হুমায়ূন আহমেদের লেখা সে আসে ধীরে খন্ড-২৬

না, আমাদের মধ্যে কোনাে ঝগড়াঝাটি হয় নি। সবার কাছে আমাদের পরিচয় আদর্শ দম্পতি। আপনার বন্ধু ধরেই নিয়েছিল তার প্রতি ভালােবাসায় আমার হৃদয় টলমল করছে। সে হয়তাে ভেবেছে, যে বধূ তার স্বামীর সঙ্গে দীর্ঘ দশ বছরে একটি বারও উঁচু গলায় কথা বলে নি, কঠিন করে।

তাকায় নি সেই তরুণী বধূর হৃদয় ভালােবাসায় পূর্ণ। বােকা মানুষটা বুঝতেও পারে নি ব্যাপারটা কী। একদিক দিয়ে ভালােই হয়েছে জীবন তাে চলেই যাচ্ছে। কোথাও থমকে যাচ্ছে না। যখন অসুখটা হলাে আমি বুঝে গেলাম সময় চলে এসেছে, তখন হাহাকারে হৃদয় পূর্ণ হলাে। মনে হলাে- কিছু না পেয়েই চলে যাচ্ছি ?

সে-আসে-ধীরে 

তারপর একটা ঘটনা ঘটল। বিশেষ ঘটনা। কিশােরী বয়সে যে মানুষটাকে পাগলের মতাে ভালােবেসেছিলাম সে হঠাৎ উদয় হলাে তখন। তাকে দেখে কী যে ভালাে লাগল! ইচ্ছা করল চিৎকার করে আনন্দে কেঁদে উঠি।

হিমুভাই, আপনি শুনলে খুবই অবাক হবেন, হয়তাে বা খানিকটা কষ্টও পাবেন, মানুষটাকে দেখে আমার মনে হলাে— ইস, সে যদি আমাকে নিয়ে অনেক দূরের কোনাে দেশে চলে যেত। যেখানে কেউ আমাকে চিনবে না। যে দেশে আমরা দু’জন ছাড়া আর কেউ নেই। (এমনকি ইমরুলও নেই।) 

সে আসে ধীরে খন্ড-২৬

আপনার কাছে অকপটে সত্যি কথা বললাম। এখন নিজেকে ভারমুক্ত মনে হচ্ছে। রাশেদুল করিম নামের মানুষটা মহা ব্যস্ত হয়ে গেছে আমাকে বাইরে নিয়ে চিকিৎসা করাতে। খুব লােভ হচ্ছে। চিকিৎসা হােক বা না হােক তার সঙ্গে কিছু দিন তাে থাকতে পারব! রােজ কিছুক্ষণ তার সঙ্গে  

কথা বলতে পারব। (আমি খুব খারাপ, তাই না হিমুভাই ?) আমার ভেতর যত লােভই থাকুক এই কাজ আমি করব না। ভালাে না বেসে একধরনের অপমান আমি ইমরুলের বাবাকে করেছি। বেচারা সেটা বুঝতে পারে নি বলে কষ্ট পায় নি। এখন যদি আমি রাশেদের টাকায় চিকিৎসা করি ইমরুলের বাবা কষ্ট পাবে। এই কষ্ট আমি কখননা, কোনােদিনও দিব না। এই সম্মানটুকু আমি তাকে করব। 

শুনতে পেয়েছি ইমরুলকে আপনি আসমা হক নামের এক মহিলার কাছে রেখে এসেছেন। এই মহিলা তাকে পালক পুত্র হিসেবে বড় করবে। এইসব নিয়ে আমি মাথা ঘামাচ্ছি না। কারণ আমি নিশ্চিত জানি- ইমরুলের জন্যে যা ভালাে আপনি তাই করবেন। মানুষ আপনাকে নিয়ে অনেক অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে কিন্তু আমি জানি মানুষের জন্যে যা শুভ যা কল্যাণকর আপনি সারাজীবন তাই করে এসেছেন।

সে আসে ধীরে খন্ড-২৬

আমি মাঝে মাঝে এই ভেবে অবাক হই যে পৃথিবীতে আপনার মতাে ভালাে মানুষ যেমন আসে, আমার মতাে খারাপ মানুষও আসে। এইভাবেই পৃথিবীতে সাম্যাবস্থা বজায় থাকে। 

আপনার স্নেহধন্যা 

ফরিদা 

ফরিদার চিঠি ভালােমতােবােঝার জন্যে দ্বিতীয়বার পড়া উচিত। পড়া গেল না, কারণ আমার (মহান!) শিক্ষক বাবা এই বিষয়ে কঠিন নির্দেশ দিয়ে গেছেন— 

বাবা হিমালয়, পৃথিবীর যে-কোনাে দৃশ্য প্রথমবার দেখিবে। একবার দৃষ্টি ফিরাইবার পর দ্বিতীয়বার তাকাইবে না। তাহাতে মায়া তৈরি হইবে। মায়া তৈরি হওয়ার অর্থই বিভ্রম ও ভ্রান্তি তৈরি হওয়া। ভ্রান্তি উদয় হওয়ার অর্থই হইল ভ্রান্তি বিলাস তৈরি হওয়া । বিলাসের হাতে নিজেকে সমর্পণ করা। 

একটি অতি সাধারণ উদাহরণ দেই। মনে কর তুমি একজন প্রবাসীতােমার অতি নিকট একজন তােমাকে একটি পত্র দিয়াছেন। পত্রটি দীর্ঘ, কিন্তু কিছুটা জটিল। পাঠোদ্ধারের জন্যে তােমাকে পত্রটি দ্বিতীয়বার পড়িতে হইবে। ভুলেও এই কাজ করিবে না। লাভের মধ্যে লাভ হইবে তুমি মায়ায় জড়াইবে। পত্র তা সে যত মূল্যবানই হােক পাঠ সমাপ্ত মাত্র কুচি কুচি করিয়া হাওয়ায় উড়াইয়া

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা সে আসে ধীরে খন্ড-২৭

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *