হুমায়ূন আহমেদের লেখা সে আসে ধীরে খন্ড-২৯

ইমরুলকে দত্তক নেবার আমাদের আর প্রয়ােজন নেই- এটা জানানাের জন্যে। 

আপনার স্বামী চার্লি সাহেব যে বললেন, এডপসান পেপারস রেডি করতে। সে এখনাে কিছুই জানে না। আমি যে কনসিভ করেছি এটা তাকে জানানাে হয় নি। শুধু আমি জানি, আমার গাইনােকলজিস্ট জানে আর আপনি জানেন।

সে-আসে-ধীরে

আপনার স্বামীকে জানান নি কেন? 

আসমা হক বললেন, আমি ঠিক করে রেখেছিলাম এই অদ্ভুত আনন্দময় খবরটা প্রথম আপনাকে দেব। আপনাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না বলেই চার্লিকে খবরটা দেয়া হয় নি। আপনি চলে যাবার পর তাকে খবরটা দেব। 

আমি চলে যাই। তাড়াতাড়ি তাকে খবরটা দিন। 

আসমা হক বললেন, আমি আপনার জন্যে কিছু করতে চাই। আল্লাহ আমাকে যে উপহার পাঠিয়েছেন হয়তাে তার সঙ্গে আপনার কোনাে সম্পর্ক নেই। তারপরেও আমি আপনার জন্যে কিছু করতে চাই। আপনি আমার কাছে কিছু একটা চান। 

এখন চাইতে হবে ? হ্যা, এখন।

সে আসে ধীরে খন্ড-২৯ 

আসমা হকের চোখে পানি এসে গেছে। তিনি চোখের পানি মুছতে মুছতে বললেন, হ্যা, এখন চাইতে হবে । 

আমি বললাম, ইমরুলের মা খুব অসুস্থ। তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করবেন। অনেক টাকার ব্যাপার, হয়তাে তাকে দেশের বাইরেও নিতে হতে পারে। 

আসমা হক কঠিন গলায় বললেন, টাকা-পয়সার ফিরিস্তি দিতে তাে আপনাকে বলি নি। আপনি আমার কাছে কী চান জানতে চাচ্ছি। 

এইটাই চাচ্ছি। নিজের জন্যে কিছু কি চাইবার আছে ? আছে। কিন্তু সেটা আপনি পারবেন না । অবশ্যই পারব । কেন পারব না ? বলুন কী চান? 

আমার খুব শখ চাদে যাওয়া। চাঁদ থেকে আমাদের পৃথিবীটা কেমন দেখায় সেটা দেখা। আমাকে চাঁদে পাঠাতে পারবেন? 

আসমা হক অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থেকে দুঃখিত গলায় বললেন, , পারব না। আমার ক্ষমতা থাকলে অবশ্যই আপনাকে চাদে পাঠাতাম। 

আমি এখন উঠি ? লবি থেকে আপনার স্বামীকে পাঠাচ্ছি। তাকে আনন্দের সংবাদটা দিন । আপনি যদি কিছু মনে না করেন আমি আপনার স্বামীকে একটু রাগিয়ে দিয়ে যাব। 

আসমা হক বিস্মিত হয়ে বললেন, কেন ? আমি হাসতে হাসতে বললাম, মজা করতে ইচ্ছা হচ্ছে। আপনি কি সব সময় মজা করেন ? 

করতে ইচ্ছা করে। করতে পারি না।। আমি আপনার সঙ্গে মাঝে মাঝে খুব খারাপ ব্যবহার করেছি। আপনি কি খারাপ ব্যবহারের কথাগুলি মনে রাখবেন ? 

সে আসে ধীরে খন্ড-২৯ 

আপনি চাইলে মনে রাখব। আপনি কি চান ? 

ভদ্রমহিলা জবাব দিলেন না। চোখ মুছতে লাগলেন। এই মহিলার মনে হয় কান্না রােগ আছে। 

ফজলুল আলম সাহেব রাগীমুখে লবিতে চায়ের কাপ হাতে বসেছিলেন। আমি তার সামনে এসে দাঁড়াতেই তিনি ভুরু কুঁচকে তাকালেন। আমি বললাম, এই চার্লি, তােমাকে তােমার বউ ডাকে। আজ তােমার খবর আছে। তােমাকে সে প্যাদানি দিবে। 

ভদ্রলােক হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছেন। টপ করে শব্দ হলাে। তার হাত থেকে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির কপিটা মেঝেতে পড়ে গেল। 

আমার বিছানার পাশে কে যেন বসে আছে। সূর্যের আলাে ভালােমতাে ফোটে নি। যে বসে আছে তাকে পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে না। তারপরেও চেনা চেনা লাগছে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেই লােকটাকে চিনে ফেলব। আমি তাকিয়ে আছি।

হঠাৎ মনে হলাে এত কষ্ট করে চেনার কি কোনাে প্রয়ােজন আছে? শীত শীত লাগছে। গায়ের উপর পাতলা চাদর থাকায় আরামদায়ক ওম। চেনাচেনি বাদ দিয়ে আরাে খানিকক্ষণ ঘুমানাে যেতে পারে। বিছানার পাশে যে বসে আছে বসে থাকুক। ঘুম ভাঙার পর দিনের প্রথম আলােয় তার সঙ্গে পরিচয় হবে। দিনের প্রথম আলােয় বিভ্রম থাকে না। পরিচয়ের জন্যে বিভ্রমহীন আলাের কোনাে বিকল্প নেই। 

সে আসে ধীরে খন্ড-২৯ 

আমি চাদরটা মাথা পর্যন্ত টেনে দিলাম। আমার মাথার ভেতর জটিল গবেষণামূলক আলােচনা আসি আসি করছে। তাকে প্রশ্রয় না দিয়ে আরাম করে কিছুক্ষণ ঘুমানাে দরকার। পৃথিবীতে সবচে’ সুখী মানুষ কে?’ যার কাছে ঘুম আনন্দময় সে-ই পৃথিবীর সবচে’ সুখী মানুষ। কথাটা কে বলেছেন? বিখ্যাত কেউ নিশ্চয়ই বলেছেন। সাধারণ মানুষ যত ভালাে কথাই বলুক কেউ তা বিবেচনার ভেতরও আনবে না। কথাটা বলতে হবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ একজনকে। 

 

Rad More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা সে আসে ধীরে শেষ খন্ড

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *