে কিছু নিশ্চয়ই বললেন।
Read More